শুভ্রতার কথা আসলেই আমাদের চিন্তায় ভেসে উঠে কাশফুলের শুভ্রতা। শাদা মেঘের উড়া উড়ি। যেনো সে বয়ে নিয়ে যায় জান্নাতী শুভ্রতা। যেখানে কেবলী পবিত্র এক অনুভূতি। পরিস্কার নীল আকাশে শুভ্র মেঘের ফুল ফুটে। জমিনেও সবুজ প্রকৃতির মাঝে কাশফুলের শুভ্রতা। এই জন্যই সৃজনশীল মানুষ এই ঋতুকে রাণী বলে। বাংলার আকাশে যখন এই বৃষ্টি এই মেঘ। এটা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি। তিনি বলেছে ‘আমি যদি বেঁচে থাকি তবে এরকম এক প্রকৃতিতে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু আমার অনেক কাজ। সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তিব্বত জয় করেই আমি আবার বাংলায় ফিরে আসবো। আর আল্লাহ যদি হায়াত দেন তবে বাংলাতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে চাই।’

শহৎকাল এমন এক ঋতু যার ভেতর বাহির সবই শুভ্র। তার আকাশ থাকে পরিস্কার, নীল নয়না আকাশে টুকরো টুকরো শাদা মেঘের ভেলা। মেঘকাটা প্রকৃতিতে থাকে সবুজ পাতার সজীবতা। কমতে থাকা বিলে ঝিলে শাদা শাদা শাপলা ফুল। যেনো স্বচ্ছ কাচের উপর বসে আছে সুন্দরী শাপলাফুল।

এমন দৃশ্য দেখে সৃজনশীল মানুষের হৃদয়ে দোল খায় শুভ্র চিন্তা। সে চিন্তায় মগ্ন হয় সৃজনে। লিখে কবিতা, গল্প, গীতিকবিতা আরো কতো কী! যেনো এই প্রকৃতি তাকে দিয়ে লিখেয়ে নেই শুভ্রপ্রেমের বয়ান। ‘মোলাকাত’ ডটকম শুভ্র শরৎ নামে শরৎ সংখ্যার আয়োজন করে। লেখক বন্ধুরা তাদের সৃজনক্রিয়া আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সেই সকল সৃজিত লেখা নিয়ে আমরা প্রকাশ করলাম শুভ্র শরৎ ১৪২৭ : ৪র্থ পর্ব। এ সংখ্যায় আছে কুড়ি জন লেখকের লেখা। আমরা আশা করি লেখক-পাঠক সকলেরই ভালো লাগবে। সকলকে শরতের শুভ্র শুভেচ্ছা। আবার মোলাকাত হবে শুভ্র শরৎ ১৪২৭ এর ৫ম পর্বে সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

আফসার নিজাম, সম্পাদক-মোলাকাত ডটকম

সূ চী প ত্র

শরৎ কথা :: আবদুস সালাম
শরৎ স্লোগান :: অনন্য মিত্র
শারদদৃশ্য :: অনু ইসলাম
ভাদ্রের পরে আসে আশ্বিন :: রানা জামান
শরৎপত্র :: মনিরুজ্জামান মিন্টু
এই তো শরত :: শাহজাহান মোহাম্মদ
শরতে মিলবে মুক্তি :: কমল কুজুর
নীল সবুজের পাল :: জালাল খান ইউসুফী
ফুলকচুরি ফুলের কথা :: মালেক মাহমুদ
শরৎ হলো :: রেজা ফারুকী
শরতের সকাল :: যুবায়ের আহাম্মেদ
শরৎ আর কাশফুল :: আসাদুজ্জামান শাওন
মেঘকাশফুল :: সৌরভ হোসেন
শরৎচিঠি :: অনন্য কামরুল
রজচক্র :: শায়লা আক্তার
সিক্ত উনুন :: ইব্রাহীম ইউসুফ
হাসিনা বিবি :: সুমন নন্দ
শরতের স্বপ্নঘোর :: আবু আফজাল সালেহ
শরতের বিকেল :: ইসমাইল বিন আবেদীন
মনে পড়ে সেই শরৎ সন্ধ্যা :: এম.এস ফরিদ
…………………………………………..

