শুভ্রতার কথা আসলেই আমাদের চিন্তায় ভেসে উঠে কাশফুলের শুভ্রতা। শাদা মেঘের উড়া উড়ি। যেনো সে বয়ে নিয়ে যায় জান্নাতী শুভ্রতা। যেখানে কেবলী পবিত্র এক অনুভূতি। পরিস্কার নীল আকাশে শুভ্র মেঘের ফুল ফুটে। জমিনেও সবুজ প্রকৃতির মাঝে কাশফুলের শুভ্রতা। এই জন্যই সৃজনশীল মানুষ এই ঋতুকে রাণী বলে। বাংলার আকাশে যখন এই বৃষ্টি এই মেঘ। এটা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি। তিনি বলেছে ‘আমি যদি বেঁচে থাকি তবে এরকম এক প্রকৃতিতে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু আমার অনেক কাজ। সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তিব্বত জয় করেই আমি আবার বাংলায় ফিরে আসবো। আর আল্লাহ যদি হায়াত দেন তবে বাংলাতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে চাই।’

শহৎকাল এমন এক ঋতু যার ভেতর বাহির সবই শুভ্র। তার আকাশ থাকে পরিস্কার, নীল নয়না আকাশে টুকরো টুকরো শাদা মেঘের ভেলা। মেঘকাটা প্রকৃতিতে থাকে সবুজ পাতার সজীবতা। কমতে থাকা বিলে ঝিলে শাদা শাদা শাপলা ফুল। যেনো স্বচ্ছ কাচের উপর বসে আছে সুন্দরী শাপলাফুল।

এমন দৃশ্য দেখে সৃজনশীল মানুষের হৃদয়ে দোল খায় শুভ্র চিন্তা। সে চিন্তায় মগ্ন হয় সৃজনে। লিখে কবিতা, গল্প, গীতিকবিতা আরো কতো কী! যেনো এই প্রকৃতি তাকে দিয়ে লিখেয়ে নেই শুভ্রপ্রেমের বয়ান। ‘মোলাকাত’ ডটকম শুভ্র শরৎ নামে শরৎ সংখ্যার আয়োজন করে। লেখক বন্ধুরা তাদের সৃজনক্রিয়া আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সেই সকল সৃজিত লেখা নিয়ে আমরা প্রকাশ করলাম শুভ্র শরৎ ১৪২৭ : ৩য় পর্ব। এ সংখ্যায় আছে কুড়ি জন লেখকের লেখা। আমরা আশা করি লেখক-পাঠক সকলেরই ভালো লাগবে। সকলকে শরতের শুভ্র শুভেচ্ছা। আবার মোলাকাত হবে শুভ্র শরৎ ১৪২৭ এর ৪র্থ পর্বে সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

আফসার নিজাম, সম্পাদক-মোলাকাত ডটকম

সূ চী প ত্র

এসো শারদ প্রাতের পথিক :: কাজী নজরুল ইসলাম
শরৎ :: মহাদেব সাহা
বালিকাদের ব্যালে নৃত্য :: মিনার মনসুর
শরৎ :: কামরুজ্জামান কামু
শরৎকন্যা :: তৈমুর খান
শরতের মেঘ :: মনসুর আজিজ
শরতের কাজকাম :: মারজুক রাসেল
শরৎকালের কবিতা একখানা :: রুবী রহমান
শারদীয় :: শামসেত তাবরেজী
রক্তশোভা শরৎ :: পিয়াস মজিদ
মেঘের ব্যাপারি :: মিহির মুসাকী
নদীবৃষ্টির বনিবনা :: অপরাহ্ণ সুসমিতো
শরৎ বন্দনা :: আনোয়ার কামাল
মধুক্ষণ :: তাহমিনা বেগম
যতই সরাও দূরে :: কিশলয় গুপ্ত
শরৎ আসে :: মুহাম্মদ ইব্রাহিম বাহারী
শরতীয় প্রতীতি :: জাফর পাঠান
কাশফুলের তটে :: ওয়াসিম সেখ
শরৎ মেয়ে :: মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান
হায় রে শরৎ :: শিবলী মোকতাদির
…………………………………………..

এসো শারদ প্রাতের পথিক
কাজী নজরুল ইসলাম

এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে।
এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ-রথে।।
দলি, শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল
নীল লাবনি ঝরায়ে চলচল এসো অরণ্য পর্বতে।।
এসো ভাদরের ভরা নদীতে ভাসায়েকেতকী পাতার তরণী
এসো বলাকার রঙ পালক কুড়ায়ে রাহি’ছায়াপথ-সরণি।
শ্যাম শদ্যে কুসুমে হাসিয়া এসো হিমেল হাওয়ায় ভাসিয়া
এসো ধরনীরে ভালোবাসিয়া দুর নন্দন-তীর হতে।।
…………………………………………..

শরৎ
মহাদেব সাহা

কাশবনে শরৎ নেই, শরৎ আমার মনে
আমি তাকে প্রথম দেখি ভাদ্রের বর্ষণে,
উছলে পড়ে জ্যোৎস্না জলে, নৃত্য করে চাঁদ
তারই জন্য আমার এই ব্যাকুল সেরেনাদ;
উঠানভরা শারদশশী আমায় বলে—আয়
ভালোবাসার পাঠ নিয়েছি শারদ–পূর্ণিমায়,
সেই শরতের গন্ধে আমি এমন দিশেহারা
দুচোখ ভরে ফোটে আমার হাজার রাতের তারা;
এই শরতে তোমার চোখে শিউলিফোটা ভোর
শারদনিশির ডাকে আমি ছেড়েছি ঘরদোর।

শরৎ তোমার মিষ্টি হাতের পরশ যদি পাই
সহস্র রাত জেগে থাকি, আনন্দে গান গাই,
শরৎ তোমায় কিনেছি যে চোখের জলের দামে
ভালোবাসার হলুদ চিঠি পাঠাই নীল খামে,
কাশবনে শরৎ নেই, শরৎ আমার মনে
শরৎ তোমায় বেধে রাখি জন্মের বন্ধনে।
…………………………………………..

বালিকাদের ব্যালে নৃত্য
মিনার মনসুর

যদি বলি অন্ধকার—তারা নেই মিথ্যে বলা হবে।
শিশুটি হাসে। শিশুটি আজও হাসে। কামরাঙা মেয়েটি ঠিক বাড়িয়ে দেয় তার ভেজা ঠোঁট। তখনই তিমির জটিল জঠর ফুঁড়ে তারারা ফোটে আর প্লাস্টিকের বাগানজুড়ে চলতে থাকে নেত্রকোনানিবাসী গুণমুগ্ধ শুভ্রবসনা বালিকাদের ব্যালে নৃত্য। তুমি চাও বা না চাও।
এদিকে আমাজনভুক একটি প্লাস্টিকের দানব টপাটপ গিলে খাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের ষড়বর্ণ যত গান আর কাজলা দিদির বিখ্যাত সেই বাঁশবাগান। তার মাথার ওপর বেমক্কা ঝুলে থাকা চাঁদটিকে নিয়ে শিশুরা বড় আতঙ্কে আছে। তুমি মানো বা না মানো।
…………………………………………..

শরৎ
কামরুজ্জামান কামু

কার্যকারণের মতো এ জীবনের
গভীরে ডুব দিয়ে, পাখি
পেয়েছ নীল আকাশ, ডানার উদ্ভাস
দুইটি অবারিত আঁখি

এই যে ব্রিজ থেকে ওই যে কাশবন
শরৎ এল নাকি বেলা
আহা কী সুন্দর নদীর দুই তীর
নামো না করো না গো খেলা

উতলা এ হৃদয় এখানে ব্রিজপারে
যদি বা রেখে যাই কভু
খেলতে এসে তাহা গোপনে তুলে নিয়ে
আবার ফেলে দিয়ো, প্রভু
…………………………………………..

