‘শেষ মারবেলা’ ব্রিটেনের পটভূমিকায় লেখা উপন্যাস। ক্রিস পরিবারের গল্প। দীর্ঘদিন ব্রিটেনে থাকেন। তাই এমন একটি উপন্যাস লিখেছেন। ‘শেষ মারবেলা’ নিয়ে উইলিয়াম র‌্যাডিচে বলেছিলেন- ‘একটি অসাধারণ ও অনবদ্য উপন্যাস। বইটির এখনো অনুবাদ হয়নি কেন?’

আমার কথা
কাজুও ইশিগুরোর “দি রিমেনস অব দ্য ডে” পাঠ করতে গিয়ে এক জায়গায় আমাদের দুজনার চিন্তার সমান্তরাল খুঁজে পেয়েছিলাম। বৃটেনকে গ্রেট ব্রিটেন বলা যেতে পারে একটি মাত্র কারণে সে তার অর্নিবচনীয় প্রকৃতি ল্যান্ডস্কেপের দিগন্ত প্রসারিত মানচিত্র সজ্জা। কখনো কোন ভাবনার মিলে চমকে উঠতে হয়। ওর সঙ্গে আমার চিন্তার মিল চমকে দিয়েছিল। বিভিন্ন্ ভৌগলিকতার দেয়াল সত্ত্বেও আমরা একই গ্রহালোকের অধিবাসী। তাই এমন করে মিলে যায় ভাবনা। যদি কেউ মিলের খোঁজ করে।
আমি প্রেমে ডুবে যাই আকণ্ঠ হ্রদের দেশের পর্বতে, ঝর্নায়, অরণ্যে, বনান্তরে। নিসর্গ প্রেম ছেয়ে ফেলে আমাকে। নিঃশব্দের তর্জনী সংকেত আমাকে অর্ন্তমুখী করে তোলে। ভাবি তখন আমরা যা বলি যা বুঝি তাই কি সবকিছু? ফ্রান্সের এক প্রসিদ্ধ ঔপন্যাসিক আকাশের দিকে তর্জনী তুলে, নিঃশব্দের উর্দ্ধলোকে তাকিয়ে বলেন Ñ লুক হি নেভার স্পিকস। হ্রদের দেশে আমি হয়ে যাই প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম। হয়ে উঠি পরিপূর্ন। ঐশ্বর্য অনুসন্ধানে নিজের দিকে চাইবার মত ঘটনাও ঘটে। যখন ঐশ্বর্যময়ী নিসর্গ অকাতরে নিজেকে বিলায়।
এই গ্রন্থের নায়ক আমার সৃষ্ট ক্রাইস্ট ক্রিস্টোফার নিথর প্রকৃতির রহস্যময় গ্রন্থের অলিখিত বানী পাঠ করতে চায়, বার বার। পারে না। না পারার যন্ত্রনায় ফিরে আসে হ্রদে, অরন্যে, নিস্তব্ধতায়। বুঁদ হয়ে যায় ভাবনায়। চার্চ অব ইংরল্যান্ডের সারমন সভা তাকে বদলায় না, বদলায় কেবল নিসর্গের আলোছায়া ও নির্জনতা। প্রকৃতির ঔদাসিন্যে, ঔদার্যে কি এক অনুভূতি ও উপলব্ধির কস্তুরি মৃগ, কিংবা খ্যাপার পরশ পাথর অনুসন্ধান তাকে সতত চঞ্চল এবং অর্ন্তমুখী করে। হ্রদের দেশে ছুটি কাটাতে গিয়ে ডাইরির পাতায় এমন একজন মানুষ এবং তার আনন্দ বেদনার খসরা একেছিলাম। কি হয় কোন এক সংবেদনশীল মন যদি এখানে জন্ম গ্রহণ করে, এখানে বড় হয়। সারাদিন ঘুরে ফিরে পর্বতে হ্রদে মনে মনে ভাবতাম এমনি একজনকে। এই পৃথিবীর অপার রহস্যলোকে যার কোন ক্লান্তি নেই।
