কেক বিস্কুট বানানো আপাতত শেষ। তিন ঘন্টার চাকরি আজকের মত শেষ হলো। মুখ তোলে মেরী। ওর এটা খুবই প্রিয় কাজ। কেকের রূপ রসে কারুকাজ ফোটানো। বিস্কুটের বিবধ নকশা করা। চোঙ্গের মত সাদা আইসিং কাগজের ফ্যানেলে কত যে নকশা করে ও। কোনটা জন্মদিনের, কোনটা বিয়ের, কোনটা ম্যারেজ এ্যাসিভার্র্সারির। ও সবগুলোতেই নিজের শিল্পভাবনার স্বাক্ষর রাখে। গোল্ডেন ম্যরেজ আনি ভার্সারির জন্য যে কেকের অর্ডার এসেছে তার পেছনে সকাল থেকে লেগে ছিল মেরী। তখন ও কাজ করতে করতে ভাবছে- সত্যিই কি আমাদের জীবনে এমন একটা কেকের দিন এসে পৌঁছাবে? রূপোলী সাজসজ্জায়, সোনালি কারুকাজে চিত্রিত। তিন টিয়ারা কেকের উপর দুটো ছোট্ট সাদা পুতুল বিয়ের পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে। পুতুল দুটোর সাদা পোশাক আর বনেট নিয়ে ব্যস্ত ছিল মেরী। এমন সুক্ষè কাজ ওর মত আর কেউ পারে না।
মেরী বরাবরই শিল্পকলায় উৎসাহী। ওর সুজনশীল ক্ষমতা রন্ধনে, বাগানে, সূচিকর্ম, কেশ পরিচর্চায়। আর বড় বড় উলের পুলোভার, শাল কার্ডিগানে। এ অঞ্চলের সকলেই ওকে জানে। এইসব ব্যাপারে পরামর্শ না হলে হাতে কলমে শিখিয়ে দেওয়ার কারণে ডাকও পড়ে। খবর পেয়েই পাখির মত ছূটে যায় পাঁচ ফুট নাথিং মেরী। তিন ঘন্টার একনিষ্ঠ শিল্পকলায় যে পাউন্ড সে উপার্জন করে প্রতি সপ্তাহে জমা রাখে পোস্টঅফিসের জমার বইতে। উল টুল, ওফি ক্যামেলির জামার কাপড়, নিজের পছন্দমত এক শিশি পারফিউম, কখনো ছোট খাটো বাজার সারবার কারণে সেগুলোর সদব্যবহার হয়। এ ব্যাপারে কোন প্রকার জিজ্ঞাসাবাদ করে না ক্রিস। “এ বিট অফ পকেট মানির ” জন্য মেরী যা করছে ক্রিসের বাৎষরিক, সান্মাষিক, মাসিক, সাপ্তাহিক আয় ব্যায় তাকে বাদ দিয়েই পরিকল্পনা করে। আজকের মত কাজ শেষ। হাত মুখ ধুয়ে আবার একটু সাজুগুজু করে বাইরে আসে মেরী। এক পনেট স্ট্রবেরী কিনে ফেলে, কেনে এক পাউন্ড ব্রকলী। গ্রীন গ্রোসার চেনা, হেসে ওর জিনিষ থলেতে ভরে দেয়। আর কিনেছে দোকানের ভাঙ্গা ভাঙ্গা বিস্কুট নাম মাত্র মূল্যে। কাঁচের বোয়ামে থাকে সেই ভাঙ্গা বিস্কুট। ক্যামেলি আর ওফি চায়ে ডুবিয়ে খেতে ভালবাসে সেই সব ভাঙ্গা বিস্কুট। এক প্লেট ভাঙ্গা বিস্কুট আর এক পট চা নিয়ে দুই বোন বেশ কিছু সময় কাটায়। হেজ ঘেরা বাগানে কখনো চেয়ার টেনে বসে। মস্ত কাঁচি চালিয়ে হেজের উপর কত সব নকশা করে ক্রিস। নিয়মিত পরিচর্যায় হেজগুলো কখনো ঝুঁটি বাঁধা টিয়ে পাখি। ওদের সঙ্গে মেরীও বসে কখনো। আড়াইটা থেকে পাঁচটা পোস্টঅফিসের সর্টিং সেরে ক্রিস এসে যোগ দেয় তিন রমণীর আসরে। রাতেও সর্টিং করতে হয় ওকে।