শরৎকন্যা
তৈমুর খান

এখন তোমার নীল দেখতে পাই না আর
কখন শরৎকাল এসে চলে যায়
কখন সোনারোদ ঝরে কাশের হাওয়ায়

এখন শুধু চোখের সামনে জমে থাকে মেঘ
ধোঁয়ার মতন কথাবার্তা তাদের
কীরকম অবিশ্বাস তাদের ছলনায়

মুঠো মুঠো ধানশিষের শিশির ভেজা গানে
রাস্তা ডাকে না আর
রাস্তা সব বিক্রি হয়ে গেছে কংক্রিটের সোপানে

তোমার ভ্রমর নেই, শালুক ফুল নেই
স্মৃতিরা সাঁতার কেটে দিঘি পার হয়
দিঘির জলেই ভাসে মৃত বাল্যকাল আমাদের

আমার নিজস্ব খাতাখানি এখনও হারাইনি
পুজো আসছে বলে এবারও কি নাটক হবে না?
আমাদের প্রথম অভিনয়, মঞ্চের চারিপাশে মুগ্ধ হাততালি!
…………………………………………..

শরতের মেঘ
মনসুর আজিজ

এসো, শরতের মেঘ, কোল জুড়ে এসো
কোলে বসে একটুকু হেসো
আমার পশম দেহ, তোমার নরম
তুমি তো আমার প্রিয় কত না পরম।

এসো, তুলতুলে মেঘ, পাশে এসে বসো
কিবা পেলে কাছে এসে গুন-ভাগ কষো
শাদাফুল সুরভিত তোমায় দিলাম
নরম পলকটুকু শুধুই নিলাম।

আঁড়চোখে তাকালেই গলে যাও কেন?
উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে দূরে থাকো যেন,
তুলোর কুশন গড়ে রেখেছি কখন
বসতে বারণ নেই; যখন তখন।

এসো, শরতের মেঘরানী আমার কাছে
বায়ুর মতন প্রেম হৃদয়ে আছে
ঘুমঘোরে থাকো কাছে জেগে যেন পাই
হাওয়ায় মিলিয়ে গেলে; দেখি তুমি নাই!
…………………………………………..

শরতের কাজকাম
মারজুক রাসেল

ইংলিশ প্যান্ট আর স্যান্ডো পরে শরৎ—গায়ে রোদ ছায়া ঘাম অন্ধকার শুকায়—শিউলি ফোটায়, ঝরায়—তাল পাকায়—সাদা ড্রেস—কাশ ফুল—মেয়েদের—ইশকুল ছুটি দেয়—পাখির বাসা ভাঙা না-ভাঙার দ্বন্দ্বে ভোগে—‘দুইটা কুকুর দুই দিকে মুখ, একটা চতুর্পাশে’—আরতিতে নাচে—সূর্য ডোবার শব্দ শোনায় প্রতিমা ডোবার অনেক আগে—ধূপগন্ধ—মেঘফুল শোঁকার পর হাতের তরল জ্যোৎস্না মোছে নারকেলগাছ।
…………………………………………..

শরৎকালের কবিতা একখানা
রুবী রহমান

আলতাফ তো চেয়েই বসে আছে
শরৎকালের কবিতা একখানা
চলতে–ফিরতে কত হুলুস্থুল
সেসব কথা কারুর তো নেই জানা

শরৎ এল আলোর ভেলায় ভেসে
শিউলিতলা গন্ধে ম–ম করা
সাদা ফুলে জাফরান রং বোঁটা
যেনবা সে আলোর সহদোরা

এত আলোর মধ্যে তবু দেখি
ছায়ার মতো মেঘ জমেছে মনে
কেউ যে নেই তা ধ্রুব সত্য বলে
বিফলতা জাগছে ঈশান কোণে

আলতাফকে বলছি সংগোপনে
সংসারে নেই ঝুট–ঝামেলার শেষ
শরৎ–আলোয় জীবন যদি ভাসে
ভাসিয়ে দিয়ো। স্বপ্ন যে অশেষ
…………………………………………..

