শনিবারে তিন ঘন্টা যে মেয়ে কাজ করছে তার বয়স চৌদ্দ। সেই মেয়েটির মাও প্রতিদিন তিনঘন্টা কাজ করতো। দরকার হলে দু এক ঘন্টা বেশি। ওদের বয়সের ব্যবধান যদিও কুড়ি বছর কিন্তু মুখের আদলে ও চোখের দৃষ্টিতে বড় বেশি মিল। ওফেলী পেয়েছে বাবার মুখ। বোধকরি এই মুখের দিকে চেয়ে টম জানায়- ক্যামেলি আমি কিন্তু বারোটায় আসবো। তুমি অপেক্ষা করবে। হুট করে দোকান ছেড়ে যাবে না। এখন পর্যন্ত ক্যামেলি তার সকল দুঃখ ও আনন্দ ভাগ করে নেয় ওফির সঙ্গে। এখনো ওর জীবনে এমন কোন গোপনীয়তা নেমে আসেনি যার জন্য আড়াল খুঁজতে হবে। হয়তো চৌদ্দ বছরের ক্যামেলি এতদিনে ওর গাঁয়ের পনেরো বছরের ছেলেটির সঙ্গে মাঠে বনে প্রজাপতির অনুসন্ধানে যেত, কিন্তু এখন স্নেহের পাখার আড়ালে রাখবার কারণে বড় বেশি দায়িত্ত্বশীল। পনেরো বছরের ছেলেটি যখন সতেরোতে পড়বে হয়তো ক্যামেলি প্রজাপতি না খুঁজে হ্রদের মাছ ধরতে যাবে, এবং লুপিন ডেইজির বনে চুপচাপ দুজনে দুজনার মুখের ঘ্রাণ জেনে নেবে। আপাতত এমন কোন খেয়াল বা ইচ্ছেয় আক্রান্ত নয় ক্যামেলি। এখন ওর মনে হয় আজ বারোটায় ওফেলিকে কোথায় পাওয়া যাবে। সে জানে আজ টমের সাদা পঙ্খিরাজে বেড়াতে যাবার ঘটনা ঘটবে। ওফেলিকে বাড়ি থেকে কি করে ধরে আনা যায় সেটাই ভাবছে ক্যামেলি।

-রেডি মাই ডিয়ার?
চাবির রং ঘোরাতে ঘোরাতে ঠিক বারোটার সময় সেই দোকানে প্রবেশ করেছে টম। আশে পাশেই কি সব দেখাশোনা ও কেনাকাটায় ব্যস্ত ছিল। -একটা কথা বলবো? পরিটেল টেনে ঠিক করতে করতে জানায় ক্যামেলি।
-বল।
-ওফেলিকে আনা যায় না?
-কেন বলতো?
-বাঃ আমরা বেড়াতে যাব না?
-বেড়াতে? একটু ভেবে বলে- চমৎকার আইডিয়া। যদিও সে ভেবেছিল পাশের কান্টিনে বসে ওদের সাম্প্রতিক জীবনের খবরাখবর জেনে নেবে। যদি কোন সাহায্য কোন সহযোগিতা। মেরী নামের চৌত্রিশ পঁয়ত্রিশের কিশোরী গুন গুন সুর তুলে কেক মিক্স করছে না, ঘন ঘন চা বানিয়ে ঝুপ করে সামনে নামিয়ে রাখছে না, সতেজ রোদের মত চোখের সামনে এসে দাঁড়ায় না এ হেন অ-ভাললাগাকে এখনো মানতে কষ্ট। অনেক পরিচিত কাস্টমার কেকের উৎকর্ষ বৃদ্ধির দাবী জানিয়েছে। বলছে- কেক আগের মত নয় কেন? বোধকরি ব্যবসায়ী টমের এই কারণেও মন খারাপ। ক্যামেলির বেড়াতে যাবার ইচ্ছার সমর্থনে আবার হাসে টম। বলে- কত দূর থাকে ওফেলি?
-আন্ট ডরোথির বাড়ি বেশি দূরে নয়।
-কেমন আছেন আন্ট ডরোথি?
