বাগান করবার কাজ আছে ক্রিসের। সবজির বাগান। যেখানে আনপেয়েড বন্দি সরকারের কিছু টাকা উশুল করতে চেষ্টা করে। বড় বড় শাবলে মাটি গুঁড়িয়ে ফেলে। আগাছা পরিস্কার চলছিল সকাল থেকে। র‌্যাডিশেষ, বিনস, টমাটো, ব্রকলির নিবিড় বাগান ও ফুলের বাগান দুটোরই দায়িত্ব ছিল মেরীর। গ্রামে বড় হয়ে ওঠা ক্রিস বাগান করতে শিখেছে ছোটবেলায়। তবু মেরীই করতো বাগানের কাজ। ওর দায়িত্ব ছিল কমপোস্ট এনে দেওয়া, বেড়া বেঁধে দেওয়া, আগাছা ছেঁটে দেওয়া এইসব।
ওর সঙ্গী বা ইনমেটরা ওরা কাছে প্রশ্ন করে উত্তর পায় না। আন্ট ডরেথির মতই নিঃশব্দ ক্রিস। মাটি কুপিয়ে চারা গুলো একই ব্যবধানে লাগানোর কাজ শেষ করছিল ক্রিস। মেঘ মেঘ দিন। এক পশলার প্রয়োজন। শেকড় ও মাটির গভীর ভালবাসার কারনে।
-কেমন আছো? একজন ইনমেট প্রশ্ন করে। ক্রিস উত্তর করে না। এরপর আসেন প্রধান বন্দীশালা পরিদর্শক। প্রশ্ন করেন তিনি-কেমন আছো ক্রিস্টোফার?
-ভাল স্যার। শান্ত মুখে উত্তর দেয় ক্রিস।
যে সব অন্তরালবর্তী নিজেদের সুকৃতিতে গুডবুকে নিজেদের বয়স কমিয়ে আনতে পারে ক্রিসের তাদের মধ্যে অন্যতম। সুকৃতির কোন ইচ্ছাকৃত তাগিদ নেই। যা ওর স্বভাবজ তাতেই এইসব দিন রাতের মেয়াদ কমে যায়। যা আজন্ম রক্তস্রোতে প্রবাহিত তাই ওকে আর সকলের চাইতে বিশিষ্ট করেছে। এমনই তো করবার কথা। ক্যাবল কার অধিকর্তার ইচ্ছে, পুতুল নাচের ইতিকথায় আর এক পুতুল ক্রিস, পথ ভাঙ্গছে নীল নকশার ছক বাঁধা পথে। নিঃশব্দ দিন, নিঃশব্দ রাত। নিঃশব্দ থাকা ওদের চরিত্রগত বৈশিষ্ঠ্য। বাবা পিটারের ছিল। তার বোন ডরোথির আছে। ক্রিসও সময় বিশেষে নিঃশব্দ থাকে। যখন মেরীর মুখোমুখি খুব একটা কথা হয় না আজকাল।
দুপুরে খাবারের জন্য এক ঘন্টা ছুটি। কাজের ইমুনেশন বা রশদ সংগ্রহের জন্য। সে অল্পকিছু সময় ডাইনিং টেবিলে বসে কাটায়। তারপর বাইরে এসে বসে।
দেয়াল ঘিরে বেগুণী ফুল ফুটেছে। সেই দেয়ালের কাছে একটা কাঠের বেঞ্চ পাতা। এসব ফুলে তেমন করে ফড়িং প্রজাপিতর আসা যাওয়া চোখে পড়ে না। এবং এসব দেখবার জন্য এখানে এসে বসে না কেউ। যদিও ওর রুমমেট বুকপকেটে একটা নেংটি ইঁদুর পুষছে। ক্রিস একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে মেঘের কথা। চার দেয়াল খোলা আকাশটা রেখেছে। নিজের মনে সেই আকাশের নিচে বসে কি ভাবছে ক্রিস। মনে পড়ে সেই নদী, বাতাসের চূর্ণ চূর্ণ ডান্ডেলিয়ন। নিঃশব্দ বৃক্ষের সর সর মর মর। এরাই এখন স্বপ্নে শোনা আওয়াজের মত কতকাল আগের ঘটনা। যেখানে ঝর্নার গান তাকে ফেরায় নিজের সেই অর্ন্তলোকের দুধপথে। জীবনের উত্থান পতনকে যারা সহজেই হেসে উড়িয়ে দিতে পারে ক্রিস তাদেরই একজন এমনই ভেবেছে বরাবর। কিন্তু এখন সে নিজেকে চিনতে পারে না। “ডিমিনিশড রেসপনসিলিটি” নামক এক আইন সংক্রান্ত কোডে ক্রিস পড়ে না। হঠাৎ ভালবাসার জীবন থেকে পতন আমার। এমনি এক বোধের সঙ্গে প্রতিদিন সমঝোতা। ক্রিস প্রতি মুহূর্তে কেমন অন্যরকম আজকাল। আঙুলে আঙুল ছুঁইয়ে টেবিলের ওপারে বসে থাকে মেরী। তারপর চলে যায় শূন্যতার আকাশ তলায়।
-হ্যালো মেট। সদ্য পৌঁছে যাওয়া চার দেয়ালের অধিবাসী। লাঞ্চ সেরে পাশে এসে বসে বেশ একটু ভাব জমাতে চায়। পকেট থেকে এক খানা সিগারেট বের করে। ক্রিস কেবল একটু হাসে। হ্যালোমেট সম্ভাষনে চোখ ফেরায়।
-কতদিন এখানে?
-অনেকদিন। বলে ক্রিস। প্রতিটি মুহূর্তকে যার কাছে অনন্তকালের সমান মনে হয় এক বছর তার কাছে এখন অনেক দিনই বটে। ঠিক এক বছর নয়। এক বছর দুই মাস।
-কাকে খুন করেছো? যে অনেকদিন এখানে তাকে প্রশ্ন করে একজন সত্যিকারের খুনী।
-নিজেকে। ক্রিস এই বলে উঠে দাঁড়ায়। দ্রুত হেঁটে নিজের বরাদ্দিকৃত প্লটের কাছে চলে আসে। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে নিজেকে রাজি করানো কঠিন। সাংঘাতিক এক অপরাধী এমন ধারণায় কেউ আর ওকে তেমন ঘাঁটায় না। লাঞ্চ পিরিয়ড শেষ হতে এখনো দশ মিনিট বাঁকি। খেত খামারের দায়িত্ব যাদের তারা এখনো চারপাশে বসে। কেউ মাঠে, কেউ ছড়ানো গুড়িতে, কেউ বেঞ্চে। কেউ কেউ এখনো খাওয়া শেষ করেনি। কখনো দুবার খাবার নেয় কেউ, যাকে ইংরাজিতে বলে সেকেন্ড হেল্পিং। মর্জি মেজাজ ভাল থাকলে পরিবেশন কারী উদার হয়। সূপের শেষ বিন্দু অগ্যস্ত মুনীর মত শুষে নিয়ে বসে আছে কিছু মানুষ। যদি আবার স্বর্গচ্যুত মানা ঝরে পড়ে ওদের বাটিতে। হঠাৎ হঠাৎ ঝরেও পড়ে। কিন্তু ক্রিস কখনো সে আশায় বসে থাকে না।
চারাগাছ গুলো লাগাতে হবে সমান ব্যবধানে। দশ মিনিট বাঁকি। কিন্তু ক্রিস কাজ শুরু করে।
