চাঁদের আলোয় সমুদ্র যেন অপরূপ হয়ে ওঠে সে সন্বন্ধে মেরীর ধারণা ছিল না। স্কারবারার সমুদ্র দর্শনে চাঁদ ছিল না। ভুমধ্যসাগরের হাওয়া যখন চুলে আর শরীরে, সমুদ্রের ধার দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মেরী বলে- কি অপরূপ এই সব দিন রাত ক্রিস। স্তব্ধতা ভেঙ্গে, বুকের হাঁপরে সুবাতাস ভরে, ক্রিস মুখ ফেরায় মেরীর মুখের দিকে। অজস্র বর্ণ কুচির মত রেনু রেনু জোৎস্না ওর চুলে। জোনাকির আলোর গুড়োর মত ঝিকমিক। ঘাড় পর্যন্ত থোকা থোকা চুলে পনিটেল বাধা নেই। তাই আলো চুলের ভেতর। হেয়ার ব্যন্ড বা ক্লিপ শাসন করছে না চুলের রাশ। খোলা, অবারিত। মেরীর হাত ধরে চলতে চলতে বলে ক্রিস- জোছনাকে যেমন বোতলে ভরে রাখা যায় না সুর্যের আলোকেও নয়। না হলে আমাদের হ্রদের দেশের বিষ্টি যখন ছাড়ে না, বিদিকিচ্ছি অন্ধকার হয় চারপাশ, সারা ঘরে এই সব আলো ছড়িয়ে দেওয়া যেত। বোতলবন্ধ উষ্ণতা আর আলো।
মেরী হেসে বলে- এ কোটেশন তুমি কোথা থেকে চুরি করেছো আমি জানি।
-কোথা থেকে মেরী অব ম্যাগডালা?
-ডাফনে ডি মারিয়ার রেবেকা থেকে।
ক্রিস হেসে মেরীকে আরো নিবিড় করে বাঁধে পঞ্জরের ভেতরে। বলে- রেবেকায় চাঁদ সূর্য বোতলে ভরবার কথা নেই। আছে সুখস্মৃতিকে বোতলে ভরবার কথা।
-একই কথা।
-আসলে এ কোটেশন মেরী আরাবিয়ান নাইটস থেকে তুলে নেওয়া। দেখ না ইয়া বড় বড় দৈত্যদের কেমন করে বোতলে ভরে ফেলা হয়।
মেরী ক্রিসের হাত গালে ঠেকায়। বলে- বোতলের দরকার নেই। আমি গল্পে গল্পে সব তোমাকে মনে করিয়ে দেব।
চাঁদ জোৎস্নায় সবকিছু বড় সূচীময় আজ। কিছু ভাঙা টিন, বোতল, কাগজের বাক্স এবং ফলের খোসাকেও আবর্জনা ভাবছে কে? ক্যামেলি আর ওফি- তোমরা দুই টিনএজার ঘোর। আমরা অন্যদিকে গেলাম। এই বলে চলে গেছে নতুন জায়গায় এক নতুন বাসে চেপে আরো কয়েকজন ওদের বয়সী ছেলেমেয়ের সঙ্গে।
নানা সব কথায় পথ চলা। নানা সুর। নানা ভাবনা। নানা শব্দে তারই তরঙ্গ। বলা যায় ক্রিস আর মেরী বিয়ের পনেরো বছর বাদে প্রেমেই বসবাস করছে তাদের সময়ের প্রতিটি মুহূর্তে। অন্ততঃ মেরীর চলা বলা “ইনলাভের” মত। ক্রিসকে সকলসময় সকলে বোঝে এ সাধ্য আছে কার? ক্রিসের অর্ন্তলাক? কেবল ঈশ্বর বলতে পারেন।

পরদিন সকালে ঘরে ফেরা ক্রিসের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে মেরী- কোথায় ছিলে তুমি।
-এই তো ওদিকে মেরী। সকালে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম।
ভূমধ্যসাগরের আবহাওয়ায় যে সব গাছপালা ফিস ফিস ভাষায় কথা বলে, অস্তিত্ব ঘোষনা করে, হ্রদের দেশের গাছাপালার সঙ্গে তেমন মিল নেই। মিল শুধু নিস্তব্ধতার। যে রহেস্যে ক্রিসের অর্ন্তধ্যান। যে ব্লাকম্যাজিক বা তার অতিীন্দ্রীয় অনুভুতির সবটুকু ধরতে পারে না ক্রিস, বুঝতেও পারে না। যখন ছোঁয় এদের পাতা বুঝতে পারে জগতের ভেতর আর এক জগতের কথা।
