মেঘের দেশ মেঘালয়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি রাজ্যের নাম। মেঘ ও পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্যের জন্য ভারতের মধ্যে বিখ্যাত এ রাজ্যটি। পুরো রাজ্যটি পাহাড় আর পাইন গাছের বনে ঘেরা। তাই এখানে মেঘের পাশাপাশি সুউচ্চ পাহাড় থেকে বেয়ে পড়া ফল্স বা ঝর্ণাধারার শেষ নেই। বিশেষ করে মেঘালয়ের রাজধানী শিলং শহর এবং পুরো খাসিয়া পাহাড়জুড়ে রয়েছে ছোট-বড় হাজারও ঝর্ণা। শিলংয়ের বিভিন্ন রাস্তায় ছুটে চলার সময় রাস্তার এপাশে-ওপাশে তাকালে চোখে পড়বে অসংখ্য ঝর্ণা বা ফল্স। এসব ঝর্ণার পানি পাহাড় থেকে আছড়ে পড়ার শব্দ অন্য রকম অনুভূতি জাগায় মনে। এমনি একটি ঝর্ণা বা ফল্সের নাম ‘এলিফ্যান্ট ফল্স’ বা ‘হাতির ঝর্ণা’। শিলংয়ের অসংখ্য দর্শনীয় ও বেড়ানোর স্থানের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ওই এলিফ্যান্ট ফল্স বা হাতির ঝর্ণা।
২০১৮ সালের ৩০ জুলাই আমরা তিন বন্ধু মিলে অনেকটা হঠাৎ করেই মেঘালয়ের শিলং ভ্রমণে গিয়েছিলাম। শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও সীমান্তের ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডালু ইমিগ্রেশন পয়েন্ট দিয়ে তুরা শহর হয়ে গিয়েছিলাম মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে। বাংলাদেশের সিলেট জেলা হয়েও শিলং যাওয়া যায়। কিন্তু বাড়ির পাশ দিয়েই সহজ রাস্তা থাকায় আমরা নাকুগাঁও-ডালু সীমান্ত হয়ে শিলং যাই। যদিও মেঘালয়ের তুরা শহর থেকে আসাম প্রদেশের গুয়াহাটি হয়ে অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হয় শিলংয়ে, তবুও পূর্ব মেঘালয় ও আসামের বিভিন্ন মনোরম দৃশ্য দেখে দেখে ভ্রমণের বাড়তি আনন্দ উপভোগ করা যায়।
আমরা আমাদের শহর থেকে সকাল সকাল রওনা হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের ইমিগ্রেশন, কাস্টমস ও বিজিবি-বিএসএফ চেকিং শেষ করে সীমান্ত থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে ভারতের বারাঙ্গাপাড়া বাজার থেকে ১০০ টাকার ভাড়ায় ১৪ সিটের উইঞ্জার (স্থানীয় ভাষায়) বা মাইক্রোবাস ধরে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তুরা শহরে পৌঁছে যাই। সেখানে পৌঁছে প্রথমেই শিলংয়ের রাতের বাসের টিকিট সংগ্রহের জন্য গিয়ে রাতের বাস না পেয়ে পরদিন ভোরে বাসের টিকিট কেটে তুরার সবচেয়ে ভালো হোটেল ‘সুন্দরী’তে উঠি। পাহাড়ি শহর তাই রাত ৮ টার মধ্যে নীরব হয়ে যায় শহর। আমরা কিছুক্ষণ হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাতের তুরা শহর দেখে রাত ১২ টা পর্যন্ত রুমের ভেতর বসে আড্ডা দিয়ে শুয়ে পড়ি। দেশের বাইরে এবং রোমাঞ্চকর মেঘের দেশে বেড়াতে যাচ্ছি সেসব চিন্তা করতে করতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ি।
