জুনের প্রথম সপ্তাহে, এক সোনাঝরা রবিবারে ব্যাংক হলিডে উইকএন্ডের অবসর সময়ে ক্রিস পরিবার পৌঁছে গেল নর্দান লেকপাড়ে। এখান থেকে হক্সহেড বেশি দূরে নয়। ওখানেই তো পড়াশুনা করেছিলেরন ক্রিসের রূপকথার কথক ওয়ার্ডস ওয়ার্থ। পিকনিক সারা হলে ওখানেও ঘুরে ফিরে দেখবার বাসনা। ক্রিসের সহকর্মীর বাড়িতে বিকালে চা পান পর্ব। অলস ভঙ্গিতে অতিবাহিত হবে বেশ খানিকটা সময়। সারা দুপুর সেই নিসর্গে এই সব খাবারের সদগতি চলছে- সফেদ টুনার স্যান্ডউইচ, পাইন আপেলের রস, আপেল স্ট্রুডল এবং এক ঝুড়ি মিস্টি সাত সুমাস।
এ ছাড়া বাড়িতে বানানো ফেয়ারি কেকের সুশোভন হাসি এবং টিনখোলা বিবিধ বিস্কুটের স্বাদ আর গন্ধ পরখ করতে করতে কেটে যায় আরো কিছু সময়। স্ক্রাবলে শব্দের খেলা। অভিধানে বানান জেনে ঝগড়া শেষ। এই সব করতে করতে পার হয় কিছু সময়। মেরীর সেলাইএর ঝুড়ি আর প্যাটার্নের বই। উল, কাঁটা। সে বুনছে ডবল নিটিং মোহিয়ার সোয়েটার ক্রিসের জন্য। একেবারে ফুল শ্লিভ। মানে বড় হাতার ঢিলেঢালা ঢাউস জাম্পার। যে জাম্পার গায়ে ক্রিস উপেক্ষা করতে পারবে শীত এবং গাড়িতে ঝুলিয়ে রাখা ব্লেজার্ড গায়ে চাপাতে ভুলে গেলেও অসুবিধা হবে না। মেরীর ভালবাসা প্যাটার্নে গড়া এক থোকা জাম্পার। কি সাধ্য আছে শীতের ক্রিসকে শীতার্ত করে।
সবুজ ঘাসের পার্সিয়ান কার্পেটে আলো ছায়া রোদ। নর্দান লেক পাড়, সামনে হ্রদ। একটা গাছের নিচে শুয়ে কি যেন ভাবছে ক্রিস।
স্যন্ডউইচ আর টুকরো খাবারের আশায় এসে বসেছে হরেক পাখি। আর নানা সব কাঠবেড়ালি মস্ত সতেজ গাছ বেয়ে উঠছে আর নামছে। টুকরো খাবার লুকিয়ে রাখবে কোটরে, শীতের সঞ্চয়। তাই নামা আর ওদের দিকে তাকানো। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে আবার উপরে চলে যাওয়া। ক্যামেলি ও ওফি স্ক্রাবলের স্কোর বন্ধ রেখে এই দেখছে তাকিয়ে। মেরী এক সময় হাতের সেলাই বন্ধ করে। স্যান্ডইউচের ভরপেট আহার, এক ক্যান বিয়ার পান করবার পর থেকে ক্রিস চুপচাপ শুয়ে আছে গাছের নিচে। কি যেন ভাবছে আজকাল। একসময় প্রশ্ন করে মেরী- কি ভাবছো ক্রিস? ক’দিন হলো কেমন অন্যমনস্ক তুমি।
ক্রিসের নিঃশ্বাসের শব্দে মেরী জেনে যায় ম্বস্তিতে না অম্বস্তিতে আছে ক্রিস। ক’দিন হলো সে বুঝতে পারছে ক্রিসের নিঃশ্বাসে অস্বস্তি। তার চলায় বলায় কি এক অসম ছন্দপতন। ক্যামেলি আর ওফি এবার কাঠবেড়িালির পিছু পিছু হর্সচেস্টনাটের বড় গাছটার তলায়। এক ফাঁকে প্রশ্ন করে মেরী ক্রিসের খুব কাছে বসে, অন্তরঙ্গ কণ্ঠে। বলে- কি ভাবো আজকাল তুমি ক্রিস? ব্রডবিনর্সে এমন ফলন হয়নি কখনো, আর লেটুস আর র‌্যাডিশেষে কাচের ঘর ভর্তি। তিন মাসের জন্য আর ভাবনা নেই। তাহলে কি নিয়ে এত ভাবনা তোমার?