-ভাল। চুপচাপ সারাক্ষণ। কথা বলেন না তেমন। সপ্তাহে একদিন বাজারে যান আর একদিন পোস্ট অফিসে। এ ছাড়া কোথাও যান না আর। সারাদিন একই ভাবে বসে থাকেন চুপচাপ। কখনো ফায়ার প্লেসের সামনে। না হলে পেছনের বাগানে।
কনিসটন লেক পাশে রেখে গাড়ি চলছে। বিশুদ্ধ হাওয়ার নীল লেকে পাল তোলা নৌকার সার। কাগজের থলে থেকে এক মুঠো চকলেট বের করে ক্যামেলি। এক মুঠো সামনে ধরে। শনিবারের তিন ঘন্টার কাজের পয়সার পর এক মুঠো চকলেট ফ্রি পায় ক্যামেলি। ওর মুঠ থেকে একটি চকলেট তুলে নেয় টম। মুখে পুরতে পুরতে বলে- থ্যাংকয়ু।
কি এক অচেনা গুণ গুণ সুর থামিয়ে বলে ক্যামেলি- বাঁ দিকে।
এ রাস্তা ধরে এগোতে থাকে টম। চার নম্বর বাঁকে গ্রেট আন্ট ডরোথির বাড়ি।
-বেশ তোমার নাম। বলে টম- ক্যামেলিয়া। সবুজ পাতায় গোলাপি ফুল ক্যামেলিযা।

বাড়িতে ঢুকেই বলে ক্যামেলি- এ টম। আমার মায়ের বস, টম থিদারেজ।
মায়ের বস অভিবাদনে নড করে। আন্ট ডরোথিকে হ্যালো বলে। তিনি কেবল একটু মাথা ঝোঁকান। তারপর সুপ পান করতে থাকেন আপন মনে। উপরতলায় কি এক কাজে ব্যস্ত ওফেলি। বেড়াতে যাবার সুখবর জানিয়ে নিচে নেমে আসে।
-চা দেব?
-না এখন চা নয়। চল বেরিয়ে পড়া যাক।
-ওফেলির জন্য একটু অপেক্ষা করতে হবে। ও ওর স্কার্ট ইস্ত্রি করছে। আন্ট ডরোথির শীতল দৃষ্টিতে অস্বস্থি বোধ করছিল টম। নির্বিকার মুখ ভঙ্গিতে যদিও কিছু বুঝবার উপায় নেই। কিন্তু একার জীবনে এত সব মানুষ! এটাই হয়তো তাকে বিরক্ত করেছে। কি ভাবতে ভাবতে মেঝে থেকে কুড়িয়ে একটা ম্যাগাজিন চোখের সামনে ধরে টম।

রাস্তা থেকে খাবার কিনে হ্রদ, ঝোপ, কোন, নিরিবিলি একটা মনোরম পিকনিক স্পট বের করে নেয় ওরা। হু হু হাওয়ার সেল পাওয়ার তোলা নৌকা। ছুটছে পাল্লা দিয়ে। বলে টম যুত হয়ে বসতে বসতে- ক্যামলিয়া অর্থ সবুজ শোভন বৃক্ষের লাল গোলাপি ফুল। আর ওফেলির অর্থ?
-এটা বাবার দেওয়া নাম। হ্যামেলেটের ওফেলিয়া। মা বলেছে শেক্সপিয়ার থেকে যদি নাম নাও তাহলে মিরান্ডা নয় কেন? বাবা বলেছেন- ওফেলিয়া চমৎকার নাম। মিরান্ডায় একটা ঝংকার আছে। সেটা ভাল শোনায় না। মা আর কিছু বলেন নি। বলে ক্যামেলি- শেক্সপিয়ারের ক্যাটেরিনা মজার তাই না টম আংকল। টেমিং অব দ্য শ্রু।
-আমি এত বেশি শ্ক্সেপিয়ার জানি না। তবে টেমিং অব দ্য শ্রু জানি।
-আমার পছন্দ মিডসামার নাইস ড্রিম বলে ওফেলিয়া।
এক গোছা কর্নবিফ স্যান্ডউইচ সামনে পড়ে আছে। আপেলের স্নিগ্ধ ঠান্ডা জুস। কিছু মিষ্টি ফেযারী কেক সামনে।
-মেরীর খবর পাও? টম ওর বিয়ারের টিন খোলে।
-মাঝে মাঝে। মা সময় পেলে ফোন করেন দোকানে। আন্ট ডরোথির বাড়িতে ফোন নেই।
-ভাল আছে তো মেরী?
