সিলেটকে শহর বলতেই আমার ভালো লাগে। শহর মানে ক্যামন একটি শান্ত সৌম্য চেহারা-ছবির মতো একটি জনপদ; চারপাশে গাছগাছালি, প্রতিটি বাড়ির আগে-পিছে, ডানে-বামে ফাকা জায়গা; বাড়ির সামনে অনেকগুলো গাছ দাঁড়িয়ে-প্রয়োজনীয় অথবা অপ্রয়োজনীয়। কোথাও বাড়ির সামনে ছোটখাটো জঙ্গল, বেটনের ঘরবাড়ি। রাস্তায় নেই কোন যানজট, টুংটাং ঘন্টি বাজিয়ে ছুটে চলেছে রিকসা। পরম মমতায় জড়িয়ে আমার শহর-রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি খাল, পাহাড়ি খালকে আমরা বলি ছড়া। কতো ছড়া আমাদের শহরে-মালনীছড়া, গোয়ালি ছড়া, গাবিয়ার ছড়া। ছড়ার জল ছিলো স্বচ্ছ, জলের নিচের বালিও দেখা যায়, ঘুরে বেড়াচ্ছে ডানকানা মাছ। দল বেঁধে পায়ে হেটে পাঠশালায় যাওয়া, আরো কতো কি, হয়তো এইসব নস্টালজিক কারণে সিলেটকে আমি শহর ভাবতেই ভালোবাসি।
আমাদের প্রিয় এই শহরটার পরিচিত একটা মুখ সাঈদ চৌধুরী। সবাই তাকে জানে সাংবাদিক। কিন্তু এই পরিচয়টা ছাপিয়ে তার আরো অনেক পরিচয়, সবটিই প্রধান। তিনি একজন লেখক, কবিতা লেখেন, ফিচার লেখেন, নানা জনের জীবনকথা লেখেন। অবাক বিস্ময়ে দেখি ফেইসবুকে প্রতিদিনই একটি লেখা ছাড়ছেন। তাজ্জব কা বাত, এতো সব লেখেন কখন। বই বেরিয়েছে-উপন্যাস ছায়াপ্রিয়া, প্রবন্ধ গ্রন্থ সুনিকেত, সাক্ষাৎকার কালজয়ী কবিতার স্রষ্টা আল মাহমুদ, কবিতাগ্রন্থ আত্মার অলিন্দে, আরব জাহান নিয়ে স্মৃতিময় লেখা ধুসর মরুর বুকে, বিলেত নিয়ে লেখা লন্ডনে যাপিত জীবন, সাহিত্য আলোচনা সমকালীন সাহিত্য ভুবন ইত্যাদি। আবার ইউনাইটেড এয়ার নামে সিলেটিদের প্রথম এয়ারলাইন ব্যবসার সূচনাকারীদের তিনি একজন। তিনি ছিলেন সেই বিমান কোম্পানির একজন ডাইরেক্টর। সিলেটে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ‘ব্রিটিশ-বাংলাদেশ স্কুল এন্ড কলেজ’র সূচনা তার হাত দিয়ে। ইংল্যান্ড থেকে ২০০১ সালে তার সম্পাদনায় বের হয়েছে সাপ্তাহিক ইউরো বাংলা নামের পত্রিকা। ২০০০ সালে বিলেতে প্রতিষ্ঠা করেন সংবাদ সংস্থা মিডিয়া মহল। প্রকাশ করেছেন ইউকে-বাংলা ডাইরেক্টরি, ইউকে-এশিয়ান রেস্টুরেন্ট ডাইরেক্টরি ও ইসলামিক সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) ৫৭ টি দেশের তথ্য নিয়ে মুসলিম ইনডেক্স। সাঈদ চৌধুরী রিসোর্ট ব্যবসা করেছেন। ব্যবসায় লস খেয়েছেন, লাভ করেছেন। নানা প্রতিকুলতার বাঁধ ভেঙ্গে প্রবাহমান নদীর মতো তিনি। কবি আল মাহমুদ চমৎকার বলেছেন,‘সাঈদ চৌধুরী একজন পরিশ্রমী এবং উদ্যমশীল ব্যক্তি। […] তাছাড়া সাংবাদিক, সাহিত্যিক এবং সংগঠক হিসেবেও বাংলাদেশের সিলেট এবং প্রবাসে যথেষ্ট সুপরিচিত। পর্যটন শিল্পেও রয়েছে তার বিশেষ অবদান। আর মানুষ হিসেবে তিনি পরোপকারী এবং বন্ধু বৎসল। আমি তাকে কাছের এক বন্ধু বলেই গণ্য করে এসেছি, অনেকদিন ধরে। সহজেই মানুষকে আপন করে নেয়ার শক্তি সাঈদ চৌধুরীর আগেও ছিল, এখনও আছে।’
