সদাকা অর্থ দান, ফিতর মানে রোজা সমাপন; সদাকাতুল ফিতর অর্থ হলো রোজা শেষে ঈদুল ফিতরের দিনে সকালবেলায় শোকরিয়া ও আনন্দস্বরূপ যে নির্ধারিত সদাকা আদায় করা হয়। এর দ্বারা রোজার ত্রুটিবিচ্যুতি মার্জনা হয়।
একে জাকাতুল ফিতরও বলা হয়। ঈদের দিন সকালবেলায় যিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের (সাড়ে সাত ভরি সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা বা সমমূল্যের ব্যবসাপণ্যের) মালিক থাকবেন, তাঁর নিজের ও পরিবারের ছোট-বড় সবার পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা তাঁর প্রতি ওয়াজিব।
সদাকার ফযিলাত সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যারা আল্লাহ তা‘আলার পথে নিজেদের ধন-সম্পদগুলো ব্যয় করে তাদের উপমা যেমন একটি শস্য বীজ। যা থেকে উৎপন্ন হয়েছে সাতটি শীষ। প্রত্যেক শীষে রয়েছে শত শস্য। আর আল্লাহ তা‘আলা যার জন্য ইচ্ছে করবেন তাকে আরো বাড়িয়ে দিবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ তা‘আলা হচ্ছেন মহান দাতা ও মহাজ্ঞানী।” [সূরা আল-বাকারা : ২৬১]
সদাকাত প্রদানের বহু উপকারিতা রয়েছে। হাদীস শরিফে এসেছে, ‘‘দাতা আল্লাহর কাছে, মানুষের কাছে, জান্নাতেরও কাছে; জাহান্নাম থেকে দূরে। সাধারণ দাতা কৃপণ আবেদ অপেক্ষা আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।’’ [তিরমিজি শরিফ]
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত ‘‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদাকাতুল ফিতরকে অপরিহার্য করেছেন অর্থহীন, অশালীন কথা ও কাজে রোজার যে ক্ষতি হয় তা পূরণের জন্য এবং নিঃস্ব লোকের আহার জোগানোর জন্য।’’ [সুনানে আবু দাউদ : ১৬১১] অন্য হাদীসে এসেছে, হজরত আনাস ইবনে মালিক রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, ‘‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যতক্ষণ পর্যন্ত সদাকায়ে ফিতর আদায় করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার রোজা জমিন ও আসমানের মাঝখানে ঝুলন্ত থাকে।’’ [কানযুল উম্মাল : ২৪১২৯]
ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, ‘‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদাকাতুল ফিতর আবশ্যক করেছেন। এর পরিমাণ হলো, এক সা যব বা এক সা খেজুর। ছোট-বড়, স্বাধীন-পরাধীন সবার ওপরই এটা আবশ্যক।” [বুখারী : ১৫১২]
প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিম ব্যক্তির ওপর সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজীব।
‘সামর্থ্যবান’ শব্দের ব্যাখ্যা হলো, প্রয়োজনিতিরিক্ত (ব্যবহৃত, ঋণ ইত্যাদি) যাকাতের নেসাব পরিমাণ সম্পদের (৫২.৫ ভরি রূপা) মালিক হওয়া। তবে যাকাতের ন্যায় এক্ষেত্রে এক বৎসর অতিক্রান্ত হওয়া জরুরি নয়।
সামর্থ্যবান না হলে সদাকাতুল ফিতর ওয়াজীব হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সর্বোত্তম সদাকা সেটাই, যেটা সামর্থ্যবান কেউ আদায় করে।” [বুখারী : ১৩৬০]
অতএব পুরুষ, নারী সবার ওপরই এই সদাকা ওয়াজীব।
নিজের পক্ষ থেকে এবং নিজের অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান বা অবিবাহিত মেয়ের পক্ষ থেকে আদায় করা ওয়াজীব। সন্তানের নামে সম্পদ থাকলে সেখান থেকে আদায় করা যাবে। প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের পক্ষ থেকে আদায় করা ওয়াজীব নয়।
সদকাতুল ফিতর ঈদুল ফিতরের ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াজীব হয়। কাজেই সেদিন ভোরের আগে যে জন্ম নিয়েছে, বা এই পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছে, তাকেও এই সদাকা আদায় করতে হবে।
কেউ যদি সেদিন ভোরের আগে মারা যায়, তার ওপর সদাকা ওয়াজীব হবে না।
ঈদুল ফিতরের দিন সকালে ঈদের নামায পড়তে যাওয়ার আগে সদাকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম। তবে যাকাতের ন্যায় সেই সময়ের আগেও আদায় করা যেতে পারে।
যাঁদের জাকাত দেওয়া যায়, তাঁদের ফিতরাও দেওয়া যায়। ফিতরা নির্ধারিত খাদ্যসামগ্রী বা তার মূল্যে টাকায়ও আদায় করা যায় এবং অন্য কোনো বস্তু কিনেও দেওয়া যায়।
পিতা, মাতা ও ঊর্ধ্বতন এবং ছেলে, মেয়ে ও অধঃস্তন এবং যার ভরণপোষণের দায়িত্ব রয়েছে (যেমন স্ত্রী), তাঁদের ওয়াজিব ফিতরা ও জাকাত প্রদান করা যায় না।
