সময় ফুরোয়। সময় শেষ হয়। ভাল অথবা মন্দ। সুখের রাত সত্বর আর দুখের রাত অনাবশ্যক দীর্ঘ। তবু ফুরোয়। দু বছর শেষ হবার দু মাস আগে জেলঘরের বিশেষ অধিকর্তা ডেকে বলেন- এবার তুমি আমাদের ফেলে, তোমার অসমাপ্ত বাগান রেখে চলে যেতে পার ক্রিস।
-সময় শেষ হয়েছে? অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করে ক্রিস।
-তোমার সময় শেষ হয়েছে। কতৃপক্ষ দু মাস তোমাকে উপহার দিয়েছে। তোমার দু বছর একমাসের আগে তাই ছাড়া পেলে। ওর জেলের সময় ছিল ঠিক দু বছর এক মাস। জজ বলেছিলেন- এক মাস বেশি কারণ কাজটা তুমি ঠান্ডা মাথায় করেছো ক্রিস্টোফার। সে কথায় মাথা নিঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। অবক্ষয়ের মুহূর্ত কি করে অস্বীকার করে ক্রিস।
দু সপ্তাহ আগেও এমন সম্ভাবনা ও ভাবতে পারে নি। আর দশদিন পর মেরী আসবে দেখা করতে। তিনদিন আগেই দেখে গেছে।

লৌহ ফটক পেরিয়ে মুক্ত পৃথিবীতে পা রাখে ক্রিস। সূর্যটাই প্রথমে তাকে হ্যালো জানায়। মধ্য গগনে বলশালী সুর্য় আজ কেমন জ্বলজ্বলে। ব্রিটেনের আবহাওয়ায় প্রতিবাদ সূর্যের সমগ্র অস্তিত্বে। শীতের মত অশৌর্যিক সময়ে। ঠিক শীত নয়, বসন্তের শুরু। বেলা একটার লন্ডন জনসমাগমে পরিপূর্ন। ক্রিস প্রথমে এক অপরিচিত গুলমোহরের মত কোন এক গাছের তলায় বসে। যেন সে ধাতস্থ হতে চায়। অত্মস্থ হতে চায়। হ্রদয় স্পন্দন বড় দ্রুত, চঞ্চল। একটু সুস্থির হয়ে ভাবে সে কি করবে। সেকি মেরীর ওখানে গিয়ে মেরীর সঙ্গে দেখা করবে? মনে পড়ে এভনলী। মনে পড়ে যায় স্বচ্ছ স্ফটিক হ্রদ, গম খেতের খ্যাপা হওয়া, পাহাড়, ঝর্না, তুর্নী নদী এবং সর্বোপরি নিজের বাড়ি- হানিপট কটেজ। হেমন্তের নীল আকাশ। জন সমাগমের সমুদ্র মেলা। এই লন্ডনকে ঠিক চেনে না ক্রিস। লন্ডনে সে খুব বেশি আসেনি। গভীর ভাবে ভাবছে কোথায় যাবে এবার। মুক্ত আকাশ কত কিছু ভাবায় তাকে। মেরী আসবে দশদিন পরে। মন ঠিক করে ফেলে। কোন এক দোকানে এক টুকরো কুকিজ এবং এক মগ চা পান করতে করতে। সে পয়সা মেটায়।

ট্রেনে বাসে চেপে পায়ে হেঁটে যে বাড়ির সামনে সে উপস্থিত সে তার আশৈশবের হানিপট কটেজ। কিন্তু এমন নামে বাড়িটাকে এখন আর ডাকা যায় না। কি এক ভৌতিক ছবির মত দাঁড়িয়ে নি¯প্রাণ বাড়ি। চারপাশের আগাছা, গুল্ম, দীর্ঘ ঘাস। এমনতো ছিল না কখনো? অনেকক্ষণ এই বাড়ির সামনে নিঃশব্দ ক্রিস। এক সময় দরজা খোলে। বাড়িতে প্রবেশ করে। নিজের বাড়ি। শুভ্র চাদরে ঢাকা যাবতীয় আসবাব। শুভ্র চাদরে ঢাকা টেবিল চেয়ার। কফিনাবৃত বাড়িতে, নি¯প্রাণ সময়ে ক্রিস চারপাশে তাকায়। ভুতের মত দোর ঠেলে বাড়িতে প্রবেশ করছে টিসা। এখন কেমন অন্যমত দেখায় তাকে। ম্লান, বিবর্ন, বিষন্ন। হাসতে চেষ্টা করে টিসা। বলে- কেমন আছো ক্রিস?
যেন গতকালের পর আজ আবার দেখা হলো। এমন সহজ ও অন্তরঙ্গ কণ্ঠস্বর টিসার। ক্রিস মুখ তুলে তাকায়। তাকিয়ে দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য টিসার মুখ।
কফিনাবৃত টেবিল চেয়ার সোফা বুক কেস গুলোকে শুভ্রতার শাসন থেকে মুক্ত করতে চেষ্টা করে। প্রশ্ন করে আবার এই সব করতে করতে- আমি ভাল। তুমি কেমন?
