যেমন কর্ম তেমন ফলঃ

না, না কোথাও যাওয়ার দরকার নাই। গ্রামে যেয়ে তোমার দাদাকে দেখে আস। তিনি অসুস্থ।
আব্বু আমার দিকে তাকিয়ে বিরস গলায় কথাগুলো বললেন।
মোহাম্মদুল্লাহ ভাইকে দিয়ে আব্বুর কাছে ফোন করালাম চুয়াডাঙ্গায় যাওয়ার গুরুত্ব বোঝানোর জন্যে। তবু আব্বু মানলেন না। তিনি অনড় তার কথায়। তাই আমার ভেতর ‘আমি যাবোই’ ধরনের রোখ চেপে বসলো।
কেউ যখন কোথাও যাবেই বা কোনো কাজ করবেই বলে দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় তখন তাকে না আটকানোই শ্রেয়। যদি তাতে কোনো ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে। আব্বু-ও তাই করলেন আমার একগুঁয়েতামী দেখে। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও আমায় যেতে দিলেন। আর বাধা দিলেন না।

পরদিন সোমবার। গেলাম গাবতলি বাসস্ট্যান্ডে। সকাল সকাল। মোহাম্মদুল্লাহ ভাইও আসলেন। তিনি আমার সহপাঠী। তার সঙ্গে পরে আমার বেশ কিছু সফর হয়েছে। তিনি অত্যন্ত হিসেবি। মানুষ হিসেবেও ভালো। আমরা দুজন এখন যাবো চুয়াডাঙ্গা আবু সাঈদ ভাইদের বাড়ি। সাঈদ ভাই-ও আমাদের সহপাঠী। বেশ কিছুদিন যাবত বলে যাচ্ছেন তাদের বাড়ির মেহমান হতে। তাই আর-কি যাওয়া।

দুতিন মাস আগে তাবলিগে গিয়ে দেলােয়ার ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেখান থেকে বন্ধুসুলভ আচরণ, কথাবার্তা। দেলোয়ার ভাই বেশ ভালো ছেলে। নরম-সাদাসিদে ও বড়ো দিলঅলা। আমায় অনেকদিন যাবত বলে যাচ্ছেন কক্সবাজার ঘুরতে যাবেন। সঙ্গে আমায় নেবেন। যাবো না যাবো না বলে পাশ কাটালাম কিছুদিন। তবু ডেকে যাচ্ছেন। তাছাড়া পড়াশোনারও একটা চাপ ছিলো। ফুরসত পাচ্ছিলাম না। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। যখন জানলেন কদিন পর আমি ছুটি পাবো তখন আমায় চেপে ধরলেন। এবার তো যাবেন! তাছাড়া দেলোয়ার ভাই একটু শক্ত ধাতের লোক। তাই রাজি হয়ে গেলাম এভেবে, এক ছুটিতে দুই সফর। মন্দ কী। কিন্তু তিনি আমায় চমকিয়ে দিয়ে বিমানের টিকিট কাটলেন। আমায় জানালেন বুধবার সকাল সাতটায় ফ্লাইট।

যাইহোক, আমি ও মোহাম্মদুল্লাহ ভাই চুয়াডাঙ্গার বাসে চেপে বসলাম। বাস চলছে। শাঁই শাঁই করে। ঢাকা পেরোতেই রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ধরনের গাছ দেখা যায়। গাছগুলো আমাদের পেছনে চলে যেতে লাগলো। খুব দ্রুততা দেখিয়ে। দেখে মনে হচ্ছে তারা চলছে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। ঘন্টা দু-এক পর বাস অস্বাভাবিক আচরণ করতে লাগলো। যাত্রীরা ড্রাইভারের ওপর চেঁচাতে লাগলো। ড্রাইভারের প্রতিক্রিয়া বুঝে উঠার আগেই বাস আামাদের আঁতকে দিয়ে এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করে রাস্তার পাশে থাকা গাছের সাথে টক্কর খেলো। বাসের ভেতর অনেকই কান্না জুড়ে দিলো। এক এক করে সবাই বাস থেকে নামলাম। ড্রাইভার-ও। নেমে যা দেখলাম যেনো আমার সংবিৎ হারানোর উপক্রম। বাস একটি গাছের সাথে বেজে আছে। আটকে আছে। গাছের পরই একটা বড়োসড় পুকুর। গাছ না থাকলে নির্ঘাত বাস পুকুরে! সবাই আল্লাহর শোকর আদায় করতে লাগলো।

বাসে আমরা দুজন টুপিওয়ালা থাকায় অনেকে বলাবলি করতে লাগলো, এ দুই হুজুরের কারণে আল্লাহ তায়ালা আমাদের বাঁচিয়ে দিলেন। তাদের কথা শুনে মোহাম্মদুল্লাহ ভাই নেপথ্যে মিটিমিটি হাসছেন। কিন্তু আমি ভয়ে সিঁটিয়ে আছি। ভাবতে লাগলাম! আব্বুর বারণ থাকা সত্ত্বেও জেদবসত চলে এলাম। রাস্তায় এতবড়ো বিপদ! আব্বুকে ফোন করতে খুব মন চাচ্ছিলো। কিন্তু সাহস পাইনি। তাই মনে মনে বলে উঠলাম, আব্বু আমায় ক্ষমা করে দিয়ো।

এরি ফাঁকে সবাই ড্রাইভারকে চেপে ধরলো। ড্রাইভার ভড়কে গেলো যাত্রীদের ক্ষিপ্ততা দেখে। ড্রাইভার গোবেচারার মতন বলে উঠলো, একটা হোন্ডা সামনে থাকায় সমস্যা হচ্ছিলো গাড়ি চালাতে। হোন্ডা এদিক-সেদিক করতে লাগলো। আমায় বেরিয়ে যাওয়ার পথ দিচ্ছিলো না। সামনে থাকা হোন্ডা হঠাৎ ব্রেক মারে। তৎক্ষণাৎ আমি ব্রেকে চাপ দিয়ে বাসের স্পিড সামলাতে না পারায় এ দুরবস্থা হলো। ড্রাইভারের অপারগতার কথা শুনে সবাই একটু থিতু হলো।

বাস আবার চলতে শুরু করলো। একটু পর আরিচপুরের ফেরিতে উঠলো বাস। ফেরি ভাসতে শুরু করলো পানিতে। বাস খালি দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রীরা ফেরিতে দাঁড়িয়ে কেউ খাওয়াদাওয়া করছে। কেউ ছবি-সেল্ফি তোলছে। আমরা দুজন ফেরির এক কোণে এসে দাঁড়াই। এক দুটো ঢেউয়ের পানি আঁচড়ে পড়ছে আমাদের গায়। কোনোদিন লঞ্চে চড়িনি। ভাবলাম লঞ্চে চড়লে এমনই আনন্দময় লাগবে বোধহয়। গাড়িঘোড়ার কোনো অসহ্যকর শব্দ দূষণ নাই। জ্যামের কোনো প্রশ্নই আসে না। পরে অবশ্য লঞ্চে চাঁদপুর সফর হয়েছে আমার। মোহাম্মদুল্লাহ ভাই-ও সঙ্গে ছিলেন।

