টম বসে আছে ওর ঘরে। কি সব লেখালেখি চলছে তার। কয়েকটি অর্ডার এসে পৌঁছেছে টেলিফোনে। দুটি বিবাহ বার্ষিকীর ও একটি জন্মদিনের। সবগুলোই তিন টিয়ারার বড় কেক। কাগজে কেকের নকশা করছিল টম। সামনে ইনভয়েস লিখবার শক্ত মলাটের খাতা। ওখানে আয় ব্যয় হিসাব পত্র সব লিখে রাখে বুক কিপার কাম ডগস বডি বা সবকাজের কাজি লুইসা নামের পনিটেলের সেই মেয়েটা। যে সপ্তাহে দুইদিন কাজ করে এবং আর তিনদিন অন্য কোথায় কাজ করে। রিভলভিং চেযার ঘোরায়। দরজায় টোকা শুনেছে। “কাম ইন” বলে সে টোকার অবয়বের প্রতীক্ষা। মেরীকে দেখতেই চেযার ঘোরানো। মেরীর টোকা বুঝতে পারে টম।
গোলাপি নকশায় বিনুনী বাঁধা মেরী কিশোরীর মত প্রবেশ করছে ঘরে। প্রজাপতির একটি ক্লিপ চুলের বাঁ পাশে। ক্যামেলিয়ার পরিত্যক্ত ক্লিপ। অলমোন্ড শেপের মুখে দুটো গভীর নীল চোখ বসানো। কাজলের রেখা সেই চোখে গভীরতা এনেছে। গলায় সোনালি মালা। লকেটটি একটি সি। এম নয়। মেরী টোল ফেলে হেসে জানায়- ডাকছিলে টম?
-হ্যাঁ বস একটুখানি। অর্ডারের চিঠি হাতে তুলে জানায়। বলে- জরুরি অর্ডার এসছে। আজকে কি একটু বেশি কাজ করতে পারবে?
মেরীর ভাবনা আক্রান্ত মুখের দিকে চেয়ে টম বলে- কাজের পর পৌঁছে দেব তোমাকে।
এই কর্মস্থল থেকে নিজের বাড়ি পৌঁছাতে জনতার যানবাহনে ঝামেলা অনেক। সোজাসুজি কোন বাস ওর বাড়ি পর্যন্ত যায় না। প্রতিদিন তাই সময় করে ক্রিস এসে ওকে তুলে নিয়ে পৌঁছে দেয় হানিপট কটেজে। আজো সে ঠিক সময় আসবে। মেরী একটু ভাবে। বলে- পারবো দু ঘন্টা বেশি থাকতে। ধন্যবাদ বিনিময় এরপর। মেরীর নকশা ও মিক্সিং এ কেকের রূপ কি ভাবে বদলে যায় সেটা টম জানে। কার সাধ্য আছে মেরীর নিপুনতায় খরিদ্দারের মন তোষন করে। মেরী কেক বানায় না কেক সৃষ্টি করে। মেরীর শিল্পকলা তার সুজনশীল ক্ষমতা ও সুকুমারত্বে যা করে তাই বোধহয় ওর ভাবাবেগের এক গভীর আউটলেট। এটা ওর প্রয়োজন নেই। তবু সুজনশীলতার কাজই এই। বোতলের জিন এই হলো সুজনশীলতার আরেক নাম। তাজমহল সম্রাট সাজহানের এক বিপুল ভাব প্রবণতা ছাড়া আর কি? মেরীর কেক তাজমহলের মতই। সে ক্রিসের সহধর্মনী। ভাবপ্রণতায় ক্রিসের যোগ্য সহযাত্রী। তবে ওর সজনশীলতা রন্ধন, সূচীকর্ম, বাগান, ড্রেসমেকিং, হেয়ার ড্রেসিং এ সীমাবদ্ধ। মেরী নেই বা আর কাজে আসবে না এ ভাবনা ব্যথিত করে টমকে। ব্যবসাগত কারণেই ধরে নেওয়া যাক। এর বেশি কিছু নয়।

ক্রিসের গাড়ি এসে ফিরে গেছে। ওফেলিয়া ও ক্যামেলিয়ার জন্য কি কি করতে হবে এমন একটা নির্দেশ মনে রেখে ক্রিস চলে গেছে। মেরীর আর সব নির্দেশ থলেতে ভরে, ক্রিস গাড়ি ছুটিয়ে ফিরে গেছে নিজের কাজের জগতে। যখন বাড়িতে ফিরবে মস্ত এক স্যান্ডউইচ বানাবে নিজের জন্য। লেটুস আর টুনা মাছের ঘন স্বাদে সে সেটা খাবে এক মগ কফির সঙ্গে।
মেরী আইসিং সুগারে ফুল পাতার কাজ প্রায় শেষ করে ফেলেছে। অপরূপ একটি কেক। ঘরে প্রবেশ করে টম। নিমগ্ন মেরীকে সচকিত করে বলে- আর কতক্ষণ?
