আর এমনি এক ভাল লাগা অপরাহ্নে জুড দ্য টেরিবল শনিবারের ঝড়ো হাওয়ায় আটলান্টিকের ওপার থেকে উড়ে এসে পেঁছালো এভনলীতে। এবং এসেই সে আস্বস্থ করলো সে রইবে আপনার বাড়িতে। জুডের বাড়িটা ক্রিসের পরের বাড়ি। তখন জুলাই নয় অক্টোবর মাস।
-কেমন আছো ক্রিস? পিঠে মস্ত এক হামবার্গার মার্কা থাপ্পর মেরে শুধোয়।
-ভাল আছি। তুমি?
-দেখতেই পাচ্ছো।
অবশ্যই দেখতে পাচ্ছে ক্রিস। ছয় ফুট দুই ইঞ্চি পনেরো স্টোনের জুড তার লটবহর সহ সুস্থ শরীরে এসে পৌঁছায়। সাইড বন্ডের মত এক পুরুষালী হাসিতে আকর্ন হেসে। নানা সব আধিভৌতিক ভানায় আচ্ছন্ন এমন ঠুনকো ময় নয় তার। শরীরের মত প্রচন্ড বলশালী মন। প্রকৃতির অপার জলরাশিতে যেসব অলিখিত বানী, হ্রদের স্বচ্ছজলে যে সময়ের স্রোত, গমের শিষে শিষে যে খ্যাপা নিস্তব্ধতা, এক অতীন্দ্রিয় দুর্জ্ঞেয় গ্রন্থকে যে ভঙ্গুর মন বার বার পাঠ করতে চায়, তেমন কোন মনোগত আদিব্যধিতে ভোগে না সে কখনো। মন খারাপ করবার কারণ? সেও খুব সংজ্ঞা পরিমিত ঘটনা। নারীসঙ্গ সুখকর কতখানি কিম্বা খাবারে সেকেন্ড বা থার্ড হেল্পিংএর সুযোগ আছে কিনা, এইসব। আর টাকা পয়সার ভাবনা খুব আছে বলে মনে হয় না। আংকল জর্জ কি সব টাকা পয়সার বিলি ব্যবস্থা করে জুডকে ও ব্যাপারে নিশ্চিন্ত করে রেখে গেছে। আপাতত নারী সঙ্গ, এক প্লেট এ্যারোমাটিক রোস্টডাক, কখনো বিফ কখনো চিকেন, সন্ধ্যার টেলিভিশন, ও ভিডিওর রমরমা সিনেমা। এরপরও আছে মোটাসোটা লাস্টিবিস্টি গ্রন্থবলী। এরপর আর কি নিয়ে বিষাদিত হবে জুড দ্য টেরিবল। “মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকালো মাঝে” যাদের বাস সেই সব ভাবনা মুহূর্তের জন্যও ভাবায় না তাকে। মহাকালের আঁধারে সে খুঁজে নেবে উপাদেয় স্বাদ হরিণীমাংস।
কিন্তু এখন নিজের ঘরে মাস্টি বা ভ্যাপসা গন্ধে বিরক্ত। বেশ কিছুদিন অব্যবহ্রত ঘর। আতর সুবাস বিলায় না। কেমন অস্বস্থিকর সব কিছু। মেরী জানায় জানালার নেট পর্দা গুলো ঝকঝকে হবে, চাদর বেডকভারও বদলে দেবে। পাঁচ ফুট নাথিং মেরীকে মস্ত থ্যাংকু জানায় জুড। বাঁ চোখ টিপে ক্রিসকে জানায় জুড দ্য টেরিবল- তুমি অত্যন্ত লাকি, মহাভাগ্যবান।
-ধন্যবাদ। স্ত্রী প্রশংসায় উৎফুল্ল হবে না এতখানি নির্মোহ এখনো হতে পারে নি।
-কতদিন থাকবে তুমি? সযতনে জেনে নেওয়া কতদিন জুডকে তাদের সহ্য করতে হবে।
