পলের সন্তান কেঁদে চলছে এক টানা। যেমন সে বরবর কাঁদে। ঘুমোয় কম। কাঠের দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে কাঁদে। বারবারা বাথে নেমেছে। অনেকক্ষণ কোন সাড়া শব্দ নেই। সপ্তাহে একদিন বাথে নামে বারবারা। কখনো দেড় ঘন্টা, কখনো দু ঘন্টা এবং সময় বিশেষে এক ঘন্টায় বাথ সারে। তার কমে নয়। বড় তিনজন স্কুলে। পল বাইরে। ব্যাক অব দি লরির কিছু শস্তা জিনিষপত্রের খবর পেয়ে ভ্যান ছুটিয়ে রওনা দিয়েছে। এই সব আলিবাবার গুপ্ত ধনের কারণে প্যাসেজ, লাউঞ্জ, কাবার্ড, করিডোর, বেডের নিচে, টেবিলের নিচে, স্টোর রুমে, সিঁড়ির নিচে ভাঙ্গাচোরা জিনিষে পরিপূর্ন। মেরী যে ঘরে শোয় তার পাইন বেডের নিচে সুঁচ গলানোর জায়গা নেই। পাইন বেডটি কোন এক সেকেন্ডহ্যান্ড দোকান থেকে শস্তায় কেনা। এসবের মধ্যেই এখন বাস করে মেরী। হঠাৎ রাতে আলো জ্বালিয়ে ইঁদূর আরশোলার ছুটোছুটি লক্ষ্য করে। মেয়েটির কান্না শুনতে শুনতে মেরী উঠে বসে। বারবারার বাথরুমের দরজা বন্ধ। বাথে নেমে ড্রিংক করতে পছন্দ বারবারার। বাথ শেষে উঠে আসে অতল জল হতে আফ্রোদাইতির ভঙ্গিতে। পৃথিবীর কোন জ্বালা, কোন দুঃখ, কোন কষ্ট, কোন বেদনা এই বাথের বারবারাকে ভাবায় না। এই ওর অন্যতম প্রধান ও একমাত্র বিলাস।
-কিরে কাঁদছিস কেন?
মেয়েটিকে কোলে উঠিয়ে নেয়। ন্যাপি বদলাতে হবে। বোধকরি খিদেও পেয়েছে। রান্নাঘরে প্রবেশ করে মেরী। খাবারের অনুসন্ধানে। সারাঘরে জিনিষ পত্র ছড়ানো। রান্নাঘরও যে গুছিয়ে পরিপাটি করে তোলা যায় সে সন্বন্ধে বারবারার কোন ধারণা নেই। একদিন কোমর বেঁধে মেরী গুছিয়েছিল সবকিছু। দুই দিন পর যেকে সেই। টিন থেকে দুটো ডাইজেসটিভ বিস্কুট তুলে মেয়েটির হাতে গুঁজে দেয়। কান্না বন্ধ। বিস্কুট মুখে পোরে মেয়েটা। একটু খানি ব্যালকনির মত আছে বাড়িতে। যেখানে এক কাপড় শুকানোর আলনা, গোটা দশেক ন্যাপি ঝুলছে। একটি ভাঙ্গা চেয়ার পড়ে আছে। তিন পায়ের এক টেবিলের উপর কে যেন সকালের পরিজের খানিকটা রেখে চলে গেছে। পূর্ব লন্ডনের কিছু মাছি এসে বসেছে সেখানে। এক হাতে সেই সিরিয়ালের বাটি তুলে নিয়ে রান্নাঘরের চৌবাচ্চায় ডুবিয়ে আসে মেরী। মনে পড়ে নিজের রান্নাঘর। ফিটেট না হোক, নিখুঁত পরিপাটি। লেবেল লাগানো স্বচ্ছ সুন্দর সব জার ও বোয়াম। ফয়েল পাতা উজ্জ্বল রুপোলি শেল্ফ। কফি, চা, চিনি, বিস্কুটের নকশাদার চিনে মাটির পাত্র। জানালার উপর মোটা পুরুষ্ট মানি প্লান্ট। বন্য আইভি, ওয়াডারিং সেলরের লতা। সবজি র‌্যাক সবুজ সতেজ। কপারের প্যান পাতিল গুলোকে সবসময় নতুন মনে হয়। দেয়ালের তুলোর ফুলের মত দেয়াল কাগজে সবকিছু বড় উজ্জ্বল দেখায়।