ধীরে ধীরে ফেলে আসা ঘাট অদৃশ্য হতে লাগলো। আর ওপারের ঘাট কাছে আসতে লাগলো। ফেরি যখন ঘাটের কাছাকাছি চলে আসলো যাত্রীরা তখন যার যার বাসে নিজ আসন গ্রহণ করলো। ফেরি থামলো ঘাটে। বাস নামলো পাড়ে। আবার চললো বাস। চলতে চলতে যখন চুয়াডাঙ্গার বড়োবাজারে এসে দাঁড়ালো তখন জোহরের শেষ মুহূর্ত। মোহাম্মদুল্লাহ ভাই আমাকে ডেকে উঠালেন। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি। নামলাম বাস থেকে। কারণ সাঈদ ভাই এখানেই নামতে বলেছিলেন।

পড়শিদেশের সন্নিকটেঃ

বাস কাউন্টারের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি আমরা দুজন। দুতিনটা অটো আমাদের অতিক্রম করলো। হঠাৎ একটা অটো থেকে বের হয়ে আসলেন আমাদের মোটা ভাই সাঈদ। সে একটু মোটাতো তাই আমরা ভালোবেসে মাঝেমধ্যে মোটা ভাই বলে সম্মোধন করি। আমাদের ব্যাগ দুটো মোটা ভাই হাতে নিলেন। প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর্ব শেষ করে আমরা অটোতে উঠলাম। বড়োবাজার থেকে বের হয়ে মফস্বলের ভেতরের রাস্তা দিয়ে অটো চলছে। অবশ্য মফস্বল বললে ভুল হবে। কারণ, বড়োবাজার চুয়াডাঙ্গার সদরে। আর মোটা ভাইদের বাড়ি সদরের গা ঘেঁষা। দশ-পনেরো মিনিটেই অটো গিয়ে দাঁড়ালো মোটা ভাইদের বাড়ির সামনে। বিল্ডিং বাড়ি। একতলা করেছেন। তাও কমপ্লিট হয়নি। সাঈদ ভাইয়ের মুখে অনেক শুনেছি তাদের না-কি অনেক ভেড়া। গরুও আছে। সত্যি-ই বাড়ির ডান পাশে ভেড়ার পাল। বাড়ির পেছনে গোয়াল ঘর।

আমরা ঘরে প্রবেশ করে একটু ফ্রেশ হতেই ভেড়ার গরম দুধ নিয়ে হাজির সাঈদ ভাইয়ের মা। সেদিনই প্রথম খেয়েছিলাম ভেড়ার দুধ। আর খাওয়া হয়নি। আন্টির সঙ্গে কিছু কথা হলো। খুব সরল-সোজা মনে হলো। কিছুক্ষণ পর ভেড়ার গোশত দিয়ে খানা খেয়ে একটু আরাম করলাম।

আসরের নামাজ আদায় করলাম একটি মসজিদে। খুব আড়ম্বর যে ঠিক তা নয়। সাদামাটা। কিন্তু দেখতে সুন্দর। নামাজ শেষে সাঈদ ভাই আমাদের একটু গ্রামের ভেতরে নিয়ে গেলেন। সামনে অনেক ধান ক্ষেত। ওই যে ইন্ডিয়ার সীমানা বলে শূন্যে হাত উঠিয়ে দেখালেন সাঈদ ভাই।
এজন্যই তো দাদা দাদা ভাব দেখা যায় আপনাদের চলন-বলন এ। একটু খোঁচা মেরে বললাম সাঈদ ভাইকে।
তা তো অবশ্য বলে মোহাম্মদুল্লাহ ভাই আরেকটু লবণ ছিটা দিলেন। হেসে উঠলাম তিনজনই। আমরা মেহমান বলে চুপ মেরে শুধু শুনলেন মোটা ভাই। না হয় মোটা ভাই ছেড়ে কথা বলার মানুষ না!

সে যাইহোক, মাগরিব পড়ে সাঈদ ভাইদের বাড়ির ছাদে উঠলাম। ভাবলাম ওপর থেকে ইন্ডিয়ার নিকটতম পড়শিদের একটু ভালো করে দেখে নিই। কিন্তু কিছু দেখা গেল না। কারণ বাড়ি একতলা যে!
ফোন কেঁপে উঠলো। ওপাশ থেকে দেলোয়ার ভাই বললেন, কাফি ভাই মনে আছে তো? বুধবার সকাল সাতটায় আমাদের ফ্লাইট।
হুম, মনে আছে।
সময়মতো চলে আসবেন কিন্তু! বলে ফোন কেটে দিলেন। এখান থেকে আমি যাবো ঢাকা হয়ে চিটাগাং-কক্সবাজার। মোহাম্মদুল্লাহ ভাইদের বাড়ি গোপালগঞ্জ। তাই তিনি কাল সকাল বাড়ি চলে যাবেন।

এশার পর খানা খাওয়ার দস্তরখানে দেখা হলো সাঈদ ভাইয়ের বাবার সঙ্গে। আমরা কিছুক্ষণ কথা বললাম। মাঝেমধ্যে সাঈদ ভাই তার বাবার কথন আমাদের তরজমা করে দিচ্ছেন। আন্টির কথা তো কিছু বুঝেছি কিন্তু আঙ্কেলের কথা সব মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছিলো। সব চলে যেতো যদি না সাঈদ ভাই তরজমা করতেন। উফ! মনে হলো তিনি চাইনিজ বগছেন! আমরা একটা বিষয়ে একটু বিব্রতবোধ করছিলাম যখন শুনলাম সাঈদ ভাই তার মাকে বলছেন, ওই মা তুই কনে গেলি।
আরে আজব ব্যাপার। মোটা ভাই এতটাই বেয়াদব যে, মাকে তুইতোকারি করে সম্মোধন করছেন! তাও আবার আমাদের সামনে। আমি ও মোহাম্মদুল্লাহ ভাই একে-অপরের দিয়ে মূঢ় নেত্রে তাকাচ্ছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম তারা সবাই একে অপরকে তুই বলে সম্মোধন করছে; বাচ্চা থেকে শুরু করে যুবক বৃদ্ধরাও_ আমাদের বোধগম্য হলো হয়তো এখনকার বুলিই এটা। তুইতোকারি বলতেই তারা সাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পরে অবশ্য মোটা ভাই আমাদের ধারণার সাথে সহমত হয়েছেন।

আথিতেয়তার প্রেমে পড়েছিঃ

ফজর পড়ে মোহাম্মদুল্লাহ ভাইকে আমরা ভোরের গাড়িতে উঠিয়ে দিলাম। আমি যাবো নাইটে। তাই কাউন্টারগুলোতে ঢাকার টিকিট তালাশ করতে লাগলেন সাঈদ ভাই। কিন্তু সবাই আমাদের নিরাশ করলো। শুধু কী নিরাশ! তারা এও বলে দিলো, আগামী দুদিন কোনো সিট পাওয়া যাবে না। যেনো মাথায় বাড়ি পড়লো। দু’একটা কাউন্টার অবশ্য আমাদের এ বলে আশ্বস্ত করলো, আপনারা দুপুরবেলা আসুন দেখি সিট বের করতে পারি কি-না। আমরা ফ্যাকাস চেহারায় বাড়ি ফিরলাম।