তবে আজকের সকালে অন্য এক অনুভূতি তাকে ব্যথিত ও বেদনার্ত করেছে। প্রথম বারের মত মনে হয়েছে অপার রহস্যলোক, গাছপালায় সে বহিরাগত। ওরা এখন আর তাকে চিনতে চায় না। ফিস ফিস থামিয়ে স্তব্ধ হয়েছে ওর আগমনে। এদের ভেতর নিজেকে হারিয়ে ডুবিয়ে তুলবার কাজটি এখন আর সে আগের মত সম্পন্ন করতে পারছে না। জলপাই বন মাথা দুলিয়ে এসো বলে চুপ হয়ে গেছে। বিক্ষুদ্ধ ও বিক্ষিপ্ত ভাবনায় দিশেহারা ক্রিস। তার একান্ত অনুভবের কোথায় তোড় পরেছে? সে বুঝতে পারছে না। আগের মত বিশুদ্ধ হ্রদয়ে ফিরে যেতে পারছে না ওদের জগতে। সেই নির্দোষ সময়ের আনন্দে এখন আর নির্দোষ আনন্দের ছল ছল অনুভুতি নেই। কঠিন হয়ে গেছে সেই অনুভূতি। কঠিন হয়ে আছে সবগুলো গাছের পাতা, কান্ড, ডালপালা। কিছুকাল ইতস্তত ঘোরাঘুরির পর এক কফি শপে এসে বসেছিল। সকালে দোকানে তেমন লোকজন ছিল না। কফির কাপে চোখ রেখে ও ভেবেছে এভনলীর তুর্ণী নদী আর সেই সব চেনা নিসর্গের কথা। হু হু হাওয়ায় ঢেকে দেওয়া, নিস্তব্ধতায় ছেয়ে দেয়া, রহস্যময়তায় ছল ছল উদাসীন সেই সব সময়।
ফলের দোকান থেকে কিছু পাকা ডুমুর আর তরমুজ কিনে ফিরে এসেছে। আর মেরী নামের আজকের অপার উচ্ছ্বল কিশোরীর জন্য কিছু রঙ্গিন ফুল। ফুলগুলো বৃটেনের মত নয়। এখানকার ফুলগুলো সুরভিময়। ছোট্ট ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েছিল মেরী। পাশের ভিলার আর দুটো মেয়ের সঙ্গে ক্যামেলি আর ওফি সমুদ্র স্নানে গেছে। ঘরবার করতে করতে এবার এসে ব্যলকনির বারান্দায় ছবির মত দাঁড়িয়ে আছে।
-কোথায় গিয়েছিলে তুমি?
-বাইরে। এই দেখ কতসব ফুল আর ফল তোমার জন্য।
ফল ও ফুলের বুকে হাতে ঘরে আসে মেরী। বলে- এমন ভাবে যাবে না। আমার খুব চিন্তা হয়েছিল। প্রতিজ্ঞার কণ্ঠে মেরীকে নিশ্চিত করে বলতে পারে না ক্রিস- আচ্ছা যাবো না। অতিথি বালক তারাপদ এমন প্রতিজ্ঞা কারো সঙ্গেই করতে পারে না। তাই সে নিঃশব্দ। নিঃশব্দ বাহুবন্ধনে স্তব্ধ ও আবেগাপ্লুত কন্ঠে বলে মেরী একসময়
-সময় সময় আমি তোমাকে একটুও বুঝতে পারি না।
-সময়ে সময়ে আমিও নিজেকে নয়। একদম জটিল হয়ে যায় সবকিছু।

মারবেলায় হঠাৎ দূরদার ধারাপতন। সেই মন্দ্রিত সঘন বর্ষণ মুখরিত সময়ে ক্রিস ও মেরী গভীর অন্তরঙ্গতায় ডুবে ভাবে সুখের আর এক নাম কি তবে শরীর? ওক, বার্চ, এ্যাশ, পপলারের থোক থোক ছায়ায় একটা বসন্তের বৃক্ষ এখন মেরী। কেবল পবিতানে সুরভিময়। অপার রহস্য ওর সবকিছুতে, খোলা চুলে, অনাবৃত শরীরে। মেরীকে সফেদ ডিকান্টারের একপাত্র ক্রিস্টালের মত চুমুকে চুমুকে পান করে ক্রিস। হলিডের প্রপাতি সময়ে এখন দুজনে অত্মহারা।
আজ প্রবল ধারাপতনে ক্রিসের আদিবাসীদের কবিতা উৎসবে যাবার কথা ছিল। সে দোকান থেকে একটা বই কিনেছে- তিরিশোত্তর মহাকবিদের আত্মার প্রতিফলন। পাতা ওল্টানো হয়নি। লিরিকাল মেজাজ তার মেজাজে আনে চন্দনের ভাললাগা প্রলেপ। যদিও সকালের বিক্ষুদ্ধ মন এখন মেরীর প্রেমের প্রলেপে স্নিগ্ধ। তবে কখন আবার মন বেবশ হয়ে ওঠে কে জানে। এই টরেনচুয়াল রেনের ভেতর সে জেনে গেছে মনের কোনখানে কি প্রদাহ। কি খোয়া গেছে আমার এমনি কোন ভাবনা। কি হারিয়েছে চিরতরে? কোথায় তোড় পরেছে?

