এক দাঁড়কাক মোহর কুড়িয়ে পেল। কৃষকের ঘরের চালে লুকিয়ে রাখল সে মোহরটি। প্রতিদিন সে এসে মোহর বের করে নেড়েচেড়ে রেখে দেয়। কাকেরা কোথাও কিছু রাখলে তাড়াতাড়ি ভূলে যায়। কিন্তু দাঁড়কাক মোহরের কথা একদম ভোলে না। সে বুঝেছে এটি সাধারণ জিনিষ নয়। এটি তার অনেক উপকারে লাগবে। পশ্চিমের আমুলে ওর এক বন্ধু বাস করে। একদিন বন্ধু ওর বাড়িতে বেড়াতে আসে। বন্ধুকে নিয়ে সে অনেক জায়গায় ঘূরতে যায়। তার জন্মভূমি মূরলি ছেড়ে সে যায় পরিচ্ছন্ন শহর সামিরায়। সেখানে একটি দালানের কার্র্নিশে ওরা থাকার ব্যবস্থা করে। তারা দুজনে দোকান থেকে খাবার এনে খায় আর মনের আনন্দে শহরে ঘুরে বেড়ায়। শহরের সৌন্দর্য দেখে তারা অভিভূত হয়ে পড়ে। এখানে খাবারের অভাব নেই। এখানকার মানুষ কাকের সামনে খাবার ছড়িয়ে দেয়। তারা কাকের কোন ক্ষতি হতে দেয় না। তারা মনে করে কাক না থাকলে শহরে বিপদ নেমে আসবে। দাঁড়কাকের নাম বৃত্ত আর বন্ধুর নাম মিত্ত।
বৃত্ত বলল,“বন্ধু। কেমন লাগল সামিরা?”
“অপূর্ব! এমন শহর আমি দেখিনি।”
“মূরলি ছেড়ে সামিরায় আসা আমি। এখানে কত সূবিধা।”
“আমিও ভাবছি একই কথা।”
“কী কথা বন্ধু? আমাকে খুলে বল।”
“এখানে বাচ্চারা শান্তিতে থাকবে। পশ্চিমে খুব শীত।”
“তাহলে আর দেরি কেন? ওদের জলদি নিয়ে আস।”
“তোমার ভাবিকে সব বলব। কুঞ্জি রাজি হলে দ্রুত চলে আসব এখানে।”

সামিরা থেকে মূরলিতে ফিরে আসে তারা। বৃত্ত বন্ধুকে তাগাদা দেয় সবাইকে নিয়ে আসার জন্য। তার মন সামিরায় যাবার জন্য উতলা হয়ে ওঠল। ছায়াময় পরিবেশে খাবারের কত প্রাচুর্য। শহরের বাসিন্দারা কাকের দিকে একটি ঢিলও ছোড়ে না। পুষ্টিকর খাবার খেয়ে হেসে খেলে দিন কাটাতে পারবে সে এখানে। মোহর বিক্রি করতে পারলে সে হবে এক বিত্তবান কাক। স্বগোত্রীয়রা তার পশমের যোগ্য হতে পারবে না। বন্ধুকে নিয়ে দোকান খুলতে পারবে। মোহরের কথা মনে হতেই বৃত্ত কৃষকের বাড়ি যায়। মোহর বের করে চোখ ভরে দেখে । মিত্তও সামিরায় আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠল। কিন্তু কুঞ্জি যদি আমূল ছেড়ে না আসতে চায়। সেজন্য বন্ধুকে সাথে নেয়। যাতে সে কুঞ্জিকে ভালো করে বুঝাতে পারে।