আমার ক্রিস তেমনি এক চরিত্র হয়তো বা। অপটিয়সী দার্শনিক চিন্তার আন্তরিক প্রয়াস। মেরী, ক্যামেলি, ওফি, জেসি ওরা সব ক্রিস পরিবারের সদস্য। ক্রিসের চারপাশে ঘুরে ফিরে ওরই আলোছায়ায় ওদের দিন রাত অতিবাহন।
ইনোসেন্স বা নির্দোষিতা এক মনোগ্রাহী প্রাচীন শব্দ। প্রাচীন বলাই ভাল। এখন এই শব্দের তেমন আর কদর কোথায়? নাগরিকতার দায়িত্বভার, গ্রামীণ জটিলতা এবং আরো নানা কারণে সে শব্দকে আর কোথায় তেমন করে খুঁজে পাওয়া যায় না। এর মধ্যে আছে সিনেমা, টেলিভিশন, কমপিউটার নামের হাজারো যন্ত্রপাতি। স্বচ্ছ জলধারা যদিও প্রথমদিন থেকে আজ পর্যন্ত বয়ে চলেছে পর্বতে, প্রপাতে, ঝর্নায়, নদীতে। আমাদের আদি মাতা তার এই নির্দোষ বোধ হারিয়েছিল গন্ধম ফলের কারণে।
শেষ মারবেলার ক্রিস তেমনি এক বেদনাবোধে নিজের মধ্যে ডুবে যায়। এবং সেখান থেকে কখনোই নিজেকে উজ্জীবিত করতে পারে না। তারপর? পাঠক বইটি পাঠ করে জেনে নেবেন তারপর। যদি ভাল লাগে হ্রদের দেশের গল্প আমার শ্রম সকল পারিশ্রমিকে ধন্য হবে। পর্বতে, ঝর্নায় ঘুরে যা ভেবেছি সেই ভাবনার যোগসূত্র হবে পাঠকের সঙ্গে। লেখার আর এক নামই তো তাই। ভাবনার সংযোজন।

১।
গ্রামমেয়ার আর আম্বলসাইডের মাঝখানে যে অপরূপ পৃথিবী অনায়াসে গ্রীনডেল বা রোজডেল নামে অভিষিক্ত হতে পারতো, এভনলী নামের মিষ্টি শব্দে পঞ্চাশ বাড়ি লোকের মুখে মুখে সর্বক্ষণ এমন এক আশ্বাস প্রদান করে -পৃথিবীই স্বর্গ, পৃথিবীই সকল সুখ ও শান্তির অবাক চাবিকাঠি।
ক্রিসেনিংএ যে নাম ক্রাইস্ট ক্রিস্টোফার, ভারী এমন এক দাবীতে সে নাম এখন ক্রিস। মেরী কখনো সখনো দুষ্ট কণ্ঠে- “ক্রাইস্ট অব এভনলি” এমন এক নামে সস্বোধিত করে ওকে। আর প্রতুত্ত্বরে অপসৃয়মান মেরীকে ধরে ফেলে বলে ক্রিস “মেরী অব ম্যাগডালা।” চিঠি বিলি করবার লাল গাড়ি থামিয়ে যখন তখন কত সময় ক্রিস সেই আশ্চর্য পৃথিবীকে প্রাণ ভরে দেখে। যখন বসন্ত নামের চপলমতি স্থির হয়ে থামে প্রজাপতির ছোপ ছোপ ডানায়, ফুলে গাছের পাতায় ও ব্লসমে। ঘাসে নথের মত ডেইজি। থোলো থোলো লুপিন গোল চুরির মত সারা উপত্যকায়, আরো নানা বর্নাঢ্য ফুল অপরূপ প্রাণ সঞ্চারে জাগিয়ে তোলে শীতের মানুষদের। চোখ মেলে তখন কেবল চেয়ে দেখা। ইউ আর ইউকালিপটাস, পপলার আর বার্চ, ক্যকটাস ও কনিফারে চলে আলোর নাচন। বিবিধ ঐশ্বর্যময়ী বৃক্ষ বিভাবে ঋদ্ধ করে প্রকৃতি।