আগামীকাল কেভ নগরীতে যাত্রা। পাহাড়ের গা কেটে টেরাকোটা মূর্তির কিছু ঘর বাড়ি বানিয়েছে অনেক কাল আগে কারা সব। সেখানেই যাবার কথা। ঘরে ফেরার দিন সমাগত। পৃথিবীতে ফুরোয় না কোন বস্তু? এক সেজ আলো ফুরায়। অতবড় সূর্যটাও একদিন ফুরিয়ে যাবে একদিন অকাতরে বিলাতে বিলাতে। ক্রিসের সোনারতরীতে কেবলই কি সুকৃতির সোনার ফসল? ওফেলিকে কাছে টানে। ক্যমেলিকে পাশে বসায়। হঠাৎ কি এক রসিকতায় ঘর কাঁপানো হাসিতে কার্নিশের দুটো শালিককে সচকিত করে। হাসতে হাসতে আবার ক্রিস কেমন বিষন্ন। যা দেখে মেরী বলে- ওকে কি আমি সবসময় চিনতে পারি?

ক্যাবলকারে ক্রিসের পাশে ওফি। মায়ের পাশে ক্যামেলি। দ্রুত ছুটে চলা ক্যাবল কার কি কারণে আটকে গেল মাঝপথে। এক মস্ত নির্মেঘ আকাশের নিচে। ঝুলন্ত লিডে মানুষ। দুলছে শূন্যতার মধ্যে। ওফেলি আর ক্যামেলি এর মধ্যে চিৎকার করে কথা বলছে- ভয় তাড়াতে। কিছু মানুষকে মহাশূন্যে কিছু সময় ভীত রেখে আবার সচল হয় ক্যাবল কার। যে থামায় যে আবার সচল করে গতি। সোনারতরীর ফসল গত সমস্যা আপাতত ক্রিসের মনে নেই।
-এবার বাড়ি ফিরে যে মারবেলার রচনা লিখে আমাকে চমৎকৃত করতে পারবে সে এক মজার উপহার পাবে। আপাতত ক্যবলকারের বোতাম টেপা পরিচালক ওদের নিশ্চিন্ত করেছে। তাই দুই মেয়ের হাত ধরে গল্প করতে করতে ক্রিস চলেছে। মেরী একটু আগে।
-কি উপহার? ওফেলির প্রশ্ন।
-আগে বলে দিলে মজা কোথায়?
-আর এক মজার হলিডেতে নিয়ে যাবে?
-আর এক মজার হলিডে? ক্রিস একটু ভাবে। তারপর বলে- ঠিক তা নয় ওফি। বললাম তো উপহার।
ওফেলি আর ক্যামেলি সিঁড়ি ভেঙ্গে নামতে মায়ের হাত ধরে। পঁচিশ ডিগি রসেলসিয়াসের উষ্ণ আবহাওয়া চারপাশে। সিঁড়ি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে কার্ডিগান খুলে কোমরে বেঁধেছে ওরা তিনজন। পনিটেলে মেরী, ক্যামেলি আর ওফি। মনে হয় ওরা তিন বোন। মেরীর দিকে চেয়ে হেসে ওঠে ক্রিস। পর্বতের গুহা, পর্বতের ঘর, ঘরের মানুষ, নগরালী, সবকিছু দেখা হলো দু চোখ ভরে। এরপর ফিরে আসা সেই সমৃদ্ধ ভিলাতে।
আজো চাঁদ উঠবে। পূর্নিমার আলো নিয়ে নয়। কিছু আলো তবু রয়ে যাবে শরীরে। স্ফিত সমুদ্র ছল ছল কল কল শব্দে ডাকবে ওদের। তবু আজ ওরা কেউই আর সেই মেখলার জগতে যেতে রাজি নয়। আগামী কালের দশটা জাম্বোজেট ওদের পৌঁছে দেবে প্রথমে হির্থো। তারপর ছোট প্লেনে বাড়ি। একদিন লন্ডনে ঘোরাফেরা। মেরীর ভাই আছে। তারপর হ্রদের দেশ। বৃষ্টি আর বসন্তের মধ্যে। শরৎ আর পাতাঝরার ভেতরে।
ঝিম ধরা রাতে আর একবার সবকিছু ঘুরে ফিরে দেখে আসতে চেয়েছিল ক্রিস। পরে সেই ইচ্ছেকে গুডবাই বিছানা দখল। এপাশ ওপাশ করতে করতে মেরীর গালে গাল ঠেকিয়ে ঘুমিয়ে গেল ক্রিস।