মেরীর হাত নিজের হাতের মুঠোয় ভরে ক্রিস। সলিটিয়ার হিরায় নিজের আঙুলের স্পর্শ রেখে বলে- বিনস, র‌্যাডিশেষ, ম্যারো আর ক্যাবেজ নিয়ে ভাবছি না মেরী।
-তাহলে জেসির আপসেট স্টমাক নিয়ে? পেটটা একটু গড়বড় তাই?
-না তা নয়।
-তবে কি ওফির পায়ের কড়ে আঙুলটায় ব্যথা লেগেছে সে নিয়ে ভাবছো? দেখ না ও কেমন ছুটছে। লিটিল টোর ভাবনা আছে ওর?
-না তাও নয়। বলে ক্রিস।
-তাহলে? ক্রিসের চুলগুলো সুচারু করতে করতে প্রশ্ন করে মেরী।
একটু ভাবে ক্রিস। তারপর প্রায় হঠাৎই বলে ওঠে- ভাবছি জুডের কথা।
-জুড? কে এই জুড? মেরী ভাবতে চেষ্টা করে বিয়ের পনেরো বছরের মধ্যে এমন নাম তাদের বাড়িতে একবারো উচ্চারিত হয়েছে কিনা?
সুইট চেষ্টনাটের আলো ছায়া সময়ে, প্রকৃতির অর্ন্তলোকের দ্বার প্রান্তে, এক আকাশ আলোর নিচে, কাঠবেড়ালির লেজ তোলা ছুট আর অছুটের ভেতর, পাখির পাখার কাঁপন তোলা এমন সময়ে উদাস ক্রিস বলে- জুড মেরী। আমার কাজিন জুড। জুড দ্য টেরিবল।
মেরী মনে করতে পারে না এমন ভয়ানক টেরিবল নাম সে আগে শুনেছে কিনা। বিয়ের পর যত গুলো নাম ও নামাবলী হানিপট কটেজে উচ্চারিত হয়েছে তার মধ্যে “জুড দ্য টেরিবলের” নাম ও কখনো শোনে নি।
-ওরা অনেক কাল আগে আমেরিকা চলে গেছে মেরী। এভনলীর পাট চুকিয়ে। এবারের জুলাইতে ও আসছে এখানে। কাটাতে কিছু সময়। আমাদের পাশের বাড়িটা ওদের।
সে বাড়িতে কখনো কাউকে বাস করতে দেখেনি মেরী। আংকল জর্জের বাড়ি ওটা এই তো শুনেছে বরাবর। ওদেরই ছেলে জুড।
নিটিং গুছিয়ে সারা মুখে লুপিন বনের বিভাব মেখে বলে- ওমা সেতো অত্যন্ত ভাল কথা। তালাবন্ধ বাড়িটায় প্রাণ আসবে এবার।
মেরীর উৎসাহে খুশী হতে পারছে কোথায় ক্রিস। তার সমস্ত মনে সেই রক্তাক্ত ঘটনা আঁকা, যখন স্কার্ফি নামের তুলতুলি বেড়ালটাকে বিনা কারণে পায়ে দড়ি বেঁধে টানতে টানতে বন বাঁদারের ভেতর দিয়ে প্রাণ শেষ করেছিল। উচ্চহাসির সঙ্গে বলেছির- ক্রিস তুই না একটা চিকেন। এই সামান্য কারণে এত মন খারাপ তোর? আর সেইদিনই ক্রিস বলেছিল- জুড দ্য টেরিবল আজ থেকে তোমার সঙ্গে আমার সমস্ত সম্পর্ক শেষ। এর অল্পকিছুদিন পরই আংকল জর্জ ও আনটি এ্যান তাদের একমাত্র সন্তান জুডকে নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল। চুপচাপ ক্রিস কয়দিন থেকে এইসবই ভাবছে। এখন চুপচাপ শুয়ে আছে। মেরী ওর শরীরে হেলান দিয়ে আবার একমনে বোনা শুরু করে। ক্যামেলি আর ওফি ঘুরে ঘুরে একরাশ ফলপাকুড় নিয়ে ফিরে এসেছে। ফিরে এসেছে কাঠবেড়ালি গতিবিধি ভালমত জেনে নিয়ে। এক স্কুলের গান মার্চ করতে করতে ওরা ফিরে এসেছে আবার এই পিকনিকস্পটে।