অন্যান্য কয়েদি নানা সব আলোচনায় মগ্ন। কেউ উদাস হয়ে ভাবছে। কেউ বিড়ি ফুঁকছে। তারা হয়তো মেনে নিয়েছে সেই বিশেষ দাবারুর ইচ্ছে। লেটুসের চারা শেষ করে ক্রিস হাত বাড়ায় র‌্যাডিশেষের দিকে। ধূলি ধুসরিত দুটি হাত। দেখতে দেখতে হাতের চেহারা কেমন বদলে গেল। শিরা উপশিরা ডাল পালার মত অত্যন্ত স্পষ্ট। -গেট অন উইথ ইয়োর ওয়ার্ক। তাকে বলেনি যদিও তবু ক্রিস আরো মনোযোগে কাজ করতে থাকে। ছিচ কাঁদুনে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেই বৃষ্টি ভিজিয়ে দিল সদ্য রোপিত চারা গাছ গুলোকে। ভাল ফসল ফলবে। প্রতিটি অন্তরালবর্তীর জন্য সরকারের খরচ ম্যালা। চরিত্র সংশোধনের সঙ্গে সঙ্গে ওদের কাজ যদি সরকারের খরচের খাতে কিছু পয়সা এনে দেয়। ফান্ডরেইজিং ভাল মত সম্পন্ন হয়।
নিজ ঘরে এসে বসে ক্রিস যথাসময়ে। টেবিলে পড়ে আছে লাইব্রেরীর বই। বহু পঠিত টলস্টয়ের ছোট গল্প। জমিদার টলস্টয় কি আশ্চর্য সব ছোট গল্প লেখেন। ধর্ম গ্রন্থের সংজ্ঞা ক্রিসের জানা নেই। কিন্তু বাইবেলের গল্পের চাইতেও এগুলো আবেদন তোলে অনেক বেশি। বোধকরি সেই কারণেই অনেক বেশি হ্রদয়গ্রাহ্য। টেবিলের ড্রয়ারে ক্যামেলি আর ওফির চিঠি। -ড্যাডি আই মিস ইউ। প্রতিটি চিঠিতে একই কথা। ক্যামেলির চিঠিতে কিছু খবরাখবর। শেষ পংক্তি এমন- আই এ্যাম ডাইং টু সি ইউ ডাডি।
অপরাধী পিতা মৃদু হাসে। অতঃপর অন্ধকারে দুচোখ মেলে এরপর কিসের অনুসন্ধান। দিগন্তের কোল ছুঁয়ে যে পর্বত মালা মনে পড়ে তাকে। যেমন সেই কবে র‌্যাপস্যাক পিঠে ফেলে নতুন যৌবন প্রাপ্ত ক্রিস পদব্রজে বহু সময় অতিবাহিত করেছে। রুম মেট চব্বিশ বছরের এক তরুণ। ক্রুদ্ধ মুহূর্তে স্টেপ ডটারকে পিটিয়ে প্রায় শেষ করবার অপরাধে এখন এই রুদ্ধদ্বারের জগতে তার বসবাস। একটি ঘর ভাগ করে নেয় ওরা দুজন।

-ডিনারের সময় হলো যাবে না এখন? সন্ধ্যায় রুমমেট বলে তাকে।
চেয়ার থেকে নিজেকে টেনে তুলে ক্রিস বলে- চল।
ছেলেটার সঙ্গে কথা জমে না ক্রিসের। সে অন্য জগতের, অন্য ভাবনার একজন। চিন্তার সমা›তরাল তার সঙ্গে ছেলেটার যোজন যোজন দূরে। বাড়িতে ফিরে স্ত্রী এবং স্টেপ ডটার আর কাউকেই দেখবে না এ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই তার। নারী সংগ্রহে অসুবিধা হবার কথা নয়। যেমন জুড দ্য টেরিবল পেয়ে যায় নারী “জাস্ট লাইক দ্যাট।”
এই ঘরে নারী বিবর্জিত জীবনে ক্রিসের দিকে তাকিয়ে এক অশোভন ঈঙ্গিত করেছিল। যেমন হয়ে থাকে সচারচর নারী বিবর্জিত জীবনে। ক্রিস সিধে বাইরে গিয়ে অন্ধকারে বসেছিল। কি এক নেশার অনুপান সংগ্রহ করতে সমর্থ এই তরুণ। বোধকরি আর একজন নেশা আর শরীর ভাগ করে ওর সঙ্গে। ফলে ক্রিস নিশ্চিন্ত। ক্রিস উঠে দাঁড়িয়েছে। সিগারেটের তীব্র ধোঁয়ার গন্ধ। যা সে সংগ্রহ করে কি এক অসাধ্য কৌশলে।