শরৎ কথা
আবদুস সালাম

কাশে মঞ্জরী আসে শরতের আমন্ত্রণে
ডুবে যায় নিসর্গ মগ্ন বোধের আলিঙ্গনে

আত্মগত উচ্ছাস, শূন্যতা গিলে খায়
নিসর্গ খুন হয় প্রতিদিন ভ্রান্ত ছায়ায়

সোহাগী দুঃখ পুড়ে সিগ্রেটের ধোঁয়ায়
শোকেসে সাজিয়ে রাখি সর্বনামময় মোহকথা

পাতাল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে গোপন আনন্দ
শূন্যে. ছুঁড়ে দিই ক্ষোভ আর করুণ প্রবাহ

ফুলেদের রঙিন কান্না, অচেনা প্রজাপতি
ঘড়ি পেন্ডুলামে বাঁধা, ঝাপসা সংস্কৃতি

মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শরতের মেঘ
থেকে থেকে জেগে উঠে শীতের উদ্বেগ
…………………………………………..

শরৎ স্লোগান
অনন্য মিত্র

শরৎ মানেই শিউলিফুলের হাসি,
শরৎ আমি বড্ড ভালোবাসি।
শরৎ মানেই কাশের বনে দোলা,
নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা।

শরৎ মানেই ঢাকের কাঠি,
পড়াশোনা হচ্ছে মাটি।
পুজোর ছুটি হচ্ছে শুরু,
বুকটা তাই করছে দুরুদুরু।

আনন্দমেলা আর শুকতারায়,
ডাক দিয়ে যায় চুপ ইশারায়।
এটার প্রতি আমার বড় ঝোঁক,
এই কটাদিন আনন্দটাই হোক।

এই কটাদিন আনন্দ গান,
এই কটাদিন পড়াশোনার ছুটি।
সাজছে আকাশ,সাজছে বাতাস,
রোদ্দুরটা বারান্দাতে করছে লুটোপুটি।
…………………………………………..

শারদদৃশ্য
অনু ইসলাম

শারদবেলায় রৌদ্ররথে যাত্রা ছিল পীতবর্ণের কার্পেটে হেঁটে হেঁটে
মনোবৈঠা আজও তা অন্বেষণ করে হলুদডোবা সন্ধ্যাবেলায়
আকাশপরিধি বেয়ে ছেঁয়ে গেছে আগুনকুসুম রঙ; জলআয়নায়—
ভেসে উঠছে কুসুম রঙের আগুন!

প্রান্তবেলায় দাঁড়িয়ে কেউ বলবে না আবার তবে পরিচর্যা হোক
নতুনের;- জয়ের ভেতর এতটা দুর্বার পরাজয় থমকে যাক
সুন্দর, তুমি তো লুকিয়ে থাকো নিজেরই আড়ালে ডুমুরেফুল হয়ে—
তাই বলছি, এখন ভাঙার সাহস চাই; বেরিয়ে এসো-
শাদা অন্ধকার ঘেঁষা শুভ্রফুলের প্রকরণ ভেঙে সবুজ উঠোনে

রঙপেন্সিলে আঁকা শারদদৃশ্য বাস্তবিক ফুটে উঠুক ক্যানভাস জুড়ে।

…………………………………………..

ভাদ্রের পরে আসে আশ্বিন
রানা জামান

শরৎ কালের দ্বিতীয় মাস
আশ্বিন ভাদ্রের পরে
মাঠ প্রান্তরে সবুজ ধানে
খুশি চাষির ঘরে

কমতে থাকে খালে বিলে
পানির ভয়াল ধারা
দেশি মাছে ডোলা ভরতে
থাকে অনেক তাড়া

হরেক রকম মৌসুমি ফুল
ফুটে থাকে গাছে
শরতের স্বাদ পেতে চাইলে
চলো পল্লীর কাছে।
…………………………………………..

শরৎপত্র
মনিরুজ্জামান মিন্টু

আজ সব কাশফুল মেঘের অলংকারে সেজে বিকেলের কাছে সোনালি রোদ রেখে যায় চলে… যে আলোয় পত্রবাহক পথ চিনে যাবে তোমার কাছে… সে আলোর আয়ু থেকে তোমার ঠিকানা আজ বহুদূরে… রাত্রি নেমে এলে জোনাকিরা যাবে ডাকহরকরা আর পত্রের প্রিয় সহচর সেজে… তবুও পত্র যাবে ঠিকানাবিহীন শূন্যের অজানা ঘোরে…

পাখির পালকে ভর করে…
আকাশের রৈখিক নীল দেখে…
জলের প্রতিমা ঘেঁষে…
পত্রবাহকের হাতে হাত ঘুরে ভেজা বরষায়…

ও পরবাসী মেঘ… এই শ্রাবণ ধারায়…
ভেসে যায় মনোহর দৃশ্যাবলি…
আমার অলিখিত প্রেম…
…………………………………………..

