জেসিকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। বন্ধ দূয়ারে মাথা খুঁড়ে কোথায় চলে গেছে হানপট কটেজ ফেলে। খুব বেশি দূরে নয়। আশে পাশেই কোথাও।
জেসিকে খুঁজে পেয়ে আমাদের জানাবে কেমন আছে ও? পারবে না?
-অবশ্যই। আমি প্রাণপনে চেষ্টা করবো তোমাদের জেসিকে খুঁজে বের করতে। বলেছিল টম ক্যামেলি আর ওফিকে। যারা খুব ভাল করে জানে জেসি ভাল নেই। ওদের দুচোখের, মুখের সুকুমার রেখায় অপার সারল্য আর বিশ্বাস।
আজ হানিপট কটেজের সামনে দাঁড়িয়ে সে কথা মনে পড়ে টমের। সে তাকায় মধূভান্ড কুটিরের দিকে। দেয়াল বেয়ে লাফিয়ে ওঠা গোলাপ গাছে ট্রিমিং হয়নি। দেয়ালচ্যুৎ সাপের মত ফনা বি¯তার করেছে। আগাছায় পরিপূর্ন। বাড়ির সামনে ও পেছনে মানুষ ডুবে যাওয়া বড় বড় ঘাস। বাড়ির লাবন্য ও ঔজ্জ্বল্য অর্ন্তহিত। অর্ন্তহিত সুকল সুষমা। একটি কুটির বাড়ি করুন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঝড়ে, জলে, শীতে, শ্রাবনে ও প্লাবনে। গাড়ি থামিয়ে পায়ে পায়ে প্রবেশ করে সেই চত্বরে টম। এক বছর কয়েক মাস দীর্ঘ সময় নয়। কিন্তু এ বাড়ির দিকে তাকিয়ে মনে হয় হাজার বছরের অযত্ন। এ বাড়ির দেয়াল, জানালা, দরজা, বাগানের বেড়া, জানালার নেটে ও অযত্নের ফুলবাগানে। যে পরিবর্তনে কেমন অন্য মানুষ হয়ে ওঠে টম। সে খুব ধীর পায়ে চারপাশে ঘুরে ঘুরে দেখে। বেড়ার চারপাশে লতিয়ে ওঠা গাছ। চাষ না করা হেজেরা মেডুসার সাপের মত বাতাসে দুলছে। একটি ইলেকট্রিক কাঁচিতে এখন খানিকটা ছিরি ছাঁদ ফিরিয়ে আনা যায়। কিন্তু এ বাড়ির সে দায়িত্ব কেউ টমকে দেয়নি। সর সর মর মর শব্দে চারপাশের আপেল, পেয়ার্স, সিকামোর, ক্রিসমাস ট্রি বাতাসে দুলছে। সামনের দরজায় তালা। লিলাক ভেলভেটের পর্দার অন্তরালে যে ঘর তাকে দেখা যায় না। বছরে একবার রং পড়তো বাড়িতে। সামনে, পেছনে, ঘরে ঘরে, দরজায় ও জানালায়। ঘরের চাবি তার কাছে নেই। না হলে একবার সে এ বাড়ির ভেতরটা দেখে নিত। কোন রানিং ট্যাপ বা কোন লিকিং রুফ আছে কি নেই সেটা জেনে নিত। কোন বাস্ট পাম্প বা কোন গোলমেলে সাটার বা পাল্লার মেরামতির দরকার আছে কি নেই সেটা বাইরে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় না। ক্রিসের পাশের বাড়িও যথারীতি বন্ধ। পৈতৃক উত্তরাধিকারের প্রতি খুব বেশি মনোযোগ আছে মনে হয় না। আত্মগোপন বা নিজেকে লুকানোর কারণে হয়তো জুড আবার আসতে পারে। কিম্বা “লক স্টকর ব্যারোল” সহ এই বাড়ি বিক্রি করতেও পারে।