শারদীয়
শামসেত তাবরেজী

একবার বাইরে আসো, ওহে, ও গোপন
দেখে যাও বহির-উঠানে ছায়া নাশ করছে সকাল,
ওপরে নিমের ডাল এ বুঝি তারি কারসাজি
কামিনেরা কাজে গেছে, আপু, তুমি দেখিছ স্বপন!

বল্লাল সেনের বাড়ি, মাটি খুঁড়ে হয়েছে প্রকাশ
সাত পল্লা আকাশ হচ্ছে সাড়ে সাত শ নিরাকার ঢেউ,
কী করো ভিতরে তবে? বাচ্চারা নাচছে উঠানে
এ রকমই রবে কি শরৎ, যতক্ষণ না পড়ে আরও কটি লাশ!
…………………………………………..

রক্তশোভা শরৎ
পিয়াস মজিদ

আমারও শরৎ ছিল;
শেফালির স্তূপ, কাশের গুচ্ছ
আর আলোর অরুণ।
বড় হতে গিয়ে মানুষ যেভাবে
গলা টিপে হত্যা করে
তার ভেতরের সরল শরৎ,
এভাবে আমিও
অলীক সুগার স্ট্রিটে
হাঁটতে গিয়ে দেখি
হারিয়ে ফেলেছি
জীবনের জরুরি সব
বিষাক্ত লাবণি।
অথচ আমার ভেতরবাড়ির মাঠেও
হাঁক দিত
অপু ও দুর্গার শারদীয়া ফেরিঅলা,
সন্দেশ, তিলগজা, বাতাসা…।
আবারও শরৎ এল,
এইবার জীবনের
ঋতুহীন যত জটিল অর্জন
খুন করে, লাল রক্তমাখা আমি
অপু ও দুর্গার সাথে ছুটতে থাকব
মহাপৃথিবীর শারদীয় মাঠে;
একরত্তি সাদা বাতাসার দিকে।
…………………………………………..

মেঘের ব্যাপারি
মিহির মুসাকী

মেঘের ব্যাপারি, তুমি কি রাখো শরতের খবর?
নাকি তুমি ভেসে যাও শূন্যতার মধুকূপে
সাথে নিয়ে স্বপ্নশীকর?

তুমি একদিন বলেছিলে, ভালো থেকো বাতাসনন্দিনী,
পরে নিও তোমার পছন্দমতো ফুটি কার্পাস,
সেকথা শুনে শীতলক্ষ্যা পাড়ে নেমে এসেছিল লজ্জাবতী পরী
জলে ধুয়ে নিতে মিহিন মসলিন
আমি তাই আজও মেঘের বাড়িতে তাঁতের শব্দ শুনে জেগে উঠি।

মেঘের ব্যাপারি, তুমি কি শোনো দূরাগত শব্দের ধ্বনি
মগ্ন মন্ত্রপাঠ, আচ্ছন্ন উচ্চারণে শুভ-সুন্দরের আবাহন?
কলার পাতায় তুমি কি দেখেছ সাজানো ভক্তির নৈবেদ্য?
আবহমান ঋতু তাই ভেসেছে উৎসবের আনন্দে।

যদি তুমি বলো, দাঁড়াবে কোমল রোদ হয়ে পুবের উঠোনে
ছড়াবে বাতাসে তোমার পবিত্র সুবাস,
আমি তবে থাকবো অপেক্ষায়
তোমার পথের দিকে চেয়ে হবো শাদা কাশ।
…………………………………………..