এমন প্রশ্নের প্রয়োজন ছিল না। টিসার মুখের দিকে তাকিয়েই ও বুঝতে পারছে কেমন আছে টিসা। তবু এমন প্রশ্নই সবাই করে- কেমন আছো তুমি।
-জুড কোথায়?
ডাস্টারে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলে আবার ক্রিস। টিসা ওকে সাহায্য করবে বলে এগিয়ে আসে। জানালার সবগুলো পাল্লা খুলে দিয়ে পাইন বনের হাওয়া আনে। বিশুদ্ধ হাওয়া হ্রদের দেশের গন্ধ ও আবহ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে ঘরে। অনেকদিন পর এক পরিচিত আবহে প্রাণভরে নিঃশ্বাস নেয় ক্রিস। এবং খানিক পর একই প্রশ্ন Ñ জুড কোথায় আছে ও কেমন আছে।
পাশের বাড়িতে সাড়া শব্দ নেই। নেই কোন হৈ চৈ। কোন প্রকার জীবনের লক্ষণ নেই সেখানে। অযাচিত সময়ের ব্লটিং এ শুষে নেওয়া টিসা। লাবন্যহীন মুখ। লাবন্য ওর বৈশিষ্ট্য নয়, যৌনতা ওর সর্বস্ব। এখন? যৌনতা ও লাবন্য দুটোই অর্ন্তহিত। এখন টিসা হলুদ পাতার মত ম্লান ও বিশুষ্ক।
-জুড আমেরিকা চলে গেছে ক্রিস। পামেলাকে সঙ্গে করে। এ অঞ্চলের অষ্টাদশী পামেলাকে চেনে সকলে। যে মেয়েটির উচ্ছ্বল যৌবনের কাছে হার মেনেছে টিসা। ক্রিস আর কোন প্রশ্ন করে না। কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রান্নাঘরের টেবিলে কাগজে মোড়া মাছ ও আলুভাজা- ফিশ ও চিপস। আজ রাতের খাবার। দেয়ালের ছবি গুলো ধুলো ঝাড়তেই উজ্জ্বল হয়ে হাসে। ক্যামেলি, ওফি, ওদের মা। জেসি কোলে ওফির টুসটুসে ডালিমের মত মুখ। সারা মুখে ভোরের আলো। সারা বাড়ি ভুতের মত ঘুরে টিসা চলে গেছে। আর সারা বাড়ি কয়েকবার ঘুরে ক্লান্ত ক্রিস এসে বসে প্রিয় চেয়ারে। কয়েকটি ক্রিসপেই পরিপূর্ন সে। খাবার বেশি খায় না আজকাল। বেশি খাওয়ার ব্যাপারটা ঠিক কোনকালে ওর প্রিয় ছিল এখন আর মনে করতে পারে না। রাতের এক বাতি আলোতে নিজেকে নিরীক্ষন করে। বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। ফাংশুয়ে বিশ্বাসী মেরী রাতে আয়না দেখে না। ক্রিসের এখন তা মনে নেই।
গেঞ্জির আড়ালে চামরা আর অস্থির ক্রিস। দু বছরের অযত্ন। এক বছর দশমাস সত্যিকার অর্থে। ঘন জঙ্গলের মত এক মুখ দাড়ি। সেই মুখকে আজ বড় অপরিচিত বোধ হয়। আয়নার জগত থেকে নিজের বিছানা।
চুপচাপ শুয়ে সে ভাবছে রান্নাঘরের কথা। ফিটেট, কাবার্ড, ফিটেট আলমারি, থালা বাসন ধোবার যন্ত্র, র‌্যাক, ঝকঝকে টাইলস। ম্যাচিং। কি আছে আমার যা দিয়ে মেরীর একটি সখকে পূর্ন করতে পারি। ছাদের দিকে তাকিয়ে আপনমনে বলে ক্রিস। সাতদিনে বাড়ি ঠিক হবে। মেরীর জন্য একখানা নতুন, নিখূঁত রান্নাঘর হবে। ব্যয় হবে আরো সাতদিন। তারপর এস ও এস। একটা উজ্জ্বল বাড়িতে মেরীকে আমন্ত্রন। ওরা দুজন এক সঙ্গে পৌছে যাবে ক্যামেলি আর ওফির জগতে, ওদের নিঃসঙ্গ দিন রাতে। তারপর? এবার নিজেকে প্রশ্ন- এরপর ক্রিস? বিশুদ্ধ হাওয়ার ঘর পূর্ন। শয্যায় সে, ভাবছে সামনের চৌদ্দ দিনের নানা সব পরিকল্পনা। সবুজ রং পড়বে, ছাদে ফুটবে ফুটকি ফুটকি তারা। ছাদের টালিতে বর্নালী বাদামি। জানালায় হালকা নীল। দরজা হালকা গোলাপি। বাড়িটা একটা খেলনা বাড়ি হয়ে যাবে। এতো ওর তিনদিনের কাজ। আর বাঁকি এগারো দিন? রান্নাঘর তৈরী। কি আছে আমার? কি আছে যা দিয়ে মেরী সাধারণীকে চমকে দেওয়া যায়।