লাল গাড়ি ছুটে আসছে বড় রাস্তা ধরে। ক্রিসের উৎফুল্ল মুখ চোখে পড়ে। মে মাসের ঝলমলে দিন। হ্রদের দেশে বৃষ্টি হয় প্রচুর। এখন বৃষ্টি নেই। ওরা ছাতা রাখে সঙ্গে। যদিও এখনো সামার নামেনি সবটুকু তাপ নিয়ে তবু আজকের দিনের সঙ্গে সামারের দিনের বেশি পার্থক্য নেই। একটু ইলশেগুড়ি ঝুর ঝুর ঝরে এখন আবার ঘসা আয়না। মেরী বোধহয় এই ইলশেগুড়ির কারণে একটু দেরী করে বেরিয়েছে ওর কাজের জগত থেকে। ক্রিসের গাড়ি থামে ওর সামনে এসে। মুখ বাড়িয়ে এক আকাশ হাসিতে মেরীকে আলোকিত করে জানায়- ভিজে গেছো মেরী?
-ভিজিনি। মেরী বলে তৎক্ষনাত। ওর পাশে বসতে বসতে। জেসিকে হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নেয় মেরী। বলে পিঠে নরম স্পর্শ রেখে- ডিনার খেতে হবে এবার তোমার তাই না? বলে ক্রিসের দিকে তাকিয়ে- তোমারও তো ডিনার চাই।
-অবশ্যই। কি বাজার করলে তুমি?
-ব্রকলি, বিনস আর বিস্কুট।
পথের পাশে গাড়ি থামিয়ে দুকোন আইসক্রিম কেনে মেরী। স্ট্রবেরী আর ভ্যানিলা আইসক্রিম। তির তির নদী বয়ে চলেছে সাঁকোর নিচ দিয়ে। তার উজ্জ্বল ক্রিস্টাল জলধারায় সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে খন্ড খন্ড পাথর। সেখানে সময় মত দুপা রেখে অনেকদূর চলে যাওয়া যায়। -রেস মি মেরী। আমাকে ধরবে এস। এখন তেমন আহবানে মেরীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দুজনে কিশোর কিশোরীর প্রগলভতায় ছোটে না। এখন একটু খেয়েই আবার ছুটতে হবে। কিন্তু পথ চলতে চলতে এমন আহবান ক্রিসের স্বভাবজ। চলতে চলতে হঠাৎ বলবে এমন কথা। নির্জন পথে। নির্জন পথে গান গাইবে। নির্জন পথে হাত ধরে শোনাবে কবিতা। নির্জন পথে যখন মেরী সঙ্গে। আর নির্জন পথে যখন ক্রিস একা? সে অন্য গল্প। এখন ঘরে ফেরার কারণে স্বচ্ছ নদীর আমন্ত্রণ দেখেও দেখে না ক্রিস।
দুপুরের খাবারের পর খানিক সময় কাটে ওর কিচেন গার্ডেনে। কখনো গ্রন্থে কিছুটা সময় ব্যয় করে। আবার কখনো দ্রুত রং তুলির ইজেলে। এর মাঝে ক্যাটন্যাপ।
আজ স্পিনাচ বুনবার দিন তার। একটু দেরীতেই এবার স্পিনাচ বুনছে ওরা। বেগুনী লতানো ফুলগুলো আর ঝোপবন নিবিড় কাঁচিতে সচারু করবার কথা। পুরো জুন কেটে যায় তার ঘরবাড়ির কলি ফেরাতে। সবুজ অরণ্যে সবুজ লাল হানিপট কটেজ। জেগে থাকে শান্ত সমুদ্রে আর এক জাহাজ বাড়ির মত। সবুজ আর লাল টিয়ে পাখি এই মধুভান্ড কৌটো। সবুজ ওর প্রিয় রং। বৃক্ষ সবুজ, ঘাস সবুজ, আর ক্রিসের জীবন ভালবাসা চির সবুজ।
স্ট্রবেরী কোনের একটুখানি জেসিকে খাইয়ে বাকি টুকু শেষ করে মেরী। যদিও বাড়ির সবুজ লাল রংএর দিকে চেয়ে বলে -অন্য কোন রং বাছলে হতো না?
