ক্যামেলি আর ওফি অংক করছিল। ডরোথি চুপচাপ বসে আছে। ষাটের শেষ এবং সত্তুরের শুরুতে তার বয়স। সজল, সজীব। বয়স ওকে ধরতে পারে নি চলাফেরায় যদিও এ সত্য স্পষ্ট কিন্তু নিশ্চুপ ডরোথির মনের বয়স জানবার কারো কোন উপায় নেই। কথা বলাতেই যত বিরক্তি তার। বোধকরি দীর্ঘ কুড়ি বছর একা থাকার ফল। শব্দ উচ্চারণ না করেই ভাল থাকে। বাড়িতে যে দুই কিশোর কিশোরী এসে তার নিঃসঙ্গ জীবনে ঢেউ তুলেছে, যাদের পায়ের শব্দ, কথা, হাসিতে জেনে যায় ডরোথি সে একা নয়, কিন্তু সেই দুই কথাকলিও ডরোথির মনের খবর জানতে পারে না। এমনই ভবিষ্যত বানী করেছিল মেরী ওদের কানে কানে। আন্টি ডরোথিকে দুবার দেখেছে মেরী বিয়ের পর। চুপচাপ। প্রায়শই রুদ্ধবাক। উত্তর সবসময় মনোসিলেবিক- হ্যাঁ বা না। ক্রিসের ধারণা স্বামীর মৃত্যুই তাকে স্তব্ধ করেছে। সোলমেট ছিল দুজনে। সেই স্তব্ধতা ভেঙ্গে ডরোথি কখনো জেগে ওঠেনি। এমন দীর্ঘকালীন নিস্তব্ধতা যদিও খুব স্বাভাবিক নয়- কিন্তু আজকের পৃথিবীতে স্বাভাবিকতার সংজ্ঞা যে কি তাও স্পষ্ট নয় সকলের কাছে।

উপরের ঘরে হিটার নেই। বসার ঘরে গ্যাস ফায়ার। আনটির ইলেকট্রিক কম্বল আছে। আর ওরা দুজন লেপের তলায় ঢোকার আগে দুটো গরম পানির ভাল্লুকবোতলে আগে থেকে বিছানা গরম করে। অসুবিধা হয় না খুব। ঘুমানো ছাড়া উপরে যাবার নিয়ম নেই এ বাড়িতে। লিভিং রুম সবশেষে স্লিপিং রুম। টেলিভিশন বর্জিত বাড়ি। অতএব হিটারের পাশে বসে আন্টডরোথির টুপুনি সচকিত ক্যামেলি আর ওফি স্ক্রাবল, ব্যাকগামন, মনোপলি, লুডো এসব নিয়ে মেতে থাকে। হোমওয়ার্ক শেষ করে। আবার নানা সব বই পত্র পড়া চলে।

কাছেই স্কুল। পপলার নয় হলি ট্রিনিটি। স্কুল ফেরত বাড়ি। হঠাৎ মাকে চিঠি লেখে। বাবাকেও। যদিও বাবার কাছ থেকে কেবল দুটো চিঠি পেয়েছে ওরা। বাবা লিখেছেন- মন দিয়ে পড়াশুনা কর। মারবেলার উপর যে রচনা লিখবার কথা মন দিয়ে লিখে শেষ করে ফেল। পুরস্কার ঘোষনা করেছিলাম। মনে আছে? মেরীর সঙ্গে নিশ্চয়ই যোগাযোগ রাখছো। ও এ শহরেই রয়ে গেল। “বড় হয়েছি আমরা” এমন দাবী তুলতে। এবার নিজেদের দেখাশোনার দায়িত্বে সে দাবীকে সত্য প্রমানিত করতে হবে। তোমাদের উপর আমার অগাধ বিশ্বাস। আন্টি ডরোথিকে সঙ্গ দিও। কথা বলেন না বেশি তবে শোনেন মন দিয়ে।

কি এক ছবি আঁকার চেষ্টা করছে ক্যামেলি। ওফি বই পড়ছে। পায়ের উপর নরম একটা ব্লাঙ্কেট চাপিয়ে তিনি চুপচাপ বসে আছেন ফায়ারসাইড চেয়ারে। বই পড়তে পড়তে মুখ তোলে ক্যামেলি। শনিবারে তিন ঘন্টা কাজের পর কোথায় যাওয়া যেতে পারে। কি করা যেতে পারে এইসব আলোচনা। এক পেপারশপে আন্টডরোথির একে কাজিনের ছেলের দোকানে তিনঘন্টা কাজ করে ক্যামেলি শনিবারে। মায়ের পাঠানো টাকায় আরো কিছু বাড়তি টাকা আনতে। চৌদ্দ বছর বয়স চলছে ক্যামেলির। ওফেলির বারো।
-কোথায় যাব আমরা? চোখ না তুলে সযত্ন অংকিত ছবিতে চোখ রেখে প্রশ্ন করে ওফেলি।
-কোথায়? লেকের ধার দিয়ে, পর্বতের পাশ দিয়ে হেঁটে বেড়াব। ঘোরাফেরা। কনিস্টনেও বাস করে প্রশ্ন কোথায় যাব আমরা?
-বাবার মত কথা বলিস না ক্যামেলি।
-আচ্ছা এবার তাহলে মায়ের মত কথা বলি। প্রথমে ফিশ এ্যান্ড চিপসেø দোকান, তারপর উইনডো শপিং, তারপর পার্কে গিয়ে রিংগা রিংগা রোজেস, তারপর আবার উইনডো শপিং। পছন্দ হয়েছে তোর?