-তিনমাস থেকে ছয়মাস। সুটকেস থেকে ডিউটি ফ্রি এ্যালকোহল বের করতে করতে জানায় জুড। বড় বোতলে একশো ভাগ প্রুফ নির্জলা হুইস্কি।
-তুমি কি এখনো একা? এমন প্রশ্ন করতেই হয় ওকে। জেনে নিতে তিনমাসে আর কোন পদধূলি পড়বে কিনা এই নীরব বাড়িতে।
-একা? অর্থাত আমি কাউকে বিয়ে করেছি কিনা। না। তোমাদের এখানে গরুর কি অনেক দাম? নিজের রসিকতায় নিজেই হাসে হো হো করে।
-আমার তো তাই বিশ্বাস। শান্ত কণ্ঠে জানায় ক্রিস। ফেরানো পিঠে মেরী নেটের পর্দাগুলো খুলে নিতে ব্যস্ত। এক গ্লাশ হুইসকি ঢেলে বলে জুড- সুজি, টিসা, নেলী, পলিদের খবর কি? সবাই কি গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে বিয়ে টিয়ে করে।
-টিসা আছে। আর সকলে অন্যত্র। ও আছে নিজের দূভার্গ্যরে কারণে। দুবার বিয়ের পর আপাতত একা। ওর দুজন স্বামী দূর্ঘটনায় মারা যায়। এখন একা।
-এ্যাকসিডেন্ট প্রণ নাকি? এক মস্ত সিপে অনেকখানি হুইসকি শেষ করেছে জুড।
জমিয়ে ঠান্ডা পড়ে এভনলীতে। হটওয়াটার বোতল নয় আটাত্তর ডিগ্রি ফারেনহাইট মানব উত্তাপ পছন্দ ওর। এ ব্যাপারে কখনো কোন অসুবিধায় পড়েনি। আটাত্তর ডিগ্রি ফারেনহাইট এক চাঁই আগুন উত্তাপের কাছে হার মানবে না এমন তো কখনোই হতে পারে না। আজকের রাতের খাবার মেরীদের সঙ্গে সেরে নেবার কথা।

পাইন কাঠের টেবিলের পাশে একখানি বাড়তে চেয়ার। যা পুরণো ওকে তৈরী। শক্ত মজবুত। জেসি নামের তুলতুলি বেড়াল পায়ের কাছে ঘোরাঘুরি করতেই মধ্যম সাইজের কিক খেল। এবং উধাও হলো বাড়ি থেকে। ফিরলো না যতক্ষণ জুড বাড়িতে থাকে। ঘটনাটি ঘটেছে সকলের চোখের আড়ালে। অতএব জেসি অর্ন্তধান নিয়ে ভাবনা করলো না কেউ। ব্রকলি ও ব্রডবিনস সেদ্ধ, রোস্ট পোটাটোর সঙ্গে ধোঁওয়ার ট্রাউট। মাংস নেই বলে খাওয়াটা জমলো না জুডের। স্ট্রবেরী পাই খেল দুবার। সকলে বসলো একসময় ফায়ারপ্লেসের সামনে।
-হঠাৎ এখানে তিন মাসের জন্য কি ব্যাপার জুড?
-এলাম। ছুটি কাটাতে। হাই তুলতে তুলতে জুড জানায়।
-এতদিন ছুটি পেলে?
-নতুন চাকরি শুরু করবো তিনমাস থেকে ছয়মাস পরে। দেশের এই বাড়ি। পড়ে আছে। মা বাবাদের ইচ্ছা ছিল ফিরে আসবার। তাই বিক্রি টিক্রি হয়নি। ভাল দাম পেলে বাড়িটা বিক্রি করে দেব।
মেরী যথারীতি সব কাজ শেষ করে এসে বসেছে তার নিটিংবাক্স হাতে। সেই ভারী জাম্পারের অনেক খানি হয়ে গেছে। এখন গলা উঠছে। তাই গল্প করতে পারছে না বটে তবে শুনছে। এ কথা সে কথার পর প্রশ্ন করে জুড- ছুটিতে এ বছর কোথায় গিয়েছিলে?
