শুভ্রতার কথা আসলেই আমাদের চিন্তায় ভেসে উঠে কাশফুলের শুভ্রতা। শাদা মেঘের উড়া উড়ি। যেনো সে বয়ে নিয়ে যায় জান্নাতী শুভ্রতা। যেখানে কেবলী পবিত্র এক অনুভূতি। পরিস্কার নীল আকাশে শুভ্র মেঘের ফুল ফুটে। জমিনেও সবুজ প্রকৃতির মাঝে কাশফুলের শুভ্রতা। এই জন্যই সৃজনশীল মানুষ এই ঋতুকে রাণী বলে। বাংলার আকাশে যখন এই বৃষ্টি এই মেঘ। এটা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি। তিনি বলেছে ‘আমি যদি বেঁচে থাকি তবে এরকম এক প্রকৃতিতে বেঁচে থাকতে চাই। কিন্তু আমার অনেক কাজ। সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তিব্বত জয় করেই আমি আবার বাংলায় ফিরে আসবো। আর আল্লাহ যদি হায়াত দেন তবে বাংলাতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে চাই।’

শহৎকাল এমন এক ঋতু যার ভেতর বাহির সবই শুভ্র। তার আকাশ থাকে পরিস্কার, নীল নয়না আকাশে টুকরো টুকরো শাদা মেঘের ভেলা। মেঘকাটা প্রকৃতিতে থাকে সবুজ পাতার সজীবতা। কমতে থাকা বিলে ঝিলে শাদা শাদা শাপলা ফুল। যেনো স্বচ্ছ কাচের উপর বসে আছে সুন্দরী শাপলাফুল।

এমন দৃশ্য দেখে সৃজনশীল মানুষের হৃদয়ে দোল খায় শুভ্র চিন্তা। সে চিন্তায় মগ্ন হয় সৃজনে। লিখে কবিতা, গল্প, গীতিকবিতা আরো কতো কী! যেনো এই প্রকৃতি তাকে দিয়ে লিখেয়ে নেই শুভ্রপ্রেমের বয়ান। ‘মোলাকাত’ ডটকম শুভ্র শরৎ নামে শরৎ সংখ্যার আয়োজন করে। লেখক বন্ধুরা তাদের সৃজনক্রিয়া আমাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। সেই সকল সৃজিত লেখা নিয়ে আমরা প্রকাশ করলাম শুভ্র শরৎ ১৪২৭ : ৫ম পর্ব। এ সংখ্যায় আছে কুড়ি জন লেখকের লেখা। আমরা আশা করি লেখক-পাঠক সকলেরই ভালো লাগবে। সকলকে শরতের শুভ্র শুভেচ্ছা। আবার মোলাকাত হবে অন্য কোনো সংখ্যায় সেই পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

আফসার নিজাম, সম্পাদক-মোলাকাত ডটকম

সূ চী প ত্র

নীল নীল রোদ্দুর :: ফজলুল হক তুহিন
শরতের রজতশ্রুভ্র মহিমায় :: আমির হোসেন
শুভ্র শরৎ :: নেহাল মাহমুদ
শরৎ তুমি অবিনাশী :: আয়েশা মুন্নি
প্রজাপতি পরাগ রেণু ঢালো :: বিকাশ চন্দ
এবার শরৎ :: তুলি চক্রবর্তী
শরৎ মানে :: শ্রীজিৎ জানা
তিমিরবিনাশী :: শুভ্রাশ্রী মাইতি
শরতের স্মৃতিচারণ :: রবিউল হাসান
ভাবছি :: রোকন রেহান
পেঁজা তুলোর দুঃখ :: অশোক অধিকারী
কর্তব্য :: ইব্রাহিম বিশ্বাস
শুভ্র শরৎ :: ডা. এম ওহাব লাবিব
পার্বণ :: পাপড়ি দাস সরকার
নীলাম্বরী :: মালা ঘোষ (মিত্র)
শরৎচ্যুত ষড়ঋতু :: দিপংকর ইমন
শরৎ :: নীলিমা শামীম
আমার শরৎরানি :: রবীন বসু
শরত সুহাসিনী :: শাহনাজ পারভীন
শুভ্র-শরৎ :: মৃণালেন্দু দাশ
রূপের হাট :: জুবায়ের হুসাইন
…………………………………………..