দুপুর খেয়ে কিছু আশার আলো দেখার আশায় গেলাম কাউন্টারে। কিন্তু ওই দু’একটা কাউন্টার-ও আমাদের মলিন চেহারায় হাসি ফুটাতে ব্যর্থ হলো। আমার তো অবস্থা খারাপ। কাল সকাল বিমানের ফ্লাইট। তার ওপর দেলোয়ার ভাইয়ের ফোনের ওপর ফোন। তাকে আশ্বস্তর বাণী শুনাতে পারছি না।
শেষমেশ অনেক দৌড়াদৌড়ি ও ইনিয়েবিনিয়ে একটা সিট পেয়েছি। ওটাকে আদৌ সিট বলা যায় কি-না! আমায় বসতে হবে ইঞ্জিনের ওপর। কী আর করার যেতে তো হবে।

বাদ এশা খাওয়াদাওয়ার পর্ব চলছে। সাঈদ ভাইয়ের মা আমার পাতে ঠেসেঠেসে দিচ্ছেন আর বলছেন, আমাদের কুটুম আজ চলে যাইবো। ন্যাও কুটুম বেশি করে ন্যাও। ভেড়ার গোশত ন্যাও। সাঈদ ভাইয়ের দিদি-ও কম যাচ্ছেন না। ন্যাও কুটুম ভেড়ার দুধ ন্যাও। আবার আইস্যো কুটুম। আইস্যো কিন্তু।
জি, ইনশাআল্লাহ আসবো’ বলে হাসছি আর কুট কুট করে খাচ্ছি। তাদের কথা ও কান্ড দেখে লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছিলাম। বুঝতে পারলাম তারা বেশ মিশুক। তাদের আতিথেয়তা দেখে সত্যি আমি আপ্লুত হয়েছি।

তিক্ত অভিজ্ঞতাঃ

সাঈদ ভাইয়ের মা বাবা দিদি ও ছোটবোন তিশার থেকে বিদায় নিয়ে রাত ন’টায় কাউন্টারে পৌঁছাই। দশটায় বাস ছাড়লো। সাঈদ ভাই চলে গেলেন। আমি বসলাম ইঞ্জিনের ওপর। আমার সঙ্গে আরো চারজন। এটা কী সিট না উত্তপ্ত তাওয়া! বেশিক্ষণ বসে থাকা যায় না। তাই কিছুক্ষণ পরপর ওঠে দাঁড়াই। আবার যখন নিতম্ব একটু শীতল হয়ে আসে তখন বসি। আবার দাঁড়াই আবার বসি। এভাবে অনেক দূর চললাম।

আরিচপুর ফেরিতে এসে গরম-শীতলকে উড়িয়ে দেয় আমার ওপর চেপে বসা ঘুম। কখন যে ফেরি পার হলাম কে জানে! কিছু মনে নেই। শুধু এতটু মনে পড়ে আমি ঘুমি এলিয়ে পড়ছিলাম ড্রাইভারের ওপর। ড্রাইভার বারবার আমায় জাগিয়ে দিচ্ছিলো। পরে যখন বাস একটু খালি হয় তখন ড্রাইভার আমায় জাগিয়ে সামনে তাকিয়ে বললো, তুমি বাসের পিছনে গিয়ে ঘুমাও। ওখানে দু’একটা সিট খালি হইছে। তুমি যেভাবে বারবার ঘুমিয়ে আমার ওপর পড়তেছো আমি তো এক্সিডেন্ট করবো। আমি চোখ দুটো আধো খুলে বাসের পেছনের সিটে বসে এক ঘুম। আমার আর কোনো খবর নাই। যখন খবর হলো তখন নিজেকে আবিষ্কার করলাম গাবতলির বাস টার্মিনালে। পুরো বাসে আমি একা। শুয়ে দেদারসে ঘুমোচ্ছি। ড্রাইভার হয়তো আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে বলে কাউকে ডাকতে নিষেধ করেছে। ধন্যবাদটা আর দেয়া হলো না। কারণ বাস থেকে নেমে দেখি কেউ নেই।

ফোন ভোঁ ভোঁ করে উঠলো। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে সাঈদ ভাই আতঙ্ক সুরে বলে উঠলেন, কাফি তুমি কি ঠিক আছো? তুমি এখন কোথায়? দেলোয়ার ভাই না-কি রাতভর তোমায় ফোন করেছেন, তুমি ধরোনি! তাই সকাল সকাল আমাকে ফোন করে তোমাকে ফোন দিতে বললেন। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললেন মোটাভাই।
ভাই আমি অচেতনভাবে ঘুমিয়ে ছিলাম। তাই কিছু বলতে পারিনি। এইমাত্র ঘুম থেকে উঠতেই আপনার ফোন।
ঠিক আছে। তুমি এখন দেলোয়ার ভাইকে ফোন করো।
হুম, করছি।
আমি মিস্ ড কল অবশনে গিয়ে দেখি অনেকগুলো মিস্ ড কল। দ্রুত দেলোয়ার ভাইকে ফোন করলাম। কিন্তু তিনি রিসিভ করেই আমার মেজাজ বিগড়ে দিলেন ৷ বললেন, আমি আপনাকে সারারাত ফোন দিয়ে গেলাম কিন্তু আপনি ফোন উঠালেন না। যে-ই সাঈদ ভাই একবার ফোন করলেন আপনি ঠিকই তার ফোন রিসিভ করলেন!
দেলোয়ার ভাই এসব বিরক্তিকর কথাগুলো একনাগাড়ে রাগান্বিত সুরে বলে ফেললেন। একবারও জিজ্ঞেস করেননি আমি কেনো তার ফোন ধরলাম না। আমার প্রচন্ড রাগ চেপে গেলো। একবার ভাবলাম যাবোই না। কিন্তু না গেলে যে কেলেংকারি হয়ে যাবে। সারাজীবনের জন্য তার কাছে আমার নামের সাথে লেপ্টে থাকবে কথা বরখেলাপকারী।
ফোনে তাকিয়ে দেখি সকাল ছ’টা ছুঁইছুঁই। তৎক্ষনাৎ একটা সিএনজি করলাম এয়ারপোর্টের লক্ষ্যে।

মহাকাশ পারিঃ

সিএনজি আামকে নামিয়ে দিলো এয়ারপোর্টের দ্বারপ্রান্তে। নামতেই দেলোয়ার ভাইকে চোখে পড়লো। তিনি অস্থির প্রতীক্ষার দৃষ্টি ছুড়ছেন এয়ারপোর্টের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়ানো সিএনজি গুলোতে। আমাকে দেখে মনে হলো তার মলিন চেহারায় উদাসীনতার ছাপ কেটে গেলো কিছুটা। কিন্তু কোনো ঔৎসুক্যতা দেখা দিলো না তার মধ্যে। আমি সিএনজির ভাড়া মিটিয়ে সালাম দিয়ে মুসাফা করলাম। তিনি বিরস গলায় বললেন, বেশি সময় হাতে নেই। আমার ভেতর উৎসাহ বুঝাতে আমি বলে উঠলাম, তাহলে ভেতরে চলেন। বিমান আমাদের রেখে উড়াল দেবে তো!