-এই তো দশ মিনিট।
-আসছি তাহলে দশ মিনিট পরে। সাতদিনে একজন, মেরীর পাঁচ অর্দ্ধেক দিন, এবং ইনভয়েসের লুইসা কাজ করে সপ্তাহে দুই দিন। বাকি কাজ নিজে সারবার মত অপার শক্তি রাখে টম। সেই অর্ডার সাপ্লাইর, কেয়ারটেকার, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার। কেক টেবিলে সাজিয়ে হাত মুখ ধয়ে গা থেকে এ্যাপ্রোণ খোলে। ওর ফুল ফুল কোট পরে ফেলে। ঠোঁটের টুকটকি লিপস্টিক লেটুস স্যানউচের সঙ্গে মিশে গেছে। অতএব ব্যাগ খুলে একটুখানি লিপস্টিক মাখে। চিরুনিতে চুল আঁচড়ায়। এবং আয়নায় এক সরল মুখশ্রীকে একটুখানি হাসি উপহার করে। দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করেছে টম। চোখের সোনালী ফ্রেমের চশমায় টমকে বেশ বুদ্ধিমান দেখায়। সেই কবে পড়েছিল একমাস ধরে “ওয়ার এ্যান্ড পিস”। পিয়ের বেজুখভ কি এমন ছিল। দু একবার ভেবেছে মেরী।
-ধন্যবাদ মেরী। কাজটি শেষ করবার জন্য। আর্জেন্ট অর্ডার। ওরা দেরী করতে রাজি নয়।
এ ক্রিসের চিঠি বিলির গাড়ি নয়। সাদা রং সুর্দশন গাড়ি। প্রায় নতুন কিনছে টম। মেরী সামনের সিটে বসে। টমের পাশের সিট। ওর ব্যবসা কেবল কেক বিক্রি নয়। আরো কি সব কাজ কারবার আছে ওর।
খালো সাঁকো চেনা পথ পার হয়ে দুধের মত সাদা গাড়িটা ছুটতে থাকে। যে পথ ভাঙ্গতে ক্রিস কখনো স্তব্ধ। কখনো শিশুর মত উচ্ছ্বল। কখনো মগ্ন। সেই পথেই এক চটুল সঙ্গীত মেরীর মন এখন অন্যমত। চৌত্রিশ বছর যেমন হয় চটুল সঙ্গীত আর বেবলগা স্পিড। সুর থেমে গেলে শিষে সেই সুর তোলে টম। চঞ্চল কণ্ঠে একসময় বলে- ক্রিস সৌভাগ্যবান।
সারা মুখে উচ্ছ্বল হাসির প্রপাত। টমকে শান্ত করে বলে- টম তুমি নিজেই জানো না তুমি কত ভাল।
-ভাল! এমন বিশেষনে এবার স্তব্ধ টম। তারপর ভাল মানুষের মুখ ভঙ্গিমায় বলে- থ্যাংক য়ু সুইটি।
মেরীর বাড়ির পথ অনন্তকালের নয়। সাঁকো, তুর্নী নদী, সফেদ সোনালী মাছেদের নাচ, পাখি ও পপলারের সারি, এই সব পার হয়ে গাড়ি পৌঁছায় হানিপট কটেজের সামনে। হেজ ঘেরা সবুজ মাঠে সবুজ বাড়ি। গাছ পালায় লুকিয়ে থাকার মত পুচ্ছবিলাসী টিয়ে পাখি। এক সিঁথি পথ বাড়ির দোড় গোড়ায় থেমেছে। মেরী কি মনে মনে ভাবছে পথটা এত সংক্ষিপ্ত কেন? চটুল সঙ্গীতে দু পাখা মেলে শুভ্র গাড়ি সারা পথ উড়ছিল। আর একটু ধীরে উড়তে পারতো। পায়ে পায়ে বিকাল এসে থেমেছে হেজ ঘেরা মাঠের বাড়িতে। মুখ ঘুরিয়ে বৈভবী হাসিতে টমকে পুরস্কৃত করে বলে- দেখা হবে। সি ইউ।
মেরীর গালে টুক করে একটা ছোট চুমুর ছাপ রেখে বলে- হতেই হবে।
টমের গাড়ি এবার উড়ছে। এক কাজের জগত থেকে আর এক কাজের জগতে।