কেউ খাঁচায়, কেউ চেনে বাঁধা, কেউ উইকার বাস্কেটে। কুকুর, বেড়াল ও অসুস্থ পশুপাখির মিছিলে যোগ দিয়েছে জেসি। সেই বেতের খাঁচায় আপাতত বন্দি। দু একবার প্রতিবাদ জানিয়েছিল এমন বন্দি দশায়। বিশেষত আজকাল একা একা বনে বাঁদাড়ে ঘুরে ঘুরে এক ধরণের স্বাধীনতার মনোভঙ্গি তার। সোফার পেছনে, খাটের নিচে, কার্পেটের কোণায়, নিজের শয্যা বিনব্যাগে আরাম আয়েশ ফেলে সেসব জায়গায় যেতে পারলেই বেঁচে যেত ও। কিন্তু টমের শাসনে সেসব হবার উপায় নেই। জেসির শারীরিক কুশলতার সবটুকু জেনে নিতেই ওকে নিয়ে এসেছে এখন টম। খাঁচা হাতে টম বসে আছে আর সব উদবিগ্ন মাতা পিতার মত। ভাবছে মনে মনে কেক বানানোর ব্যবসা এবং অন্যান্য নানা বিধ কাজ কর্ম বাদ দিয়ে, কত সব কাজ ফেলে ক্যামেলি আর ওফি নামের দুই কিশোরীর কথা ভেবে বেড়ালের খাঁচা হাতে ভেটের দোকানে বসে থাকা তার জীবনে প্রথম এবং নতুন ঘটনা। নিজের পরিবর্তনে দুঃখিত বা ভীত নয় বরং বিস্মিত। ক্যামেলি আর ওফির মায়ের মুখখানিও বড় স্পস্ট ওদের মুখাবয়বে। ভেটের সেক্রেটারি নেল ফাইল করতে করতে সুদর্শন টমের দিকে চেয়ে হাসে। বলে- আর দুজন হয়ে গেলেই তোমার। ধন্যবাদ জানায় টম। রুমালে চশমার কাচ মোছে। সোনালি ফ্রেমের চশমাতে সত্যিই বুদ্ধিদৃপ্ত আর স্মার্ট দেখায়। বেতের বাস্কেটের ফোঁকড় গলিয়ে জেসির নরম শরীরে স্পর্শ রাখে। -আর একটু অপেক্ষা কর জেসি। তোমার টার্ন এলো বলে। চার নখে ক্রিসের হাত আঁচড়ে তার বন্দিদশায় বিরূপতা প্রকাশ করে। টমের আগের জন এক মস্ত গ্রেহাউন্ড নিয়ে চলে গেল ভেতরে। দোকান পাহারায় যে ব্যস্ত সেই শক্তিশালী কুকুর মহারাজতে অধিক ক্রিয়াশীল ও কর্মক্ষম রাখতে একটি ছয় মাসের বুস্টার প্রয়োজন। এবং সেই কারণে ভেটের কাজে আসা তার। খুব বয়স সময় ব্যয় হবে না এতে।
জেসির খবর খারাপ নয়। বনে জঙ্গলে ঘুরে যে দু একটা বেড়ালের সঙ্গে ভাব করেছিল তারই কারো একজনের গোটা কয় লিটার বহন করছে সে। এখন তখনের মধ্যে লেবারে যেতে হবে। ধাত্রী বিদ্যার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন, এবং আরো নানা উপদেশ শুনে ফিরে আসা এবার। একটি বিশেষ ইনজেকশনে জেসিকে আরো একটু সবল করে। ছোট বাচ্চা আসছে, শরীরটা ঠিক থাকতে হবে তো। দাঁত দেখে, চোখ দেখে, কান দেখে। তারপর টমের দিকে তাকিয়ে বলে- ভয়ের কিছু নেই। এই বড়িগুলো খাবারের সঙ্গে খাওয়াতে হবে।