নদীবৃষ্টির বনিবনা
অপরাহ্ণ সুসমিতো

যে গাছটার ছায়ায় আমাদের বনবাস হতে পারত, সেখানে ভিড় রে
আবার যে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটি, তার কাছে পড়ে থাকে
দুটো ঘড়ি;
সময় কাউকে কব্জিতে বেঁধে রাখে, কাউকে মুঠোফোনে।

নদীটার পাশে তুমি যে কোনো সকাল বা সন্ধ্যায় খালি পায়ে হাঁটতে
পারতে
ওখানে তোমারই মতো লোকজন থাকছে, সন্তান নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে
তুমি দেখতে পাও না আমাদের নদীটা মিশে যাচ্ছে ছবির মতো।

যে ট্রেনটায় তুমি ঝিকঝিক করতে,জানালা দিয়ে মুখ বের করে
বৃষ্টির ছাঁট নিতে
দেখবার পলকে রাজত্ব না বিছাতেই শরতের সাদা মেঘে
মিলিয়ে যাচ্ছে কাবেরী নদী, বাউল করিমের মতো জনপদ।

ভেসে যেতে পারতাম, আমরা দুজন মিলে একটা সংসার নাটক হতে
পারত,
কতো মানুষ কতো কতো অভিনয় করে, গান গায়, পর্দা টানে
সমাপ্তির;
আমরা দুজনে আকাশের সাথে একটা সন্ধি করতে পারতাম যে চলো,
এই ভাদ্র আশ্বিনে সূর্যের রোদে এসে ডিম ভেজে খাই।

কে যেনো সারাক্ষণ বাঁশি ফুঁকে চলে, আমাদের মতো কতো মানুষ
হুম হুম করে হাঁটে। কেউ কেউ খেতে পায় না, কেউ দমবন্ধ
গাড়িতে বসে থাকে
আমরা তখন বসেও থাকতে পারি। বসে থাকার একটা অলস কাজ
লগ্নি করা আছে।
কতো অপ্রয়োজনে ঋতু খেয়ে নেয় মানুষ, চারপাশ বানভাসি,

ও ঋতুময়ী শরৎ
ছায়ারোদে আজ নদীবৃষ্টির বনিবনা হোক।
…………………………………………..

শরৎ বন্দনা
আনোয়ার কামাল

বিলে ফুটেছে শাপলা, ঝিলের কচুরিপানায় ঘর বেঁধেছে ডুবুরি পানকৌড়ি
ডুবসাঁতারে পটু পানকৌড়ি ছানাদের নিয়ে ডুব দেয় আবার ভেসে ওঠে
শরতের মেঘের কোণে জমে থাকে বিন্দু বিন্দু বেদনার জলকণা;
মেঘেরা দুঃখকে ভুলে যেতে ছেড়ে দেয় হূদয়ে জমিয়ে রাখা ক’ ফোঁটা জল।

ঝিরঝিরে হাওয়া গা শিনশিনে আবেশে উদাসী মনে নীলাকাশে
সাদা বকের হাতছানি, মন চলে যায় শরতের উঠোনে।
…………………………………………..

মধুক্ষণ
তাহমিনা বেগম

শরৎ এলে মনে পড়ে তোমার সাথে
মধুময় ক্ষণ
সাদা কাশবনে দুজনে হাতে হাত রেখে
চোখে চোখ স্মৃতির আলিঙ্গন
তুমিও কি ভাবনায় রাখো আমায়?