গেলাম ভেতরে। দেলোয়ার ভাই দুটো বোর্ডিং নিয়ে আমার হাতে একটি দিলেন। তাতে তাকাতেই আমার নাম ভেসে উঠলো, Muhibbullah kafi. আর ওপরে তারিখটা ছিলো 29 September,2015
একটু এগুতেই আমাদের দুজনের ব্যাগ দেলোয়ার ভাই স্ক্যানারে দিতেই ওপাশ দিয়ে বের করে দিলো কোনোরকম সংকেত ছাড়াই। আরে সংকেত কেনো দেবে! আমি তো বড্ড বোকা।

যাইহোক, আমরা একটি লাইনে দাঁড়ালাম। দু’তিনজন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা সবার বোর্ডিং চেক করছে। আমাদের চেক শেষে একটি বাসে উঠলাম সবাই। বাসের ভেতরের দৃশ্যটা একটু অন্যরকম। আমরা সচরাচর যে বাসগুলো দেখে থাকি সেগুলোর থেকে একটু ভিন্ন। একটু বিবরণ দেয়া যাক; সড়কের বাসের ভেতরের বিবরণ হলো,বাসের মাঝখানে হাঁটা-চলার মতন জায়গা রেখে দুপাশে দুটো-দুটো করে সিট সারিবদ্ধভাবে সাজানো। যেমনটা আপনাদের চোখে এখন ভাসছে। কিন্তু আমাদের যে বাসে করে বিমানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার বর্ণনা হলো, মাঝখানে বিশাল জায়গা ফাঁকা রেখে বাসের দুপাশে টং দোকানের বেঞ্চির মতন চেয়ার বিছানো জানালা ঘেঁষে। দুপাশে বসলে জানালা পেছনে রেখে মুখোমুখি হয়ে বসতে হয়। হয়তো আপনাদের কিছুটা বুঝাতে পেরেছি।

বাস সচল হলো। বাস আমাদের বিশাল বড়ো-বড়ো বিমানের পাশ ঘেঁষে ছোট্ট একটি বিমানের সামনে নামিয়ে দিলো। লম্বা উঁচু সিঁড়ি দিয়ে সবাই বিমানে উঠছে। আমি উঠার আগে চারদিকে একটু চোখ বোলালাম। বিশাল মাঠ শুয়ে আছে। মাঠকে একটু জাঁকজমকপূর্ণ করার জন্যে পিচঢালা রাস্তার দুপাশে লাল-নীল বাতি বসানো হয়েছে। রাস্তাগুলো বেশ লম্বা। এ মাথা থেকে ও মাথা দেখা যায় না। চারপাশ একটু ঘুরতে মন চাচ্ছিলো। কিন্তু দেলোয়ার ভাই ‘এখনি বিমান ছেড়ে দেবে’ বলে আমায় থামিয়ে দিলেন। বিসমিল্লাহি তাওয়াককালতু আলাল্লাহ বলে প্রথম সিঁড়িতে পা রাখলাম। উপরে উঠছি আর আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। তার ইচ্ছেতেই আজ আকাশ পারি দিতে যাচ্ছি। (যদিও দেলোয়ার ভাই সব খরচ বহণ করেছেন। তিনি তো অসিলা মাত্র)

আমরা যে-ই বিমানে ঢুকতে যাবো তখন গেইটের দুপাশে দুজন বিমানবালা আমাদের ওয়েলকাম বলে স্বাগতম জানাল। (তাদের সাজ দেখে মনে হলো তারাই দূর পথের যাত্রী।) ঢুকে দেখি আরে এতো বাস! দূরন্তগামী বাসের সিটের মতন বিমানের সিট। আমি তো ভেবেছিলাম ভেতরে কী নাকি আছে! দেখে হয়তো থ হয় যাবো। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। অবশ্য বাসের তুলনায় অনেক উন্নত। বেশ আড়ম্বর পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি। কোনো হই-হুল্লোড় চেঁচামেচি নাই। দেলোয়ার ভাই আমাদের আসন খোঁজে বের করলেন। এদিক দিয়ে তিনি আমার চেয়ে বেশ স্মার্টতা দেখালেন। আমরা আসন গ্রহণ করলাম। ককপিট থেকে স্পিকারে যাত্রীদের স্বাগতম জানানো হলো। যতো টাকা ততো স্বাগতম!

কিছুক্ষণের মধ্যে শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঢাকা থেকে বিমান আকাশ পথে উড়বে। এ-সব কথা শুনা যাচ্ছিলো। হঠাৎ এক বিমানবালা এসে আমাদের বলে বসলো, স্যার সিটবেলটা বেঁধে নিন প্লিজ। বিমানবালাকে ধন্যবাদ জানিয়ে দেলোয়ার ভাই সিটবেল বেঁধে নিলেন। বললাম না স্মার্ট! আমি দেখছিলাম তিনি কীভাবে বাঁধছিলেন। দেলোয়ার ভাই আমার দিকে হাত বাড়ালেন সিটবেল বেঁধে দেবেন বলে। আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। বললাম, আমি বেঁধে নেবো। আমি বাঁধতে গিয়ে প্রথমে ব্যর্থ হলাম। হয়তো তিনি হাসছিলেন আমার বাঁধার স্টাইল দেখে। অবশ্য যে কেউ-ই হাসতো। আমি অপমান বোধ করলাম। তাই গোঁ না ছেড়েই দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় সফল হলাম। সিটবেল বেঁধে ‘এটা কোনো ব্যাপার হলো’ এমন মনোভাব নিয়ে তার দিকে তাকালাম।

বিমানের চাকা সচল হলো। ধীরে ধীরে গতি বাড়লো। আমি ছোট্ট জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। খুব দ্রুত পিচঢালা পাকা রাস্তা পেছনে চলে যাচ্ছে। সহসা বিমানের মাথা ওপরে আর পেছনের অংশ নিচে নেমে গেলো। মেলায় নাগরদোলায় দোলে নিচে নামার সময় যে সুড়সুড়ি বোধহয় ঠিক তেমন সুড়সুড়ি লাগছিলো আমার। বিমান এমন খাড়া হলো যে, দাঁড়িপাল্লার সামনের অংশে দু কেজি ওজনের আর পেছনের অংশে চার কেজি ওজনের বাটখারা দিলে দাঁড়িপাল্লার যে রুপ হয় বিমান তেমন হয়ে গেলো বোধহয়।

যেনো ঢাকা নগরী নিচের দিকে নেমে যাচ্ছিলো। আস্তে আস্তে শহরের বিল্ডিংগুলো ছোট হয়ে যাচ্ছিলো। খানিক বাদে বিমান স্বাভাবিক হলো। যেনো সমতল রাস্তায় চলছে। আমি বাইরে তাকিয়েই আছি। এখন শহর বা বিল্ডিং কিছুই দেখা যায় না। সাদা সাদা কী যেনো দেখা যায়। সেগুলোর পরিচয় আমার কাছে নেই। আমার নিরবতা ভেঙে দিয়ে একটি কেক ও ছোট একটি পানির বোতল দিয়ে গেলো বিমানবালা। কেকটা কিন্তু বেশ সুস্বাদু ছিলো। খেয়ে আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। এবার টুকরো টুকরো কালমেঘ দেখা গেলো।

একটু পর ককপিট থেকে আওয়াজ আসলো, আর কিছুক্ষণের মধ্যে বিমান চট্টগ্রাম আমানত শাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লেন করবে। এবার দেলোয়ার ভাইও আমার সঙ্গে বাইরে তাকালেন। বিমান ধীরে ধীরে নিচের দিকে ঝুঁকছে। চিটাগাং এর উঁচু নিচু পাহাড়গুলো দেখা যায়। কিছু খাল বিল হয়তো-বা নদী; তাও দেখা যায়। আঁকাবাঁকা সরু পথ ধরে রাস্তা বের করে নিয়েছে খাল বিল হয়তো-বা নদী। মনোরম দৃশ্যগুলো দেখতে কী যে ভালো লাগছিলো আমার! ওপর থেকে দেখে মনে হলো চিটাগাং ঢাকার থেকে রূপবতী। ঢাকায় শুধু দালানকোঠা দেখা যায়। না আছে গাছগাছালি না আছে পাহাড়-পর্বত নালা-নদী। কিন্তু চিটাগাং এর সবি নিয়ে এক অপরুপ রুপ দিয়ে শুয়ে আছে শান্তভাবে। বিমান এবার আকাশ পথ থেকে চিটাগাং এর পিচঢালা রাস্তায় এসে দাঁড়ালো।