ঘুরে ফিরে আবার সামনের বাগানে দাঁড়ায় টম। কোনের কাচঘরে কোন লতানো সবুজ বৃক্ষ নেই। গ্রীন হাউসের সংরক্ষিত তাপে ফোটে নি কোন ফুল। এ বাড়িতে আগেও এসেছে। কি আশ্চর্য ব্যবধান এখন আর তখন। মাকড়সার মত কি এক তন্তু সর্বস্ব পোকা গ্রীনহাউজ অধিকার করেছে। মস্ত ঘাসে রয়াল বেঙ্গল টাইগার ঘুরতে পারে। শুস্ক শ্রী হীন। সেই বিবর্ন, প্রাণহীন, ম্রিয়মান বাড়ির মুখোমুখি বেশ কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইলো টম। জেসি নামের এই বাড়ির এক বিশেষ অধিবাসীকে খুঁজে পেল না। তবু ক্যামেলিয় আর ওফেলিয়ার কারণে চারপাশের ঝোপ বনে খানিক অনুসন্ধান। সবুজ বাড়িটা টিয়ে পাখির মত গাছপালার ভেতর লুকিয়ে থাকে তাই এ রং নির্বাচন। এই বাড়ির বৈশিষ্ঠ্য নীলচে শার্সি ও গোলাপি দরজা। যেন এই বাড়ির রূপকথা প্রিয় মানুষদের রূপকথার বাড়ি। যারা এই ধুলোমাটির পৃথিবীতে বাস করেও রূপকথা অনুসন্ধান করে। সাদা একটা পাথরে বেশ কিছুক্ষণ বসে রইলো টম। হু হু হাওয়ায় একান্তে। এক খেলনা বাড়ির মুখোমুখি ও। আর খেলনা বাড়ির চারটি মানুষ পুতুল নাচের খেলনা হয়ে কোথায় ছিটকে পড়লো? এক অজনা উদাসিনতা গ্রাস করলো টমকে। এই তো জীবন? আজ আছে কাল নেই। এমনি কোন দার্শনিক চিন্তা। এমন হু হু আবহাওয়ায় কান পেতে বসে থাকা ওর স্বভাবজ নয়। খালি বাড়িতে কাজ খুঁজে ও ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বোলিং, লন টেনিস এগুলো তার প্রিয় অবসর আনন্দ। প্রস্তরখন্ডে বসে এমন দার্শনিক হয়ে ওঠা নয়। নীলচে কাচের জানালা থেকে মেরীর গোল মুখ হয়তো এখনি বলবে- আর একটু বস টম আমি আসছি।
মনে পড়ে শান্ত ক্যামেলি আর ওফিকে। এ বাড়ির লনে ছুটোছুটিতে মগ্ন হতো যারা। কিন্তু এখন? হঠাৎ বড় হয়ে গেছে যেটা ঠিক বয়সের সঙ্গে মেলে না। এসব ভাবতে ভাবতে চমকে মুখ তোলে কারণ? একটা বেড়াল ওর সামনে।
জেসি? আর্তনাদের মত কণ্ঠস্বর।
পৃথিবীর কোন জন্তু দর্শনে এর আগে এত বেশি খুশী হয়েছে মনে পড়ে না।
উসকো খুসকো জেসিকে সে সত্যিই খুঁজে পাবে ভানে নি। তবু এসেছিল। দুটো সরল মুখের কথা রাখতে। ভেবেছিল এতদিনে কোথায় হারিয়ে গেছে জেসি। পকেটে এক মুঠো বেড়াল খাদ্য “গো ক্যাট” যার নাম। যদি প্রয়োজন হয় এমন ক্ষীন ভাবনায়। সেই খাদ্য হাতে ডাকে- জেসি জেস এখানে আসো।
পালাতে পালাতে ফিরে আসে জেসি। নানা সব লোকজন, প্রতিবেশীর মুষ্ঠিভিক্ষায় এখনো জীবিত জেসি।
পিঠে হাত বুলোয় সযতনে। কেমন অদভুত সব কিছু। ব্যবসা সর্বস্ব মানুষ এমন বোধে কাতর হয়নি আগে। কি এক অনাবশ্যক কারণে ছল ছল। চশমার কাচ মোছে। টম থিদরেজ হয়তো পিয়েরও হতে পারে। কিন্তু সে কথা মেরীর জানবার কথা নয়।
-জেস?
-মিউ। বলে বাঁকি গো ক্যাট শেষ করতে ব্যস্ত জেসি। টম বিড়াল বিশেষজ্ঞ নয়। যে জেসি টমের হাতের পাতায় মাথা রেখেছে তার দিকে তাকিয়ে ওর ফুলো পেটের কারণ বুঝতে পারে।
-তোকে তাহলে আমার কাছেই রাখতে হবে। এমনি এক সদিচ্ছায় দু হাতে ক্যামেলি আর ওফির জেসিকে তুলে গাড়ির পেছনের সিটে বসায়। তারপর হানিপট কটেজের ঝোপ বন গুল্ম ও নিঃসঙ্গতার পথ পার হয়। এর আগে এমর চরিত্রবিরোধী কাজ করেছে কিনা মনে পড়ে না।
-চরিত্র বিরোধী?
মানুষ কি সবসময় নিজেকে জানে?