পূর্ব লন্ডনের এক টেরাসড বাড়িতে উল বুনছিল মেরী। একটি মাত্র ভাইয়ের সংসারে স্থান পেয়ে গেছে মেরী দুই বছরের জন্য। নিজের বাড়িতে থাকতে পারতো। তাদের গুঞ্জরিত জীবনের পুলকিত মধুভান্ড। পারেনি থাকতে। সহস্য স্মৃতিরা তাকে উন্মাদ করেছিল। সে পৌঁছে গেল লন্ডনের এ ঘিঞ্জি এলাকায়। এক খুপরী বাক্স ঘরে। ক্যামেলি ও ওফি আন্টি ডরেথির ওখানে। জেসির খবর কেউ জানে না। যারা দেখবে বলেছিল তারা দেখছে না। তালা লাগানো বাড়িতে জেসিকে রাখা যায় না।
ইতোমধ্যে জুড দ্য টেরিবল এক অষ্টদশীকে প্রেমে বেঁধে কোথায় যেন চলে গেছে। টিসা নামের দূর্ভাগ্য একাকি আবার। আবার যদি জুড দ্য টেরিবল তাকে ডাকে এবং এসে পৌঁছায় এভনলীর নিঃশব্দ বাড়িতে, অষ্টাদশীকে ফ্লোর বোর্ডের নিচে গুম করে, তাহলে হয়তো টিসার ভাগ্য খুলবে। মাংসের দোকানের এক মাত্র মহিমান্বিত খরিদ্দারের মত জুডকে আশান্বিত করবে। আপাতত সে কতদিন পরের ব্যাপার টিসা বা জুড কেই জানে না।

মেরী চোখ রাখে জানালায়। সমৃদ্ধ বৃক্ষাবলী চারপাশে নেই। সারি সারি বাড়ি কেবল। দোকান। জনবহুল রাস্তা। রাস্তায় বাজার বসে। ভ্যানের দোকানও আছে। গাড়িতে দোকান সাজনো। মানুষের কোলাহল। এমনি এক দোকান চালায় মেরীর অগ্রজ। যে গোটা কয়েক সন্তান এবং এক “হাউজওয়াইফ” সহ দিনাতিপাত করে। মেরী জানালা থেকে সরে আসে। পৌঁছার বসবার ঘরে। নানা সব ভাঙ্গাচোরা জিনিষপত্র। এরি মাঝে হাত পা ছড়িয়ে এক নোট খাতায় কি সব হিসেব কষছে পল- মেরীর অগ্রজ। চোখ তোলে না। পদশব্দ যদিও তার খুব কাছে। স্ত্রী রান্নাঘরে। সন্ধ্যার খাবার তৈরীতে ব্যস্ত। বেবি কটে দুই বছরের কনিষ্ঠতম। সে কখন থেকে চিৎকার করছে। যে কোন বয়স্ক একজনের দৃষ্টি আকর্ষণই সেই চিৎকারের কারণ। আপাতত মা ও বাবা কারোরই সেদিকে সময় দেবার অবসর নেই। মেরী শিশুটিকে কোলে তুলে রান্নাঘরে প্রবেশ করে।
-ও কাঁদছে। মেরী জানায় বিব্রত কণ্ঠে।
মেরীর কথায় বিরক্তি ভরা কণ্ঠে পলের স্ত্রী জানায়- রেখে দাও ওখানে। নিজেই চুপ করবে। বড় ফন্দিবাজ হয়েছে আজকাল।
চুলোতে আলুসেদ্ধ। কিছু মাংসের কিমা প্লেটে। ছোট রান্নাঘর। এক পাইন কাঠের টেবিল। দু পাশে চেয়ার নয় বেঞ্চ। পলের ছয়জন ছেলেমেয়ে অনায়াসে সেখানে বসতে পারে। আপাতত বারো, দশ, আট ও ছয় খাবারের আশায় শান্ত মুখে বসে আছে। তেরোর টিন এজার খুব জোরে, অনেক উঁচু ভলুমে রেগে শুনছে। সারা বাড়ি শুদ্ধো যে গন্ধ তাকে হানিপট কটেজের সুবাস বলবে না কেউ। সেই চমৎকার পটপুরির গন্ধ নয়, কিম্বা সবুজ বাতাসের বিশুদ্ধ ঘ্রাণ নয়। যে ঘ্রাণ উঠে আসে লেকের হ্রদয় থেকে, পর্বতের পাইন থেকে, আর লুপিনের বন থেকে। এ ঘ্রাণ পুরণো আসবাবের, জমে থাকা রান্নাঘরের। নানা বিধ অর্ধ শুস্ক ন্যাপির। পলের স্ত্রী ঘর সাজানো গোছানোতে বড় অগোছালো। নেহায়েতই অপটু। মেরী চেষ্টা করেছিল। কিছু করতে পারেনি। পরদিন ঘর যে কে সেই- ব্যাক টু নরমাল।
-আগামীকাল যাবি নাকি ক্রিসকে দেখতে?
-যাব। নির্লিপ্ত গলায় বলে মেরী।
মাসে দুবার সে ক্রিসকে দেখতে যায়। পলের ভ্যানে পৌঁছায় তারপর ফিরে আসে ট্রেনে, বাসে, হেঁটে। এই কি কারণ? মেরী আর বাড়িতে ফিরে গেল না। একবার দেখতে এসে রয়েই গেল।
-তৈরী থাকিস। বেলা একটায়।
-আচ্ছা।
-একা আসতে পারবিতো?
-পারবো।
-আমাকে যেতে হবে বার্মিংহামে। তড়িতে এমন খবর পৌঁছৈ দিয়ে ব্যস্ত পল। আবার নিজের কাজে ফিরে যায়।