নীল নীল রোদ্দুর
ফজলুল হক তুহিন

আকাশটা অমলিন নীল নীল রোদ্দুর
মেঘের ভেলায় ভেসে যাবো বলো কদ্দূর
নদীর আকাশ ওই দিগন্তে একাকার
গাঙচিল ঢেউ খেলে আনন্দে পারাপার
সবুজের হিন্দোল বাতাসের কলরব
শিশুদের চোখে হাসে পাখিদের উৎসব
খোলা মাঠে ঘুড়ি ওড়ে হাওয়ায় হাওয়ায়
কি যে খুশি ভেসে চলা কাটা ঘুড়ি পাওয়ায়
সেই গাঁয়ে জোছনাতে আমাদের রূপকথা
আমের বাগানে যেন সুর তোলে চুপকথা
সকালে শিশির হাসে শিউলির সৌরভে
আমাদের শৈশব জ্বলে ওঠে গৌরবে ॥
…………………………………………..

শরতের রজতশ্রুভ্র মহিমায়
আমির হোসেন

মানসলোকের নীলাকাশে হিরন-রূপ
আলোর রেখায় থাকি জেগে

আন্দোলিত কাশবনের সফেদ মঞ্জুরি
পদ্ম-শাপলা-শালুক আচ্ছন্ন জলাভূমি
তুমি-আমি প্রাণের সারথি হয়ে দেখি
দেখি আর শিখি, শিখি আর লিখি

শরৎ রাতের কূলে অলক্ষে শিউলি হয়ে ফোঁটা
সূর্য প্রেমে বিগলিতা প্রবঞ্চের শিকার প্রেমিকা
সে কাহিনী মর্মন্তুত জেনেও প্রেম
জেগে থাকে আমাদের সুবাশিত কুঞ্জে

স্নিগ্ধ রাতে জ্যোৎন্সার সাথে
হলুদ বোঁটার ঝরে পড়া
শেফালির মধুগন্ধে আকুল হয়ে জাগি

ঝরে যায় ফুল, ঝরে যায় তরুলতা
ঝরে যায় গ্রামবধূর শুভ্র হাসির মতো
সরল জীবনের মধুময় ক্ষণগুলি
তবু বেঁচে থাকি ভালোবাসায়
শরৎ রাতে জ্যোৎন্সার সাথে।
…………………………………………..

শুভ্র শরৎ
নেহাল মাহমুদ

আজকে শরৎ, তোমার হাসি সারা প্রান্তরে
শিশির ধোওয়া উচ্ছ্বাস সাথে বাজে অন্তরে।
অরুণ হাসে তরুণ ধানের নম্র আভায়
হৃদয় দুলে হাওয়ায়, ভরা নদীর পূর্ণতায়
গুচ্ছ কাশে সেজে ওঠে সবুজের দিগন্ত
শুভ্র মেঘের যাত্রা হতে চায় অসীম, অনন্ত।
ডালে ডালে জেগে উঠে দোয়েল, পাপিয়ার সুর
উপুড় হওয়া জোছনায় মন ছোটে বহুদূর।
শিউলির সুবাসের মাঝে বয়ে যায় স্নিগ্ধ বাতাস
টলমল শিশিরে ভিজে যায় সবুজ ঘাস।
অবারিত নীলিমায় আকাশের আদিগন্ত বিস্তার,
প্রাঙ্গনে প্রাঙ্গনে গেয়ে উঠে শেফালীর সমাহার
গুঞ্জনে, উচ্ছ্বাসে, আনন্দের জোয়ারে প্লাবিত হৃদয়
শরৎ, তোমার পূর্ণতায়, শুভ্রতায় নেই কোন সংশয়।
…………………………………………..

শরৎ তুমি অবিনাশী
আয়েশা মুন্নি

নদীর কূলে কূলে
কাশফুলে ফুলে
বললো চুপিসারে শরৎ এসেছে,
সূর্য মেঘে লুকোচুরি
রাখাল উড়ায় রঙ্গিন ঘুড়ি
মনটা আমার খুব আদরে ভালোবেসেছে।

কাশবনের পাশে
হেলে পড়া কাশে
দুলছে সাদা বক,
দেখতে দেখতে বিকেল হলে
সূর্য এলো জলের কোলে
খুব যত্নে শরৎ আমার রাঙ্গিয়ে দিলো শখ।

আবার যদি ফিরে আসি
বলবো শরৎ ভালোবাসি
তোমার কোলে সবুজ ধানে বাতাস দোলায় ঢেউ,
শরৎ তুমি সুখ বিলাসী
শরৎ তুমি অবিনাশী
তোমার মতো এমন ভালো বাসবে না আর কেউ।
…………………………………………..

