শিল্পের জন্য শিল্প নাকি মানবতার জন্য শিল্প এই বিতর্ক অনেক পুরাতন। এই বিতর্কের চর্চা হতে হতে এটি এখন একটি সিদ্ধান্তমূলক বন্ধনীতে আবদ্ধ হয়ে গেছে। সাহিত্যের দুটি ধারা- আস্তিকতা বনাম নাস্তিকতা ব্যাপকভাবে চর্চিত একটি অনুষঙ্গ। গত শতাব্দীজুড়ে সারা বিশ্বে মার্কসবাদের জয়জয়কারের সময় “শিল্পের জন্য শিল্প” শ্লোগানটিকে ধারণ করে সারা বিশ্বের মহৎ শিল্পীগণ তাদের নিজ নিজ কর্ম সম্পাদন করেছেন। সেখানে শিল্পের প্রয়োজনে তারা হেন কিছু নাই যা বর্জন করেন নি। এমনকি মানুষের সহজাত ধর্মীয় জীবনধারাকেও তারা প্রশ্নবিদ্ধ করতে কুণ্ঠিত হন নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে ধর্মকে নেতিবাচক দৃষ্টিকোণে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ভেতর ধর্ম নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে উন্নাসিকতা। এর বিপরীতে খুব ক্ষীয়মান হলেও আস্তিক সাহিত্যধারা তৈরি হয়েছে সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পসাহিত্য অঙ্গনে। এ ধারা ক্রমান্বয়ে ব্যাপক গতিশীল হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। নাস্তিক ঘরানার অনেক খ্যাতিমান লেখকও এখন আবার আস্তিক ঘরানার সাহিত্য চর্চায় মেতে উঠেছেন, কেউ খ্যাতি পাবার জন্য, কেউ নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে আস্তিক লেখক হয়ে গেছেন। এটা একটা ইতিবাচক দিক।
সে যাক, সাহিত্য মানেই হলো মানুষের জীবনের চিত্রায়ন। বিশেষ করে গল্প-উপন্যাস-নাটকে যাপিত জীবনের নানা বিষয় আশয় নিয়ে লেখা হয়। কখনো গল্প তৈরি হয়ে যায়, কখনো গল্প তৈরি করতে হয়। যখন গল্প তৈরি হয়ে যায়, তখন সেটাকে কাটছাট না করলে সত্যিকার অর্থে তা আর গল্প থাকে না; সেটা হয়ে যায় হয় কোন রিপোর্ট, নয়তো আত্মজৈবনিক রচনা। কাটছাটের বিষয়টি নিয়ে দুটো কথা না বললেই নয়। নিচের ছবিটি ভালো করে লক্ষ্য করুন।
একই আকারের তিনটি চিত্র। ৩ নম্বরটি সলিড কালারের, ১ নম্বরটিতে সলিড কালারের ওপর কয়েকটি দাগ টানা হয়েছে, ২ নম্বরটিতে সলিড কালার উঠিয়ে দিয়ে একই মাপের কয়েকটি দাগ টানা হয়েছে। এখানে দেখুন ১ ও ২ নং ছবিতে কাটছাট করা হয়েছে। এ জন্যই ৩ নং থেকে তারা আলাদা। এই কাটছাটের কারণেই ১ ও ২ নং শিল্প হয়ে উঠেছে।
এই চিত্রের সাথে লেখকের সম্পর্ক কি তাই তো ভাবছেন? বলছি।
মনে করুন আপনি একটি গল্প লিখবেন। একটি সুন্দর ঘটনা নির্বাচন করেছেন। ধরলাম আপনার পরিবারের কোনো একটি বিশেষ ঘটনা লিখতে চাচ্ছেন। এরকম ক্ষেত্রে আপনি অবশ্যই হুবহু ঘটনাটি লিখতে পারেন না। আপনাকে এখানে কাটছাঁট করতে হবে। কিছু বাদ দিতে হবে, কিছু সংযোজন করতে হবে। তাহলেই গল্পটা গল্প হয়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে আপনার উদ্দেশ্য। আপনি কি শুধুই গল্প লিখছেন? হতে পারে আপনি সমাজের চিত্র অংকণ করছেন। হতে পারে আপনি কোন মতবাদ প্রচার করতে চাচ্ছেন। আপনার উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন। উদ্দেশ্যের কথা অবশ্যই আপনাকে মনে রাখতে হবে।।
উপমার ব্যবহারঃ