বাংলাদেশের প্রধান বন্দরনগরেঃ

বিমান আমাদের নামিয়ে দিয়ে উড়াল দিলো জর্ডানের আকাশে। তার শেষ গন্তব্য জর্ডান। আমানত শাহ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরটা একটু ঘুরলাম। এখন যাবো কক্সবাজার। এই প্রথম চিটাগাং এর মাটিতে পা রাখলাম। কিছুই চিনি না। তাই বাসস্ট্যান্ড খুঁজতে গিয়ে শুধু শুধু সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না ভেবে রাহবার হিসেবে সিএনজিকে ধরলাম। সিএনজির গ্রিলের ছোট ছোট ফোটা দিয়ে যতটুকু শহর দেখা যায় তাই উপভোগ করলাম। হঠাৎ পাশে বসে থাকা লোকটি আমার মেজাজটা আবার বিগড়ে দিলেন। আবার সেই গান ধরলেন, কাফি ভাই আমি রাতভর…! আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বিরক্তিকর চেহারায় চেঁচিয়ে উঠলাম, আপনি জানেন আমি কত কষ্ট করে এসেছি? বাসের কোনো সিট না পাওয়ায় উত্তপ্ত ইঞ্জিনে বসে এসেছি একমাত্র আপনার কথা রাখার জন্যে।
আরেকটু নরম হয়ে গেলাম, ভাই আমি অঘোর ঘুমে তলিয়ে ছিলাম। তাছাড়া ফোনের টন অফ ছিলো। তাই আপনার ফোন ধরতে পারিনি। যখন আমার চোখ খোলে তখন দেখি গাবতলি দাঁড়িয়ে থাকা ফাঁকা বাসে আমি একা। সূর্যও হেসে উঠেছে। আড়মোড়া ভেঙে ফোন হাতে নিতেই সাঈদ ভাইয়ের ফোন পেলাম।
আমার কর্কশ গলায় বৃত্তান্ত শিনে চুপসে গেলেন দেলোয়ার ভাই। কিন্তু চেহারা বলছে তার সংশয় এখনও কাটেনি। দুজন চুপচাপ বসে আছি। সিএনজি আমাদের বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিলো।

দেলোয়ার ভাই ইউনিক বাসের টিকিট সংগ্রহ করলেন। বাস ছুটছে কক্সবাজারের লক্ষ্যে। আমি জানালার পাশের সিটে বসতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করি। তাছাড়া প্রাকৃতিক দৃশ্য ভালো করে অনুধাবন করা যায়। তাই এবারও জানালার পাশে আমি। বাস ছুটছে। এবার আরেকটু নরম হয়ে দেলোয়ার ভাইকে বললাম,আমি উপলব্ধি করতে পারছি গতরাতে আপনার ওপর দিয়ে কী গিয়েছে। কেউ যখন রাতে কোনো যানবাহনে চড়ে আর তাকে যদি সারারাত ফোনে না পাওয়া যায় তাতে অবশ্যই চিন্তিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই গতরাতে আপনার ফোন ধরতে না পারায় আর কিছুক্ষণ আগে আপনার সঙ্গে রাফ ব্যবহারের কারণে আমি দুঃখিত। দেলোয়ার ভাই আমার চেয়েও বিনয়ী। এটা তার স্বভাবগত। বিনয়ে একেবারে নুয়ে যান। এটা আমার অপছন্দ। অবশ্য এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে একেবারে যে তিনি অমায়িক তাও না!

আমি আমার অভ্যেসগত জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম। সূর্য আমার দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকালো। যেনো চোখ থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হচ্ছে। আমি একগুঁয়েতামী না করে নিজেকে জানালার থেকে সড়িয়ে নিলাম। পর্দা টেনে দিলাম। যেনো দুষ্ট সূর্য থেকে পর্দা নিলাম। বাস ক্লান্তিহীন ছুটছে। কোথায় কক্সবাজার! আগে ভাবতাম চিটাগাং থেকেই কক্সবাজারের সমুদ্র অবলোকন করা যায়। যেনো তারা পড়শি। উঁকি দিলেই হলো। কিন্তু গুগল আমার ভুল ধারণা ভেঙে দিলো। গুগল আমাকে জানালো, চিটাগাং থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব হলো ১৫২ কিলোমিটার! আর ঢাকা থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব ৪১৪ কিলোমিটার।

সূর্য একটু হাঁপিয়ে উঠায় পর্দা সড়িয়ে আবার বাইরে তাকালাম। বাস অনেক বাড়িঘর ও ছোটো-বড়ো পাহাড় অতিক্রম করছে। এভাবে ছোটো-বড়ো পাহাড় দেখতে দেখতে বাস আমাদের কক্সবাজার এসে যখন নামিয়ে দিলো তখন সূর্য সমুদ্রে ডুব দেওয়ার পথে।

তারা তিনজনঃ

একটু দূর হেঁটে একটা আবাসিক হোটেলের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দেলোয়ার ভাই ফোন করায় তার পরিচিত তিনজন ছেলে (আমাদের সমবয়সী বা একটু বড়ো হবে) আসলেন। ‘আমি মিরাজ ভুঁইয়া মুন, আমি মুহাম্মদ সবুজ মিয়া, আর আমি মুহাম্মদ শাওন’ যার যার নাম বলে পরিচয় দিলেন। আমি আমার পরিচয় দিয়ে তাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম। দেলোয়ার ভাই জানালেন তারা গতরাত এসেছেন। মুন ছেলেটা তার বেয়াই। বোনের দেবর। আর বাকিরা মুন ভাইয়ের বন্ধু। তারা খুব সহজে আমার সঙ্গে মিশে গেলেন। তারা মিশুক ভেবে ভালো লাগলো।

তারা তিনজন বড়ো একটি রোম আর আমরা দুজন ছোটো একটি রোম নিলাম একই হোটেলে। হোটেল বেশি দূরে নয়। বিচ থেকে দশ-বারো মিনিট দূর। রাতে সমুদ্রের গর্জন শুনা যায়। জানালা দিয়ে নিশীথে সমুদ্রের রুপ দেখা যায়।
আমার শরীর বেশি দুর্বল হওয়ায় গোসল সেরে যেই চোখ লাগালাম এমন সময় তারা তিনজন এসে টানতে লাগলেন বিচে যাওয়ার জন্যে। তাদের কে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একটু আরাম করলাম।