-হতো হয়তো। কিন্তু গাছপালার ভেতরে লুকিয়ে থাকার এবং হারিয়ে যাওয়ার জন্য এর চাইতে ভাল রং আর কি হতে পারে মেরী। সবুজ নয় সবুজাভ। গ্রীন নয় গ্রীনিশ।
মেরী আর কিছু বলে না। ঠিক ক্যাটকেটে সবুজ নয়। ফিরোজার মত টলটলে রং। ঝিকমিক তারা গুলো দেয়াল শুদ্ধো ফুটে ওঠে। এক আকাশ নক্ষত্র আর একটা বড় চাঁদ স্কুল লিভার ক্রিসকে বড় উদাসীন করে। “মুনস এ বেলুন” নামের কবিতার চরণ ওকে অস্থির করে। এক ধরণের আকুলি বিকুলি কিসের জন্য ও জানে না। যদি থাকে এর সঙ্গে এক মাঠ সবুজ হাওয়া ক্রিস জেনে যায় সারা পৃথিবীতে এক অর্নিবচনীয় সঙ্গীত কখনো এক্কেবারে তাকে গ্রাস করে ফেলতে পারে। সেই মুহূর্তে ক্রিস নিজেকে বলে- আমি একা। আমি মেরী আমরা দুজন নই বা আমরা চারজন নই। মেরী হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গা রাতে খুঁজে ফেরে তার স্বামীকে। জানে কোথায় এখন ক্রিস। বাড়তি শোবার ঘরে ছবি আঁকার পুরণো অভ্যাসে ক্রিস কি ভীষন অসহায় এখন। এক বাক্স রং আর তুলির ভেতরে আত্মসমাহিত। কাঁচা ভাবাবেগ, গভীর ভাবাবেগ, এবং অসহায় ক্রিস যখন হঠাৎ হঠাৎ নিজেকে বুঝতে পারে না- কোথায় উজাড় করে দেবে এমনি সব অনুভব। যখন মেরীর শরীর আর মন তার সমস্ত ভাবাবেগের জন্য বিশাল নয় তখনি রং আর তুলিতে ছবি ফোটে আর ক্রিস ভাবে কোথায় থাকে আমার এই সব ভাবনার উৎস। ভাবে এখন আমি একা। এক অর্নিবচনীয় সঙ্গীতের গভীরে আমার প্রবেশাধিকার চাই। চাইই চাই। কি ভাবে কোন পথ ধরে পৌঁছানো যায় সেখানে? বার্চ, পপলার, কনিফার, দেওদারের নিথর সবুজ বনজ গন্ধ ভরা মাঠে ও হাওয়ায় হাওয়ায়, উপত্যকার গভীরতার ভেতরে, বিপুল উদাসীন প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে বলে ক্রিস- কোথায় এই অপার রহস্যের শেষ আর কোথায় এর আরম্ভ।
মেরী বলে তখন- এসো এসো বিছানায় ক্রিস।
আসছি মেরী। মেরীর জগতে পৌঁছে বেঁচে যায় ক্রিস। মেরীতে সর্ম্পর্পিত ক্রিস মুড বদলে বলে- মেরী আর আমি আমরা একজন। মুড আর মুহূর্ত বড় ক্ষণস্থায়ী। আর তাইতো ক্রিস কখনো বড় বাস্তব, কখনো উদাসীন, কখনো সবুজ, কখনো ভঙ্গুর, কখনো ছল ছল, কখনো নিঃশব্দ।