ক্রিস কখনো এদের তুলনা করে কবিতার সঙ্গে, কখনো জীবনের। হানিপট কটেজের দেয়ালে দেয়ালে, গেটে, সন্মুখ দরজায়, বাগানে, সহস্য বিবিধ গোলাপ, ক্রিসের কর্মনিপুনতায় দৃষ্টিকে করে পুরস্কৃত। সকলকেই করতে পারে। সৌন্দর্যে আমার প্রয়্জেন নেই এমন ব্যাক্য উচ্চারণ করে না স্বর্গচ্যুৎ মানব ও মানবী। হানিপট কটেজের খড়ের ছাদ বা “থ্যাচড রুফে” সে সকল গোলাপ রক্তাক্ত , গোলাপি, হলুদ, সাদা বর্নে অপরূপ তেলরং ছবির মত পৃথিবীর প্রপিতামহ ঈশ্বরকে স্যালুট ঢুকতে পারে। সেই ছাদ, বাড়ি ক্রিসের নিজের। বাবার নিকট থেকে উত্তারিধকার সূত্রে পাওয়া। আর সেই একটি মাত্র কারণে ছোট্ট কৌটোর মত বাড়ি নাম বদলে রোজভিলা বা রোজকটেজ হয়নি। ক্রিস পারেনি বাবার দেওয়া নামটা বদলে ফেলতে। হানিপট কটেজ অনেক গুলো শ্রেষ্ঠ বাড়ির একটি। কঠিন তীব্র শীতের হাওয়ায় যে সব গাছেরা কখনোই সবুজ সাজ খুলে অনাবৃত হয়ে ওঠে না, বৈভব বিলুপ্তিতে ধুসর, তেমন এক সার চিরসবুজ গাছ হানপিট কটেজকে ধরে রেখেছে ছবির ফ্রেমের মত। সুশ্রী, মিষ্টি, মধুূভান্ড।
মেরী নামের এক ছোট্ট সচল ও সজল মানুষ এ বাড়ির সর্বময় কর্ত্রী। ক্রিসের প্রেমে আত্মসমর্পন করেছে এক যুগের ও বেশি আগে। নদীর মত গভীর ভালবাসায় আপাতত বসবাস। মধুকৌটো বাড়িতে প্রবেশ করেছে পনেরো বছর আগে। ফেলে এসেছে নিজের অঞ্চল। আর এক সমৃদ্ধ উপত্যকা। চার্চ বাড়ির যাবতীয় নিয়ম রীতি পার হয়ে শুভ্র পোশাকে, চুলে কারনেশন গেঁথে এখন সে ক্রিসের বাড়ি ও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাতে হাত রেখে প্রবেশ করেছিল এ বাড়িতে। এখনো দুঃখে, ভাবনায়, বিষাদে, সন্তাপে, হাতে হাত রেখেইে সকল সমস্যার সমাধান।
চিঠি বিলি করতে গিয়েই ভাব মেরীর সঙ্গে। আমেরিকা থেকে উড়ে আসা নীল সমুদ্রের ছোপ আঁকা এক টুকরো নীলচে কার্ডে অভিভুত আল্পুত মেরীকে কখনোই মন থেকে নামাতে পারে নি ক্রিস। বাড়িতে ঠাঁই দিয়ে তবে রক্ষা। ফাইভ ফুট নাথিং এবং হালকা মেরী মিশে গেল হানিপট কটেজের গোলাপে, লুপিনে, ডালিয়া, ডেইজি ও ব্রডবিনস, ক্যাবেজ, মারো, রাডিশেষের অরণ্যে। ভাল মানুষ ক্রিস সময় পেলে মেরীকে বুকের কাছে ধরে প্রশ্ন করে- মেরী মেরী কোয়ায়েট কনট্রারি হাই ডাজ ইয়োর গার্ডেন গ্রো? মিষ্টি হেসে হানিসকলের বাতাস মেখে বলে মেরী- উইথ রোজেজ এ্যান্ড বুশেশ প্রিটি লাভ অল ইন এ রো।। তখন ক্রিস যা ভাবে তা এমন আমি আর মেরী আমরা আসলে মিলে মিশে একজন।