-বোধহয়। জানায় ক্যামেলি।
অন্যমনস্ক টম এক সিপে অনেকটা বিয়ার গলায় ঢালে।
কোন কথা এবার সে বলবে ভেবে পায় না। বলে ওফেলি- আরো কিছুদিন আমাদের এখানে থাকতে হবে।
ক্যামেলিকে কেমন বিষন্ন ও সুদূর মনে হয়। ওফেলি মন লাগিয়ে এবার স্যান্ডউইচ সদব্যবহারে ব্যস্ত। এবার সে ফেয়ারি কেক তুলে নেয়। কথার গতি প্রকৃতি বদলে বলে টম- সন্ধ্যাবেলা কি কর?
-হোমওয়ার্ক। বই পড়া। না হয় ব্যাকগ্যামন। কিম্বা মনোপলি বা লুডো।
-কোন অনুষ্ঠান পছন্দ তোমার? মানে টেলিভিশনের কোন অনুষ্ঠান। একটা আপেলকে পুলোভারের হাতায় মুছে একবারে অনেকটা কামড়ে নিয়ে প্রশ্ন করে টম।
-আপাতত আমরা টেলিভিশন দেখছি না?
-কেন?
-আন্ট ডরোথির কোন টেলিভিশন নেই।
-সেতো ভারী মুশকিলের কথা। ইচ্ছে করে না টেলিভিশনের নানা সব প্রোগ্রাম দেখতে?
-খুবই ইচ্ছে করে টম আংকল। আমি নানা সব কুইজ প্রোগ্রাম মিস করছি। আর ওফেলি মিস করছে নানা সব ভয়ের গল্প। যাকে বলে হরোর মুভি।
টম হেসে ওঠে। বলে- আমি কিন্তু এই মুহূর্তে তোমাদের সমস্যার সমাধান করে দিতে পারি। যদি বলি আমার গাড়ির বুটে একটা টেলিভিশন আছে যা হোম এ্যানটেনাতে চলে।
ক্যামেলি আর ওফি সমস্বরে হেসে ওঠে। বলাবাহুল্য এমন খবরে দুজনেই বিমোহিত।
-আপনি না ভারী মজার।
টম কেবল হাসে। উত্তর করে না। ভাবছে বোধহয় ও কথায় কথায় এমন প্রশংসার ভাষা ব্যবহার করতো মেরী।
চনচনে রোদের প্রখরতা প্রবল এখানে। আকাশ ভেঙ্গে রোদ উঠেছে আজ। টম ওর পুলোভার খুলে রাখে মাটিতে। স্যান্ডউইচ শেষ হয়েছে। আপেল তখনো কিছু সামনে। এবং নরম পানিয়ের কৌটো আর বোতল। টমই কেবল বিয়ার পান করছে। চশমার কাচ মুছে আবার চশমা চোখে পড়ে। পকেট থেকে চিরুণি বের করে চুল আঁচড়ায়।
বলে ক্যামেলি- এলেই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে ভুলবেন না।
-অবশ্যই। খুব ভাল লাগবে তোমাদের সঙ্গে দেখা হলে। দেখা হলো ভাব হলো। এবার না দেখে কি করে যাই? কি বলো ওফেলি?