ক্রিসের জন্য মস্ত এক স্যান্ডউইচ বানায় মেরী। নিজে প্রায়ই দুপুরের খাবার পরিহার করে। স্যাান্ডউইচের ভেতরে কর্নবিফ, লেটুস, টমাটো, আর টুনামাছ। ক্রিসকে আর ক্ষুধায় কাতর করবে না সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত। তারপর আবার পাইন কাঠের চেয়ারে ওরা চারজন, এক সংসার মানুষ কলহাস্যে মুখর হবে। ওফেলিয়ার বিবিধ বন্ধুদের গল্প, ক্রিসের কর্মময় দিন, আর ক্যামেলিয়ার অনাবিল সেন্স অব হিউমারে জমে উঠবে সন্ধ্যার আসর। জেসিও তখন লাল প্লেট থেকে তুলে নেবে ওর নিজের ডিনার। কখনো টলটলে এক পাত্র পানিতে মুখ ডুবিয়ে তন্ময়।
-জেসিটা না ক্যামেলি- ওদের জন্য একটা মনকাড়া গল্প বাছবে মেরী। বলবে কেক বানানোর কথা। বাজারে স্ট্রবেরী আসার কথা।
এরপর হোম ওয়ার্কের খাতা খুলে ক্যামেলিয়া ও ওফেলিয়া বসবে পড়াশুনা করতে। ওদের সারা ঘর ভরে উঠবে খাতা ও বইপত্রে। আর সারাদিন পর টেলিভিশনের সামনে বসবে ক্রিস। এক কাপ কফি হাতে। খানিক পর ধোয়া মোছা শেষ করে শীতল হাত মুছতে মুছতে এসে পাশে বসবে মেরী। সামারে জ্বলে না বড় কাঠের ফায়ার প্লেস। কয়লা আর কাঠ নিজেকে পোড়াতে পোড়াতে জ্বলতে জ্বলতে এক সুখী দম্পতিকে তাপ উষ্ণতায় নিবিড়তর করে না এখন। এখন প্রকৃতি অকৃপণ। বিলায় কণা কণা ঐশ্বর্য। তারই ছিটেফোঁটা এই ঘরে। পায়ের কাছে রেশমী পশমি ব্লাঙ্কেটের মত ঝুপ করে বসে হেসে উঠবে জেসি। মেরীই জানে কখন জেসি হাসে আর কখন জেসি কাঁদে।
আপাতত মেরী চুপচাপ উল বুনছে। ক্রিস বইতে মগ্ন। টেলিভিশন দেখা শেষ। খবর টবর শুনে আপাতত সে বই বেছে নিয়েছে। খবর শুনিয়ে টেলি নামের ছবি আর শব্দের যন্ত্র আপাতত চুপচাপ। বই মুড়ে দু একবার মেরীর নানা সব প্রশ্নের উত্তর। প্রশ্ন গুলো এমন
-ব্রডবিনসের জন্য একখানা জাংলা চাই।
-জানি। এই সপ্তাহান্তেই করবো ভাবছি।
-কমপোস্ট এসেছে ল্যারিস নার্সারিতে। আপাতত সেল চলছে। জানো।
-নাতো। আচ্ছা ওখান থেকেই কমপোস্ট কিনে নেব।
প্রতি বছর গোলাপে নতুন কমপোস্ট ব্যবহার করে ক্রিস। গোলাপ ফোটে সারা বাগান আলো করে। এন্তার, অজস্র। লাস্যে, হাস্যে, বিভাবে, অতুলনীয়। পুষ্পপরিচর্চায় ক্লান্তিবিহীন ক্রিস।
ক্যামেলি আর ওফি হোমওয়ার্ক শেষ করে মনোপলিতে আত্মসমাহিত। তাদের ঝগড়ার শব্দ কানে আসে। বই মুড়ে কি যেন ভাবছে ক্রিস।
