ক্রিসের পরিবর্তন শরীর না মনের তা মেরী কি করে বুঝবে? টেবিলের আর এক পাশে ক্রিস নামের যে মানুষটি, কেমন এক দূরবগাহ ছবির মত এখন। ওকে এক নিমেষে বুঝে ফেলবে এমন দুরাশায় আসেনি মেরী। আসে চেয়ে দেখতে। নির্মিনেষে। যতক্ষন সময় বরাদ্দ। বাহ্যিক পরিবর্তন চোখে পড়বার মত নয়। হ্রদয় খাঁচা বা বুকের ভেতর অস্থিগুলো কত বেশি দৃশ্যমান আজকাল, কত বেশি স্পষ্ট সে সংবাদ সার্টের ভেতরে লুকিয়ে থাকা শরীরে মেরী জানবে কি করে? বলে ক্রিস- ওদের খবর পাও?
-পাই। জানায় মেরী।
টেবিলের দু পাশে দুজন। ক্রিসের আঙুলের সঙ্গে মেরীর আঙুল ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে থাকা। সীমিত সময়। সীমিত শব্দ বিনিময়। ক্রিস তাকিয়ে আছে মেরীর চোখের দিকে। দুজনের দৃষ্টিই দুজনের চোখে। এই দুটি চোখকেই ক্রিস প্রথম ভালবেসিছিল। আটলান্টিকের ওপার থেকে একখানি সুদৃশ্য কার্ডে সজল হয়েছিল যে হ্রদয় প্রতিবিম্ব।
-শরীরের প্রতি যত্ন নিও।
-আমি যত্ন নেব। আমি জীবন ভালবাসি ক্রিস। কিন্তু তুমি কি যত্ন নেবে।
-আমিও যত্ন নেব। আবার চাপ পড়ে মেরীর হাতে। তারপর নিঃশব্দ সময়। বড় দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দ, দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা নিঃশব্দ প্রহরী। ঘরে বানানো চিকেন পাইএর প্যাকেট নামিয়ে রাখে। এক পনেট স্ট্রবেরী। সময় ফুরিয়ে গেছে। ফুরোয় না এমন সময় আছে কি মহাকালের ঘড়িতে।

আপাতত ঘরে ফেরা হয় না। বার্মিংহামে চলে গেছে পল। একা তাকে ঘরে ফিরতে হবে। সূর্যালোকিত পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে এবার কোটের পকেট থেকে টিসু বের করতেই হয়। এই জগতে এই মুক্ত আলোতে যে এখন নেই তাকে মনে করে। এরপর পথ ভাঙ্গবার চেষ্টা। জেব্রার লাল বাতি। মেরী চুপচাপ দাঁড়িয়ে নানা সব গাড়ির রং চেয়ে দেখে। সবুজ বাতিতে রাস্তা পার হয়ে এসে পৌঁছায় এক পার্কে। এ পার্ক সবুজ। সবুজই এই ঋতুর রূপ। আবার টিস্যুর অনুসন্ধান। এক সার হাঁসেদের রুটি খাওয়ায়। কোন এক দুষ্টু ছেলের সঙ্গে পায়ে পায়ে হেঁটে। এক কাপ কফি কেনে। এক টিয়ারং গাছের ছায়ায় এক যুগল প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে ভেজা চোখে হাসে। ছল ছল লেকের পানে চেয়ে হঠাৎ রাতের স্বপ্ন মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে চিরচেনা উপত্যকার প্রবহমান ঝর্না। তারি কোন এক খানে ক্রিস দাঁড়িয়ে। মেরী দু হাতে লেকের ঠান্ডা পানি ছুঁয়ে দেখে। উইপিং উইলোর ছায়া লেকের জলে। আর মাথার উপর নীল শূন্যতা। মেরী উইলো, পাখি, আর স্বচ্ছ জলস্রোতের থির থির আলোয় দেখে নিজের প্রতিবিম্ব। এক সার হাঁস এসে ভেঙ্গে দেয় নেই প্রতিবিম্ব। বলে মনে মনে Ñ আমি আজ একা। সত্যিই একা।
নিজের উচ্চারিত শব্দ নিজের কাছে অপরিচিত মনে হয়। ক্রিসের সমস্ত অনুভূতি সংক্রামিত করতে পারে নি তাকে। কিন্তু আজকের এই শূন্যতার অনুভব ওর একার। যেমন অনুভব জন্ম নেয় শূন্য আকাশে, নীরব প্রকৃতির কোলে। মেরী হঠাৎ কেমন ভীত বোধ করে। এবার মনে হয় সেই বাক্সঘরটায় এবার নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হবে। এত বড় পৃথিবীতে একা এই ভাবনা সত্যিই ভয়ের।
প্রতিদিনের অকারণ দীর্ঘ দিন, রাত্রির নিস্তব্ধতা, প্রভাতের শূন্যতায় এমনি সব উপলব্ধি। প্রথম দিনের মত যন্ত্রময়। ওরা বলে- টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার। সে সময় কত বছরের? মেরী ভাবে মনে মনে। পলের সমবেত শিশু, তাদের কান্না, চিৎকার, হুল্লোড়. অগোছালো বসবার ঘর, ওদের দাম্পত্য কলহ, থির মদির আটকে থাকা গন্ধ। টেরাচড বাড়ির চারপাশের আওয়াজ। প্রতিক্ষনই মনে করিয়ে দেয় সেই সব দিন। এক থোকা রক্তাক্ত কারনেশনে উৎফুল্ল হবার মত সাধারনী। কে যেন ভুল করে হ্যালো বলে।
মেরী প্রত্যুত্ত্বরে হ্যালো বলতেই লোকটা নিজের ভুল বুঝতে পারে। বলে- ও আমি মনে করেছিলাম।
-তাতে কি হয়েছে। মেরী এবার পথ হাঁটে। উলের দোকান থেকে দু বল উল কেনে। পলের ছোট মেয়ের জন্য একটা কিছু বুনবে।
সকালের দু স্লাইস টোস্ট। এখন বিকাল প্রায় পাঁচটা। ক্ষুধা তৃষ্ণার কাছে হার মানে না মেরী। আজো মানবে না ও। ঘরের কারণে আবার পথ হাঁটা। -হাজার বছর ধরে যারা পথ হাঁটে ঠিক তাদের মত।