এই তো শরত
শাহজাহান মোহাম্মদ

ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের পাল
ছুটছে অচিন দেশে
ঝুমুর ঝুমুর পরীর রানী
কাশ ফুলের বেশে।

কলমি লতা শাপলার ভেলা
বিলের জলে হাসে
বলাকারা পালক মেলে
দূর আকাশে ভাসে।

মৃদু মৃদু হাওয়ায় উড়ে
কৃষ্ণাণ বউরে আঁচল
স্বপ্নে দোলা সবুজ ক্ষেতে
নয়ন জুড়ানো কাজল।

হাঁটু জলে মাছ ধরতে
ছেলেমেয়ের মেলা
এই তো শরত, সাজ ধরেছে
নিত্য সারাবেলা।
…………………………………………..

শরতে মিলবে মুক্তি
কমল কুজুর

হাজার বছর ধরে সাধনায় নিমগ্ন যোগী
অবশেষে চোখ মেলে তাকান
জগৎ দেখে বিস্মিত হতবাক হয়ে পড়েন।

রক্তের জবা ফুলে তখন আগুন জ্বলছে অবিরাম তাই নৈঃসঙ্গ এই বেঁচে থাকা
তাকে ক্রমশঃ দ্বিধান্বিত করে।

কর্কশ উষার পর ক্ষুদ্র অণুজীব ক্ষয়িত মধ্যাহ্নের গ্রীষ্মে অসময় সূর্যাস্তের মতোই বিষময় ক্ষণের
সংস্পর্শে জরাগ্রস্ত সন্ধ্যা আনে ডেকে।

বর্ষায় প্রচন্ড অস্থিরতায় পদ্মা মেঘনা যমুনা শান্তিবারি করে বর্ষণ, অশান্তির আগুন জ্বলে তবুও চারিদিকে পোড়ে মন্দির, মসজিদ আর নগর।

দৃষ্টিহীনতায় এমনি করেই ভ্রমে কাটানো কাল
পেঁজা তুলোর মতো ভেসে ভেসে আসা
শ্বেত শুভ্র মেঘ যেন অভয় দিয়ে যায়।

শরতের গাঢ় নীল আকাশে শান্তির বীণা বাজে
একটু একটু করে যাক দূরে সরে আতংক
আসুক ফিরে জগতে মধুসম্ভার।
…………………………………………..

নীল সবুজের পাল
জালাল খান ইউসুফী

শিউলী মালা খোঁপায় পরে
গ্রামের মেয়ে হাঁটে
কলসী ভরে জল তুলে নেয়
সুরমা নদীর ঘাটে।

ঘাসের ডগায় শিশির সকাল বেলা
সুর্যরাজের আলোক তাতে
আলতা রাঙা পায়ের সাথে
মুক্ত করে খেলা।

চলছে ছুটে দূর আকাশে মেঘ
সওদাগরের হাঁটার মতো চলার গতিবেগ।

ঐআকাশে লক্ষ ঘুড়ি
শরৎ রানি মেঘের বুড়ি
নদীর পাড়ে কাশ
কাশবাগানের একটু দূরে
বাগান ভরা বাঁশ।

শিউলী ফুলের সুবাস পেয়ে
উদাস এ মন উঠল গেয়ে
পল্লীগীতি গান
শরৎ রূপে মুগ্ধ কবি
উদাস কবির প্রাণ।

কাল জননীর ছয়টি মেয়ে
একটি শরৎ কাল
এই মেয়েটি দেয় উড়িয়ে
নীল সবুজের পাল
…………………………………………..

ফুলকচুরি ফুলের কথা
মালেক মাহমুদ

কচুরিপানার জীবন যখন
নদীর মাঝে ঢেউ খেলে
ঢেউয়ের সাথে অছড়ে পড়ে
জীবন তখন নড়বড়ে
কোথায় নেবে ঠাঁই
ফুলকচুরি ভাই
ঠাঁই যদি পায় ঝিলের জলে
ফুল ফুটে সে গল্প বলে
ফুলকচুরি ফুল
আনন্দ বুলবুল ।

কচুরিপানা ফুলকচুরি
ফুলকচুরি ফুল রাশে
ডোবার জলে ফুল হাসে
দেখতে লাগে ভালো
শরৎ সকাল আলো,
গাঁয়ের খোকা দেখে খুশি
আরো খুশি মৌটুসি
ফুলকচুরি রাঙিয়ে
ফুলের তোড়া বানিয়ে
আনন্দ পায় খুব
ওরা ফুলকচুরির রূপ।
…………………………………………..