মেরী ওঠে একসময়। ফ্রিজ আর কাবার্ডের দরজা খোলা আর বন্ধ হবার শব্দ শোনা যায়। হাউজ কোট স্লিপারে ঘুরে ঘুরে ঠিক জেসির মতই সময় অতিবাহিত করে মেরী। হানিপট কটেজের বসবার ঘরের এক ছাতিম গাছ আলো। আলো ক্রিসের মাথার পেছনে। সেই আলোতে ছায়াতে কপালে হাত রেখে কি সব ভাবনায় তন্ময় ক্রিস। সেই পরিচিত দৃশ্য অবলোকন করে মেরী । মনে মনে ভাবে- আমি কি সবসময় ওকে বুঝতে পারি। আমি সব সময় ওর খুব কাছে পেঁছাতে পারি? বোধহয় নয়। পাঁচ ফুট নাথিং মেরী স্বামীকে পর্যবেক্ষন করে। ভাবে এই পরিচিত মানুষ ক্রিসের ভেতর এক দুর্জ্ঞেয় সত্তা রয়ে গেছে। যা কখনো মেরীকে ভাবিত করে। এখন অবশ্য এমন দৃশ্য অভ্যাসে পরিণত। আর যখন ক্রিস সহজ? আ একেবারে আনন্দের পাগলাঝোরা। সেই কথা ভেবে এমন দুর্জ্ঞেয় সত্তাকে মেনে নেয় মেরী। মেরীর প্রেমে আছে এক ধরণের সমর্পন। দুর্জ্ঞেয় আর আনন্দময় সবমিলে ও আমার। এই ভাবনায় গভীর আনন্দে বাতাসে দোলা খায় বাগানের লতানো গোলাপের মত। ভাবেও এক এক সময় কি যন্ত্রনা ওর? আমাকে কি ভাগ দিতে পারে না সেই ভাবনার? মেরী মুর্খ নয়। সে জেনে যায় অন্যরা যখন যন্ত্রনায় বাস করে।

এখন দুপুর। কঞ্চিতে ব্রডবিনসের লতানো গাছ গুলোকে গ্রীন হাউজের মাথায় তুলে দেবে বলে বাগানে এসেছে মেরী। ক্রিস ক্যাটন্যাপ বিলাসে সেটিতে দুপা তুলে চুপচাপ। এইতো কিছুক্ষণ পর ঝটপট চুল ব্রাশ করে বেরিয়ে পড়বে পোস্ট অফিসের উদ্দেশ্যে। চিঠি গুলো সর্টিং হয়ে খোপে খোপে পৌঁছে যাবে। আর ঘরে ফিরবার সময় মস্ত থলিতে সেগুলো ভরে বাড়ি পৌঁছাবে ক্রিস পরদিনের জন্য। বাগান করবার কাজে একেক দিন সারা সন্ধ্যা ব্যয় হবে ওর। আর রবিবার কখনো সখনো।
বেড়াল আঁকা মগে এক মগ কফি কুসুম শিতল। দু চুমুক পান করে ব্রডবিনসের তদারকিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দূরদার পদক্ষেপে এই তো খানিক পর বাড়িতে ফিরবে মেয়েরা। তারপর এসে বসবে এই বাগানে। সবুজ সুশােভন লনে। পাতার মত চেয়ার পাতা। গোলমত একটা টেবিল। সেই টেবিলে মেরীর কফির কাপ। জেসি এসে ঘুরে গেল একবার। এবং দুই বনঝোপ ওপারের সেই নারী। হেজের ওপারে দাঁড়িয়ে খানিক গল্প করবার বাসনা ওর। এক কাপ কফির কারণে সে এসে বসবে না মেরীর বাগানে। কখনো বসে যদি হাতে সময় থাকে। আপাতত হলিডে থেকে ফিরে এসেছে। তার সূর্যরোদের গল্প শুনিয়ে মেরীকে বেশ চঞ্চল করবে। উষ্ণ স্পেনের মেয়োর্কা থেকে সদ্য এক শরীর বাদামি রং সঙ্গে করে বাড়ি ফিরেছে যে নারী। শুনতে শুনতে বিনতদারকির মেরী অন্যমনস্ক হবে। ভাববে মেয়োর্কা নামের সেই অজানা শহর যেখানে সানট্যান লোশন ছাড়াই মানুষ জন এমন বাদামি ব্রোঞ্চ হয়ে ওঠে। ডোনা নামের সেই বিলাসী নারী হাত দুটো বাড়িয়ে দিয়ে বলবে- দেখেছো কি অপূর্ব ট্যান।