আর মেরী প্রিকলড ক্রজেডে মগ্ন, আত্মসমাহিত পুলোভার লেসে, এমব্রয়াডারি না হয় বাগান বিলাসে নির্জন উপত্যকায় নিঃসঙ্গ ক্রিস ভাবে এই অপার উদার বিশ্বলোকে তাকিয়ে- আসলে আমরা সকলেই একা। আমি একজন, মেরী একজন। এবং আমরা দুজন। এমনি এক বিপরিত ধর্মী বোধে ও অনুভূতিতে হাঁসের মত সময় ভাসে লেকের দেশ এভনলীতে। জেসি নামের খয়েরি সাদা বেড়াল গাড়ির পেছনে বসিয়ে চিঠি বিলি করে ক্রিস। গ্রামের এক ছোট্ট অফিস কাম দোকান, দোকান কাম ফাক্টরিতে কেক বিস্কুট বানায় মেরী দিনে তিন ঘন্টা। আর ক্রিস সেই কারণে না হলে বিনা কারণে জেসির সঙ্গে বেরিয়ে পড়ে নিজের কাজের জগতে।
ক্যামেলিয়া আর ওফেলিয়া স্কুলে যায়। এই অঞ্চলের মত সজীব, স্নিগ্ধ , চারুময়, আনন্দময়, উজ্জ্বল দুই কন্যা।

সকালের প্রাতরাশ রুটির সঙ্গে মধু, সিরিয়াল নামের গুড থিং, প্রোটিন ও রাফেজের যুগল মিলনে স্বাস্থ্যকর এমন খাবার খায় ওরা সকলে। চারজনার চার রকম সিরিয়াল। পাইন কাঠের ডাইনিং টেবিলে সেগুলো সাজানো এখন। চারটি পাইন কাঠের চেয়ার ওদের চারজনকে ধারণ করে পৌঁছে দেয় এক চমৎকার ভাললাগা সময়ে। সকালে একবার আর সন্ধ্যায় একবার। রোববারে অন্য নিয়ম, ব্যতিক্রম। রোববারের লাঞ্চে কখনো বাড়িতি চেয়ারের দরকার হয়ে পড়ে। মেরীর আনটি রুথ কিংবা ক্রিসের দুর সস্পর্কের গ্রান্ডমা থেলমা আসেন।
এখন মেয়েদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে মেরী- কি ব্যাপার সিরিয়াল খেলে না আজ? প্রশ্ন করে ওফেলিয়াকে। তার প্রিয় কোকোপপ ছোঁয় নি ও। এক্ষুনি লাল সাদা ফ্রকে যে স্কুলে যাবে এবং রইবে সারাদিন মেরীর দৃষ্টির অন্তরালে।
-ভাল লাগছে না সিরিয়াল খেতে। আমি ফুলআপ মা। “ফুল অব কান্ট্রি গুডনেসে” মন নেই তার। টিসুতে হানি মোছে।
-তোমার বাড়তি শরীর। এসবের প্রয়োজন অনেক ওফি। শেষ কর সিরিয়াল। মেরী বলে একটু রেগে।
ওফেলিয়া মাথা নেড়ে জানায়- মধূূতে অনেক কিছু থাকে তুমিই তো বলেছো মা। এখন আর সিরিয়াল নাই বা খেলাম।
টেবিলের একপাশে একটা ছোট রেডিওতে খাবার সাজাতে সাজাতে মেরী শুনছিল- ধ্রপদী সঙ্গীত। সঁপা, বাক বা বোটেফেন না হলে লন্ডন ফিল হারমনিক অর্কেস্ট্রা।