পরদিন ভোরে উঠে যথারীতি তৈরি হয়ে হোটেলে বাইরে বেড়িয়ে দেখি নাস্তা খাওয়ার জন্য কোন হেটেল খোলা নেই। তবে ফুটপাতে গরম গরম লুচি ও আলুর দম বিক্রি হচ্ছে। এসব ফুটাপাতের দোকানগুলো মূলত তুরা শহরের ভোরের বাসের যাত্রীদের উদ্দেশেই বসে। কি আর করা অন্যান্যদের মতো আমরাও ওই লুচি-দম নাস্তা সেরে এক কাপ চা পান করে বাসের সিটে বসে পড়ি।
সকাল ৮টায় বাসে চড়ে শিলংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হই। প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরত্বের পথে মেঘালয়ের ও আসামের তিনটি স্থানে (ধাবা বা হোটেল) খাবারের বিরতি দিয়ে বিকাল ৩টার মধ্যে শিলং শহরে পৌঁছে যাই। আমরা যে সময়টায় পৌঁছি সে সময়টা হোটেল পাওয়া দুষ্কর। কারণ পর্যটন এলাকার সব হেটেলেই বেলা ১২ টার মধ্যে হোটেল খালি হয় এবং বিকেলের মধ্যে আবারও তা বুকিং হয়ে যায়। আমাদের প্রথম ভ্রমণ তাই বুঝতে পারিনাই যে, বিকেলে গেলে হোটেল পাওয়া দুষ্কর। তাই অনেক খোঁজাখুঁজি করে পুলিশ বাজার নামক স্থানে ‘পাইন বোরো’ নামের একটি হোটেলে উঠি। হোটেল ভাড়াও অনেক বেশি। ডবল বেডের রুম ভাড়া ১ হাজার ৫ শত থেকে দুই হাজার। কিন্তু ত্রিপুল বেডের প্রতি রুম ভাড়া ২ হাজার ৫ শত থেকে ৩ হাজার টাকা। কিন্তু কি আর করা ভ্রমণে এসে পয়সার হিসেব করা যাবে না।
এদিকে আমাদের হোটেল খুঁজতেই বিকেল গড়িয়ে যায়। তাই হোটেলে উঠে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় আশেপাশের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য ও শহরে কিছুটা ঘোরাঘুরি করে হোটেলে ফিরি রাত ৯টার মধ্যেই। পরদিন সকাল ৮টার দিকে আমার পুর্ব পরিচিত ঝিনাইগাতির মরিয়মনগরের বিজন জেসপারের মাধ্যমে স্থানীয় গারো নেতা ও মেঘালয়ের টিকিরকিল্লা এলাকার সাবেক এমএলএ মাইকেল টি. সাংমা আমাদের হোটেলে আসেন। এসময় তিনি বলেন, ‘বিজন এর দুলাভাই তুরার অধিবাসি বিপুল মারাক আমার ঘনিষ্ট বন্ধু। তারই অনুরোধে আপনাদেরকে নিয়ে শিলং বেড়ানোর দায়িত্ব পড়েছে।’ কথা মতো কাজ তার সাথে বেড়িয়ে পড়ি শিলং এর বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান দেখতে। দিনব্যাপী তার সাথে তার নিজস্ব প্রাইভেট কারে করে শিলংয়ের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে এসে সন্ধ্যার ঠিক আগে শহরের পাশেই এলিফ্যান্ট ফল্স বা হাতির ঝর্ণা দেখতে যাই।
মেঘালয়ের পূর্ব খাসিয়া পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ছে এ এলিফ্যান্ট ফল্স বা হাতির ঝর্ণা। স্থানীয় ইতিহাস সূত্রে জানাগেছে, তৎকালে ভারতের খাসিয়া রাজ্যে এ ঝর্ণাধারাকে বলা হতো ‘কা খাসাইদ লাই পাতেং খোসিউ’, যাকে বাংলায় বলা যায় ‘তিন ধাপের ঝর্ণা’। এখানে তিনটি ধাপে পাথর বেয়ে নামে পানি। পরবর্তীকালে ব্রিটিশরা এ ঝর্ণার নাম দেয় এলিফ্যান্ট ফল্স বা হাতির ঝর্ণা। ব্রিটিশদের ‘এলিফ্যান্ট ফল্স’ নাম দেওয়ার কারণ হলো, তৎকালে মূল ঝর্ণার বাঁদিকে একটি বড় পাথর ছিল। পাথরটা দেখতে হুবহু হাতির মতো ছিল। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে সেই পাথরখ-টি ভেঙে পড়ে। ফলে এখন সে পাথরটির আর কোন চিহ্ন নেই। কিন্তু এখনও নাম রয়ে গেছে এলিফ্যান্ট ফলস্ বা হাতির ঝর্ণা।