মেরীর ধবল হাত ওর পাশে দেখায় রক্তশূন্য। তাই ওর হাত দুটো আড়াল খুঁজবে এখন।
এভনলীর সুর্য় পেরে উঠবে কেন মেয়োর্কার সূর্যের সঙ্গে। সূর্য আপন প্রচন্ডতা জানাতে না জানাতেই মেঘমেদূর আকাশ এভনলীকে করবে রহস্যময়। ঝির ঝির বর্ষণসিক্ত অন্য অঞ্চল। আর মাথা বাঁচাতে মেরী প্রবেশ করকে কাচঘরের ভেতরে। দুশো পাউন্ডে একখানা কাচঘর কিনেছে ক্রিস। যে এখন গ্রীনহাউস হয়ে ওদের সারা বছরের কত সব ফসলের যোগান দেয়। যেখানে ক্রিস হো, শ্যাভল, হেক, এই সবের সঙ্গে সঙ্গে টবের বাগানে ফোটায় ফুল আর ফসল। আর মেরী এসে বাছে আগাছা, তোলে ফসল।

পথ ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে ক্রিস ভাবে ওয়ার্ডস ওয়ার্থ। আর গাড়ি থামিয়ে জানতে চায় “ব্লিস অব সলিচুডের” গূঢ় অর্থ। পাগলই বটে ক্রিস। অবশ্য এসব ভাবনায় কোন প্রকার নাটুকেপনা বা লোক দেখানোর প্রয়াস নেই। সবকিছুই স্বাভাবিক ওর চরিত্রে। স্বভাবজ। সবকিছুই অনায়াস, স্বতঃস্ফূর্ত। মে মাসের এভনলীতে তেমন আর ডাফোলি নেই, একটু আধটু এখানে ওখানে। যেমন ওর কাচের ঘরে একটু। তবে ফোটে আর কত ফুল। হলুদ লাল ফুল থামিয়ে দেবে ওর চলার গতি। এক সাদামত প্রস্তরখন্ডে বসবে ক্রিস। এক জড়িপার নদী বয়ে চলেছে ক্ষীণ ভাবে। বর্শি ফেলে এইমতো মাছ ধরা চলতো ওর। সে আগে। ছিপে যে মাছ গুলো ধরা পড়ে বেকায়দায় চেয়ে থাকতো ওর মুখের দিকে সেগুলো আর টোপ খুলে নির্বিেঘ্ন পৌঁছে যেত সবুজ জড়িপাড় নদীতে। ক্রিসের ভালবাসার কারণে। মাছ খেতে হবে? কেন ফিশমংগার কি রিজাইন দিয়েছে? আর মাছ ধরা? সেতো এই নির্জনতায় সময় অতিবাহন ছাড়া আর কিছু নয়। নানা সব মাছ ধরা পড়তো ওর বর্শিতে। রুপোলী সোনালি কত সব মাছ। চিত্রিত, নকশাকরা। টোপে বোকা মাছগুলো চটপট ধরা পড়তো। আর ক্রিস? লাফানো ঝাপানো ডানা ঝাপটানো সেই সব সোনালি রূপালি মাছেদের চুমু খেয়ে বলতো- যা চলে যা। ফ্রক করা দুষ্টু চঞ্চল মেয়ে কখনো বসতো এসে কাছে। বক বক সময় বিনিময়ের সুযোগ না পেয়ে ফিরে যেত আবার। – সুস। কথা বলে না। মাছ ধরছি দেখতে পাও না?