হানিপট কটেজের সকালের রূপেরে তুলনা কোথায়? মেরী তখন বৈভবী হয়ে বাজনা শুনতে শুনতে ছল ছল হয়। ওফেলি এবার রেডিওর চাবি ঘুরিয়ে বের করে আনে হালকা সব সঙ্গীত। খোঁজে রেগে আর পপ। নানা সব চটুল সঙ্গীত। মায়ের বোরিং বাজনা নয়। বলে মনে মনে। চটুল পাখির মত উড়ন্ত সুর। হালকা রসিকতার কথক নানা সব গল্পে এইসময় গান পরিবেশন করেন। সঙ্গীত খুঁজে ক্যামেলিয়া সিরিয়ালে চিনি ছড়ায়। গভীর মনোযোগে কাগজ পড়ছে ক্রিস। তার প্রাতরাশ শেষ। একসময় কাগজ থেকে মুখ তুলে বলে- ক্যামেলি ও ওফি তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেললে আমি তোমাদের স্কুলে নিয়ে যেতে পারি। এমন আশ্বাসবানীর পর চটপট খেয়ে ফেলতে সময় লাগবার কথা নয়। চিঠি বিলি করবার লাল গাড়িতে চেপে স্কুলে যেতে পছন্দ ওদের। স্কুলে যাবার পথে পলাস গ্রসারী নামের সেই চকলেটের দোকান থেকে চকলেট ও ফাজ কিনবে ওরা। ড্যাডি সঙ্গে থাকলে কাজটি সহজ হয়। স্কুল ব্যাগে সেসব ভরে ওরা পৌঁছে যাবে এক ভাললাগা ঝাউবন স্কুলে। মিষ্টি বিতরনে আনন্দিত করবে অন্যদের, আনন্দিত হবে নিজেরা।
মেরীর কফি ও রুটি শেষ হয়। শেষ হয়েছে ক্রিসের ব্রেকফাস্ট। এবার চিরুনি হাতে ঘোরাফেরা মায়ের কাছে। ওফি মাথার মাঝখানে ফিঙ্গের মত ফিতের ফুল, ক্যামেলির মিষ্টি দুটো বেনীর গোড়ায় কুঁড়ির মত ক্লিপ। রেশমী চুলের গোল গোল আঙ্গুরলতা মুগ্ধ করে ক্রিসকে। করে পুলকিত। – ওরা আমার। এমনি এক স্বগোতক্তির ভাষনে স্কুল লিভার ক্রিস অভিভুত এখন। এবং মেরীকে দুষ্টমির হাসিতে চঞ্চল করে জানায়- ইউ আর মাইন টু। তুমিও আমার। এইসব আুেগ, ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে মেরী প্রায়শই নির্বাক। যেমন সে নির্বাক সকালের ধ্রুপদী প্রপাতে। শ্রোতার নিবিষ্টতায় ক্রিসের হ্রদয়ের শব্দ শোনে। খুব খুশী খুশী মনে ভালবাসার ঘোরে কোমল করে বলতে পারে- দেখো এবার আংগোরা উলে বেড়ালের মত কি চমৎকার পুলোভার বানাবো তোমার আমি।
আর সেই বেড়ালের মত পুলোভার গায়ে চাপিয়ে ক্রিস ঘুরবে হ্রদ থেকে হ্রদে, পর্বত থেকে পর্বতে, বড় রাস্তা, ছোট রাস্তা। এ বাড়ি সে বাড়ি। দরজায় জানালায় উৎকণ্ঠিত প্রতিক্ষিত মুখ। আবার কোন বাড়ির দরজার লেটারবক্স টা এত চেনা ক্রিস জানে কতগুলো চিঠি একসঙ্গে সেই ফোঁকর গলিয়ে পার হতে পারে। যখন মুখ হেসে ওঠে ক্রিস হেসে বলে- নাও। তোমার চিঠি। আছে নানা সব মোড়ক আর পার্শ্বেল। রেকর্ডেড ডেলিভারি। উড়োন্ত পাখোন্ত কত সব কার্ড। সারা বছরে কত সব পরব। আর জন্মদিন তো প্রায় প্রতিদিন।
