বাড়িতে একা ফিরে নিজের জন্য এক কাপ গরম কফি বানায় ক্রিস। মেয়েদের ঘরে উঁকি দেয়। মেঝেতে গতরাতের ব্যাকগ্যামর। বিছানায় ছড়ানো কাপড়। টেবিলে কি সব খাতা পত্র অগোছালো। সেই অগোছালো কাগজের ভেতর ওর আঁকা একটা ছবি। পপলারের সার। তার ভেতরে লেকের সুর্যকে ধরে রাখবার প্রয়াস। একটু হলুদ সূর্য লেকের ভেতরে ম্লান হাসছে। ঠিক পছন্দ হয়নি বলে ছবিটা ফেলে দিয়েছে। ও যেমন পারে না রংধনুকে মনের মত করে আঁকতে, তেমনি কঠিন মনে হয়েছে লেকের ভেতরের সূর্যটাকে। প্রাণ বা আত্মা সহ আঁকা যে কি ভীষন কঠিন ও তা জানে। আর ভঙ্গুর কাচের মত ভঙ্গুর অনুভব, এসবও ফোটানো যায় না তুলিতে। তবু চেষ্টা করে।
ক্রিস্টাল কাচে বিচ্ছুরিত আলো। ওফেলির হেডবোর্ডের পাশে টিং টং শব্দে ক্রিস্টাল আলো আর এক তোড়া ফুল বড় অপরূপ হয়ে আছে। ছেলেমানুষের মত সেই প্রিজমকে কয়েকবার বাজায় ক্রিস। জানালার উপরের পাল্লাটা খুলতেই প্রিজমের মাতোয়ালি টুং টাং শিশুর মত ক্রিসকে খুশী করে। জানালার ওপারে রৌদ্রের এভনলী হাসছে ভাসছে। তিনদিন বৃষ্টি গেছে হ্রদের দেশে। পাশের বাড়িতে শব্দ নেই আজ। গান আর চিৎকার দু একজন বন্ধুবান্ধবের সমবেত হাসি নেই। জুড আর টিসা কোথায় যেন গেছে। ভাবছে ও স্পেন থেকে ফিরে এসে মেরীর দল কি গল্প করবে সূর্যস্নাত এক দেশের? সাতদিন একটা ভাল হোটেলে থাকা, প্লেন ভাড়া, ঘোরাঘুরি, দেখা, কেনাকাটা অনেকগুলো পাউন্ডের দরকার। পোস্টম্যান ক্রিস সেই অর্থের চিন্তায় আপাতত কাতর।
এ মাসেও আনটি ডরেথিকে-। যাক গে সেসব।
মস্ত এক স্যান্ডউইচ আর এক মগ কালো কফি শেষ করে ক্রিস। তার অনেক বদান্যতার কথা মেরী জানে না।

জেসি নামের বেড়ালটা চুপচাপ শুয়ে ওর নরম বিছানায়। ওকে কিছু “গো ক্যাট” পরিবেশন করে ক্রিস। বলে- যাবি নাকিরে আমার সঙ্গে?
আপাতত জেসির যাবার ইচ্ছা নেই। ওর শরীরে বেশ একটু হাত বুলিয়ে নিজের চিঠি বিলির গাড়িতে উঠে বসে ক্রিস।
বর্ষায় এক, বসন্তে এক, শীতে এক, গ্রীষ্ণে এক। দিন ও কবিতার রং ছেলেবেলার নার্সারি রাইমের মত মনে আঁকা। বর্ষায় ছাতলা পরা সেই শীলাখন্ডে, ক্রিস যেখানে মৌনভাবনায় নিজেকে হারায়। গ্রীষ্ণে সেই পাথর শুভ্রতর। আর শীতে নির্লিপ্ত কঠিন। কি ভেবে ক্রিস সেই প্রিয় জায়গাটিতে এসে বসে। ক্রিসের হেরা পাহাড়ের গুহায়। এইখানে এসে ক্রিস জানে প্রকৃতির নির্যাস। স্পর্শ করে হাওয়া। ডুবে যায় নিস্তব্ধতার গভীরতায়। বৃষ্টির মধ্যে পথ কেটে চলার মত গহন নির্য়াসে পথ চলে। ফার্নের সবুজ পাতায় যে ছোট পাখিটা তির তির পাখার কাঁপন তুলে উড়ে বসে সেদিকে তাকায় ক্রিস। বলে সে- আসলে অওয়ার ফাদার দাউ আর্ট ইন হেভেন নয়। আওয়ার ফাদার দাউ আর্ট ইন এভনলী। ইন ট্রি, ইন সান, রেন এ্যান্ড এভরি মিস্ট্রি। আজো মনে মনে কবিতা রচনার চেষ্টা। চার্চ অব ইংল্যান্ডে যা কখনোই সে অনুভব করে না, নিথর তন্ময় অবগাহনে, সারা মন এখন কেমন বিস্ময়কর ভাবে ছল ছল। ক্রন্দন যদি অধিকার করে ও অবাক হবে না। কাকে সে বলবে ভাগ করে নিতে হ্রদয়ের এই ¯ষ্ফটিক স্বচ্ছ আবেগ। কাকে বলবে- এসো এসো চেয়ে দেখ আইস এজ হতে যে হ্রদ প্রবাহিত আজো তা তেমনি আছে। কেবল মানুষের পৃথিবীতে কত সব গোলমাল। হ্রদের তেমনি তো থাকবার কথা। যেমন তেমনি আছে এই সব পর্বত। বৃক্ষাবলী। কেবল তুমি আমি কেমন বদলে যাই দেখেছো? বিস্ময়কর ভাবে বদল হয় আমাদের। বদলাতে বদলাতে একদিন নিজেকেই চেনা যায় না। দুহাত বাড়িয়ে ক্রিস অনুভব করে নিথরতম সঙ্গ। ওর চারপাশে আর কেউ নেই।

