নড়বড়ে গেট ঠিক করতে ব্যস্ত ক্রিস। বহুদিন অব্যবহারে জং পরা। ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে ছুঁতে গেলেই। নিজের বাড়ি থেকে লন মোয়ার এনে কাজিন জুডের লক্ষ লক্ষ অযাচিত ঘাস গুল্মকে পরিস্কার করে। হ্রদের দেশে ইতোমধ্যে সাতদিন অতিবাহিত করেছে ক্রিস। টিসা নামের সেই মেয়েটাকে বাড়িতে আনতে পেরেছে। এবং কি এক এশ্বর্যময়ী নীল পাখিকে হত্যা করে ট্যাক্সিডার্মিতে দেয়ালে টাঙ্গিয়ে তার সৃজনশীল ক্ষমতায় পুরো ক্রিস পরিবারকে বাকরুদ্ধ করেছে। -এ আর কখনোই পাখা মেলে উড়বে না। এমন এক আত্মপ্রসাদের মহান হাসি জুডের সারা মুখে।
এত কিছু করবার পর ক্লান্ত হয়ে এসে বসেছে ক্রিস। ক্রিসের বাড়ির সিঁড়িতে। এক ক্যান বিয়ার এনে সামনে ধরে ক্রিস। নিজে বসেছে অনেকগুলো বিয়ারের ক্যানের মাঝখানে। তারই প্রায় গলায় ঢেলে মস্ত এক ঢেকুর তুলে বলে- একই কুড়ে ঘরে, একই জায়গায় তুমি সারাজীবন কাটালে ক্রিস।
তার লতানো গোলাপ ছাওয়া বাড়িটাকে অনেকে কুড়েঘর বলে। -মধুভান্ড কুড়েঘর। এইতো আমার বাড়ি। পুরণো বাড়ির ছাদে সঘন ধারাপাতের পর কাজ বেড়ে যায়। সবই সে সম্পন্ন করে মনের আনন্দে। -এই বাড়িতেই আমি জন্মেছি, এখানে আমি বড় হয়েছি, এই বাড়ি আমার সুখের শেষ কথা জুড।
-রাবিশ। এক ধাপ নিচে বসেছে জুড। সকালের চার ক্যান বিয়ার। আপাতত আরো কয়েকটি সামনে। বলে সে ইয়াবড় এক ঢেকুর তুলে- পৃথিবী দেখতে ইচ্ছে করে না তোমার?
-পৃথিবী? বলে ক্রিস। সেতো প্রতিদিনই দেখি। প্রতিদিনের সূর্য, ঋতু বদল, লেক, ঝর্না, পর্বত, বৃক্ষ, এর চাইতে ভাল আর কোন পৃথিবী আছে?
-আছে রে বোকা আছে। আর একটা ক্যানের মুখ ফট করে খুলে যায়। বলে সে- চিঠির থলিতে প্রতিদিন কত সব দেশের চিঠি ভরে ঘোর তুমি দেখনি কত সব দেশের নাম? ইচ্ছে করে না তোমার আফ্রিকার রহস্য, আমেরিকার বিশালতা, ইউরোপের পরম প্রিয় প্রাচীনতা, অস্ট্রেলিয়ার ভূখন্ডটাকে ভাল করে জানা? স্পেনের বুলফাইট দেখেছো কখনো?
-বুল ফাইটের মধ্যে দেখার কি আছে? নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর ক্রিসের। এর চাইতে সহস্রগুণ আনন্দের কাজ তুর্ণী নদীতে ছিপ ফেলে হু হু হাওয়ার গান শোনা।
-ডেড বোরিং। নাক কুচকে জানায় জুড।
ক্রিস উত্তর করে না। ঋতু ভরা উৎসবের উপত্যকা, পুষ্প বৃক্ষ ছাওয়া উৎসবের উপত্যকা, নদীর গভীর স্রোত, জল ও পাতার শব্দ, এসব ফেলে কোথায় যেতে বলছে জুড। ওর এসব ভাললাগা নির্ববাদে মেনে নেয় মেরী। অন্য সকলে জুডের মত নাক কুচকে দু একসময় বলেছে বটে- কি বিশ্রি আর ক্লান্তিকর অভ্যাস তোমার ক্রিস। পাতার গান শোন? কেন টেলিভিশন রেডিও নেই।
একটু থেমে পাকস্থলিতে একটু নাড়াচাড়া করে, কিছু বিয়ার ভেতরে যেন ঠিকমত যেতে পারে সেই মত নড়াচড়া করে বলে জুড- কি যে ঘরকুনো আর স্বার্থপর তুমি ক্রিস। তোমার স্ত্রী, মেয়েরা ওদের কথাও তো তোমার ভাবা দরকার।
এই একটি শব্দ স্বার্থপর ক্রিসকে যেন আঘাত করে। অনেকটা বিদ্যূতের মত। উদার বিশ্বলোকের শেষ প্রতিনিধি এমন এক শব্দে নিজের উপর ক্ষুদ্ধ হয়। সেকি সত্যিই তাই? খানিক চুপচাপ দুজনেই।
-আহা ইউরোপের কত সব সুরম্য জায়গা, ইতালি, স্পেন, ভেনিস। বাড়িতে ফিরে একবার না হয় প্রশ্ন করো ওদের কি ইচ্ছা?