আহ কী অনুভূতিময় ছিল সেই সময়টুকু!
দিনমণি কখন তার শেষ আভাটুকু নিভিয়ে দেয়
সাঁঝের আঁধারে দু’জনা ছিলাম একেবারে মোহাবিষ্ট
কিছু নাম না জানা পতঙ্গের গুঞ্জনে চেতনায় ফেরে।

কিছুটা লজ্জায় পড়ে যাই
বলি,চলো অনেক দেরি হলো
তুমি কেমন মিটমিটিয়ে হাসলে
আবছায়া অন্ধকারেও টের পেলাম কিছু।

হঠাৎ তুমি কী যে করে বসলে!
ছটফট করে উঠলাম
কেমন যেন আবেগে শিহরিত হলাম
তুমি আলতো করে ছোঁয়ালে অধর
তিরতির করে কেঁপে উঠলাম।

আবেগতাড়িত হয়ে বললে,’লজ্জা কেন
আমি,আমিই তো’!
তারপর ফিরে চলা
দু’জনার আলাদা বাঁকে।
মনে কি পড়ে
সেই মধুক্ষণ?
…………………………………………..

যতই সরাও দূরে
কিশলয় গুপ্ত

প্রিয় চাঁদ,কী এনেছো বলো
অসুখ নাকি শুধুই জলের গ্লাস
এখন আমার বুকের অবসাদ
মরে গিয়ে অনেকটা উল্লাস

শুভ মন, কী দেবে এই হাতে
অসুখ নাকি একপো মেপে ধান
শস্য গোলা সময় বুঝে কাঁদে
চাষী বৌএর কন্ঠে দারুন গান

সোনা বুক, কী পেতেছো হাড়ে
অসুখ নাকি সবুজ কচি ঘাস
সদর খোলা আদর কেড়ে নাও
পথে পথে কাঁদুক সর্বনাশ

প্রিয় চাঁদ,মাথার উপর থাকো
অসুখ হলে ওষুধ খাবো বেশ
জ্যোৎস্না তুমি সামলে কিছু রাখো
আঁধার হবে হঠাৎ নিরুদ্দেশ
…………………………………………..

শরৎ আসে
মুহাম্মদ ইব্রাহিম বাহারী

পেজামেঘ আর শুভ্রকাশে
নদীর কূলে শরৎ হাসে
শরৎ হাসে শিউলি বোঁটায়
ধানের পাতায় শিশির ফোটায়।

মেঘের ফাকে নীলের খামে
উড়োচিঠির শরৎ নামে
সবুজ সবুজ চোখের পলক
বৃষ্টি নামে ঝলক ঝলক।

হঠাৎ আলো হঠাৎ কালো
আকাশ আঁকে মেঘে ভালো
ভরাযৌবণ নদীর কূলে
স্বপ্ন ওড়ে কাশেরফুলে।

শিউলি ঝরা ভোরের আলো
সুরভি ভেজা লাগে ভালো
ফড়িং লাফায় সবুজ ফুড়ে
শরৎ আসে হৃদয় জুড়ে।
…………………………………………..

শরতীয় প্রতীতি
জাফর পাঠান

এই রোদ- এই বৃষ্টি- শরতীয় শূরোচিত সৃষ্টি
এই আলো এই কালো- ষড়ঋতুর কাঙ্খিত কৃষ্টি,
কখনো ঝিরিঝিরি কখনো ফিরিফিরি মেঘ নিড়ি
ছুঁয়ে যায় ভাবঅপ্সরী- আলতো ছোঁয়া অশরীরী।

কবি ভাবে ডুবে ভাবে- বাস্তবে নাকি ভাবে খোয়াবে
কুহকাবেগের নীরব- নিস্তব্ধ বিবাগি বেতাবে,
আজি পুস্পপল্লবে পেলবতা জাগ্রত বিভা জানি
ছন্দ ছোঁয়া ছুঁয়েছে সবাইকে, নয় একটুখানি।

দোলে বন দোলে মন, দোলে ছন্দে ছন্দে কাশবন
সূর্যের মুখে মেঘের গুণ্ঠণ- মগন নিধুবন,
পাশে পাশে গা ঘেষে ঘেষে ঘুরছে রবি আর বৃষ্টি
ক্ষণে হাসে ক্ষণে কাঁদে, ক্ষণেতে গোমড়া মুখো দৃষ্টি।

প্রকৃতির এত বিত্ত বৈভব, বহন করে ভব
একাকী বসে নির্জনে কবি, আহরণ করে সব।
…………………………………………..