আমূলে শীত জেঁকে বসেছে। সবাই ঘরের দরজা বন্ধ করে সময় কাটায়। বন্ধুর বাড়িতে এসে বৃত্ত অসুস্থ হয়ে পড়ল। ঠাণ্ডা মোটেই সহ্য করতে পারে না সে। মিত্তের বাসাটি বরফে ঢেকে গেল। সে পরিবার নিয়ে পাহাড়ের গুহায় চলে গেল। বৃত্ত দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রাও করতে পারে না। মিত্ত যে গুহায় আশ্রয় নিল তার কাছে খাদ্য এবং পানীয়ের ব্যবস্থা নেই। তারা খুব কষ্টে দিনাতিপাত করতে থাকে। মিত্ত এবং তার স্ত্রী বৃত্তের সেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা ওর জন্য তীব্র শীতে খাদ্য ও ঔষধ সংগ্রহ করে। বন্ধুর কষ্ট দেখে বৃত্ত ব্যথিত হয়। সে বলে,
“তোমরা করছোটা কি! এই ঠা-ায় বের হলে অসূখ করবে।”
“তুমি ভেব না বন্ধু। কোন ক্ষতি হবে না আমাদের।”
“ক্ষতি হবে না মানে। কোন অসূখ হলে কেমন হবে।”
“চিন্তা করবেন না মেজবান। আমরা ভালোভাবেই ফিরে আসব।’ বৃত্তের কথার জবাবে মিত্তের স্ত্রী বলে।

বৃত্ত ভাবে শীত কমলেই হয়। বন্ধুকে নিয়ে সে নিজ দেশে যাবে। তারপর মোহর বিক্রি করে সামিরায় ব্যবসা করবে। সামিরায় যা পরিবেশ। কারবার করে বড়লোক হবে। কুঞ্জিকে বুঝিয়ে বলে সে। এখানে তারা কত কষ্টে দিন কাটায়। আর ওখানে কাককে না খাওয়ায়ে মানুষ পানি মুখে দেয় না। ওখানে কাকেরা দোকান দিয়ে ব্যবসা করতে পারে। সে বলে,
“ভাবি। এখানে এক মুহুর্ত থাকা চলবে না। এত শীতে কী বাস করা সম্ভব?”
“বাপদাদার বসত ছেড়ে যাওয়াটা ভালো হবে? ”
“ভালো হবে না মানে! বলছেন কি? গিয়ে দেখুন না। বড়লোক হতে কদিন লাগে।”
“দুবেলা খাবার জোটে না তাদের আবার বড়লোক।”
“ভাবি। কথার কথা বললাম। সামিরার পরিবেশ খুব ভালো।”

শীত কমে যেতে সময় লেগে গেল। এর মধ্যে বৃত্ত বেশ দূর্বল হয়ে পড়ল। ওঝা ডেকে মিত্ত তার চিকিৎসা করল। ওদের সেবায় সুস্থ হতে লাগল সে। শীত কেটে আমূলের আকাশে একদিন রোদ দেখা দিল। রোদের তেজে কেটে যেতে লাগল কুয়াশা। নবিন কিশলয়ে ভরে উঠলো গাছপালা। বৃত্ত বিষণœ মনে গুহার বাইরে বসে গায়ে রোদ মাখে। বন্ধু তাকে প্রজাপতি আর বনডুমুর এনে খাওয়ায়। বন্ধুর আতিথ্যে তৃপ্ত হয় বৃত্ত। হোগলার রসে ঠোঁট ডুবিয়ে সে বলে,
“মিত্ত, কি ভাবলে?”
“কোন বিষয়ে বলছ?”
“বারে ভুলে গেলে! ব্যবসার কথা কি ভাবলে?”
“ভেবেছি। কিন্তু কুঞ্জি শুনতে চায় না।”
“ওর কি সমস্যা?”
“এখানে সবাই আছে। বিপদ আপদে পাশে এসে দাঁড়ায়।”
“সামিরায় বড় করে দোকান দেব। বিষয়টা ভেবে দেখ।”
“ঠিক আছে। এদিকে লোকজনের পাওনা। সম্পত্তির ঝামেলা। দেখি কি করা যায়।”
“আমি আর থাকতে পারছি না। ভাবছি কালই যাব। ঝটপট সব সেরে নাও।”
“কালই যাবে মানে? তোমার শরীর খারাপ। আগে সেরে ওঠ। তারপর যাওয়ার কথা ভাববে।”

বৃত্ত একদম দেরি করতে চায় না। মোহরের কথা ভেবে ওর মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। গাছের কোটরে সে যদি মোহর লুকিয়ে রাখত। তাহলে এত দূশ্চিন্তা হত না। শীতে কৃষকরা ঘর মেরামত করে। কৃষক যদি ঘর মেরামত করে থাকে তাহলে হয়েছে। তাহলে আর মোহর পেতে হবে না। মিত্ত জোর করলেও বৃত্ত ব্যস্ত হয়ে ওঠল। অবশেষে মিত্ত বন্ধুকে এগিয়ে দেয়ার জন্য তৈরি হল। মূরলির দিকে যাত্রা শুরু করল দুই বন্ধু। বৃত্ত ঠিকমত উড়তে পারে না। খাবার এবং পানি সাথে নিয়েছে মিত্ত। বন্ধুকে সে বাড়িতে পৌছে দেয় ।