প্রজাপতি পরাগ রেণু ঢালো
বিকাশ চন্দ

হৃদ কমলের স্পর্শকাতর প্রহর ছুঁয়ে সকাল আসে এমনই
অমাবস্যা কোটাল এসেছিলো ভেসে ছিল পূর্ণিমা জোয়ার
জীবনের ঘেরা টোপে তুখোড় একটা সময়ও দামাল তখন
শারদ সময় মেঘ বৃষ্টি বুকের ভেতর স্বপ্ন বুনেছে নম্র সাদা
দীর্ঘশ্বাসের ভেতরেও থাকে অন্য একটা প্রাণের শ্বাস প্রহর
সঙ্গেই থাকেতো মায়া চাঁদ বুকে ঢাকা শালুক পাতা আদর।

ভালোবাসার নির্জনতায় সৃষ্টিকালের মৌণ মোহন ধ্বনি সুর
আকাশ ডাকে সকাল সূর্য গোধূলি যেন ব্যাস্ত লোহিত স্নানে
গাছ গাছালি পাখ পাখালির বৈরাগি সুর ভেসে যায়কি গানে
ঘরেফেরা রাস্তা জুড়ে মনের ভেতর স্বপ্ন খোঁজে জীবন জুড়ে
এখন বনের ঘরে কতক জন্ম জানে মাতৃত্ব বোঝে বনজ কুসুম
উজ্জীবিত পুরুষ পাগল নীল ছায়া তার সবুজ বাসরে প্রাণ ।

ভর সন্ধ্যার রঙ মেখেছে কৃষ্ণচূড়া পরাগ রঙের দিগন্ত মায়ায়
এখনও তো মাটির গন্ধে মারি মড়ক থমকে স্বচ্ছ কথা সকল
কোঁচড়ে সোহাগ শিউলি চোখের আদর কুয়াশা কুচির সকাল
আগমনীর শুভ্র কেশর কাশের ঝালর আদর বোনে মাঠেঘাটে
কেটে যাবে নরক অতীত যাপন অনুভবে তো সবুজ জাগরণী
কত অশ্রু মিশেছে গঙ্গা মেঘনা ইচ্ছামতি জানে মোহনার সুর ।

বুকে মিশেছে উষ্ণ হৃদয় পাঁপড়ি খুলেছে পদ্ম দুটির নম্র আলো
সঞ্চিত যত বন্দিত কথা গানে প্রাণে প্রজাপতি পরাগ রেণু ঢালো।
…………………………………………..

এবার শরৎ
তুলি চক্রবর্তী

শরৎ এলো এ বছরও ভাদরের হাত ধরে,
সাদা মেঘের তুলোর ভেলা ভাসবে আকাশ পরে।
হারিয়ে যাবো!! মনে মনেই, যাবার উপায় নেই,
আগমনীর আনন্দ ম্লান, কাটবে ঘরেতেই।
ওলোট পালট যাপন এবার, নিয়মটা অন্য,
সভ্য মানুষ বন্দী ঘরে, স্বাধীন ঘোরে বন্য।
প্রকৃতির রোষে ভীত সন্ত্রস্ত, শিক্ষিত সমাজ,
সব অসহায়, সব নিরুপায়, নেই খাদ্য কাজ।
মা গো তুমি আসবে বলে, লাগে দোলা ঐ কাশ বনে,
সবাই করবো বরণ, এই আশা জাগছে মনে।
কেটে যাবে আঁধার দিন, মিটবে দূরত্ব সামাজিক,
কাঁসর, ঢাক, ধূপ, ধুনো, ভরে উঠবে দশ দিক।
দীন দুখীদের মুখের হাসি ফিরিয়ে দিও মা গো,
স্বদেশে যেন কেউ না শোনে, ‘পরিযায়ী তুমি ভাগো’
এবার শারদ অর্ঘ্য সাজাব, হিমেল কার্তিকে,
মহালয়ার অনেকটা পর, বোধন চারদিকে।
একসারিতেই রেখো গো মা, সবাই তোমার সন্তান,
অকাল বোধনে ফিরিয়ে দিও সবার হৃত সম্মান।
…………………………………………..

শরৎ মানে
শ্রীজিৎ জানা

শরৎ মানে শাপলাশালুক
জোছনা ধোয়া চাঁদ
কাঁসাই তীরে শুভ্র কাশের
থই থই আহ্লাদ!