শরৎ হলো
রেজা ফারুকী

শরত হলো কাশের বনে শ্বেত শুভ্রের মেলা
শিউলী তলায় ফুলেল মালায়
মৌ মৌ গন্ধ মেলে ধরা
নীলাম্বরে
সফেদ মেঘের পাহাড় গড়ে তোলা,

বিলেৱ ধারে ঝিলের তটে
শাপলা রাশী বাশী

বক যে হেথায় ওঁত পেতে থাকে
মৎস্য শিকারের লাগি

গাঁওয়ের কিষান ধান বুনিতে
বেজায় মাতোয়ারা

হেমন্তেতে পিঠা পুলির
চলে-
রসনা মিটানোর পালা

বাউত নামে খালে বিলে
পলো ওঁচা জুইতা জালে
মাছকে ঘিরে ফেলা

বোয়াল শোল চিংড়ি পুটি
খালই বোঝাই করা
মাছ ধরারই উৎসব যেনো
মন কাড়ারই মেলা

শরৎ হলো
মন মাতানো
জারী সারি গানের দেহলিজ-
অযুত প্রানে প্রানের মিলন খেলা৷
শরৎ হলো কাশের বনে শ্বেত শুভ্রের মেলা
নীলাম্বরে
সফেদ মেঘের পাহাড় গড়ে তোলা।
…………………………………………..

শরতের সকাল
যুবায়ের আহাম্মেদ

আমি অবাক নয়নে চাহিয়া যে রই
বাতাসে হেলে দুলে ওঠা কাশফুলের পানে
মুগ্ধ! ওগো মুগ্ধ আমি….
এই সুষ্টি রাজির শানে।

শরৎ এলে এমনি বিমোহিত
হয়ে যাই র্নিবাক
তিনিই মহান স্রষ্টা আমার
যাঁর রয়েছে নিখুত সৃষ্টির হাত।

শরতের ওই নিলাকাশে যেন
ছেড়া ছেড়া শুভ্র মেঘ
সুর্যের আলোয় আলোকিত হয়
চির সবুজের দেশ।

হে মহান সত্তা, তোমারী সৃষ্টি
দেখেআনমনে গাই তোমারি গুণগান
আমি গুণাহগার পাপী
তুমি রাহিম রাহমান।।
…………………………………………..