ইসলামী শরীয়াহ মতে সামর্থ্য অনুযায়ী আটা, খেজুর, গম, কিসমিস, পনির ও যবের যেকোনো একটি পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণ বা এর বাজার মূল্য ফিতরা হিসেবে গরীবদের মধ্যে বিতরণ করা যায়।
পবিত্র রমজান উপলক্ষে এ বছর বাংলাদেশে ফিতরার হার জনপ্রতি সর্বনিম্ন ৭০ টাকা ও সর্বোচ্চ ২ হাজার ২০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আটার ক্ষেত্রে এর পরিমাণ এক কেজি ৬৫০ গ্রাম (অর্ধ সা’)। খেজুর, কিসমিস, পনির ও যবের ক্ষেত্রে ৩ কেজি ৩০০ গ্রামের (এক সা’) মাধ্যমে সদাকাতুল ফিতর (ফিতরা) আদায় করতে হয়।
হজরত ইমাম আযম রহমাতুল্লাহ আলাইহি এর মতে, অধিক মূল্যের দ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম; অর্থাৎ যা দ্বারা আদায় করলে গরীবদের বেশি উপকার হয়, সেটাই উত্তম ফিতরা। ইমাম মালিক রহমাতুল্লাহ আলাইহি এর মতে, খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম এবং খেজুরের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত ‘আজওয়া’ খেজুর দ্বারাই আদায় করা উত্তম। ইমাম শাফিয়ী রহমাতুল্লাহ আলাইহি এর মতে, হাদীসে উল্লিখিত বস্তুসমূহের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট ও সর্বোচ্চ মূল্যের দ্রব্য দ্বারা সদাকা আদায় করা শ্রেয়। অন্য সব ইমামের মতও অনুরূপ। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহ আলাইহি এর মতে, সাহাবায়ে কিরাম রাদিআল্লাহু আনহুম এর অনুসরণ হিসেবে খেজুর দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম। এ ছাড়া সদাকার ক্ষেত্রে সব ফকিহর ঐকমত্য হলো, ‘‘যা গরীবদের জন্য বেশি উপকারী।’’ [আল মুগনি, খ-: ৪, পৃষ্ঠা: ২১৯]
হাদীসে ৫টি দ্রব্যের যেকোনোটি দ্বারা ফিতরা আদায়ের সুযোগ দেওয়া হয়েছে যেন মুসলমানগণ নিজ নিজ সামর্থ্য ও সুবিধা অনুযায়ী এর যেকোনো ১টি দ্বারা তা আদায় করতে পারে। এখন লক্ষণীয় বিষয় হল, সকল শ্রেণির লোক যদি সবচেয়ে নিম্ন মূল্য-মানের দ্রব্য দিয়েই নিয়মিত সদাকা ফিতর আদায় করে তবে হাদীসে বর্ণিত অন্য চারটি দ্রব্যের হিসেবে ফিতরা আদায়ের উপর আমল করবে কে? আসলে এক্ষেত্রে হওয়া উচিত ছিল এমন যে, যে ব্যক্তি উন্নতমানের আজওয়া খেজুরের হিসাবে সদাকা ফিতর আদায় করার সামর্থ্য রাখে সে তা দিয়েই আদায় করবে। যার সাধ্য পনিরের হিসাবে দেওয়ার সে তাই দিবে। এর চেয়ে কম আয়ের লোকেরা খেজুর বা কিসমিসের হিসাব গ্রহণ করতে পারে। আর যার জন্য এগুলোর হিসাবে দেওয়া কঠিন সে আদায় করবে গম দ্বারা। এটিই উত্তম নিয়ম। এ নিয়মেই ছিল নবী, সাহাবা-তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের স্বর্ণযুগে। এ পর্যন্ত কোথাও দুর্বল সূত্রে একটি প্রমাণ মেলেনি যে, স্বর্ণযুগের কোনো সময়ে সব শ্রেণির সম্পদশালী সর্বনিম্ন মূল্যের দ্রব্য দ্বারা সদাকা ফিতর আদায় করেছেন। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বোত্তম দান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি ইরশাদ করেন, ‘‘দাতার নিকট যা সর্বোৎকৃষ্ট এবং যার মূল্যমান সবচেয়ে বেশি।’’ [সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইতক ৩/১৮৮]
এই সদাকা দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো ঈদের দিন গরীবের প্রয়োজন পূরণ করা, যেন তাকে কোথাও চাইতে না হয়। কাজেই সামর্থ্যানুযায়ী বেশি মূল্যটা পরিশোধ করাই উত্তম হবে।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৪ বা ২৫ মে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। তবে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের কারেণ এবারের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমরা এদেশের ফিতরা আদায়কারী ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি তারা যেন যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী হাদীসে বর্ণিত দ্রব্যগুলোর মধ্যে তুলনামূলক উচ্চমূল্যের দ্রব্যটির হিসাবে ফিতরা আদায় করেন। ধনীশ্রেণির মুসলিম ভাইদের জন্য পনির বা কিসমিসের হিসাবে ফিতরা আদায় করা কোনো সমস্যাই নয়। যেখানে রমাদানে ইফতার পার্টির নামে লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়, ঈদ শপিং করা হয় অঢেল টাকার, সেখানে কয়েক হাজার টাকার ফিতরা তো কোনো হিসাবেই পড়ে না। যদি এমনটি করা হয় তবে যেমনিভাবে পুরো হাদীসের উপর মুসলমানদের আমল প্রতিষ্ঠিত হবে এবং একটি হারিয়ে যাওয়া সুন্নত যিন্দা করা হবে, তেমনি এ পদ্ধতি গরীব-দুঃখীগণের মুখেও হাসি ফুটে উঠবে ঈদের পবিত্র দিনে।