শরৎ মানে নীলচে আকাশ
দুব্বো ঘাসে শিশির
পেঁজা তুলো মেঘের হাসি
টুকুর ছোট পিসির!

শরৎ মানে শিউলি টগর
বরফ কুচি হাওয়া
মাল্লা মাঝি আল্লা গাজী
সুজন ভেলা বাওয়া!

ঢাকের বাদ্দি পুজোর জমক
শরৎ প্রাণের দোল
পাখ পাখালির কন্ঠে ভোরাই
মিঠেল কলরোল!

শ্বেত কপোতের পাখায় বাঁধা
এপার ওপার সাঁকো
আগমানীর গান শোনাতে
বাংলাদেশকে ডাকো…
…………………………………………..

তিমিরবিনাশী
শুভ্রাশ্রী মাইতি

একটা রাক্ষসীয় অন্ধকার যাবতীয় হিংস্রতায় গ্রাস করে চলেছে
সূর্য, চাঁদ আর পৃথিবীর অনন্ত দিনলিপি আশ্চর্য মায়াঘুমে।
হাতে তুলে নিয়েছি সাদা পাতার তপোবনীয় মন্ত্র,
চোখের বিদ্যুতে জ্বালিয়ে নিয়েছি পবিত্র হোমের আগুন।
সামগানের বিশুদ্ধতায় ময়ূরকন্ঠী নীল আকাশে
পেঁজা তুলো মেঘরোদ ভরে দিতেই
একটি শিশিরভেজা নিটোল শিউলিভোর আলতারাঙা পা ফেলে নেমে আসে মাটির উঠোনে।
তার কাশফুলরঙা শাড়ীর প্রতিটি ভাঁজে আনন্দের কলকা জরির বুনোট।
চন্দনচর্চিত কপালের সিঁদুরটিপে জাগ্রত উষ্ণ জীবন তাপ।
নিশিঘন কালো চুলের মায়ায় একফালি চাঁদ লেগে থাকে জোছনার অলংকার হয়ে।
দোলনচাঁপার মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে জুঁইয়ের মালা গলায় দুলিয়ে
সে এসে বসল জারুলের নীলচে শীতল মায়ায়।
শাপলা শালুকে ডোবানো চোখ তুলে হাতটি ধরল অক্লেশে।
মল্লিকাফুলের কাঁকন বেজে উঠল রিনরিন করে।
মধুমঞ্জরীর নুপূর বাজিয়ে উড়িয়ে নিয়ে চলল অনাবিল স্বপ্নের দেশে।
তার আর এক হাতে সাজানো পুজোর থালিতে ধানদুব্বোর আলো, কাশের শুভ্রতা আর একশো আট পদ্মের আয়োজন।
ভোরের শিশিরে স্নান সেরে নিতেই প্রদীপ জ্বলে উঠল ঘরে ঘরে।
অন্ধকার কেটে বেজে উঠল আলোর আগমনী গান।
দেখি আলোর মেয়ে হাসছে…
হাসতে হাসতে কপালে জেগে উঠছে তৃতীয় নয়ন, হাতে ফুটে উঠছে বরাভয় মুদ্রা।
পায়ের তলায় রক্ত মেখে নত অন্ধকারের অসুর।
চাঁদআলোর আদিগন্ত শুভ্রতায় ধুয়ে যাচ্ছে অরণ্যানীর অন্ধকার আবিলতা।
মাদল, শিঙাবাঁশির আকুল সুরে আশ্চর্য আনন্দী পরমাপ্রকৃতি ব্যপ্ত হচ্ছে চরাচরে।
…………………………………………..

শরতের স্মৃতিচারণ
রবিউল হাসান

শরৎ সকালে নদীর কূলে
ঢেউয়ের তালে তালে,
সাদা কাশফুল নাচছে যেন
ময়ুর পেখম তুলে।

এমন অপরূপ দৃশ্য চোখে
হয় না আর দেখা,
শরৎ এলে মানস পটে
ভেসে আবার ওঠে।

মুঠি মুঠি কাশফুল তুলেছি যখন
সেই কিশোর কালে,
আজকে আবার মনে পড়ে গেল
শরতের কবিতা পড়ে।

জীবন এখন বড়ই কঠিন
ব্যস্ত এই শহরে,
সারাদিন রাত ছুটে বেড়াই
জীবিকার তাগিদে।

যদিও সাধ জাগে মোর
সময় হয় না আর,
ঘারে চেপে আছে মোর
সংসার নামক পাহাড়।

সেই স্মৃতিরই স্মৃতিচারণ
করছি আজ আমি,
সারাটা দিন খুঁজে ফেরে মন
শরতের দৃশ্যগুলি।
…………………………………………..