কোন এক নিবিড় ভাললাগার আলিঙ্গনে ক্রিস ওকে এক পছন্দসই রান্নাঘর উপহার দিতে চেয়েছিল। উদাস হয়ে ওঠে মেরী। মেয়েটিকে কোলে করে ফের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়। দীর্ঘ রাস্তার দু পাশে বাড়ি। কিছু কিছু বাড়ি ভেঙ্গে বড় বড় ফ্লাট উঠছে। এ বাড়িতেও হয়তো নোটিস পড়বে। বড় রাস্তা ব্যস্ত। দু পাশের দোকান সাজানো বলে কেনা বেচার শেষ নেই। বিস্কুট শেষ করে কি কারণে মেয়েটা হেসে ওঠে।
-বাপরে কি ব্যাপার হাসছিস যে বড়।
দু হাত বাড়িয়ে মেয়েটি ওর গলা ধরে। হঠাৎ শান্ত মেয়েটিকে বুকের মাঝে দোলাতে দোলাতে মনে পড়ে যায় ক্যামেলি আর ওফিকে। কেমন খর চোখ তার। বুকের ভেতর এক অবাক শুস্কতা। কবে জমবে মেঘ, কবে ঝরবে বৃষ্টি কে জানে। এ কেমন বোধ আমার? বিপন্ন নারী এমন বিপন্ন প্রশ্ন নিজেকে করে না। কি এক অপার ঔদাসিন্য কি এক নিদাঘ শুস্কতা। মেয়েটিকে খুব ধীরে কটে নামিয়ে বলে মেরী- ছিঃ আর কাঁদে না কেমন?
বারবারার বাথরুমের দরজায় মুখ রেখে বলে- বারবারা আমি বাইরে গেলাম।
-আচ্ছা কখন ফিরবে? ভেতর থেকে উত্তর পাঠায় বারবারা।
-এই তো খানিক পর।
এরপর আর কোন শব্দ নেই দরজার ওপারে। এ বাড়ির টেলিফোন খারাপ। মিস্ত্রি এসে ঠিক করবে দু একদিনের ভেতরে। টেলিফোন বুথের দিকে সন্মোহিত মানুষের মত এগোয় মেরী। কোথায় ফোন করবে সে? একটা বিশেষ সময় ছাড়া ক্যামেলির দোকানে ফোন করা যায় না। এখনো ওফির সঙ্গে কোন কথা হয়নি। সময়ে নিদাঘ, কঠিন, অপরিচিত, সময়ে সজলাভ স্নিগ্ধ এই তো সাধারণ মানব জীবনের ভাব ও আবেগ। দুর্জ্ঞেয় মন পরিবির্তিত করে চেনা সংসার। সব কিছুই বদলে যায় মন যখন বিক্ষিপ্ত। সেই প্রিয় পরিচিতি পিয়ানো কসসার্টকেও ন্যাকামি বলে ছোট রেডিওর কান মুচড়ে বন্ধ করেছিল মেরী। এবার সে এগোয় টেলিফোন বুথের দিকে। দুটো বড় বড় পঞ্চাশ পেন্স মেসিনে ফেলে ক্যামেলির দোকানের সেই মালিকের কাছে ওদের কথা শোনে। বার বার করে বলে আগামী শনিবার ওরা যেন ফোনের আশেপাশে থাকে। কেবল ক্যামেলি নয় ওফিও যেন থাকে। বলতে বলতে গলা ধরে আসে তার। দোকানী বলে- অবশ্যই। তুমি ভাববে না মেরী।
আহা রে সেই সময় এত সব মোবাইল চোখে দেখে নি কেউ। কেবল অপেক্ষা ল্যান্ড ফোনের।