শহরের পুলিশ বাজার হোটেল এলাকা থেকে আধা ঘণ্টা পথের দূরত্বে এলিফ্যান্ট ফল্স। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি দর্শনার্থী ও পর্যটক এ ঝর্ণার সৌন্দর্য অবলোকন করতে আসেন। এখানের তিনটি ঝর্ণার প্রধানটি সমতলের মতো পাহাড় থেকে নেমে এসে পানির ধারায় বয়ে যায় নিচের দিকে। এরপর তিনটি স্তরে নেমেছে ঝর্ণাগুলো। তবে মূল এলিফ্যান্ট ফল্স দেখতে হলে নামতে হয় প্রায় ৩০০ সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ের নিচে। সেখানে নামলেই শুরু হয় হিম শীতল অনুভূতি। চারদিকেই পাথর চুয়ে পড়ছে পানি। আছড়ে পড়া পানির শব্দ আর টলটলে জলরাশির স্রোতধারা মনকেও শীতল করে দেয়। আমরা কিছুক্ষণ অন্যান্য দর্শনার্থীর মতো ওই ঝর্ণার রূপ দর্শন এবং পাহাড় চুয়ে পড়া ঠাণ্ডা পানি ছুঁয়ে দেখলাম। তিন ধাপে সিঁড়ি বেয়ে নামে নেমে ঝর্ণা দেখার সময় ঝর্ণার কলতানে মনের ভেতর অন্যরকম শিহরণ জাগে। ঝর্ণার পানিতে নেমে এবং বিভিন্ন সিঁড়ির ধাপে দাঁড়িয়ে পর্যটকদের সেলফি তুলার হিড়িক লেগে যায়। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃৃদ্ধ সবাই যেন মাতোয়ারা হয়ে উঠে ওই ঝর্ণার স্রোতধার দেখে। এখানে এসময় অনেক পরিবার পরিজনের পাশপাশি বন্ধু-বান্ধবী এবং প্রিয়তমাকেও নিয়ে আসে এ ঝর্ণার শীতল পরশ পেতে। ক্ষণিকের আড্ডায় জমে উঠে সবাই। কেউ কেউ আবার এফবিতে লাইভ দেয় তাদের প্রিয়জনদের দেখাতে। আমাদের সারা দিনের পরিশ্রান্ত দেহ ও মন যেন ঝর্ণার শীতল পানির মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আমরা কিছুক্ষণ আশপাশের বিভিন্ন পাথরের শ্যাওলা পড়া পাহাড়ের গায়ে হাত বুলিয়ে হাতির ঝর্ণার শীতল অনুভব নেই। এ ঝর্ণায় বছর জুড়েই জলধারা থাকে। তবে বর্ষায় পানির প্রবাহ একটু বেশি থাকে।
আমাদের এই ভ্রমণের পর ২০১৯ সালের ১৭ আগস্ট আমার পরিবার নিয়ে শিলং বেড়াতে আসলে এখানে আবারও সেই হিম শীতল ঝর্ণার পরশ নিয়েছি। আমার স্ত্রী রত্না এবং ছোট ছেলে রাফসান তো ওই ঝর্ণার পানিতে পা ভেঁজাতে গিয়ে আর উঠতেই চায়নি। সন্ধ্যা হয়ে আসছে বিধায় পরে তারা উঠে আসে। বিশেষ করে আমার স্ত্রী ও ছোট ছেলের এই প্রথম উঁচু পাহাড় থেকে আছড়ে পড়া ঝর্ণা দেখা হয়। তাই তারা অবাক দৃষ্টিতে সেখান থেকে ফিরে আসার সময় বার বার পেছন ফিরে তাকিয়ে ছিল।
এদিকে চারদিকে আঁধার নেমে আসার আগেই ফেরার পালা। তাই সেখান থেকে দ্রুত বের হয়ে আবারও তুরার নাইট বাস ধরে পরদিন ভোরে চলে এলাম বাড়ির পাশের তুরা শহরে। সেখানে এক রাত থেকে পরদিন সকাল ১০ টার দিকে বারাঙ্গাপাড়া ডালু বর্ডার হয়ে বাংলাদেশের নাঁকুগাও এবং সব শেষে দেশের মাটির নিজ শহরে পা রাখলাম পরদিন দুপুরে।