শরৎ আর কাশফুল
আসাদুজ্জামান শাওন

শরৎতের শুভ্র এক বিকেল বেলা
নীল রং দিয়ে লেপটে থাকা একটা নীল আকাশ,
যেন তেল রঙ দিয়ে আঁকা কোনও শিল্পীর পোট্রেইট।
ঠিক নীল আকাশটার নিচে আমি দাঁড়িয়ে,
আর পাশ দিয়ে বয়ে চলা একটা নদী।
নদীর পাশে বিস্তৃর্ণ কাশফুলের মাঠ
যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে,
শত শত বছর ধরে।
আর কাশফুলের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে,
হলুদ রঙের শাড়ী পড়া আমারই মহাকাল!
খুব শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে
যেন একটা স্বর্গের অপ্সরী,
আমারই অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
আমাকে দেখে হয়ত বড্ড অভিমান করে আছে মহাকাল,
খুব দেরী করে ফেলেছি তো তাই!
বড্ড রাগ করে আছে পাগলীটা,
চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে দূরে।
এই মহাকাল!
কি হয়েছে তোমার?
খুব রাগ করেছো বুঝি,
দেখো আর কোনদিন এমনটা হবে না,
আর কোনদিন দেরী করবো না আমি, মহাকাল।
এই যে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম!
মহাকাল,কথা বলোনা একটু,
চুপ করে থেকো না!
অতঃপর একটু একটু করে মহাকালের সম্মুখে এগিয়ে যাওয়া,
তখনও মেয়েটা বড্ড অভিমান করে দাঁড়িয়ে আছে।
এতটা অভিমান যে,
আমার দিকে ফিরেও তাকালোনা।
মহাকাল,কাশফুলের দিকে চেয়ে আছে একদৃষ্টিতে!
যেন কাশফুলের কাছে নালিশ করছে আমার বিরুদ্ধে।
এই মহাকাল!
আমার চোখের দিকে একবার তাকাও না,
একটি বার না হয় তাকাও।
বললাম তো আর এমনটা হবে না
এই দেখো আমি কানে ধরে আছি।
একবার শুধু তাকাও,শুধু একটি বার!
তারপর চুপটি করে মহাকালের কাছে যাওয়া,
কানের কাছে মৃদু শব্দে বলা ভালোবাসি মহাকাল।
তারপর অভিমান ভুলে বুকের গহীনে অবসাদ আশ্রয় খোঁজা মহাকালের;
আর মহাকালের চোখ দিয়ে একরাশ অশ্রু ঝরে পড়া আমারই বুকে,
আর কয়েক’টি বাক্য দিয়ে গড়া একটা মধুর ঝগড়া।
অতঃপর মহাকালের প্রতিশ্রুতি বদ্ধ দু’টি হাতে বন্দী আমার হাত,
অতঃপর চোখে-চোখে বন্দী দু’জন অনন্তকাল,
ঠোঁটে-ঠোঁট রেখে তৃষ্ণা নেওয়ার নির্লজ্জ সহবাসের রংচটা প্রতিযোগিতা।
কাশফুলে লেগে থাকা কয়েক’টা মলিন স্মৃতির স্পর্শ!
তারপর নদীর তীরে বসে স্বচ্ছ পানিতে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখা,
আর খালি চোখে দেখা নীল আকাশের রঙিন পোট্রেইট।
তারপর গোধূলি বেলার শেষ লগ্নে বন্দী,
তোমার আর আমার রং-চটা স্কেচ্।
অতঃপর ইতিহাসের শেষ অধ্যায়!
যেন কাশফুলের কলম দিয়ে শরৎতের পৃষ্ঠায় লেখা,
তোমার আর আমার এক অন্য প্রণয়-কাব্য।
…………………………………………..

মেঘকাশফুল
সৌরভ হোসেন

কাশফুল আর সাদামেঘের প্রেম দেখেছো? একজন কত উঁচোয় আর আরেকজন?
তুমি জানো তারা তবুও ভালোবাসে নিবিড় ভাবে।
তারা একে অপরের ওতপ্রোত জড়িত,
তারা সাদা বলে বলছিনা!
আকাশ ভয় দেখায় মেঘ’কে, মেঘ ভয় পায়,
নদীজল ভয় দেখায় কাশফুল’কে, সে ভয় পায়।
তবুও তাদের ভালোবাসা কখনো দমে নাহ্।
কাশফুলের সেই সে শরৎ সুন্দর্য,
ঢেউ খেলানো রূপের মাধূর্য, হারিয়ে যায় একটা সময় শুকিয়ে, পঁচে গোলে, নষ্ট হয়ে যায় বিলিন হয়ে যায়।
তখন মেঘের কান্না বৃষ্টি হয়ে ঝরে পরে!
তার আত্মহুংকার শুনোনি?
দেখনি তার শরীর ফাঁটা বেড়িয়ে আসা আলো?
তীব্র সাদা রশ্মিজাল আলো।
সে আকাশের বুকেই লিখে যায় তার নাম অবিরত, ক্ষতবিক্ষত!
বিদ্যুৎ চমকায় তুমি ভয়পাও?
সে তো মানুষ নয় যে তুমি রক্ত দেখবে!
প্রিয়জন বিয়োগজ্বালা কতটা বেদনাতুর,
কতটা বিষাদময়, তুমি জানো?
পাগল হয়ে যাওয়া মেঘ, তার শুভ্রতা হারায়,
একটা সময় কালো, একটা সময় ছিন্নভিন্ন।
তবুও সে জাগে, সে স্বপ্ন দেখে, সে থাকে
তার ফেরার অপেক্ষায়।
একটা দিন যায়, একটা সপ্তাহ যায়,
একটা মাস যায় এভাবে বছর চলে যায়।
পুনঃজন্মে কাশফুল ফিরে আসে।
তাহলে মানুষ কেনো পারবেনা থাকতে অপেক্ষায়?
তুমি আমি দূরে, আজ বহুদূরে, তুমি পারবে?
আমাকে দেখো, আমি চুপটি করে সাদামেঘ হয়ে,
আজও আছি তোমার অপেক্ষায়!
তোমারি’ই প্রতীক্ষায়।
যদি তোমার কখনো পুনর্জন্ম হয়!
তুমি আসবেতো সব ভুলে? অতীত স্মৃতি ফেলে?
আমি থাকবো আকাশ মেঘে, শুভ্র তুলো এঁকে,
তুমি না হয় দূরেই থেকো মাটির বুকে লেগে।
তাকে দেখো, যত্নে থেকো, ভালো রেখো,
আমি না হয় মেঘ হয়েই রাখবো তোমায় ঢেকে।
সকাল বিকাল জল ছিটাবো,
দেখব তোমায় রেখে, থাকবো তোমাতে মেখে।..
…………………………………………..