ভাবছি
রোকন রেহান

ভাবছি
রোদ কমলে বাইরে যাবো
রোদের সংগে আড়ি।
আজ তো আর বৃষ্টি নেই
বৃথাই কানামাছি, অপেক্ষাতেই আছি।।

ভরদুপুরে শরাঘাত
কামতাড়িত সময়
নিম্নস্বরে ডাক দিয়ে যায়-
চলনা ঘুড়ে আসি।।

বাইরে দেখো নীল আকাশ
মেঘের ওড়াওড়ি
শরৎ শেষের ফড়িংদল
দিচ্ছে মাঠ পাড়ি।।

পাখিরা সব গাইছে গান
মিষ্টি বাতাস মেখে,
যুগলবন্দী আমরা দুজন
হাটবো পথে পথে।

সবুজ পাতার হাতছানিতে
পড়বো তোমার চোখ,
লুকিয়ে থাকা ইচ্ছেগুলো
বলবে হাজার স্লোক।।

লাল শাড়ী অঙ্গে তোমার
তীব্র খোলা হাওয়ায়,
ভুলিয়ে দিবে দুঃখ আমার
অল্প স্বল্প ছোঁয়ায়।।

হাতের মধ্যে হাত দুখানি
তোমার এবং আমার
ভাবছি শুধু কেমন হবে
শেষ বিকেলের বিহার।।
…………………………………………..

পেঁজা তুলোর দুঃখ
অশোক অধিকারী

দূরত্বের মুখোশ খুলে রেখেছি
বাতাসে মড়কের শূণ্যতা ভাসছে; যারা
চলে গেল তারা কেউ শিউলি তলায় প্রদীপ
দেখাবে না আর তবু কেমন শিশিরের ঘাম ছুঁয়ে
আমরা এসে দাঁড়িয়েছি ভোরের অমরত্বে

সাদা মেঘ ধরে দোল খাচ্ছে মিতভাষ তার
আরোগ্য থেকে হাজার বছরের ঘরোয়া ভাব
বাঁধনা পরবে যাবে মড়ক পেরিয়ে
তুলোর দুঃখ বেচে একদিন তাদের ভাত হবে
পোড়া মাটির সংসার থেকে বয় হবে অমরত্ব

আমি তো কোনো আঘাতের ঘর করি না, তবু
কেমন ক্ষতের ভেতরে গিয়ে শুশ্রূষার দাসত্ব করি
আমি কোনো নীল আকাশের কাছে লুকোয়নি
নতুন জামা তবু এত আলো আসে আত্মজার ঘরে
…………………………………………..

কর্তব্য
ইব্রাহিম বিশ্বাস

তোমরা কেউ আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছো না
ডাকবো,তবুও ডাকবো
তোমাদের ডাকা আমার কর্তব্য৷

এখন ঘোর তমসা
একটা আগুন কাঠি মাটিতে মুখ ঘেঁষে এদিকেই ছুটছে
উঠোন জুড়ে ছায়া দেওয়া গাছ গুলো
পুড়ে ঝলসে যাচ্ছে,পাখিরা উড়ে যাচ্ছে
তোমরা অন্ধকারের নেশা করেছো
তোমাদের চেতনার মাঠ জুড়ে
ঘুমের ডানা বিছানো৷

চোখ বুজে স্বপ্ন দেখছো
আর কত দেখবে স্বপ্ন ?

তোমরা কেউ আমার ডাকে সাড়া দিচ্ছোনা
ডাকবো, তবুও ডাকবো
তোমাদের ডাকা আমার কর্তব্য৷৷
…………………………………………..