ফলের দোকানে লাল তরমুজের সারি। কত গুলো ফালি কেটে খরিদ্দার ভোলানোর চেষ্টা। এমন লাল টুকটুকে তরমুজ পেলে ওফি আর কিছু চাইবে না। ক্যামেলির পছন্দ স্ট্রবেরী। ঝক ঝকে হাসিতে পনেট ভর্তি। এ গুলো কিনতে চেয়েও পারে না ও। হানিপট কটেজের হ্রদের দেশে মেরী থাকে মহারাণীর ঐশ্বর্যে। আর এখন? করুন, ক্লান্ত, দুস্থ, অসহায় মেরী শরীরটাকে টেনে টেনে পথ চলছে। সেও তার ভাই এর বউএর মত সপ্তাহে একদিন গোসল করে। আর বাঁকি সময়ে বাকেটে হাত, পা, ঘাড়, গলা মোছা। এ সংসারের সমস্ত বিল পলকে বহন করতে হয়। ছয় জন ছেলেমেয়ের মস্ত সংসার। নিজের মনে রাস্তা হাঁটে মেরী। দোকান গুলোতে একবার করে দাঁড়ায়। ভাইয়ের স্কুল ফেরত ছেলেমেয়ের জন্য কিছু খাবার কিনবার ইচ্ছা ছিল। এখন সে ইচ্ছা বাতিল।
নিজেকে প্রশ্ন করে মেরী- আচ্ছা দুই বছরের একটা শিশু দশ মিনিট কাঁদবার পরেই সে উঠলো? কেন দুই বছরের শিশুই তো সবচেয়ে প্রিয় ছিল তার। হাঁটতে হাঁটতে একটা বেঞ্চে বসে পড়ে। সামনে সরোবর থাকলে সেখানে মেরী একবার নিজের মুখ দর্শন করতো। আপাতত হাজারো মানুষের চলাফেরা, গতিময়তা, কথা, শব্দ, ধ্বনি কোন একজনের সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পায় না। এমন করে নিজের দিকে তাকায় নি মেরী এই কয় মাস। ভুতে পাওয়া একজনের মত জীবন যাপন। ঠান্ডা কোকোকোলা কেনে এক ক্যান। তৃষ্ণায় ছেয়ে আছে সারা বুক। যেখানে হ্রদয় শেপের এক লকেটে ওদের চারজনের ছবি। সে লকেট চোখের সামনে তুলে পানপাতার মত এক টুকরো ছবি দেখে। হক্সহেডের এক পিকনিক উৎসবের পর এক সূর্যালোকিত আরন্যক সময়ে অবারিত সূর্যের নিচে, বার্চের তলায় ওরা চারজন। কোন এক পথচারি ওদের ক্যামেরায় ছবিটা তুলেছিল।

-কি করছিস মেরী তুই এখানে?
পল সামনে দাঁড়িয়ে। দোকান থেকে কোন এক কাজে এখানে এসেছে।
-কিছু না। এই বসে আছি।
ঠান্ডা কোকোকোলার সব টুকুতে হ্রদয়ের দাহ প্রশমিত হয় কোথায়?
-এক কাজ করতে পারবি মেরী?
-কি কাজ পল?
-আয় দেখি আমার দোকানের কিছু কাজ করে দে। পার্ট টাইম কাজের মেয়েটা আজ আসেনি।
মেরী ওঠে। সাজানো গোছানো তার প্রিয় কাজ। তাতেও এখন ক্লান্তি। বলে- চল।
শুকনো আবহাওয়া শুকনো পাতা ঝরায়। মেরী ওঠে। কাজে কোন কালে অনীহা ছিল তার। এখন ক্লান্তি এক বিস্ময়কর ভাইরাস মেরীকে অধিকার করেছে নিঃশব্দে।
পলের জঞ্জালময় দোকানের শ্রী ছাঁদ ফিরিয়ে আনতে সারা দুপুর কাটলো। একটা চিজরোল আর একটা পেপসিতে খাওয়া সেরে। পল তাকিয়ে দেখে মেরীকে। সহোদরার সুনিপুন হাতের কর্ম বিন্যাস।
-জানিস মেরী ইচ্ছে এমন বড় রাস্তায় একটা বড় দোকান দেবার।
-সেতো দারুণ ভাল খবর পল।
-কিছু ক্যাপিটাল জমে গেলেই এ দোকান বদলে ফেলবো।