ছিন্ন ভাবনা। এক দল ছেলে স্কুল থেকে এসেছে ফসিল খুঁজেেত। ওদের কলরবে ক্রিস এবার উঠে দাঁড়ায়। প্রকৃতির যুবরাজ পরিত্যাগ করে তার শুভ্র শীলাখন্ডের আসন।

ঝটপট ক্রিস উঠে বসে চিঠি বিলি করবার গাড়িতে। এই সব অনুভবের সঙ্গে আগে সে যুদ্ধ করতো এখন আত্মসমর্পন। যেমন সে সারেন্ডার শব্দে মেনে নেয় মেরীর সব দাবী। কেবল অনুভূতি প্রজাপতির মত উড়ে উড়ে ছুঁয়ে যায় ওকে।

চিঠি গোছানোর খোপে খোপে চিঠি রাখে ক্রিস। এই সব খোপ বাক্স মুখস্ত তার। একটি খোপে পার্শ্বেল রাখতে গিয়ে পড়ে যায় মাটিতে। মাটি থেকে সযতনে পার্শ্বেলটাকে উঠিয়ে নেয়। বাদামি ভারী খামে একটা বই পোস্ট করেছে কেউ। সেলোটেপ খুলে গেছে। এখন খামটা খোলা। হয়তো বইটার ওজনের জন্য। পার্ম্বেলটি নেড়ে চেড়ে দেখে। কি ভেবে বইটি বার করে। সাম্প্রতিক লেখকের আধুনিক উপন্যাস। উপন্যাস মেরীর প্রিয়। সে পাঠ করে ভ্রমণ কাহিনী, জীবনী যেগুলো গল্প উপন্যাসের চেয়ে অনেক বেশি টানে তাকে। বইটির পাতা ওল্টায় এবং চমকায়। গ্রন্থটির কয়েক পাতা পর পর একটি পঞ্চাশ টাকার নোট। অভাবনীয় কান্ড। এমন করে টাকা পাঠায় কেউ? যে টাকার অংক গতরাতে তার মাথায় খেলছিল সেই অংক তার সামনে। সবগুলো পঞ্চাশ পাউন্ড গুনে জেনেছে দুই হাজার পাউন্ড। টাকা এবং গ্রন্থ হাতে ক্রিস বেশ কিছু সময় হতভম্ব। অন্যান্য চিঠি গুলোর সর্টিং করে। এমন এক গল্প ক্রিসের মা ছোট বেলায় করতো তাকে- ঈশ্বর জন্মের আগে প্রতিটি মানুষের জীবনের একটা ব্লুপ্রিন্ট বা নীল নকশা বানিয়ে তার অফিসঘরের ফাইলিং ক্যাবিনেট রেখে দেয়। মানুষ পৃথিবীতে পথ ভাঙ্গে সেই নকশামত। ক্রিস কি করে পারবে সে নীল নকশার চক্রান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে। ক্রিসের ঈশ্বর গ্রীক নন। ক্রিসের ঈশ্বর চার্চের সান অব গড নন। গ্রহ নক্ষত্রের এক বিশেষ অবস্থানে তার নাড়ি বা আমবলিকালকর্ড কেটে নার্স তাকে প্রথম বারের মত তার নিজের রাস্তায় তুলে দিয়েছে। তারপর যাত্রা একার। কাজের ফাঁকে বইটা আবার হাতে তুলে নিয়ে এসবই ভাবছে ক্রিস।

বাড়িতে প্রবেশ করবার আগে সন্ধ্যাতারা ফোটা আকাশের নিচে তুর্নী নদীর কাছে সেই ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে কি ভাবে ক্রিস। ধ্যান মগ্ন নয়, গভীর বিশেষ চিন্তায় অস্থির। এরপর ফট করে বইটা খুলে রানীর মুখ টুখ শুদ্ধো চল্লিশটি পঞ্চাশ পউন্ডের ঝকঝকে নোট ব্রিজের কার্ডের মত চোখের সামনে মেলে ধরে। হাতে এক দূর্লভ জাপানি পাখা। একটা খামে ভরে সেই ঝক ঝকে বিশটি ট্রাম্পকার্ড। তারপর ছুঁড়ে ফেলে সেই গ্রন্থ নদীর জলে। যার স্রোত ক্রমাগত অথৈ হয়ে ওঠে কোন এক ঋতু পরিবর্তনের সময়। সাঁকো থেকে মুখ বাড়ায় মাছ। একটা মাছ মুখ তুলে ওকে দেখে। তারপর হারায় গভীর স্রোতে। “রিমেনস অব দ্য ডে” ঘুরতে ঘুরতে দুলতে দুলতে হয়তো চলে যাবে সমুদ্রে।