-টাকা কোথায় পাক জুড? একটা বড় দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে কথাগুলো উচ্চারণ করে ক্রিস।
-এত বছর চাকরি করছো। ওভারটাইমওতো কর। তবু টাকা নেই?
ক্রিস এবার চুপ। টাকা পয়সা নিয়ে আর একজনের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে তার কোন মানে নেই। হলিডের জন্য তার সঞ্চয়ের বইতে বড় কোন অংক জমা হয়ে নেই। যা নিয়ে সে আটলান্টিক পাড়ি দিতে পারে বা ভেনিসের গণ্ডোলা বিহার করতে পারে।
আবার কতক্ষণ ক্লান্তিবিহীন ভাবে আমেরিকা, ক্রিস্টোফার কলম্বাসের বিশাল দেশের গল্প করে জুড। আজ সারাদিনের চেষ্টায় এক গাঙচিল ওর বাড়ির দেয়ালে অমর হয়েছে। সারা ঘরে এর চাইতে ভাল এবং শোভন জিনিষ আর কি হতে পারে? গাঙচিল পাখা মেলে আর কখনো সমুদ্র খুঁজবে না। অমর গাঙচিল ওর ট্যাক্সিডার্মি কারিগরিতে সহস্র বছর ওর ঘরের দেয়ালে নিঃশব্দে পড়ে রইবে। হরিণের শিং ঝোলানোর মত দুই পাখিকে ঘরের দেয়ালে বন্দি করেছে। এমন সখ মানায় ওকে। মাঝে মাঝে জেসির পানে যে ভাবে তাকায় জুড ভাবখানা এই হতভাগাও আমার হাতে পড়লে অমর হবে। এই বাড়িতে দেবী প্রতিষ্ঠা করবার মত জেসি প্রতিষ্ঠা করতে পারে ও। এমন এক সন্দেহে ক্রিস অবশ্য দ্বিতীয় দিনেই জুডকে সাবধান করেছে- ভুলেও ওর দিকে হাত বাড়াবে না তুমি। জেসি বিহীন হানিপটকটেজ আমরা ভাবতে পারি না।
ক্রিসকে পৃথিবী ভ্রমণে লুদ্ধ করতে করতে বুঝতে পারে বাড়িতে প্রবেশ করছে টিসা। দ্বিতীয় স্বামীর আত্মহত্যার পর যে থাকতো মুখ লুকিয়ে বলশালী জুড দ্য টেরিবল তাকে অভয়বানীতে বলিষ্ঠ বাহুবন্ধেনে জীবনের দিকে মুখ ফেরাতে সাহায্য করেছে। “যে জীবন দোয়েলের ফড়িঙএর, যে জীবন জুড দ্য টেরিবলের সেখানে সহস্র টিসাকে হাসিয়ে কাঁদিয়ে দেখিয়ে এবং দরকার হলে ফ্লোরবোর্ডের নিচে গুম করে জুড আবার ব্যাক টু নরমাল। আপাতত টিসাতে মগ্ন। ট্যাক্সিডার্মি হয়ে গেলে থাকে টিসা। বেশ মজার জীবন আপাতত।
-কেমন আছো আজ ক্রিস?
টিসার প্রশ্নে উঠে বসে ক্রিস। -আমি ভাল। তুমি কেমন?
-আমি? দেখতেই পাচ্ছো।
টিসার নতুন গোলাপি ফ্রকে উড়ন্ত ঋতুর রং। জুডের শরীর ঘেসে বসে এক ক্যান বিয়ারে লাল ঠোঁট ডোবায়। হ্যাঁ ক্রিস ঠিকই বুঝতে পারছে টিসার হাস্য লাস্য গ্লামার ও বিভাব থেকে। আবার জেগে উঠেছে সে সমস্ত পিপাসা নিয়ে। বিভাব না সেই আফ্রোডিজিয়াক যাকে অনেকে প্রেমের গুণ হিসাবে বর্ননা করেন। যার কথা ভুলে গিয়েছিল টিসা। ক্রিস এবার উঠে পড়ে। অন্যের প্রেম দর্শন করবার মত পর্নোগ্রাফিক মনোভাব নয় তার। শুভরাত জানায়। কিম্বা বলা যায় শুভ সন্ধ্যা। যদিও এখনো অটামের সারে পাঁচটা।
নিজ বাড়ির মচমচে কার্পেটের পথ পার হয়। রবিবারে এদের পেছনে লাগতে হবে এমনি কোন ভাবনা মাথায়। সেই মচে মচে পথে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে কোন রৌদ্র ঝলকিত দেশের কথা। যেখান থেকে ফিরে এসে খোলা হাত মেলে দিয়ে সকলে সুর্যের গল্প করে। সুর্যস্নানে পৃথিবীর সকল হিম জীবানু আত্মাহুতি দেয়। ব্রোঞ্চ শরীরে নতুন দেশের কথা বলতে পারে হলিডে ফেরত মানুষ। যারা আসে মেরীর কাছে। বেড়াল ওপারে দাঁড়িয়ে গল্প করে। এমন সুর্য ঝলকিত সমুদ্রপোত মেরীর চিন্তায় রয়ে গেছে। গতবার কেসিকের হলিডেতে মেরী এমন এক দেশের কথা বলছিল। গল্পটা মেয়োর্কার।