শরৎচিঠি
অনন্য কামরুল

রামগিরির দূতবৃন্দ অ্যানিমিয়াক্লিষ্ট হয়ে দুলে আছে শূন্যতার সায়রে…
পাখার পালক ভেঙে খসে গেছে সজলগাথা- নিভৃত শ্বাসের নিরন্ন সুর;
শিউলিস্বপ্নবোনা রৌদ্রস্পন্দিত ভোর সরল নাচে তবুও তো গেয়ে যায়
কাশফুলের মৌন-কাতরতা- স্বচ্ছতার নির্লোভ আগমনী-
রাতের বন্দরজুড়ে জোছনার বিকিকিনি, তারার অ্যালবামে জমকালো কথালেখ্য
ছুঁয়ে যায় বিমর্ষ অন্তঃরন্ধ্র- কল্পকথার ফুল্ল বন্দর…

রবীন্দ্র-পক্বশ্মশ্রুর মতো থোকা থোকা ভাসমান শরৎচিঠি
ভেঙে যাওয়া চক্রের বিপ্রতীপ স্রোতে
নম্র্র হাসির মধুরতা জ্বেলে, উপদ্রুত ব-এর পৃষ্ঠায়
নৈঃশব্দ্যে রেখে যায় একতারার অমোঘ সংবেদ, শুভ্রতার বৈভব-
ব্যালাড-
কুমারী ধানগাছের ফুলে ওঠার সলজ্জ সংবাদ…
…………………………………………..

রজচক্র
শায়লা আক্তার

আকা বাকা দৃষ্টিতে সব
দেখছে জামার দাগ
আত্মসম্মানে পড়লো কাঁটা
হচ্ছে লজ্জা, রাগ।

স্কুল,কলেজ মাস প্রতি
৩-৪ দিন বাদ যায়
শিক্ষকরা সব প্রশ্ন করে
জবাব মিথ্যে হয়।

সেনোরা,প্যাড কিনতে গিয়ে
ঘন্টা,ঘন্টা যায়
সেনোরা হাতে পুরুষ চক্ষু
আমায় গিলে খায়।

মায়ের কাছে সত্যটাও
হয় না কভু বলা।
মা বলবেন বাজে বকছিস
ঠিক নেই তোর চলা।

সাদা যেনো বড় শত্রু
বাড়ন্ত মেয়ের ভয়,
রাস্তাঘাটে হঠাৎ যদি
রক্তস্রাব হয়!

মেজাজ ভীষণ বিগরে থাকে
অস্বস্তি, লজ্জা,ভয়ে
রজচক্র বারংবার আসে
মাতৃত্ব নিয়ে বয়ে।
…………………………………………..

সিক্ত উনুন
ইব্রাহীম ইউসুফ

বন্যায় আছে পানি বন্ধি
লাখো লাখো লোক,
কলা গাছের ভেলায় ভাসে
দেখে লাগে শোক

সিক্ত উনুন রিক্ত পকেট
খাবার নাহি পায়,
কতেক আছে ভোটের তরে
ত্রাণ বিলাতে যায়

ছোট্ট কালে আটাশিতে
বন্যা আসে হায়!
চার সালে’ও পানি বন্ধি
মানুষ নিরুপায়

ক্ষেতের ফসল তলিয়েছে
পানির নিচে হায়!
কৃষকরা তাই দিশেহারা
হবে কী উপায়

এবার’ও যে বন্যা হবে
সুর শুনা যায় সুর,
রক্ষা করো মা’বুদ খোদা
বন্যা করো দূর।
…………………………………………..