বাড়িতে ঢুকতে না ঢুকতেই জার্মানি থেকে ফোন পেল টম। যে মেয়েটি গুডবাই জানিয়ে কয়েক মাস আগে চলে গেছে সেই ফোন করেছে। খবর অনেকটা জেসির মতই। -টম থিদরেজ এক সাত পাউন্ডের কন্যা সন্তানের পিতা এখন। চলে যাওয়া মেয়েটিকে কসগ্রাচুলেট করে। শিষ বন্ধ। মস্ত এক টল গ্লাশের হুইসকিতে বরফ মেশায়। কিছুক্ষণ ঝিম ধরে সাপের মত বসে থাকে। -তার কন্যার খরচ? না সে জন্য ভাবছে না টম। সে কি সত্যিই পিতা এমন প্রশ্নও জাগছে না মনে। সে জানে কন্যা তার। কি ভাবছে টম? জেসি এসে ঘুরে গেল একবার। জার্মানের মেয়েটি ঝড়ের মত প্রেম করেছিল। এবং ঝড়ের গতিতে আইট অফ লাভ হয়ে বিদায়। সে প্রায় ছয় সাত মাস আগের ঘটনা। নিকোলের কন্যার নাম কি হবে? সে বলেছিল- বাচ্চাটাকে সে রাখবে। সেকি উড়ে গিয়ে দেখে আসবে নিকোল এবং তার মেয়েকে? সে হবে না এখন। যদি কখনো পরিচয় দেবার প্রয়োজন হয়? সেও তো ভবিষ্যতের কথা। বলেছিল নিকোল- ভয় পেয়োনা। আমি বাবা কে সে জায়গায় কেবল এক্স লিখবো। এটা তো সুসংবাদ? এই সুসংবাদই তাকে ধরাশায়ী করেছে। টম ঝিমোতে ঝিমোতে ঘুমিয়ে পড়ে সুসংবাদের উপর।
পরদিন শনিবার। দীর্ঘ এক রাতের ঘুমের পর বশে আনতে পেরেছে মনটাকে। জেসির গোক্যাট আর হুইসকাসের খাবার সাজিয়ে রেখে নিজের জন্য এক কাপ কফি পান করে। ম্যালা সব কাজ জমে আছে। সে গুলো ঠিক করতে হবে।
ক্যামেলি আর ওফিকে জেসির খবর জানাবে বলে ফোন ডায়াল করে। দোকানের ফোন নম্বর আসবার সময় সঙ্গে এনেছিল। কার্যকারণ ব্যতিরেকে এই পরিবারের সঙ্গে কেমন করে জড়িয়ে গেল টম। কেন জড়ালাম, কিসের জন্য জড়ালাম এসব প্রশ্ন আর নিজেকে করে না টম। মনের সব স্তর পার হয়ে সেতো দর্শন করে পূর্ন চাঁদের মত এক খানি নিটোল গোল মুখ। কর্কট রাশির মেরী। যা কখনো কাজ ফেলে এসে দাঁড়ায় সামনে। কখনো কাজের কারণে। টম উঠে বসে। এরপর ক্যামেলিকে ফোন করে- সুসংবাদ ক্যামেলি।
-কি সুসংবাদ?
-তোমরা খুব তাড়াতাড়ি গ্রান্ডমা হতে চলেছো।
-কি হতে চলেছি।
-গ্রান্ড মা। গম্ভির কণ্ঠস্বর টমের।
-বুঝিয়ে বল টম আংকল।
-জেসির বাচ্চা হবে দু এক দিনের ভেতরই।
-কার বাচ্চা হবে?
-জেসির।
এরপর প্রচন্ড চিৎকার কানে আসে। ফোনটা একটু দুরে রাখে। তারপর বলে- কনগ্রাচুলেসনস গ্রান্ড মা।
-থ্যাংক য়ু থ্যাংক য়ু টম আংকল। ইউ আর এ গডসেন্ড। ঈশ্বর প্রেরীত একজন। মহামানব। এ রিয়াল প্রফেট।
-রিয়ালি?