কাশফুলের তটে
ওয়াসিম সেখ

শরৎ মানেই মননে নতুনের আভার ইঙ্গিত।
প্রকৃতির লীলারসে কাশফুলের সজাগ প্রতীক।
নিশীথের বেড়া বেয়ে এসেছি সেই স্থানে।
আবেগের নিলীমায় দেখেছি জলের কান্ডে।

ভরাডুবির জল তরঙ্গ জলোচ্ছাসে মাতোয়ারা ।
তারই সান্নিধ্য পেয়ে কাশ ফুলেরা নাচন হারা ।
সন্নিকটের দৃষ্টি হতে মননের হেলদোল।
ভাবনার নীলাকাশে সজীবতার হিল্লোল।

শ্বেত তরঙ্গময় শিরদাঁড়া কাশফুলের হাওয়ার তরান্বিত দান।
চিত্তের সন্নিবেশ উতলা যেন কথকমান।
নিয়তীর পরিহাসে আগমন তাদের ছিন্নকুট সংস্কৃতবাণ।
তাদের সমাবেশে চারিপাশ আজ মননের মহীয়ান।

ভেসে যেতে চাই তাদের সাথে বাতাসের আঙ্গীকে।
মনন আকুল স্রোতধারা ব্যাকুল পেতে চাই সদা নিকটে।
আবেগ, মোহ, ভালোবাসা বাস্তবের অবয়বে।
ভাবিতে ভাবিতে করালগ্রাসে আসন সমপন্ন এই কাশফুলের তটে।
…………………………………………..

শরৎ মেয়ে
মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান

শরতের অই শুভ্রাকাশে মেঘের তরী ভাসে
কাশের বনে জোছনা নামে সাদা পরী হাসে।
শিউলি ফোটে সুবাস ছড়ায় বাড়ির আশেপাশে
মধুর লোভে গুনগুনিয়ে মৌমাছিরা আসে।
নিপাট উঠোন আঙিনাতে তারার ঝিকিমিকি
আপন মনে হেসে ওঠে শরৎ মেয়ে ঠিকই।
ঝিলের জলে শাপলা ফোটে বিলের পানি থির
পানকৌড়িটা ডুব দিয়ে ঐ কাঁপায় শান্ত নীর।
থোকা থোকা জোনাকপোকা আলোর খেলায় মাতে
শরৎনিশি ছড়ায় হাসি জোছনাঝরা রাতে।
ধানের ক্ষেতে কোড়ার বাসা, ডাহুক ঝোপে-ঝাড়ে
সোনার বরণ সন্ধ্যা নামে গোমতি নদীর পাড়ে।
শরৎ আসে বাংলাদেশে তালের সুবাস নিয়ে
তাল-তমালের স্নিগ্ধ শোভায় শরৎ মেয়ের বিয়ে।
আনন্দে মন উদ্ভাসিত ফুলের কলি ফোটে
শরৎ মেয়ে রূপসাগরে আপনি নেয়ে ওঠে।।
…………………………………………..

হায় রে শরৎ!
শিবলী মোকতাদির

হে আমার সর্ব বকুল
নিমজ্জিত বৈঠার ভয়ানক ছায়া
আমাকে জ্ঞান করো।
আঙরা ও আতরের লোভে,
যদি আমি দুই কূলে ভেসে উঠি ফের
জেনো তুমি-এই ভুল অন্বেষণে,
আছি আমি নিজস্ব ধ্যান আর ধারণায় গঠিত হয়ে
তোমার ঘুমের মধ্যে
ভাসা-ভাসা হায় রে শরৎ!
হায় রে মোটা-মোটা বর্ষালি ভয়
আমারে মান্য করা
সেই হেতু ততটা বাধ্যতামূলক নয়!