শুভ্র শরৎ
ডা. এম ওহাব লাবিব

সবুজের সমারোহ শুভ্র সাদা শরতকে বলা হয় ‘ঋতুর
রানি’
বাংলার সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিতে শরত মুগ্ধ চঞ্চল তরুনী।
শরৎ নিয়ে কবিতা, গান, গল্পের কোন কমতি নেই সাহিত্যে
শরতের কাশফুল ভালোবাসা বিনিময়ে কাশফুলের নিমিত্তে।
আল্লাহর সৃষ্টি নদীর কূলে, বিলজুড়ে, খালের পাড়ে মন কাড়ে
কাশফুলের শুভ্রতায় বিমোহিত হয়ে কবিরা শরৎ গান ধরে।
শরৎ মেঘের এ ঋতুতে শরতের আকাশ পরিস্কার থাকে
খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায় আকাশ ঢেকে।

শরৎ মানেই নদীর তীরে কাশফুল শরৎ মানেই হাস্নাহেনা
বিলে বিলে শাপলার সমারোহ পাকা তালের আনাগোনা।
শরৎমানেই তালের পিঠা আর তালের রসের পায়েস
শরৎ মানেই ক্ষেতে ক্ষেতে আমন ধানের বাড়ন্ত আয়েশ।
ঝকঝকে কাচের মতো স্বচ্ছ তুলার মতো সাদা মেঘমালা
এসব নিয়েই প্রকৃতি বরণ করে নেয় শরৎকালের খেলা।
ঋতু পরিক্রমার তৃতীয় ঋতু হিসেবে শরৎকাল গঠিত হয় ভাদ্র আশ্বিন মাস আগস্ট থেকে মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত রয়।

শুভ্রতার প্রতীক,সাদা কাশফুল, শিউলি, স্নিগ্ধ জোসনা আলোছায়ার খেলা দিনভর- এইসব মিলেই শরতের বাসনা।
শরতের স্নিগ্ধতা এক কথায় অসাধারণ জলহারা শুভ্রতর
মেঘের দল যখন নীল, নির্জন, নির্মল আকাশে পদসঞ্চার।
শিউলির মন ভোলানো সুবাসে অনুভূত হয় শরতের ছোঁয়া
দিগন্তজুড়ে সাতরঙা হাসি দিয়ে ফুটে ওঠে রংধনুর মায়া।
শরতের রূপ যেনো শান্ত-স্নিগ্ধ-কোমল অনাবিল উচ্ছ্বাস যেখানে মলিনতা নেই, আছে নির্মল আনন্দ আর উদ্ভাস।

শরতে শেফালি, মালতী, কামিনী, জুঁই, টগর আর কাশ ফুল
মাথা উঁচিয়ে জানান দেয় সৌন্দর্য সুবাস ছড়িয়ে দেয় দুকুল।
গ্রামের দিঘিতে ফোটে পদ্ম ফুল, দিঘির পাশেই শেফালী
প্রভাতে গাছ থেকে ঝরে পড়ে শত শত শেফালির রুপালী।
এর সুগন্ধ মনে লাগায় কেউ বা গাঁথে শেফালি ফুলের মালা
আর কাশফুল যেনো শরতেরই স্মারক আর শিশুর খেলা।
শরৎ মানেই নদীর তীরে তীরে কাশফুলের সাদা হাসি
নদীর দুই ধারে, জমিতে শরৎকালের কাশবন ভালোবাসি।

দোয়েল-কোয়েলের কুজনে মুখরিত পল্লী গ্রাম-মাঠ-ঘাট
তরঙ্গিনীর কোমর জলে মাঝিদের সুরালো গানের হাট।
পালা বদলের খেলা এখন চলছে শরতের মাঝামাঝি সময়
চারদেয়ালের বাইরে প্রকৃতিতে চোখ রাখলেই লাগে মধুময়।
শরতের স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নার রাত্রি ভালোলাগা মনকে ছুঁয়ে যায়
ভোরের কুয়াশা মাড়িয়ে খালি পায়ে চলতে কার না মন চায়।
দেশের সব অঞ্চলেই নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল পাহাড়
লাবন্যে ভরে তোলে শরৎ স্নিগ্ধ আকাশে সমীরণে তাহার ।।
…………………………………………..

পার্বণ
পাপড়ি দাস সরকার

রাত্রির বারান্দায় এখন শুধু অন্ধকারের কোরাস
অতর্কিতে বিদ্যুৎ ঝলকানিতে, কেঁদে ওঠে শিশুরা
অথচ মেঘের ফাঁক দিয়ে শুক্লপক্ষের চাঁদ
ভাদ্রমাসে হাতছানি দিচ্ছে মহাপূজার-
মেঘেদের রাত্রিবেলায় বিছানার কাছে যাওয়া মানা
মেঘেদের শরীর খারাপ হলে পার্বণ বন্ধ থাকে
তবু যেন ইচ্ছে হয় মেঘ গায়ে বসে থাকি
শরতের প্রতীক্ষায়, রাত্রির বারান্দায়
…………………………………………..