-লক্ষবার রিয়ালি। তুমি গড সেন্ড।
অন্যকে সত্যিকার অর্থে আনন্দিত করবার মধ্যে যে গভীর আনন্দ তারি উচ্ছ্বসে তার গত রাতের দুঃখ ও বিষাদের হাংওভার খানিক কালো কফি পান করে। অনেকটা ঝরঝরে লাগছে এখন।
-জানো টম আংকল ওফি কেন প্রতি রাতে এখন দেরীতে ঘুমায়?
-কেন?
-ছবি দেখে প্রতিরাতে। তোমার দেওয়া টেলিভিশনে। যা চমৎকার ছবি আসে না সে আর কি বলবো।
-তুমি ছবি দেখ না?
-আমি দেখি বেশির ভাগ কুইজ প্রোগ্রাম।
-ক্লেভার গার্ল।
-উত্তর না জানা থাকলে শেখা যায়। তুমি আবার কবে আসবে টম আংকল?
-সময় পেলেই।
-এবারেও পিকনিক হবে তাহলে?
-সেতো হতেই হবে। পিকনিক, বোট রাইড সব।
-আমার ড্যাডির পিকনিকের বাতিক ছিল। প্রায় প্রতি সপ্তাহে আবহাওয়া ভাল থাকলে আমরা পিকনিকে যেতাম। কখনো হ্রদে, কখনো পাহাড়ে কোন কোন পার্কে বা বাগানে। ড্যাডি বলেন প্রকৃতির উঠোন।
-এবারে তাহলে একটা চমৎকার প্রকৃতির উঠোন খুঁজে বের করতে হবে।
-ইস কবে আসছো টম আংকল, আয়োর গড সেন্ড।
-যখনই সময় পাই।
-খবর দিতে কিন্তু ভুলো না।
-কিসের খবর?
-গ্রান্ড মা হবার।
-অবশ্যই।
-এই পৃথিবীতে কয়জন গ্রান্ডমা হতে পারে। এই বলে হেসে টম ফোন রাখে।
ফোন রেখে কি ভাবে টম। খালি বাড়িতে জেসির জন্য পানি বিস্কুট সাজিয়ে রেখে এবার কাজে যাত্রা।
দুঃখ হলেই মদ পান এমন দেবদাসীয় ব্যাপার নেই ওর ভেতরে। অভ্যাসও নেই। যখন এমন হয় মনের অবস্থা ক্ষুদ্ধ হয় সে নিজের উপর। সেই মনের ক্ষুদ্ধ ভাবটা চলে গেছে ক্যামেলির অবিমিশ্র আনন্দধ্বনিতে। জার্মাানি বা নিকোল মন থেকে মুছে গেলেও এক নবজাতিকা কি করে মুছে যায়? তাকে টম কি করে মন থেকে সরায়। সেতো জেগেই রইবে আজীবন। সেই কবেকার স্কুল সহপাঠীকে নিকোল ভুলতে পারে নি। প্রথম প্রেম নামের সেই পুরণো শব্দের কাছে পরাজিত হয়েছে টমের বুক ভরা ভালোবাসা। তাই নিঃশব্দে যেতে দিয়েছে। আর নিকোল বলে- টম তার ইমফাচুয়েসন। যার ঘোর কেটে যেতে সময় লাগেনি তার। প্রেমে যখন একেবারে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে নিকোল জানালো গুডবাই।
চুপচাপ গাড়ি চালায়। পাইন দেওদারের রাস্তা পার হয়। মনে পড়ে গ্রান্ড মা ক্যামেলির আনন্দ কণা। কণা কণা হয়ে আনন্দিত করেছে তাকে। মনে মনে বলে- হে আমার পূর্ন চন্দ্র আজ কোথায় তোমার দিন রাত জীবনযাপন? ক্যামেলির মুখে মায়ের মতই দুটো নীল চোখ বসানো। একসময় জোরে একসেলারেটরে পা দাবায় ক্রিস।