হাসিনা বিবি
সুমন নন্দ

তখন সবে শরত এসেছে,
শরত তো নয়, মোড়ের কাছে দু মুঠো বিনয়ী কাশফুল
আর বনমালীর পাঁচিল পেরিয়ে ঝাঁকড়া মাথায়
বেয়াড়া গাছটার বুকে কিছু শিউলি ফুটেছে,
এই আর কী!
ঢাকে কাঠিও পড়েছে, পুজোও এলো
তবু যেন… শরৎ আসে নি…
হরির দোকানে তখন চা-চক্র সরগরম
পাড়ায় সকল প্রবীণ তখন ব্যস্ত আড্ডায়,
পুজোর কেনাকাটি- খাওয়া দাওয়া- আত্মীয় বন্ধু
বাজারে চড়াদাম- থিম- সবজি আগুন বা,
আর কিছু
দুটো কুকুর আস্তাকুড়ের পাশে তখন
গুটিসুটি মেরে শুয়ে,
হয়তো স্বপ্ন দেখছে ঘুম ঘুম চোখে, অচিন ভাষায়
হঠাৎ চোখ মেলে ওরা,
চকিত কানগুলো খাড়া হয়ে ওঠে
এগিয়ে গেল দুলকি চালে ওরা আস্তাকুড়ের দিকে
ঘাড় উঁচিয়ে দেখলো কিছু, তারপর
চিৎকার করে উঠলো, আর্তনাদ …
বুড়োদের মন তখন আড্ডায় মজে,
হঠাৎ ছুটোছুটি তে মজলিশ ভেঙে সকলের চোখ
বিরক্তিভরে আস্তাকুড়ের দিকে চাইলো,
-কী বলুন তো, হঠাৎ কুকুরগুলো এতো চিৎকার করছে?
-ওই আস্তাকুড়ে কিছু দেখেই এরকম করছে মনে হয়৷
-আরে হ্যাঁ,হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন৷
-চলুন তো, দেখে আসি, চলুন
-চলুন৷
প্রবীণের দল লাঠি ঠুকে এগোল আস্তাকুড়ের দিকে
একটু উঁকি মারলো, আবর্জনার মাঝে ওদের
দৃষ্টি টানলো পড়ে যাওয়া রমনীর সিঁদুরের মতো
লাল একটা পুঁটলি, সেটা নড়ছে, থেমে থেমে
কারোর মনে উঠলো কৌতুহল, কারোর ভয়- বিষ্ময়
-এটা আবার কী?
-কী করে বলি ভাই, তুমিও যেখানে আমিও সেখানে
-খুলে দেখি, কী বলুন?
-দেখুন দিকি৷
-আচ্ছা দাঁড়ান৷
একজন এগিয়ে গিয়ে পুঁটলি তুলে বলে
-এ মা, এতো একটা বাচ্চা মনে হচ্ছে!
-কী বলেন!
-দাঁড়ান, খুলি৷
পুঁটলি খুলতেই শেষ ভোরের শিশিরের মতো একটা মুখ, ঠোঁটটা চেটে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, আঙুল চুষে
মাকে ডাকতে চায়, কিন্তু পারে কই!
তখন পাড়ায় গুঞ্জন শুরু হয়েছে, কেউ অবাক- বিষ্মিত, কেউ অবিশ্বাসী, কেউ ব্যস্ত রটনায়,
-কী কেচ্ছা, মাগো! ভদ্দরলোকের পাড়ায় এসব ঘটছে, ছে ছে…
-ওহে সতীশবাবু, রাখুন ওটাকে নামিয়ে, এসব পুলিশ কেস, রাখুন রাখুন…
ততক্ষণে পাড়া তোলাপাড়
অনাথ এই শিশু তখন আপনমনে আঙুল চুষছে আর মাঝে মাঝে কেঁদে উঠছে খিদে চাগাড় দিলে,
-এতো বড্ড ঝামেলা দেখছি৷
-ঠিক বলেছেন৷
ও এখন আস্তাকুড়ের মতোই অদরকারী, অতিরিক্ত
না থাকলেই বোধহয় ভালো …
ভিড়ের পেছন হতে হঠাৎ ডাক এলো,
-সরুন দেখি, সরুন, আমায় যেতে দিন৷
ও হাসিনাবিবি, কয়েকঘর কাজ করে খোরাক জোগায় সংসারের, চারটি ছেলে, একটি সবে হলো
ওদের বাপ মোড়ের মাথায় ভ্যান ঠেলে
মোটের ওপর সুখী…
-দিন দেখি, ওকে আমায় দিন
বাচ্চাটা নিয়েই বুকে জড়িয়ে চিন্তিত মুখে ওর মাথায় হাত রাখলো,
-এতো ধুম জ্বর, কিচ্ছুটি খায়নি আবার
বলেই মাই গুঁজে দিল ওর মুখে
খামচে ছিনিয়ে নিলো ও, বেঁচে থাকার ওই
শেষ আশাটুকু
বুকের ওপর কচি মুখে কাপড় টেনে হাসিনাবিবি বললো
-ওকে আমি নিলুম, ও আমার ব্যাটা এখন থেকে
বুঝলে তোমরা
এখন থেকে আমিই ওর সব, ওর মা…
কাশফুল এখনো হাওয়ায় নড়ছে
শিউলিটাও ঝরে রাস্তা ভরিয়ে ফেললো
পেঁজা তুলো মেঘও এলো, কিন্তু
হাসিনাবিবিদের হাত ধরেই
মনে হয় শরত এলো…
…………………………………………..