ষোল বছরের বাড়ি পরিত্যক্ত পল প্রথমে ছিল “রাগ এ্যান্ড বোন ম্যানের” সহযোগী। যারা দুনিয়ার আবর্জনা সংগ্রহ করে তাদেরই এই নামে ডাকে সকলে। ছেঁড়া কাপড় ও হাড়হাড্ডি সংগ্রহের একজন। প্রথমে সে কেবল গলা বাজি করতো। পরে একসময় নিজেই হলো “রাগ এ্যান্ড বোন ম্যান।” এরপর কোন এক দোকানের অংশীদার। পরবর্তী কালে ছলে বলে কৌশলে সেই দোকানীকে সরিয়ে এখন নিজেই সেই দোকানের মালিক। পূর্ব লন্ডন থেকে অভিজাত পাড়ায় যাবার ইচ্ছে। আপাতত স্বপ্ন পল গ্যেটের মতই। একটা বড় দোকানের সর্বময় কর্তা। আর সে দোকান দেবে ও অক্সফোর্ড স্টিটে। “নেশন অব শপকিপারের” অন্যতম প্রধান বানিজ্য রাস্তা।
-তোমার স্বপ্ন সফল হোক পল।
-হতেই হবে। পল জানায় টেবিল চাপড়ে। -শেল্ফ ফিলার হিসাবে তোকেই রাখা যেত। বলে সে সারি বদ্ধ টিন বোতলের দিকে তাকিয়ে। মেরী কিছু বলে না।
একা সে। সরকারি ভাতার দশ পাউন্ড ভাইকে দেয়, দশ পাউন্ড পাঠায় ক্যামেলি আর ওফিকে। বাঁকিটা জমিয়ে রাখে যখন আবার সংসার হবে, বাড়িতে ফিরে যাবে, সেই দিনের কথা ভেবে। তবে সিকনেস বেনিফিট খুব বেশি হয় না। আর কিছু দিয়ে কেনে ক্রিসের টুকিটাকি। প্রতিদিন এখানে এসে কাজ করতে হবে এমন ভাবনা ওকে স্বস্তি দেয় না। মুখে কিছু বলে না যদিও। সাবানের গুঁড়ো, কমফোর্ট, এবং অন্যান্য ধোওয়া মোছার জিনিষ একই তাকে সাজানো। এমনি এক দোকানে বাজার করতে ওফি যেত ছোট বেলায়। একটির পর একটি জিনিষ তুলে ট্রলিতে পৌঁছে দেওযাতেই ছিল তার আনন্দ। মেরীর হাত থেমে যায়।
-কি ভাবছিস রে মেরী।
ধুম ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মেরীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে পল। বর্তমানে ফিরে আবার দ্রুত হাতে গোছগাছে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
-এত অবান্তর জিনিষ পত্র রাখো কেন পল? বাড়িতেও একই অবস্থা। এখানেও। কিছু ফেলে দিলেও তো পারো।
-কি বলছিস তুই? ফেলে দেব?
প্রাণে ধরে একটা সুঁচ ফেলে দিতে পারে না যদিও এখন আর সে “রাগ এ্যান্ড বোন ম্যান” নেই। জিনিষ বিক্রি করতে পারলেই পয়সা। রিসাইকেলে যে গুলো নতুন রূপ নেবে। এখন স্বপ্নের কারণে সে খুব হিসেব করে চলে। অভিজাত পাড়ায় যাবে পল, বারবারা আর ওদের ছয় জন ছেলেমেয়ে। এখন এইসব জঞ্জাল বেচে যা জমছে তাতে একদিন অক্সফোর্ড স্টিটে একটা দোকান কি হবে না?
এবার মেরী দোকান থেকে বেরোয়। একা একেবারে। কাজ না থাকায় আবার নিজেকে প্রশ্ন, নিজেকে নানা সব কথা বলা।

শনিবারের টেলিফোনে টম থিদরেজ অবিশ্বাস্য রূপকথার মানুষ নিয়ে হৈ চৈ করে কথা বলে দুই বোন। ওফি বলে- টেলিভিশন দিয়েছে মা। আর পিকনিক করেছি আমরা।
-খুব মজার টম আংকল। বলে ক্যামেলি।
এই মুখরিত শিশুদের একসময় বলে মেরী- খুব শিগ্রি আমাদের দেখা হবে। তারপর ফোন রাখে।