ক্যামেলি কি এক ভয়ানক বইতে আত্মসমাহিত এরপর। অ্যন্ট ডরোথি একবার চোখ খুলে দুজনার কথাবার্তা শোনেন। তারপর আবার চোখ বন্ধ করেন। প্রায় এগারোটা পর্যন্ত এমনি ভাবেই বসে থাকেন। রুঝবার উপায় নেই কোন সব শব্দাবলী, পদধ্বনি, কথাকলি, এই খেলাধূলা, প্রতিযোগিতার চিৎকার তার আদৌ পছন্দ কিনা। আর কোনো কোনো দিন যখন তিনি আগে ভাগে বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকেন ওরা নিজেদের স্বাধীনতায় পুরো লিভিংরুমটাকে বাজার করে ফেলে। স্বাধীনতায় তখন ওদের পায় কে।

-আরে আরে কি ব্যাপার তুমি ক্যামেলি না?
টম কি এক কাজে কনিসটনে এসে হঠাৎ ওর দিকে তাকিয়ে ভয়ানক বিস্মিত। টম প্রথমে কথা খুঁজে পায় না। একেবারে বাকরুদ্ধ অবস্থা তার। মা ও মেয়ের চোখের বড় মিল। নীল চোখ, উপরে ঘন ভুর। বড় বড় পাঁপড়ি। ওদের বিপর্যন্ত জীবনের শেষের দিকে বার তিনেক টম ওদের এভনলীর বাড়িতে গিয়েছিল। মেরীর সুখ সুবিধার খোঁজ নিতে।
-হ্যাঁ আমি ক্যামেলি। সাদা দাঁত দেখিয়ে হাসে ক্যামেলি। উদ্ভাসিত প্রফুল্ল মুখ।
মায়ের আর কোন ছেলে বন্ধুকে ওরা জানে না কিন্তু টমের নাম অনেকবার উচ্চারিত হয়েছে বাড়িতে। এমন সুদর্শন, বুদ্ধিমান ও সরস মানুষকে চৌদ্দ বছরের ক্যামেলি কি করে ভুলে যাবে। -মেরী তুমি এখানেই থাকো। আমরা তো আছি। টমের সেই উপদেশ গ্রহণ করেনি মেরী। ওর সান্ত্বনার ভাষা, শুভ কামনা, বা সহানুভূতির নদীতে একই সঙ্গে মুখ দর্শনের ইচ্ছেকে মেনে নেয়নি। মধুভান্ড আলয়ে তালা ঝুলিয়ে, ওদের দুজনকে আন্ট ডরোথির বাড়িতে রেখে, এক স্যুটকেস হাতে চলন্ত বাস থামিয়ে লন্ডনের পথে যাত্রা করেছে মেরী। -ধাবমান কোচ থামানো। মনে পড়ে ওদের। -নিজেদের ঠিকমত দেখে শুনে রাখবে। দুজনে দুজনকে। আমি সময় পেলেই আসবো।
তখন দুঃখ অভিমান মেঘের মত। ওফেলি ঘুমিয়ে গেলে কতরাত চুপচাপ কেঁদেছে। এখনো জেগে ওঠা ফুরোয়নি। জেগে ওঠা দুঃস্বপ্নে বিষাদে, আশাবাদের সম্ভাবনায়। রোজ কটেজের কিছুই নেই এই বাড়িতে। প্রান্তর, ঝর্না, পাহাড় অন্যমত। তবু এ কনিসটন। হ্রদের দেশের আর এক হ্রদ শহর।
কিন্তু তার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা সচেতন মা কি করে পূর্ব লন্ডনের ঘিঞ্জি পাড়ায়, এক টেরাসড বাড়ির জুতোর বাক্সের সমান ময়লা ঘরে দিন রাত কাটায়। এই ভেবে অভিমান আর ভাবনা ঝুপ ঝুপ করে মেঘ থেকে ঝরে পড়ে। মা যেন এক ভুতে পাওয়া মানুষের মত বিপর্যয়ের শেষ দিনে। অপ্রকৃতিস্থ পদক্ষেপে ধাবমান কোচ থামানো। আর দেখতে দেখতে সেই কোচের রাস্তা হারালো পর্বতের বাঁকে। দু বোন ফিরে এলো আন্ট ডরোথির বাড়িতে।
-কেমন আছো ক্যামেলি?
চোখের সামনে টম। হঠাৎ আনন্দিত স্বরে প্রশ্ন করে- আপনি এখানে কি করছেন টম আংকল?
-আমি ব্যবসায়ী মানুষ। সারা হ্রদের দেশ ঘুরে আমি কাজ করি। আজ এখানে কাল সেখানে। তা তুমি কতক্ষণ কাজ কর এই দোকানে?
-বারোটা পর্যন্ত শনিবার আর রবিবারে। অন্যদিন চারটা থেকে পাঁচটা।
টম নিজের ঘড়ির দিকে তাকায়। এখন সোয়া এগারোটা। আমি আর পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে আসবো। তুমি অপেক্ষা করো এখানে। যেয়ো না কোথায়, কেমন?