নীলাম্বরী
মালা ঘোষ (মিত্র)

ভালোবাসার কথা কত ভাবে
বলি, তবুও বলতেই পারি না—
কতবার দেখি, চমকে উঠি
চোখের ওপর চোখ চলে যায়।
এখন আকাশে শরৎ শুভ্র নীলাভ ছটা।
আগমনী সুর বাজছে চতুর্দিকে।
ধানের ক্ষেতে দোলা লাগে
কাশের বনও মাথা দোলায়।
সূর্যের কিরণছটা তোমার মুখে
খেলা করে—
দূরে কোন মন্ডপে শোনা যায়
স্তোত্র পাঠ— ঘন্টা ধ্বনি।
তোমার দুচোখে গভীর বর্ণালী
কি অপরূপা তোমার দেহবল্লরী
নীলাম্বরী তুমি কত সুন্দরী
হৃদয় জুড়ে শুধুই তুমি।
…………………………………………..

শরৎচ্যুত ষড়ঋতু
দিপংকর ইমন

আজ সকালে,
চা কাপের সাথে আড়ি ছিলো শিউলী ফুলের।
বৃষ্টির নামতা পড়ে শরৎ কাঁদে,
আকাশের নীল চুরি করে নেয় ঋতুদস্যু
কালো মেঘেই কাশফুলের আগমনী।
অভিমানী শরৎ, ঋতুচক্রে পথহারা
সকাল বেলা বিলাপ করে মাটি বুকে
শিশির অসহায়।
ঈশ্বর মুঠো বন্দি করে আমাদের আদিম ষড়ঋতু।

…………………………………………..

শরৎ
নীলিমা শামীম

রোমান্টিক প্রেম খুজতে খুজতে
গেলাম অনন্যার ঐ কাশবনে,
ভাস্কর্যময় মুখে ছটক পড়লো রোদের!

ছিটেফোটা বরষায় আকাশ চমকালো
হৃৎপিন্ডটা নেড়ে উঠে চমকিত করলো
ঠাই দাঁড়িয়ে রইলাম মাঠের মধ্যিখানে!

নির্মল হাসিতে ভুবন কাপিয়েছো তুমি
সেদিন পারিনি অবজ্ঞা নিয়ে ফিরে আসতে
সত্যের সাক্ষী হয়ে, নির্ভরতায় বিকুলাম!

খালি পায়ে হেটে ছড়িয়েছ রুপের বন্যা
হাতের ঝলকে পুরেছে দেখ ছনের কুড়েঘর
দেখুক ঢং পড়শী নেমেছে ধরাতে আকাশপরী!

ঝিলিমিলি চুলের গন্ধে মাতাল বুনোহাস
অঙ্গ যেনো এক নির্মল বৈরী সু-বাতাস
লুকোচুরি করা শিউলীর মিষ্টি গন্ধ ছড়া কবিতা!

আলপনায় আবৃষ্ট পা’দুখানি অপূর্ব দৃশ্য
আবিরে ঢাকা শহরে তুমি অনামিকা
বুক বোতামের ফাকে চুম্বনের মিতালী
তুমি, আমি, রৌদ্র, ও মিটমিট বৃষ্টি শিশির!

শরৎ রানীর রুপের বাহার
কত বলে যায় লিখে
তোমার রুপে মুগ্ধ আকাশ
হয় বিলুপ্ত কিছু শিখে!!
…………………………………………..

আমার শরৎরানি
রবীন বসু

শরৎ এসেছে আজ, নীলাকাশ জুড়ে শুধু আলো
সাদাকাশ ফুটে গেছে খালবিল করে টলোমলো।
পদ্মরা ফুটেছে জলে তুলোমেঘ ভাসছে আকাশে
আগমনি এসে গেছে উৎসব-বিন বাজে বাতাসে।

তবুও ভয়ের চিহ্ন সারাদেশে অসহায় ত্রাস
সংক্রমণ বেড়ে যায় মারণ করোনা ভাইরাস।
বিশ্বব্যাপী শুধু দেখি ভয়ানক মহামারী জাগে
প্রাণের ঈশ্বর হয়ে স্বাস্থ্যকর্মী লড়ে অগ্রভাগে।

শরৎ এসেছে আজ শিশুমন খুশি নিয়ে মাতে
শাপলা-শালুক তোলে রাম-রহিমরা একসাথে।
প্রকৃতি সাজায় ডালি উপাচার আর উৎসাহে
দশভুজা দুর্গা আসে বাপের বাড়ি বাংলাদেশে।

শিউলি সকাল আসে হাতে নিয়ে শিশিরের জল
আমার শরৎরানি হাসিতে খুশিতে হল ঝলমল।
…………………………………………..