দেশের গৌরব ও রাতের সমুদ্রঃ

মাগরিব পড়ে গেলাম বিচে। ভেবেছিলাম বিচের সম্মুখে বিশাল এক জমকালো গেইট হবে। যেখানে লেখা থাকবে সমুদ্রসৈকতের পুঁথি গাঁথা কিছু কক্সবাজারের বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এর কিছুই নেই। না আছে কোনো গেইট না আছে…! এবার কক্সবাজারের কিছু ইতিকথা বলি। কারণ কক্সবাজারের গর্ব করার মতন এক বিরল ইতিহাস আছে।
প্রচীন যুগে ব্রিটিশরা এখানে বসবাস করেন। ১৭৭৩ সালের (কিংবা এর এক-দুই বছর আগে পরে) দিকে তখনকার হিরাম কক্স নামের একজন ক্যাপ্টেন ব্রিটিশ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে এ কক্সবাজারে যোগ দেন। এবং তিনি কক্সবাজারের উন্নয়নের কাজ ধরেন। হিরাম কক্স এ অঞ্চলের ব্যাপক কাজ করেন। তিনি কক্সবাজারের পাশে একটি বাজার চালু করেছিলেন। তখন কক্সবাজারের নাম ছিলো পালনকি। (একসময় অবশ্য এটি প্যানোয়া নামেও পরিচিত ছিলো) কিন্তু ১৭৯৯ সালে কক্স এর মৃত্যুর কারণে কক্সবাজারের পালনকি নাম পরিবর্তন করে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স এর নামে কক্সবাজার নামকরণ করা হয়। এখানে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন বালুময় প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত। উথাল-পাতাল ঢেউ আর মানুষের কোলাহল। যা দেখলে মনের সাগরে ঢেউয়ের মেলা বসে। ভিজিয়ে দেয় দেহের সাথে মনকেও। শীতল করে দেয় চক্ষু। উবে যায় সব চিন্তা-দুশ্চিন্তা। ধ্যান-জ্ঞান সব সমুদ্রের দিকে চলে যায় আপনাআপনি-ই। এবং কক্সবাজার ১২২ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। যার দীর্ঘতা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম।

যাক সে কথা, মানুষের অভাব নেই। ভেবেছিলাম সন্ধ্যার দিকে মানুষের আনাগোনা কিছুটা কম হবে। কিন্তু আমার ধারণা পুরোটাই ভুল হলো। মানুষ আর মানুষ। সবাই পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে। সূর্য ডুব দিচ্ছে। আর কিছু আদম সন্তানেরা তা নির্নিমেষ দৃষ্টি দিয়ে দেখছে। আর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছে। আমি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছি এ অপূর্ব দৃশ্য দেখানোর জন্যে। এতো মানুষ আর হই-হুল্লোড় তবু পরিবেশটা আমার কাছে হালকা মনে হয়েছে। ভারী হয়ে ওঠেনি এক মুহূর্তের জন্যে-ও।

সূর্য ডুব তার সাথে সাথে সমুদ্রের ছলাৎছলাৎ ঢেউ। সূর্য ডুব দেওয়ার সাথে সূর্যের সবুজ আভা ছড়িয়ে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তে। আহা! কী অপরুপ দৃশ্য। চক্ষু শীতল পরিবেশ করে তুলেছে ডুবে যাওয়া সূর্য। কিছুক্ষণ পায়ের গোড়ালি ভিজিয়ে পাড় দিয়ে আনমনে হাঁটছি। খালি পায়ে। মাঝে মাঝে ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার কাপড় ও মন ঢেউ এসে। পায়ের নিচে মাঝে মাঝে বালি সড়ে যাচ্ছে। আহা! কী যে ভালো লাগছিলো!

শুঁটকির বাড়িঃ

বেশ কিছুক্ষণ সমুদ্রের সঙ্গ নিয়ে হেঁটে শরীর ও মন তরতাজা করে গেলাম শুঁটকির বাজারে। বিশাল মার্কেট। মানুষ যত দেখা যায় তারচেয়ে বেশি দেখা যায় শুঁটকি। হরেকরকমের শুঁটকি। ছোট থেকে শুরু করে মাঝারি বড়ো এমনকি মানুষের চেয়েও বড় শুঁটকি দোকানে টাঙিয়ে রেখেছে দোকানিরা। আমি মেপেছি, পাশে দাঁড়িয়ে মেপেছি। শুঁটকি আমার চেয়ে বড়ো! মুন ও সবুজ ভাই কিছু কিনলেন। আশেপাশে আরও কিছুক্ষণ ঘুরে হোটেলে ফিরলাম রাতদুপুরে। ঠিক এতো রাতে নয় আরেকটু আগে।

সমুদ্র বিলাস ও ঢেউয়ের আহবানঃ

ফজর পড়ে আবার চোখের পাতা নামিয়ে দিলাম। আধোঘুম আধোসজাগ। এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো। দেলোয়ার ভাই দরজা খুলে দিলেন। আমি ঘুমের ঘরে উপলব্ধি করতে পারছি কেউ একজন আমার হাত টেনে ধরে বলছেন, কাফি ভাই কক্সবাজারের সব পানি তো ফুরিয়ে গেলো। আর আপনি এখনো ঘুমাচ্ছেন। চোখের পাতা একটু উঠাতেই সবুজ ভাইয়ের হাঁক দেয়া চেহারা ভেসে উঠলো। ঘুম কি আর চোখে বসে। ফ্রেশ হয়ে অল্প কিছু খেয়ে গেলাম বিচে। স্বপ্নের সেই বিচে। বিচের সম্মুখে হরেকরকম সামুদ্রিক সাজ নিয়ে বসে আছে দোকানিরা। (যা রাতে খেয়াল করিনি) তারমধ্যে ফেডোরা কেপ অন্যতম। বিচে কেপ পরে বিচরণ করলে বেশ দেখাবে ভেবে একটা কালো ফেডোরা কেপ কিনে নিলাম। সত্যি বলতে কী, কিনলেন দেলোয়ার ভাই। কিন্তু পুরো সফরে আমিই ব্যবহার করেছি। শেষমেশ আমার কাছেই ছিলো। লোকে লোকারণ্য বিচ। মানুষের হইচই-কোলাহল আর সমুদ্রের ছলাৎ-ছলাৎ ঢেউয়ে এক অপূর্ব দৃশ্য ও মুগ্ধতার মায়াজালের বেষ্টনীতে আবদ্ধ হলাম আমি। ভাবতেই ভালো লাগে এমন এক দৃষ্টিনন্দিত ও আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র আমাদের দেশের সম্পদ। এ যেনো এক বিশাল কৃতিত্ব সোনার বাঙলার।

অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যে একটি কিটকট (চেয়ার) ভাড়া করলাম। যখন যাবো তখন ভাড়া মেটাবো। এর আগে কোনো কথা হবে না বলে কিটকট ব্যবসায়ীর কাছে সন্ধির প্রস্তাব রাখলাম। ব্যবসায়ী মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে চলে গেলো। আমি আর দেলোয়ার ভাই একটা টায়ার ভাড়া করলাম। তারা তিনজন কিটকটে। বসে সমুদ্রের হাস্যোজ্জ্বল চেহারা ও মানুষের সমুদ্র বিলাস উপভোগ করছেন। টায়ার নিয়ে লোনা পানিতে কিছুক্ষণ লাফালাফি করলাম আমরা দুজন। লবণাক্ত কিছু পানিও খেলাম আমি। কিছুক্ষণ পরপর ঢেউ এসে সাক্ষাৎ করে যাচ্ছে। আসার সময় আমাদের পৌঁছে দেয় পাড়ে। বিচের পাড়ে। কিন্তু যাওয়ার সময় বেশ জোরে টান দেয় সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। কিন্তু আমরা তার এ দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করি। বিচে আসা সবাই ফিরিয়ে দেয় তার আহ্বানকে। কারণ সবক্ষেত্রে মেহমান হতে নেই। তাই কেউই সমুদ্র ঢেউয়ের মেহমান হতে চায় না। কারণ সবাই জানে যে, এ দাওয়াতের ডাকে সাড়া দিলে আর বাড়ি ফেরা হবে না।