হেসে ওঠে ওরা।
-আপনি যা মজার। খুব ভাল কাটলো এ শনিবার।
বেশ কিছুদিনের বদ্ধ জীবনে এক জানালা উষ্ণ বাতাসের মত টম থিদারেজ। ক্যামেলি আর ওফি ভাবেনি এমন হবে। এরপর আরো কিছু গল্প আরো কিছু হাসা ও মজা করা। আনন্দ মুখরিত সময়। লেক কনিসটনের নৌকো গুলোতে বিপুল প্রবল মন্দ হাওয়া। তারপর সব চুপচাপ। যখন বলে টম- এবার ফিরতে হবে। ওদের মন খারাপ করে।
দু ঘন্টারও বেশি সময় একটা মোড়কে মোড়া উপহার। আপাত স্তব্ধ হ্রদয়ে বেবলগা ভাললাগার আলোড়ন এনে বিদায় নেয় টম থিদরেজ। আর আলাদিনের প্রদীপ ব্যাতিরেকেই এক ছোট্ট ট্রানজিসটার টেলিভিশন দুলর্ভ
এক উপহার হয়ে পৌঁছে যায় ওদের চোখের সামনে।

যন্ত্রখানা দেখেই আন্টডরোথি বলেন- ওটা কি? এখানে নয়। তোমাদের ঘরে নিয়ে যাও।
পঁয়ত্রিশ বছরের প্রতি সন্ধ্যায় যে যন্ত্রটি এক সন্তানহীন দম্পতির একমাত্র আনন্দ বিলাস ছিল, নানা মুহূর্তের সুখ উৎসব ছিল আজ আন্টডরোথি বৃটেনের জল হাওয়ায় এতগুলো দিন রাত কাটিয়েও তাকে একা দর্শন করতে বেদনা বোধ করেন। পশ্চিমী জীবন দর্শন তার উপর খুব বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে এমন তো মনে হয় না। এ বোধকরি হ্রদের দেশের সুদক্ষিণার কারণ। কারণ যাই হোক ওফিদের কি সাধ্য আছে এই শব্দময়, হাসিময়, কথাময়, ধ্বনিময়, চিত্রময় যন্ত্রখানি আন্ট ডরোথির চোখের সামনে বসায়। অতএব লিভিংরুমে টেলিভিশন প্রতিষ্ঠা হয় না।
ওদের ঘরেই প্রতিষ্ঠা পেল টেলিভিশন নামের মহৎ যন্ত্রখানি। ঘরের ভেতরে বোধহয় ছবি আসবে না এমন ভাবনা মিথ্যে প্রমানিত হলো। চমৎকার ছবি ফুটলো। মাথার উপর যে গোলমত আন্টেনা তাকেই ভয়ানক শক্তিশালী মনে হলো।
আর প্রথম রাতেই ওফির পছন্দমত এক ভয়ের সিনেমা। কম্বলে আবৃত দুই বোন বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইলো। এক সময় ক্যামেলি ঘুমিয়ে গেল। কিন্তু ওফেলি ঘুমায় কি করে? বড় বড় চোখ করে ড্রাকুলার দাঁত আর কামড় দেখছে। তারপর ওফেলি একটা মানুষের কথা ভেবে মধ্য রাতে কৃতজ্ঞতায় ছল ছল হলো। বাবাকে মনে পড়লো। মনে পড়লো মায়ের মুখ। তারপর? একবার উঠে কলঘরে গিয়ে চোখ ধুয়ে এলো। এই তো করছে ওরা। ভেজা চোখের কথা দুজনার কাছে গোপন। তবু একবার ডাকলো ওফেলি- ক্যামেলি।
দুবার ডাকার পর জেগে উঠলো ক্যামেলি। বললো- কি হয়েছে?
ব্যাঙ্কবেডের উপর থেকে মুখ নামিয়ে বললো-তোর কাছে শুই?
-কেন?
ওফেলি চুপ। ক্যামেলির মনে পড়ছে অর্ধ সমাপ্ত ভয়ের সিনেমা। চোখ ঘসতে ঘসতে এবার উপরে তাকায়। জানালার এক চিলতে আলোতে কেমন ভুতুড়ে নকশা।
-ভয় করছে? শেষ টুকু দেখেছিস?
-হ্যাঁ।
-আয় নিচে।
এক লাফে নিচে নেমে ক্যামেলির গলা জড়িয়ে ঘুমিয়ে গেল ওফেলি। আর স্বপ্ন ভাঙ্গা ভেজা চোখে ছোট বোনটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে আবার স্বপ্নে হারালো ক্যামেলি।