ওফেলি ক্যামেলির সঙ্গে ব্যাকগামন খেলায় মগ্ন মেরী। সন্ধ্যার খাবার তৈরী হয়ে গেছে। ওভেনে বা মাইক্রোওয়েভে একটু গরম করা। এর ফাঁকে ক্যামেলি ও ওফির সঙ্গে কিছু সময় কাটানো। আর ব্যাকগামন মেরীর পছন্দ। ক্রিস এসে বসে ওদের ঘরে। আলো জ্বালিয়ে এখন আর বই নয়। পড়তে পড়তে বই মুড়ে কি সব ভাবনায় নিমগ্ন সময় নয়।
-জয়েন করবে নাকি? প্রশ্ন করে মেরী।
ক্যামেলিও একই প্রশ্ন করে। -আপাতত নয়। ওফির কাডলি ভাল্লুক সরিয়ে ওর বিছানায় বসে। মস্ত ভাল্লুকের গলা ধরে ঘুমোয় ওফি। সব মেয়েদেরই এমন এক বিশ্রি অভ্যাস থাকে। যেমন মেরীর। ক্রিস মৃদু হাসে। আর চুপচাপ বসে থাকতে থাকতে আত্মভাষনের ভঙ্গিতে জানায় ক্রিস Ñ আচ্ছা মেরী এবার কোন গরম দেশে-। কথা শেষ হয়না। কি এক ঘোরতর খেলা সংক্রান্ত ঝগড়া শুরু হলো। ক্যামেলি ও ওফির চিৎকারে ক্রিসের ভাবনা হারায়। এবার ওকে আম্পায়ার হতে হবে।

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর সেই পরিচিত পরিবেশে সেই একই প্রশ্নে ফিরে যায ক্রিস। স্বার্থপর শব্দটি তাকে বিপন্ন করেছে। মেরী সেই ঢাউস জাম্পারটা শেষ করেছে। চৌকো চৌকো প্যার্টানে আনটি রুথের জন্য শাল বুনছে। মেরী ক্রিসমাসে এই সবই প্রেজেন্ট করে আত্মীয় স্বজনদের।
-মেরী। ক্রিসের ডাকে মেরী চোখ তুলে তাকায়।
ফায়ার প্লেস থেকে চোখ সরিয়ে মেরীকে নিরীক্ষণ করছে ক্রিস।
-কিছু বলছো?
-তোমার খুব ইচ্ছে না কোন এক সূর্যের উষ্ণতায় এবারের হলিডে পর্ব শেষ করতে। যে হলিডে শেষ করে বেড়ার ওপারের বিভিন্ন বান্ধবীদের তুমি তোমার ব্রোঞ্চ বাদামি হাত দেখাতে পার। এবং ইচ্ছে করলে যে দেশ থেকে বোতল বোতল সুর্য় রশ্নি ভরে বাড়িতে ফিরে আসতে পার।
মেরী এমন কথায় হাসে প্রাণ খুলে। বলে- ইচ্ছে করেই তো। সত্যি কথা বলতে ও ভালবাসে ক্রিসের সঙ্গে। যদিও কখনো আপাত মিথ্যেতে স্বস্তি দিতে পছন্দ তার।
খুব কাছে বসে আছে মেরী। আঙুর গোছার মত থোকা থোকা চুল ঘিরে রাখে কপালের অর্দ্ধেক। সেই চুল সরিয়ে একটু মিষ্টি চুমু টুপ করে ঝরে পড়ে মেরীর কপালের উপর- প্রথম শেফালির মত। বলে- স্পেন না পর্তুগাল?
-পর্তুগাল পরের বছর। স্পেন এইবার। যাবে নাকি তুমি?
এবার শব্দহীন ক্রিস। মেরীকে অর্থনৈতিক অভয় প্রদানের মত সাহসী হতে পারে না। শুধু বলে- হ্যাঁ।

ও বাড়িতে হুল্লোর শোরগোল। কি এক গাড়ি সংগ্রহ করেছে জুড। সেই গাড়িতে উঁচু গলায় হেসে ওঠা জুড আর টিসাকে দেখতে পায় মেরী। কি আশ্চর্য প্রাণ শক্তি রাখে ক্রিসের এই কাজিন। কি ভয়ংকর ছোঁয়াচে জীবন তৃষ্ণা। মেরীকে শুধু নয় ক্রিসকেও সংক্রামিত করেছে সেই বিপুল তৃষ্ণা। এই মুহূর্তে ক্রিসের সঙ্গে তুলনা করে ফেলে পাঁচ ফুট নাথিং মেরী জুড নামের ট্যাক্সিডার্মি ও নারী বিশারদ এক দৈত্যকে। মেরী বিষম খায়।