জুড দ্য টেরিবলকে মন থেকে সরিয়ে উঠে বসে ক্রিস। আপন বিষন্ন চিন্তা ও বিক্ষিপ্ত বোধে এক সংসার আনন্দ প্রত্যাশী মানুষকে বিপন্ন রাখতে যে টুকু স্বার্থপরতা রয়ে যায় ক্রাইস্ট অব এলনলী তাকে মেনে নিতে পারে না। তাই হঠাৎ ঝটপট উঠে বসে সে। সেই কারণে মেরীকে গুছোতে হয় নিটিং বাক্স। এবং ক্যামেলি ও ওফিকে পাখপাখালির তদারকিতে রেখে সার্দান লেকের নানা সব বৃক্ষাবলীর আলোছায়ায় হাত ধরে পাশাপাশি এবার হেঁটে চলা। কখনো সজল কখনো নির্ঝর সিক্ত উচ্ছ্বল পথ। ঝর ঝর তির তির জলস্রোত। সর সর মর মর বনরাজি। এবং এক একসময় বড় বেশি শান্ত চারপাশ। মেরীর স্যান্ডেলসু যাতে জলসিক্ত না হয়ে ওঠে একসময় ক্রিস ক্যারি ওভার থ্রেসহোল্ডের ভঙ্গিতে কিছু পথ মেরীর জন্য সুগম করে, তাকে বহন করে। বাহু সংলগ্ন পাঁচ ফুট নাথিং মেরী এবং ঝর্নার শব্দ এই মুহূর্তে ক্রিস অব এভনলী ভাবে জীবন কি অপরূপ। আর মেরী অব ম্যাগডালা ভাবে- কি ভাগ্য ক্রিস আর কারো নয় কেবল আমার। আনন্দ অধিকার করেছে, সময় প্রপাতে কেবল সুঘ্রাণ।

হ্রদের দেশের আশেপাশেই সময় কাটায় ক্রিস পরিবার। যেখানে মাছ ধরবার সুবিধা থাকে। আর থাকে ছল ছল হ্রদের স্যোত। অপার জলরাশির বিহার। খ্যাপা হাওয়া। হলিডেতে এই সব অঞ্চল ফেরে অন্য কোথায় যেতে হবে এ ভাবনা কখনোই তাকে বিচলিত করে না। মেরী পাড়া প্রতিবেশী বা ঝোপবন ওপারের নারীর কারণে এমন কোন বাসনা হ্রদয়ে ধরে রাখে হয়তো- শরীর ব্রোঞ্চ করতে স্পেনের গ্রানাডা, মেয়োর্কা, সাইপ্রাস, পাফোস, আফ্রোদাইতির জলরাশির দেশে যাওয়া যেত যদি। ডোনার তামাটে শরীরের দিকে তাকিয়ে হ্রদের দেশের সূর্যকে অত্যন্ত অপ্রখর ভাবে ও। অবশ্য এসব নিয়ে অনুযোগ নেই। মেরীর সুখ আনন্দের অনুপান সাধারণ। এক পনেট স্ট্রবেরী কেনার পর যখন এক গুচ্ছ গোলাপ কারনেশন কিনতে পারে নিজের ভাগ্যের প্রসন্নতায় তখন উৎফুল্ল মেরী। সে এক আশ্চর্য ঐশ্বর্যে ভরপুর। রান্নাঘর, বাগানে নানা সব হামিংএ কাজ সারে। গুন গুন সুর তোলা কাজ হয়ে ওঠে মনোরম। খুশী ওর চারপাশের সকলের জন্য। যেমন ক্রিস কি এক পরিপূর্নতায় মগ্ন। যেমন হ্রদের দেশ কি এক ঐশ্বর্র্যে স্তব্ধ হয়ে থাকে। ছল ছল আবার কখনো মৌন গম্ভির। আর এই ঐশ্বর্যময়ী পিতামাতার মাঝখানে ক্যামেলি ও ওফি স্থিত, শান্ত, ভদ্র ও অর্ন্তমুখী। ওদের নিয়ে ভাবনা নেই মেরীর। এভনলীর সমস্ত স্বজন প্রতিবেশী এবং স্কুলের গুডবুকে ওদের নাম সোনার অক্ষরে লেখা।
মেরীর মনে সেই ঘটনা বড় উজ্জ্বল। এই একটি ঘটনার কারণে মেরী স্মিথ হয়েছে মেরী ক্রিস্টোফার জোনস। ডাকহরকরা অত্যন্ত সাধারণ দিনে এক বেড়ালের ছবি আঁকা কার্ড উপহার দিয়েছিল মেরীকে। ঠিক উপহার নয় বিলি। পাখা মেলে উড়তে উড়তে কোন এক অনেক দূরের আত্মীয়র কার্ড। এসে বসেছিল মেরী সাধারণীর দরজায়। ওর জীবনে এমন ঘটনা তখন শূন্য। অভিভুত মেরী সজল চোখে আল্পুত কণ্ঠে ধন্যবাদ জানিয়ে ডাক হরকার হাতে গোল মত এক পঞ্চাশ পেন্স পুরস্কার বা বখশিশ দিতে গিয়েই ক্রিসের হ্রদয়ে নিজের স্থান একেবারে পাকা করে নিয়েছিল। তারপর সময় বয়ে চলেছে ক্লান্তিহীন ভাবে।