-ও তাই নাকি? তাহলে নিজেকে নিয়েই থাকো। বিরক্তিভরা কণ্ঠে চলে যেত প্রজাপতির মত মেয়েরা।
-ও যেন কেমন। মেয়েদের সঙ্গ পছন্দ নয় ওর। সকলের এই উদ্বেগ মিথ্যে হলো মেরীর কারণে।
ক্রিস এসে বসে পাথরে। সেই নদী, সেই সব দৃশ্যাবলী হ্রদয়ে গেঁথে পথ চলে ও। সারা উপত্যকা স্তব্ধ হয়ে আছে। স্তব্ধতার গান শুনতেই পছন্দ ওর। সাউন্ড অব সাইলেন্স। চিঠি বিলি করতে করতে কতবার যে থামতে হয় ওকে তার ঠিক নেই। এক বিশ্ব মে মাস ওকে করে শান্ত, সমাহিত। শান্তি এসে কানে কানে বলে- আমি তোমার মধ্যেই বাস করি ক্রিস। আমাকে খুঁজতে তোমাকে জেনেভা প্যাক্টের দলিল পাঠ করতে হবে না। পাখি, প্রজাপতি, সবুজ ফড়িং, চিত্রিত লেডিবার্ডের জগতে -সর সর মর মর উইলো কনিফারে, ক্রিস ঠিক ঋষির মত জেনে যায় ট্রাংকুইল নামের নিথর শব্দটিকে। যা তাকে নিথর করে মুহূর্তে। সারা বিশ্ব যেখানে বহুবিধ কর্তব্য কর্মে ব্যস্ত, ক্রিস আর একবার সেই সব ভুলে কি এক অপার শান্তিতে ছল ছল হবে এখন। হবে বিষাদিত। অদূরে লাল গাড়ি তেমনি চুপচাপ। কখনো নানা সব অগন্তুকের কারণে ক্রিস ফট করে গুডআফটারনুন জানায় সেই নিসর্গ ভূবনকে। বড় তাড়াতাড়ি গাড়ি চালিয়ে বড় রাস্তা ধরে চলে। কর্তব্য কর্মের জগত অপেক্ষমান।
ফিরতি পথে বিকাল যেন টোয়লাইট। আর এক অনুভবের বৈভবী সময়। যখন সেই তূর্নী নদীতে ঝকঝকে রুপোলী মাছে প্রতিবিম্বিত দেখে নিজের হ্রদয়। সময়ের নদীতে কত সব ঢেউ, কত সব চলা, কত সব থেমে থাকা। কতসব হ্রদয় অভিলাষ ভর করে সময় সময়। নির্জনতায় তিনি। এই তিনিকে ক্রিস জানে না। চার্চ অব ইংল্যান্ড যে সব সান অব গডের কেচ্ছা শোনায় তার সঙ্গে ওর এই সব একান্ত বোধের মিল কোথায়? এ বোধ ও অনুভূতির গল্প সে কাউকে বলবে না। এমন কি মেরীকেও নয়। কারণ মেরী এসব বুঝবে না। বিচলিত হবে। এক ডিকান্টার বিয়ারের দু একজন বন্ধুকেও নয়।
আর রাতে তার ছবির ইজেলে ফুটবে মাছের মুখ, উইলোর বর্ন, নদীর স্রোত, থোলো থোলো লুপিনের মিষ্টি সুবাস.। কিন্তু সে চায় আঁকতে চায় তা পরছে না ভেবে এর একটিও পছন্দ হবে না। ক্যামেলি ওফির খেলা ঘরে না হলে ঘরের এক কোনে পড়ে রইবে অবহেলায়। ওর ভেতর থেকে দু একটা কুড়িয়ে নিয়ে মেরী রেখে দেবে নিজের যতেœ। তারপর
এই মানুষটিকে পাঁচ ফুট নাথিং মেরী নিয়ে যাবে নিজের জগতে।