আপনার লিখিত গল্পটিতে অবশ্যই উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যবহার করতে হবে।মনে করুন আপনি কোন একটি চরিত্রের অন্তিম মুহূর্তের চিত্র অংকন করছেন। এখানে আপনি প্রকৃতিকে চরিত্রের সাথে মিশিয়ে দিতে পারেন। হয়তো অস্তমিত সূর্যের একটি দৃশ্য নিয়ে আসতে পারেন। হয়তো ডুবন্ত কোন নৌযানের দৃশ্য নিয়ে আসতে পারেন। হয়তো কোন প্রাণীর বা বৃক্ষের ক্রমাগত মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার দৃ্শ্য অংকন করতে পারেন। কিংবা আপনার পছন্দমতো যে কোন ক্ষয়িষ্ণুমান দৃশ্যের অবতারণা করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই কল্পিত দৃশ্যের সাথে আপনার উদ্দিষ্ট চরিত্রের সাজুয্যতা রক্ষা করতে হবে। যেন সেটা আরোপিত মনে না হয়। তাহলেই দেখবেন আপনার গল্পটি একটি অনির্বচনীয় গল্পে পরিণত হয়েছে। মহৎ শিল্পীরা এই রকম দৃশ্যকল্প ব্যবহার করেছেন। বেশী দূরে যেতে হবে না। রবীন্দ্রনাথের গল্প পাঠ করলেও এই বিষয়টি আপনার কাছে চমৎকারভাবে ধরা পড়বে। আধুনিক কালের অন্যান্য মহৎ গল্পকারের গল্পেও এই বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়।
শ্লীলতা-অশ্লীলতাঃ
সাহিত্য যেহেতু মানব জীবনের আখ্যান, সেহেতু এখানে প্রেম-ভালোবাসা, যৌনতা আসতেই পারে। হতে পারে আপনি স্বামী-স্ত্রীর যৌনতা আপনার গল্পে-আখ্যানে তুলে ধরতে চাচ্ছেন। এখানে আপনি কতটুকু প্রকাশ করতে পারেন সেটা আপনাকে মনে রাখতে হবে। একটা বিষয় আপনাকে অবশ্যই খেয়াল করতে হবে যে, আপনি দাম্পত্য জীবনের সেই একান্ত মুহূর্তের বিষয়টি হুবহু নিয়ে আসার কোন প্রয়োজন নেই। এখানে আপনাকে অত্যন্ত চতুরতার সাথে প্রকৃতির অনুষঙ্গ ব্যবহার করা উচিত। বাদ দিলাম প্রকৃতির অনুষঙ্গ, আপনি আধুনিক জীবনের অনুষঙ্গও ব্যবহার করতে পারেন। প্রচণ্ড বেগে ঘূর্ণায়মন বৈদ্যুতিক পাখা, কিংবা আলো নির্বাপনের মাধ্যমে আপনি আপনার উদ্দিষ্ট বিষয়টি ফুটিয়ে তুলতে পারেন। তাহলেই দেখবেন অশ্লীল বিষয়টি কি চমৎকারভাবে শ্লীল হয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই আমার বিশিষ্ট কথাশিল্পী-কবি মুজতাহিদ ফারুকীর একটি গল্পের কথা মনে পড়ে গেলো। গল্পের শিরোনাম “সাত ধোয়া শাড়ি অথবা নারী”। গল্পটিতে একজন ধর্ষিত নারীর গোসলের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি। কুকুরের লালা কাপড়ে লাগলে তাকে সাতবার ধুয়ে পবিত্র করতে হয়। এখানে ধর্ষিতা নারী বারবার গোসল করছেন, সাতবার গোসল করেও তিনি নিজেকে পবিত্র মনে করছেন না। একটা অসূচীর ভাব রয়ে তার ভেতর। তার কেবলই মনে হতে থাকে একটা কুকুর তাকে নোংরা করে দিয়ে গেছে। এই নোংরা অনুভূতি যাচ্ছেই না তার ভেতর থেকে।
সাহিত্যে অশ্লীলতা আসতেই পারে, কিন্তু তাকে শ্লীলভাবে উপস্থাপন করা লেখকের দায়িত্ব।মনে করুন সম্পূর্ণ বিবসনা একজন নারী বা পুরুষ রাস্তায় নেমে এলো, তখন কিন্তু কেউ তাকে ভালো চোখে দেখবে না। ভাববে হয়তো পাগল, নয়তো অন্য কোন নারী বা পুরুষ। কুরুচিসম্পন্ন কিছু মানুষ তার দিকে হা করে তাকিয়ে তাকে দেখতে পারে সত্যি, কিন্তু রুচিশীল কারো পক্ষে তার দিকে দ্বিতীয়বার তাকানোর কোন রুচি থাকবে না। কারণ সে অশ্লীলতা প্রদর্শন করছে। কিন্তু যদি একই ব্যক্তি স্বল্পবসনা/স্বল্পবসন হয়ে পথে নামে তাহলে তাকে একেবারেই না দেখে থাকা যাবে না। অপরদিকে যদি সেই একই ব্যক্তি রুচিশীল পোশাকে রাস্তায় নামে তাহলে তাকে সবাই দেখবে। এখানেই শ্লীলতা-অশ্লীলতার মাপকাঠি। একজন লেখক অবশ্যই তার অংকিত চরিত্রকে অশ্লীলভাবে উপস্থাপন করতে পারেন না। তাকে অবশ্যই সকলের গ্রহণযোগ্য করে লিখতে হবে।
শ্লীলত-অশ্লীলতা বিষয়টির মাধ্যমে একজন লেখককে চেনা যায়। তার রুচিবোধের পরিচয় মেলে। বিষয়টি নিয়ে একজন প্রতিশ্রুতিশীল লেখককে অবশ্যই গভীরভাবে ভাবতে হবে।
শিল্পকে শুধুমাত্র শিল্পের জন্য বিবেচ্য ভাবলে চলবে না। শিল্পকে মানবতার কল্যাণের জন্য ব্যবহার করতে হবে। তবেই আমরা একটা সুন্দর সমাজ বিনির্মাণ করতে পারব।