জানালার ওপারে কলকোলাহলের লন্ডন শহর। ডবল কাচের জানালা নয়। কিছু শব্দ সারাক্ষনই ঘুরে ফেরে বাতাসে। এভনলীকে কি ক্রিস একা ভালবেসেছে? ওরাও ভালবেসেছে। সেই নেশার মত ঝিম ঝিম বাড়ি। উদার বিপুল সুর্যালোক। যখন তখন ঝরে পড়া কুচো কুচো বৃষ্টি। আইস এজের হ্রদ। সময়ের স্রোত মাঠের শস্য সম্ভারে। অনাদি পর্বত মালা। সারা অঞ্চলের বৈভব।

কিমা ও মটরশুটি আলু ভর্তার খাবার। ইংরাজি নাম মিনস মিট, ম্যাসড পোটাটো এবং মাশি পিজ। এসব একটু খেয়ে কি একটা বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গেল মেরী। স্বপ্নে পৌঁছে গেল ডেইজি আর লুপিন ঘেরা উপত্যকায়। যে উপত্যকার মাঝখানে আকাশের নিচে ক্রিস। আর হ্রদের ছল ছল স্রোতের কাছে, উইপিংউইলো তলায় দাঁড়িয়ে আছে টম।
স্বপ্ন ভেঙ্গে উঠে বসে মেরী।
অন্ধকারে এক গ্লাশ ঠান্ডা পানি হাতড়ে হোচট খায়। সুইচ দরজার কাছে। অন্ধকারে দরজা কোথায় খুঁজে পায় না। চোখে আঠার মত ঘুম। নীল আলোর বাল্ব ভেঙ্গে গেছে। আর একটি এখনো লাগানো হয়নি। অন্ধকারেই ঘুম পেয়ে বেঁচে যায়। জেগে ওঠে প্রভাতে।
হানিপট কটেজ আর খোলামেলা জগত থেকে বিতাড়িত ক্রিসের জগতে কি ভাবে একা মেরী ঘুরবে প্রস্তর থেকে প্রস্তরে, বন থেকে বনান্তরে, এ রাস্তার বাঁক পেরিয়ে অন্য রাস্তায়। কি ভাবে রোপন করবে হরেক পুষ্পাবলী যারা প্রাণ পায় বসন্তে। সামারে ফুটে ওঠা বড় বড় গোলাপের ঝাড়, দেয়াল আর ছাদ পেয়ে ঝুলে পড়া সেই সব লতানো বাগান। সেখানে একা মেরী? কি করে থাকে। এই স্বেচ্ছা নির্বসনের সব কথা জানে না বিশ্ব সংসার। জানে না কেউ পাঁচ ফুট নাথিং মেরীর হ্রদয়ে এত সব ঢেউ ওঠা নামা করে।
করিডোরে দেখা হলো পলের মাঝের ছেলেটার সঙ্গে। পিজামার ফিতা বাঁধতে বাঁধতে ঘুম চোখে ফিরে চলেছে নিজের ঘরে। এই বয়স এখন ওফির। স্বেচ্ছা নির্বাসনে ওদের সঙ্গী করে নি মেরী।
পুরণো ড্রয়ার ঘাঁটতে ঘাঁটতে যে ছত্রিশটি চিঠি পাঠানোর স্বাক্ষরিত উত্তরের কাউন্টার ফয়েল দেখেছিল মেরী সে ক্রিসের এক মাত্র জীবিত আত্মীয় আন্ট ডরোথি। প্রতিমাসে দু লাইন চিঠির সঙ্গে একটা করে চেক পাঠিয়েছে। ক্রিসের সব খবর জানা থাকলেও এ খবর জানে না মেরী। আপাতত ক্যামেলি আর ওফি কনিসটন ওয়াটারের সেই আন্ট ডরোথির বাড়িতে আছে। ওদের কথা ভেবে মাঝরাতে জেগে ওঠে মেরী। উঠে বসে বিছানায়। চোখ থেকে সব ঘুম চলে গেছে। এক শীতল পানির তৃষ্ণা বুকে। পানিতে গলা ও বুক ভেজায়। তারপর আবার ফিরে আসে ঘরে। সারা রান্নাঘর কিমার গন্ধে ভরে আছে। ভর্তার মত মটরশুটি মাশি পি যার নাম সবুজ মন্ডের মত মুখ খোলা অবস্থায় পড়ে আছে টেবিলে। কিছু প্লেট ভিজছে সিংকে। পেঁয়াজের আচারের বোয়াম খোলা। মেরী বোয়ামের মুখ লাগায়।

ঠিক নিঃশব্দ পায়ে টেবিলের ওপাশে যেমন বসে মেরী আজো সে তেমনি বসে আছে। টেবিলের অন্যপাশে ক্রিস।
-কেমন আছো?
মেরীর কণ্ঠে শান্ত কণ্ঠে জানায় ক্রিস- ভাল।
টেবিলে দু হাত প্রসারিত। মেরী ছুঁয়ে ফেলে সে হাত।
-তুমি কেমন মেরী? কিছুদিন আগেও যাকে যখন তখন ডাম্পলিং বলে ডাকা যেত এখন আর ও নামে ডাকা যায় না। পূর্নচন্দ্রের মত কর্কট রাশির গোল মুখ নয়। ক্লান্ত বিষন্ন ওভাল মুখ। তাকিয়ে আছে ক্রিসের মুখের দিকে অনিমেষে। জামাতে ইস্ত্রি নেই। গলার কাছে রান্নার দাগ। চুল গুলো কি আঁচড়ায় নি। ক্রিস বেদনার্ত মুখে মেরীকে দেখে।