-আসি মেরী।
লতানো গোলাপ দরজায় দাঁড়িয়ে ওরা তিনজন একই সঙ্গে বাই জানাবে মেরীকে। “দ্য ভিলেজ কুকিজ” নামের দোকান কাম কেক কারখানায় মেরী পৌঁছাবে খানিক পরে। তার আগে গুছিয়ে রাখে সারা বাড়ি। বড় রাস্তার ছল ছল নদীর ওপারে একটুখানি পাথুরে ব্রীজ। মেরীকে সেই চেনা বিন্দু থেকে তুলে পৌঁছে দেবে কাজের জায়গায়। চিঠি বিলি করবার ফাঁকে। আবার ফিরিয়ে আনবে বারোটায়। তারো সারে তিনঘন্টা পরে ক্যামেলি আর ওফি ফিরবে ঘরে। লাল গাড়িতে আগে থেকে বসে আছে নির্বিবাদী জেসি। হাওয়া খেতে পছন্দ ওর। গলায় কালো সুতোর মেডেলে ওর নাম পরিচয় লেখা। এখনো হারায়নি জেসি। কখনো হারিয়ে গেলে ঠিকমত যেন বাড়ি ফিরতে পারে বা বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে পারে সদাশয় লোকজন তাই এ সতর্কতা।
-গুড মর্নিং। গুডি গুডি জেসি।
মিউ প্রতুত্ত্বরে জেসি উঠে বসে ওফেলিয়ার কোলে। সকলের আগে প্রপাতি পূর্ন প্রভাতে মেরী তার লাল থালিতে টিন কেটে হুইসকাস দিয়েছে। এখন সে লক্ষী। ঘুম ভাঙ্গা সকালে মেরীর পায়ে পায়ে ঘুরে সকলের আগেই সে পেয়ে যায় তার প্রিয় হুইসকাস। তারপর বাগানের আলো হাওয়ায় হাত পা ছড়িয়ে কতক্ষণ ঘোরাফেরা। ক্রিস তুলে নেয় গাড়িতে। গাড়ির পেছনে চুপচাপ জেসি। এ পথ সে পথ ভাঙ্গে ও সম্রাজ্ঞীর ভঙ্গিতে। এখন ওফোলিয়ার হাতের স্পর্শে পারিং শুরু হয়েছে। ক্যামেলি এবার হাত বাড়ায় জেসিকে ভালবাসা জানাতে। গাড়ি পথ ভাঙ্গে। ধীরে সুস্থে। সারে আটটার এভনলী খুশী মেয়ের মত আলোর ঘাগড়া ছড়িয়ে আপনমনে নেচে চলেছে। সাইকেলে স্কুলে যেতে যেতে দুটো পরিচিত মুখ ওদের হ্যালো বলে।
পরিচিত প্রাত্যহিক দৃশ্য। সাইকেল আরোহীর পরিচিত মুখ। হাওয়ায় লাল স্কার্ফ উড়িয়ে চলে যাওয়ার ছবি। এসবই ক্রিসের ভালভাগা দৃশ্য।
বোয়ামে থরে থরে সাজানো টফি ফাজ চকলেট।
-আমি ফাজ নেব। জানায় ওফেলিয়া।
-আর আমি টফি। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, সেনালি, সাদা চকচকে কাগজে মোড়ানো। চুপচাপ শুয়ে আছে বোয়ামে। বেছে বেছে নীল আর লাল কাগজের একগুচ্ছ টফি, মুঠোয় ভরে ক্যামেলিয়া। আর ফাজের মিষ্টিঘনগন্ধ থেকে সরে আসে এমন সাধ্য আছে কি ওফেলির? গালে ফেললেই কেমন কোমল অনুভূতিতে ও অনুভবের রসে সারা মুখ নরম ও ভালবাসার মত মনোরম।