শরতের স্বপ্নঘোর
আবু আফজাল সালেহ

জোড়া শাদা-হাঁস নদীচরের কাছাকাছি;
উপরে গাঙচিলের ওড়াউড়ি
কাশবনের শাদা-পেলব ঢেউ
চকচকে নীল আকাশ, শুভ্র মেঘ
মিষ্টি বাতাসে তার দুধেল পিঠে
কালো মেঘ খেলা করে।

শরতের এই ভোরে
হারিয়ে যাচ্ছি আনমনে, স্বপ্নঘোরে।
…………………………………………..

শরতের বিকেল
ইসমাইল বিন আবেদীন

ভাদ্র আশ্বিন নিয়ে আসে
স্নিগ্ধ শরৎ ঋতু,
আকাশ নীলে হেসে ওঠে
মেঘ বালিকা মিতু।

ফুটতো কত কাশফুল আগে
বেলেমাঠের চরে,
সেই ফুলেরই মুকুট পরে
ফিরে যেতাম ঘরে।

কাশবনেরই চরে এখন
অন্য ফসল ফলে,
বাদাম তিলে ওড়ে না তাই
ভ্রমর দলে দলে।

ঋতুর স্বভাব বদলে গেছে
আকাশ ভরা মেঘে,
বাতাস হলেই যায় ছুটে মেঘ
তুমুল গতিবেগে।

তবু খোকার ভালো লাগে
শরৎ বিকেল বেলা,
নীল আকাশে ছবি আঁকা
সাদা মেঘের ভেলা।
…………………………………………..

মনে পড়ে সেই শরৎ সন্ধ্যা
এম.এস ফরিদ

একটা শরৎ সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে যায়
যেখানে আলোছায়ার খেলা দেখে ছিলাম দুজন মিলে।
চারপাশ জুড়েছিলো কাশফুল,হিমঝুরি আর গগনশিরীষ
নীল আকাশের তলে বয়ে যাওয়া সমুদ্রের বুকে তার প্রতিচ্ছবি
দেখতে দেখতে অনেকটা বিকেল গড়ালো আমাদের।
গড়ালো কত শত আলাপন আর স্বপ্নীল মধুরতার আবেগময়ী প্রহর।
সাদাটে মেঘের উপর ভাসতে ভাসতে হারিয়ে গিয়েছিলাম
তামাম শরতের আকাশ পানে ।
ধান ক্ষেতের রৌদ্র ছায়ায় আলিঙ্গন করতে করতে
কেটেছিল তোমার আমার শরৎ সন্ধ্যা।
জমিনের সবুজ রঙ যেনো গাঢ়ো হয়েছিলো সেদিন।
নীলের ছটা ছড়িয়েছিলো তোমার অঙ্গনজুড়ে নীলাভ শাড়িতে।
আমি কখনো মেঘ কখনো শরৎ ফুল হয়ে পাশে ছিলাম তোমার।
পান্থপাদপের আঁড়ালে সন্ধ্যার সাঁঝ যেনো উঁকি মেরেছিলো
নদীর ধার বেয়ে বেয়ে ফিরে ছিলাম শরতকে আলিঙ্গন করে।
আজোও মনে পড়ে সেই শরৎ সন্ধ্যা খানি।
জীবনের প্রতিটি শরৎ মুহূর্ত এলে; খুব গোপনে…