আলু ভর্তা। যার নাম মাশড পোটাটো। এক বাটি ক্যারোট বা গাজর। পিজের সঙ্গে দুটো মৎস্য আঙুলি। ইংরাজি নাম যার ফিশ ফিংগার। ডেসার্ট মানে বেড়ালের দুধভাত রাইস পুডিং। সরকারের খরচ হবারই কথা। স্যান্ডার্ন্ড বা মান একেবারে অনুপস্থিত নয়।
ক্রিসের চার দেয়ালের প্রয়োজন ছিল কি? ওর জন্য অবশ্যই নয়। কিন্তু অনেকের প্রয়োজন থাকে। সমাজ থেকে হিংস্রতা, কুশ্রীতা, ভয়াবহতা, আইন অমান্য উৎখাত করতে। চার দেয়াল কখনো সংশোধন করে কারো চরিত্র। তবে সব সময় নয়। কেউ কেউ একবার এখানে ঢুকলে চিরতরে দাগী আসামী বনে যায়। যেমন কান কাটা একজন রাস্তার মাঝখান দিয়ে চলে। তার শরীরে যখন অপরাধীর মার্কা এঁকে দেয় তখন আর সে ভাল হবে কেন? আবার কেউ সত্যিই ভাল হয়ে ফিরে যায় বাইরের জগতে।
ক্রিস কেমনটি হয়ে ফিরে যাবে? ক্রিস যেমন সে কথা জানে না অন্যরাও জানে না।
খাওয়ার পর টেলিভিশন দেখে অনেকে। ক্রিস হুল্লোড়ে টেলিভিশন না দেখে ফিরে আসে নিজের ঘরে। বার বার উল্টেপাল্টে একই গল্প পাঠ। নিজেকে চেনা কবে ফুরোয়? তবে ক্রিসকে হয়তো- দি ডেথ অব ইভান ইলিচের মত শেষ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। না অসুখটা শরীরের পচন নয়, মনের অবক্ষয়।
হঠাৎ মনে পড়ে হানিপট কটেজ। সেই চেনা আবহ মনে পড়াতে বই বন্ধ করে। যার রান্নাঘরটি মনের মত নয় এমন দুঃখ মনের ভেতরে রয়ে গেছে মেরীর। সেই অপছন্দের ঘরে এক থোকা কর্ন ঝুলিয়ে গুন গুন সুরে কত কিছু রাঁধে মেরী। এবং কখনো ক্যামেলি আর ওফি হোম ইকোনমিক্সের প্রাকটিকাল ক্লাশের শিক্ষায় মাকে ও বাবাকে সুশোভিত খাদ্য প্রস্তুত করে তাক লাগিয়ে দেয়। মনে মনে আধুনিক এক রান্নাঘরের পরিকল্পনা করে ক্রিস। মেরীর মনের মত। একটি সুশোভিত- ফিটেট আধুনিক কিচেন।
হঠাৎ মাথার যন্ত্রনায় উঠে বসে ক্রিস। দুটো এ্যাসপিরিণ গলায় ফেলে অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে থাকে। ঠিক তার বুকের কাছে একটি সুবাসিত কেশবতি মৃদু নিঃশ্বাসে নিজের অস্তিত্ব ঘোষনা করছে না। অন্ধকারে হাত প্রসারিত করে ক্রিস। ঘুমের চেষ্টা এরপর।
প্রতি রাতেই এমন। ব্যতিক্রম নেই কোন। কখনো পঠিত শব্দবলী তাকে বিনিদ্র রাখে। কখনো ঘুম পাড়ায়।