বাড়ি পৌঁছে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ে বৃত্ত। সারারাত তার ঘুম হয় না। মোহর না পেলে দোকান হবে না। বন্ধুকে কথা দিয়েছে। আহা! সামিরা কত সুন্দর শহর। সে এপাশ ওপাশ করতে থাকে। তা দেখে স্ত্রী তুলশি বলে,
“বন্ধুর বাড়ি থেকে এতদিনে ফিরলে। ঘুমাচ্ছ না কেন? ওদের কথা মনে পড়ছে বুঝি?”
‘ওখানে অসুখ করেছিল। তাই দেরি হয়েছে। তুমি মোহরের খোঁজ করেছিলে?”
“খোঁজ নিতে গিয়েছি। কিন্তু কৃষক চাল বদলে দিয়েছে। মোহরের সন্ধান পাইনি।”
“বল কি! তুমি কৃষককে কিছু বলনি?”
‘কী বলব? বললে ও আমাকে পাত্তা দিত ভাবছ ?”
“পাত্তা দেবে না মানে? নিজের জিনিষের কথা মুখ ফুটে বলবে না?”
“তুমি যেয়ে বল। বন্ধুর বাড়ি গিয়ে আর দেশে ফেরার নাম নেই।”

কৃষকের বাড়ি গিয়ে মাথা ঘোরে বৃত্তের। কৃষক নতুন চাল তৈরি করেছে। মন খারাপ করে গাছের ডালে বসে থাকে সে। কৃষক বাড়িতে নেই। থাকলে গলার আওয়াজ পাওয়া যেত। বাজারে থেকে ফল নিয়ে আসে সে। তুলশিকে বলে কৃষককে সম্মান দিয়ে কথা বলতে। দূপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারা। প্রসন্ন মনে বাড়ি ফেরে কৃষক। তার সামনে গিয়ে হাতজোড় করে দাঁড়ায় ওরা। ফল দিয়ে আদবের সাথে কথা বলে,
“চালে মোহর লুকিয়ে রেখেছি। সে চাল আপনি মেরামত করেছেন। মোহর কি করেছেন?”
“মজুর দিয়ে চালের কাজ করিয়েছি। তারা তো আমাকে কিছু বলে নি।”
“আমরা এখন কি করব ? ওটাই আমাদের সারাজীবনের সঞ্চয়।”
“আগে বললে হত। মজুর কি এখন মোহরের কথা স্বীকার করবে?”
“মজুরের বাড়িতে আমরা গোপনে খোঁজ করব। ধরা পড়লে আপনি ব্যবস্থা নেবেন।”

মজুরের বাড়িতে ওরা খুব সাবধানে অনুসন্ধান করতে লাগল। কৃষকও গোয়েন্দা লাগিয়ে মোহরের খোঁজ শুরু করল। একদিন কৃষক দেখল তার বাগানে মোহরটা পড়ে আছে। মোহর পেয়ে কাককে ডেকে পাঠাল কৃষক। কাকেরা এল দলবল নিয়ে । বৃত্তকে মোহরটা দিল কৃষক। খুব আনন্দ হল সেদিন। দামি দামি জিনিষপত্রে কৃষকের বাড়ি ভরে তুলল কাকের দল। কৃষক বৃক্তকে নিজের ধর্মপূত্র বলে মেনে নিল। একটা পরিপাটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা হল তাদের। সামিরায় ব্যবসা করার প্রয়োজন থাকল না তাদের।
সে কৃষকের সব জমিজমা দেখাশুনা করা শূরু করল। বাজারে কৃষকের সবজির ব্যবসা আছে। সেটারও তদারকি করা শূরু করল সে। অনেক জমি কৃষকের। কাককে ধর্মপূত্র করার পর কৃষক সংসারের দেথাশুনা তার উপর ছেড়ে দিল। সারাদিন কাক এতটা ব্যস্ত থাকে যে আস্তে আস্তে বন্ধুর কথাও ভূলে গেল। সামিয়ার যেয়ে ব্যবসা করা তার হল না