প্রায় আধঘন্টা লাফালাফি করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছু লোনা পানি পেটে নিয়ে ফিরলাম কিটকটে। সমুদ্রের জল এতো লোনা হয় তা আগে জানা ছিলো না। যেনো লবণের সিনিয়র। উফ! অবশ্য সমুদ্রের ফেনা থেকেই লবণের উৎপত্তি।

এবার তারা তিনজন গেলেন সমুদ্রে। আমি পা দুটো বিছিয়ে দিয়ে লম্বা হয়ে কিছুসময় পার করলাম কিটকটে। তারা তিনজন তো বেশ মজা করছেন। আমি দূর থেকে তাদের কার্যকলাপ দেখছি। চিৎকার-চেঁচামেচি-হই-হুল্লোড় শুনছি। আসলে সবুজ ভাই একজন মজার মানুষ। তাই লোভ সামলাতে না পেরে দেলোয়ার ভাইকে আমাদের সামানার গার্ড হিসেবে কিটকটে রেখে শামিল হলাম তাদের গ্রুপে। মুন ও শাওন ভাই একটু শান্ত প্রকৃতির হলেও তারাও বিচে এসে একেবারে পাঙ্খা। সবুজ ভাই সমুদ্রের ঢেউ এলেই ঢেউকে সঙ্গী করে অন্যদের গায়ে গিয়ে আচড়ে পড়ছেন।

এবার ঘণ্টাখানেক সমুদ্রের ঢেউ বিলাস করে আমরা কিটকটে ফিরে আসি। বিচে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়া দেখে উঠি তার ওপর। দেলোয়ার ভাই উঠেছিলেন কি-না এখন ঠিক মনে করতে পারছি না। তবে তারা তিনজন উঠেননি। কিছুক্ষণ ঘোড়ায় চড়ে শখ পূরণ করে যখন হোটেলে ফিরি ততক্ষণে সূর্য মাথার ওপর।

পাথুরে সৈকত ইনানীঃ

হোটেলে গোসল সেরে খানা খেয়ে একটু আরাম করার ইচ্ছায় শরীর এলিয়ে দিলাম বিছানায়। বেশ কষ্ট হয়েছে বিচে। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। তারা তিনজন ফের হাজির। যাবেন হিমছড়ি ও ইনানী। তারা খুবই স্টঙ। তাদের কথা হলো, এতো টাকা খরচ করে এখানে এসেছি কি ঘুমাবার জন্যে! অবশ্য তাদের কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু আমি যে হেরে যাই আমার দুর্বল শরীরের কাছে। সে যে অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠে। তারা তিনজন চলে গেলেন। আমরা যাবো আসরের দিকে। আগে শরীরটা চাঙ্গা হয়ে উঠুক।

আগে হিমছড়ি পরে ইনানী। বেলা তিনটে-তে আমরা সিএনজিতে উঠলাম। কক্সবাজার থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে হিমছড়ির ঝরনা। আর হিমছড়ি থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে পাথুরে সৈকত ইনানী। তাই আসার সময় হিমছড়ি হয়ে আসবো ভেবে হিমছড়ি ডিঙিয়ে প্রথমে গেলাম পাথুরে সৈকত ইনানীতে।

সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে-শুয়ে আছে আঁকাবাঁকা ছোটো-বড়ো উঁচুনিচু পাথর। আর ইনানীর মূল আকর্ষণই হলো সারিবদ্ধ পাথর। এ পাথরই হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। আর এ পাথরের কারণেই ইনানী বিচকে ‘পাথুরে সৈকত ইনানী বিচ’ বলে নামকরণ করা হয়েছে। পাথরগুলো দেখতে বেশ লাগছে। সবাই পাথরের ওপর বসে উপভোগ করছে শুয়ে থাকা সমুদ্রকে। সমুদ্রের উথাল-পাতাল ঢেউ আর তার গর্জনকে। কক্সবাজারের ঢেউ অবশ্য তিনগুণ বেশি ইনানীর থেকে। কিন্তু ইনানীর সৌন্দর্য-রুপ-নাবণ্য-আকর্ষণ সবই পাথরে। একই সমুদ্র হলেও স্থানের ভিন্নতায় উপভোগটাও ভিন্ন। এর স্বাদ অন্য। (কিন্তু শুনা যাচ্ছে এখন নাকি সেই পাথর ইনানীতে আর নেই।)

সমুদ্রের পাশেই চার চাক্কাঅলা বিশিষ্ট ছোট্ট গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। অনেকগুলো। উঠলাম আমরা দুজন একটাতে। কিন্তু মালিকই গাড়ির ড্রাইভার। তাদের নির্দিষ্ট জায়গা অনুযায়ী এক রাউন্ড দিলো। শেষমেশ আমাদের রিকোয়েস্টে ড্রাইভার নামলো। আমরা দুজন গাড়িতে। প্রথম দেলোয়ার ভাই পরে আমি ড্রাইভ করলাম। কিন্তু গাড়িটার নাম অজানাই থেকে গেলো।

পাথরের ওপর বসে আছি। নিচে পানি। সচ্ছল পানি। নিচের ছোটো-ছোটো পাথরগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। ছবি তুলতে গিয়ে মোবাইল গেলো পড়ে। আমাদের হাসি মুখ অনেকটাই হাঁড়িমুখ বনে গেলো। তবু আমি দেলোয়ার ভাইকে বুঝতে না দেয়ার চেষ্টা করলাম। আর তিনি আমাকে!

হিমছড়ির চূড়ায় অপরুপ দৃশ্যের মেলা বসেঃ

সময় আর হাতে বেশি একটা নেই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। সূর্য চাঁদকে আহ্বান জানাবে খানিক বাদে। দ্রুত সিএনজিকে ছুটালাম হিমছড়ির দিকে।

পৌঁছলাম মাগরিব লগ্নে। এ সময় হিমছড়ির চূড়ায় উঠে কিছুই উপভোগ করা যাবে না ভেবেও টিকিট কাটলাম। পাহাড়ের বুক কেটে পাকা সিঁড়ি মাড়িয়ে আমরা ওপরে উঠছি। আর সবাই নিচে নামছে আমাদের দিকে চেয়ে চেয়ে। চূড়ায় ওঠে আমি অপলক নেত্রে তাকালাম পশ্চিম আকাশে। কী অপরুপ বিস্তৃত সমুদ্র। আর পুব আকাশে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি পাহাড়। কিন্তু আমাকে টেনেছে পশ্চিমের দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র। সমুদ্রের যে আলাদা রুপ হয় তা আমি এখানে না আসলে কোনোদিন ঠাহর করে পারতাম না বোধহয়। ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আমায় আপ্লুত করেছে। ঢেউয়েরা খেলা করছে হেসে হেসে। মাগরিবের আজান সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে মিশে ভেসে আসছে আমার কানে। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম হিমছড়ির চূড়া থেকে সমুদ্রের কলতান ও পবিত্র আজানের সুমধুর ধ্বনি শোনে। ইশ! আরেকটু আগে আসলে কী যে ভালো হতো! এখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। অন্ধকারে আবছা আবছা যেটুকু দেখেছি মনের আয়নায় ছবি এঁকে ফেলেছি। যে ছবি এখনো আঁকা আছে আমার স্মৃতির আয়নায়। আমি সত্যি পাহাড়-সমুদ্রের ছোঁয়ায় উদ্বেলিত হয়েছি সেদিন। কেউ যদি বঙ্গোপসাগরের লাবণ্যময় রুপ দেখতে চায় সে যেনো হিমছড়ির চূড়ায় উঠে পশ্চিম আকাশে দৃষ্টি ছুড়ে। সে মুগ্ধ হবে। আপ্লুত হবে দিগন্ত বিস্তৃত সমুদ্র দেখে। আনন্দিত হবে সমুদ্রের কলতান ও ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শোনে। আর যদি ঢেউয়ের সাথে আজানে ধ্বনি কানে বাজে তাহলে তো…! সবশেষে হোটেলে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা বেজে যায়।