শরত সুহাসিনী
শাহনাজ পারভীন

সুহাসিনী শারদীয়া ছাতিম বিকেল-
মেঘেদের নৃত্য যেন আকাশের মতি।
কলার প্রয়োগ যত শরতের দিন-
কেউ আর জানে না কি, তার পথ-গতি?

উছলে তারার মেলা জ্যোস্না ধবল-
বাসন্তী রেমার চোখে নামে সে আঁধার।
আবাদী জমিতে তার কলার বাগান-
রাতের অন্ধকারে নোয়ানো অপার!

কে চায় বিচার তার, কে বিচার করে?
ফেসবুক ওয়ালে তার নতমুখে কথা।
শেয়ার, লাইক আর কমেন্ট লিখি
তাতে আর লোপ পায় রেমাদের ব্যথা?

শরত তুমি কি পারো, এইসব দুখ
ভাসিয়ে উড়িয়ে নিতে দূর অজানায়?
ভরিয়ে দিতে পারো নীলাকাশ শুধুÑ
রঙিন মেঘের ভেলা আকাশের গায়?

শিহরণ! শিহরণ! কাশ! কুশ! ফুল
বিল, ঝিল, শালুক আর পদ্মের গান।
মাদক দুপুর শুধু ঝিরিঝিরি ঢেউ!
শরত ফুলের মেলা শিউলির তান!
…………………………………………..

শুভ্র-শরৎ
মৃণালেন্দু দাশ

আজ আকাশ এসেছে নেমে বিছানায়
চারদিক নীল শুভ্র শরতের স্পর্শে জেগে আছে
চুপ, নক্ষত্র জোছনায় ভেসে যাচ্ছে ঘরের মেঝে

আজকে মনে পড়ছে খুব—
পুতুল খেলার সেইসব দিন বর বউ সেজে
দুজনেই কাল্পনিক ছাদনাতলায়

শিউলি শিশিরে মাখামাখি ছেলেবেলা
কাগজের নৌকো করে ভেসে যেত নিঝুম দুপুর

দূরে কাশের বনে হারিয়ে যেতে যেতে
কখন যে ভালোবেসেছিলাম দুজন দুজনকে
আজ আর মনে নেই কিছু

শুধু তোমার চুলের মধ্যে লেগে থাকা কুসুম তেলের গন্ধ
যা আজও আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়
তিরপূর্ণির মাঠ পেড়িয়ে তেপান্তরে

সে কী ভোলবার ,
ঠৌঁটে ঠোঁট রেখে প্রথম পাপড়ি মেলা শুভ ক্ষণ

এতবছর পরেও যেন অবিকল
আগের মতো হারিয়ে যেতে থাকি আজও দুজনে জোছনায়
…………………………………………..

রূপের হাট
জুবায়ের হুসাইন

অরুণ-রাঙা আকাশটা আজ স্বপ্ন আঁকে দু’চোখ জুড়ে।
ভীড় করেছে সাদা মেঘের ভেলাগুলো। কী অপরূপ
রূপের ছটা মেঘ মুলুকে; মন কেড়ে নেয় দৃশ্য অরূপ-
ইচ্ছে জাগে ওই ওখানে পাখি হয়ে যাই যে উড়ে।

নদীর কূলে দুলতে থাকে এপাশ ওপাশ সাদা সাদা
কাশের ফুল। এলোমেলো উড়তে থাকে যেন সখার
মাথার চুল। ছেঁড়া পালে বাতাস লেগে সৃষ্টি অপার
নৌকা ছোটে। সব রূপেতেই ভরবো মনন নয় তো আধা।

কুসুম-বনে গুনগুনিয়ে ভোমরারা আজ গাইছে গানা,
গন্ধে হারা প্রকৃতি রাজ; জড়িয়ে গায়ে সবুজ কায়া
ঢেউ তুলেছে সবুজ ফসল। সবকিছুতে কোমল মায়া-
লুটবো সকল রূপ-শোভা আজ মানবো না যে কোনো মানা।

এই যে আকাশ- কাশফুলে দোল- ভ্রমর-কুসুম-ফসল মাঠ
পসরা নিয়ে বসল সে যে শরতেরই রূপের হাট।