-আমার এক কোর্য়াটার পাউন্ড ফাজ চাই। বলে ওফেলিয়া।
-কি হবে রে ওফি এতগুলো ফাজে? পার্সের পয়সা গুনতে গুনতে প্রশ্ন করে ক্রিস।
-আমার আর আমার চারজন বন্ধুর জন্য।
ক্যামেলিয়া আর ওফেলিয়ার মিষ্টি আবদার পূর্ন করে ক্রিস নিজের সাধ্য ও সঙ্গতিমত। আবার গাড়ি হাঁসের মত হ্রদের দেশে পথ ভাঙ্গে। জেগে উঠেছে সারা এভনলী। দলবদ্ধ, একক, যুগল মানুষ। চেনা মনে হলেই ওয়েভ করে ক্যামেলি ও ওফি। কারো কারো পিঠে ঝুলছে রঙ্গিন সব থলে। স্কুল ব্যাগ যার নাম। দ্যা পপলার নামের স্কুলের নীল বাড়ি। ছন্দায়িত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মাঠের মাঝখানে। এক কাকচোখ স্বচ্ছ হ্রদের পাশে এক আশ্চর্য নীল জাহাজের মত। আর সেই জাহাজের ক্যাপ্তেন হলেন সদাহাস্যময়ী প্রধান শিক্ষযিত্রী মিস ব্লাববার্ন। তবু ছেলেমেয়েরা তাকে বড় ভয় পায়। একেই বোধহয় বলে ব্যক্তিত্ব। সবুজ সাগর থেকে চোখ তুলে জানায়- গুডমর্নিং ক্রিস। গুড মনিং ক্যামেলিয়া আর ওফেলিয়া। গুড মর্নিং জেসি।
জেসিকে সিটে রাখতে রাখতে বলে ওরা- গুড মুনিং মিস এ্যানেট ব্লাকবার্ন।
তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন যতক্ষণ না শেষ শিশুটি স্কুলে আসে। শিশুদের তিনিই প্রথম সম্ভাষন করেন, সুস্বাগতম জানান। কে আগে গুডমর্নিং দেবে এ নিয়ে ভাবেন না। শিশুদের শিক্ষা শুরু হয়ে স্কুলের দোড়গোড়া থেকে। ওরা শিখে নেবে সামাজিক রীতিনীতির সবকিছু। পড়াশুনার ফাঁকে। ম্যানার্স, এ্যাটিকেট, কার্টিসি। যেগুলো জানা থাকলে এই সমাজে সহজে পথ ভাঙ্গা যায়। ক্রিস লাল গাড়ির দরজা খুলে মিস ব্লাকবার্নের হাতে তুলে দেয় এক গোছা চিঠি। এখানে আসবে বলে রাতেই সর্টিং করে রাখা হয়েছে। এরপর -বাই ডাডি। সি ইউ সুন। এমনি নানা কথা। মিশে যায় এরপর ওরা গুঞ্জরিত, মঞ্জরিত, পুষ্পিত, পল্লবিত, কল্লোলিত, উচ্ছ্বসিত, আনন্দিত এক রাশ প্রাণের মেলায়। দ্য পপলার লেকের দেশের অন্যতম বিখ্যাত স্কুল। গাছের ভেতরে জেগে থাকে সারা বছর। এই স্কুলে যারা পড়তে আসে তাদের মা বাবার ভাবনা কমে যায়। এখন মে মাস। এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান প্রিয় মাস। ক্রিস একটু শিষ তুলে রাস্তায় নামে।