ও… বলাই তো হয়নি হিমছড়ির ঝরনার কথা। ইনানী যাওয়ার সময় হিমছড়ির ঝরনা দেখতে নেমে ছিলাম। কিন্তু দেখতে পাইনি। পাবো কীভাবে ঝরনা যে শুকিয়ে ছিলো। তার যৌবনের উত্তেজনা ছিলো না তখন।

সাবাড় সফর বার্মিজ মার্কেটঃ

এশা পড়ে একপ্রকার জোর করেই আমাদের বার্মিজ মার্কেট নিয়ে গেলেন সবুজ ভাই। কক্সবাজার আসলেন আর বার্মিজ মার্কেট ঘুরবেন না তা কি করে হয়!

ঢাকা থেকেই বার্মিজ মার্কেটের অনেক নামডাক শুনা যাচ্ছিলো। ভাবতাম হয়তো মার্কেট বার্মিজ দিয়ে ভরপুর। কিন্তু মার্কেটে এসে দেখি কী নেই মার্কেটে! বাহারি রকমের কাপড়চোপড় চাদর, শাল, রঙবেরঙের শাড়ি। শীতের কাপড়ই বেশি। কেননা পর্যটনকেন্দ্রগুলো শীতেই জমজমাট হয়ে ওঠে।

১৯৬২ সালে এক রাখাইন উদ্যোগী মহিলা সেখানকার বার্মিজ প্রাইমারি স্কুল সংলগ্নে নিজের বাড়ির সামনে ছোট্ট পরিসরে তাদেরই উৎপাদিত রাখাইন হস্তশিল্পের চাদর, শাল, ব্যাগ, লুঙ্গি ইত্যাদি মালামাল নিয়ে বসতেন। আর দেশি বিদেশি কক্সবাজার পর্যটকরা এ মহিলার দোকানে বাহারি রকমের হস্তশিল্পের মালামাল কিনার জন্যে ভিড় জমাতো। সেখান থেকে ধীরে ধীরে সর্বজন স্বীকৃত বার্মিজ স্টোরের সূচনা। যদিও প্রথমে বার্মিজ পণ্য তেমন একটা ছিলো না কিন্তু পরবর্তীতে বার্মিজ পণ্যের আমদানি হয়।

বার্মিজ স্টোরগুলোতে হস্তশিল্পের মালামাল থাকায় মানুষের আকর্ষণ বেশি। কারণ, মেশিনের তৈরির থেকে হস্তশিল্পের তৈরি কাপড়চোপড়ের আকর্ষণ বেশি। দৃষ্টিনন্দিত হয়ে ওঠে বেশি। তাই মানুষও ঝুঁকে বেশি। আর কতোরকমের, কতোধরনের, কতোরঙের, কতো কিছুরই না আচার! কিনবো আর কী, দেখেই পেট পুরে গেলো। কিন্তু সবুজ ভাই ব্যস্ত অন্য ধান্দায়। মার্কেটের বেশিরভাগই দোকানি চাকমা। তারা বাংলা বলতে পারে। তার চেয়ে বড়োকথা হলো, কয়েকটা দোকানি পুরুষ ছাড়া বাকিসব চাকমা মহিলা, যুবতী, উড়তি বয়সী মেয়ে। বিশেষত, চাদর শালের দোকানিরা। আর আমার মনে হয় এজন্যই হয়তো বার্মিজ মার্কেট এতো জনপ্রিয়। এজন্যই কক্সবাজার কেউ এসে বার্মিজ মার্কেট আসবে না এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কারণ,কক্সবাজার আসলেই কোনো না কোনোভাবে নাকে কানে বার্মিজ মার্কেটের নামগন্ধ আসবেই।

সে যাইহোক, সবুজ ভাই আমাদের মধ্যে থেকেও নেই। তিনি কখনো এ দোকানে তো কখনো ওই দোকানে। কিনবে না কিছুই। তবু…। আমরা অনেকক্ষণ ঘুরে কয়েক পদের আচার কিনে হোটেলে ফিরলাম বেশ রাতে।

পরদিন তারা তিনজন চলে গেলেন রাঙামাটি। আমরা যাইনি। এর কারণ আমি। বাবার বারণ থাকা সত্ত্বেও জেদ ধরে ঘর থেকে বের হয়েছি। শুরুতে ধাক্কাও খেয়েছি। না! আর থাকতে ইচ্ছে করছে না। যতো দ্রুত ঢাকায় ফিরতে হবে। মায়ের কোলে। দেলোয়ার ভাই খুব জোর করলেন। কিন্তু আমি শক্ত রইলাম। তার প্রবল আগ্রহ ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও যেতে পারেননি রাঙামাটি। সেন্টমার্টিনও যেতে চেয়েছিলেন। না যাওয়ার কারণ, আমি। আমাকে একা ঢাকা পাঠিয়ে তিনি তো তাদের সঙ্গে ঘুরতে পারেন না। আমরা দুজন একসঙ্গে এসেছি।

আমারও বেশ ইচ্ছে ছিলো রাঙামাটি সেন্টমার্টিন ঘুরে দেখার। কিন্তু আমার কী যে হলো। মন ঢাকার দিকে ঝুঁকছিলো বারবার। আমার কারণে দেলোয়ার ভাইও বঞ্চিত হলেন আরো কিছু আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র দেখা থেকে। উপভোগ করা থেকে। তিনি চেয়েছিলেন একবারে কয়েকটা পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে যাবেন। সবসময় তো আর আসা যায় না বা সময়ও হয়ে ওঠে না। তা আর হলো কোথায়!

সারাদিন গেলো সিট পেলাম না বাসের। সকাল ঘনিয়ে দুপুর-বিকেল হয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো বাস কাউন্টারে আমরা বসে আছি। আমার কপালটাই খারাপ। সময় মতো কিছুই পাই না। শেষমেশ হানিফ বাসের সিট পাওয়া গেলো। রাত ন’টা বা দশটায় বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো।

ঘুম ভেঙে নতুন ঘুম দিই। বাসে আর কতো ঘুমানো যায়। রাতের বেলাও ফুরিয়ে গেলো প্রায়। তবু রাস্তা ফুরায় না যেনো। যাওয়ার সময় বিমানে যাওয়ায় ঠাহর করতে পারিনি রাস্তার দীর্ঘ শরীর। কিন্তু এখন ফেরার পথে বুঝতে পারছি কত দূরেই না গিয়েছিলাম। পরিশেষে যখন বাস সায়দাবাদ এসে দাঁড়ালো তখন চেনা শহরের ব্যস্ততা শুরু।