নিজে পছন্দের চেয়ারে সমাহিত ক্রিস জানায়- রাইডাল ওয়াটার।
-কোথায়? সোজা হয়ে বসে এবার জুড।
-রাইডালওয়াটার। একই স্বরে জানায় ক্রিস।
-এভনলী থেকে রাইডালওয়াটার? এক হ্রদ থেকে আর এক হ্রদ। লেকডিস্ট্রিকের এক মাথা থেকে আরেক মাথায়? বোরিং নয় একেবারে?
-রাইডালওয়াটার আমাদের বোর করে না। বোর করে অপছন্দের লোকজন। নির্বিকার ক্রিস জানায়।
-এভনলী থেকে রাইডালওয়াটার? কেন পৃথিবীতে হলিডে কাটানোর আর কোন জায়গা নেই?
-কোথায় যাব? প্রশ্ন করে ক্রিস। হলিডের মধ্যে যে পরিমান উদ্দাম উল্লাসের ভাবনা রয়ে যায় ক্রিসের চরিত্র সেই সব প্রয়োজনীয়তা কখনো অনুভব করে না। এক আলোছায়া নিসর্গ হতে আর এক আলোছায়া নিসর্গে চলে যাওয়া। যেখানে শ্যালে নামের এক ডিম্বাকৃতি বাড়িতে মেরী রচনা করে নানা সব খাবার। রিমঝিম রাতে নানা সব গল্প। পায়ে হাঁটা, ঘোরা, বাসে চলাচল, সাঁতার, দৌড়ঝাঁপ, সেরে ঘরের নিভৃতে নানা সব খেলার সরঞ্জাম পেতে বসা। পুরো পরিবারই রাইডালওয়াটার, কনিসটন, স্কারবারা, কেসিকের ওপারের জগতে হলিডে করতে যাবার তাগিদ অনুভব করে না।
-মা জেসি কোথায়?
ঘরে প্রবেশ করেছে ওফেলিয়া।
কফি শেষ করেছে জুড। উঠি উঠি ভাব। আটলান্টিকের ওপার থেকে উড়ে আসা জুড দ্য টেরিবল প্রথম সন্ধ্যাতেই জেসি নামের নরম নিরিহ বেড়ালটাকে কিক মেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে এক টেরিবল কান্ড করে বসে আছে। ওফির প্রশ্নে হাই তুলতে তুলতে জানায়- আমি চললাম। জেটল্যাগ তাড়াই আগে।
মেরী সেলাই রেখে উঠে বসে। খোঁজ খোঁজ। জেসি কোথায়। বেশ কিছু খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া গেল। ঝাউগাছের আড়ালে চুপচাপ শুয়ে। ওফি জেসিকে বুকে করে বাড়িতে ফিরে আসে। সকলে মিলে বেড়ালটাকে ফিরিয়ে আনে।

পাশের বাড়িতে ফাবরিক সফ্টনার, পাইন বনের করা ঘরে, সুবাসিত বিছানায়, লাল লেপের তলায় বহুদিন পর নিশ্চিন্তে ঘুমায় জুড। ফ্লোর বোর্ডের নিচে যাকে গুম করে এসেছে সে কোন জেসি নামের বেড়াল বা জ্যাক নামের হাইল্যান্ড টেরিয়ার নয়। দশ বছরের প্রমোদ সঙ্গিনীই কি এক কথার প্রতিবাদে আজ বিস্ময়কর ভাবে নিশ্চুপ। অবশ্য এমন ইচ্ছে ওর ছিল না। কিন্তু এখন আর কিছু করবার নেই। সিমেন্ট সুড়কির চাদরে মুখ তোলে সাধ্য কি তার? জিপসি মেয়েটাকে কে খোঁজ করবে? এই কারণে এভনলীতে কেউ আসবে না তাকে খোঁজ করতে। এই কারণে কি এক সুখ স্বপ্নে হেসে ওঠে জুড?