সাঈদ চৌধুরী আর আমি, এই শহরে কতো দিন আমরা একসাথে কাটিয়েছি। কতো সন্ধ্যে পেরিয়ে গভীর রাতে ফিরেছি বাসায়। একবার তো মোটর সাইকেল এক্সিডেন্ট করে মরতে মরতে বেঁচে গেলাম। শরীরে কোন ক্ষত নেই দুজনের, কিন্তু এক ইঞ্চি এদিক-সেদিক হলো, হয়তো আজ আর কি-বোর্ড ঠুকে ঠুকে এইসব কথা লেখা হতো না। সাঈদ চৌধুরী রেমিটেন্স যোদ্ধা থেকে এখন প্রবাসী, ব্রিটেনের রানির দেশের নাগরিক, সাদা চামড়া ব্রিটিশদের মতো তিনিও একজন ব্রিটিশ, ইচ্ছে করলে ব্রিটেনের এমপি হবার চেষ্টা করতে পারেন, কপালে থাকলে পার্লামেন্টের মেম্বার হতে পারবেন।
সেদিন তো অবাক করে দিলেন তিনি, অনলাইনে প্রকাশিত এক ডজন গল্পের লিংক দিয়ে। কবিতার পরিশ্রমী চাষী জানতাম, ছায়াপ্রিয়া নামে তার একটি উপন্যাসও বেরিয়েছিলো। বইটির পেছন পাতা জুড়ে লেখা তার পরিচিতিটুকুন আমি লিখেছি। তখন লেখতে লেখতে ভেবেছিলাম, ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে তিনি যেভাবে জড়াচ্ছেন, গদ্য লেখার ফুরসত তার আর মিলবে না। তবে ভালো হোক আর মন্দ হোক-কবিতা তাকে ছাড়বে না, তিনিও কবিতাবিহনে কাটাবেন না প্রহর। কিন্তু আমার ধারনাকে থমকে দিয়ে পরিচয় হলো তার এক ডজন গল্পের সাথে। ছেলেবেলায় একটি শব্দ শিখেছিলাম-নাতিদীর্ঘ, মানে খুব একটা লম্বাও না, আবার বাট্টিও না। তার গল্পগুলোও সেই নাতিদীর্ঘ, পড়া যায় একটানে, গল্পের পরিবেশ-প্রতিবেশ ইংল্যান্ড এবং বাংলাদেশের সিলেট। গল্পগুলোর ওপর এক নজর চোখ বুলিয়ে নেয়া যায়।
আলোক ঝর্ণাধারা গল্পটিতে জীবনের বেদনার বালুকাবেলায় আনন্দের ফুল ফুটিয়েছেন লেখক। সাঈদ চৌধুরীর জীবন সূচনা সিলেট শহরতলীর শিবের বাজার এলাকার নোয়াগাঁও। তারপর প্রায় দেড় যুগের ইংল্যান্ড প্রবাস জীবন। তার ব্যক্তিগত জীবন-যাপনের ছায়া উড়ে উড়ে বসেছে গল্পের গা-গতরে। গল্পটিতে পরিবেশ-প্রতিবেশ এসেছে ইংল্যান্ড-সিলেটের। গল্পের পাত্রপাত্রীদের বাস ‘পশ্চিম লন্ডনের অভিজাত এলাকা লিন্সটার গার্ডেনের মতো। হাইড পার্ক থেকে সামনে এগোলে, বেস ওয়াটার ও কুইন্স ওয়ে টিউব স্টেশন থেকে অদূরে লিন্সটার গার্ডেন।’ আবার গল্পের পাত্র যখন সিলেট আসেন, তখনÑ‘সিলেট শহরের প্রান্ত সীমায় তারা থাকেন। এ পাড়ায় অসংখ্য বানরের বসবাস। চাষনী পীরের মাজারের টিলায় বংশ পরম্পরায় বাস করে আসছে এই বানরগুলো। জিয়ারতে আসা মুসল্লিদের দেয়া খাবার খেয়ে টিলার নিরাপদ গাছ-গাছালিতে আশ্রয় নেয়।’ সিলেটের অনেক মানুষের নিজের শহর দুটো-লন্ডন আর সিলেট। সাঈদ চৌধুরীর গল্পটিতে দৃশ্যপট এসেছে লন্ডন-সিলেট-এর। গল্পের মুল কাহিনী হচ্ছে-পলাশ নামের একজন ইংল্যান্ড প্রবাসী তার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে ইংল্যান্ড থেকে সিলেটে এসেছেন। দেশে তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়। তার সন্তানেরা ভেবেছিলো তাদের বাবা আবার বিয়ে করবেন। তিনি বিয়ে না করে নিজের ছেলে ও মেয়েকে তাদের পছন্দের মানুষের সাথে বিয়ে দিয়ে সারা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বইয়ে দেন-‘আলোক ঝর্ণাধারা’।
গল্পটিতে লেখক দৃশ্যের বর্ণনা করেছেন-‘সাত রঙের মেলবন্ধনে আলোক ঝর্ণাধারা সবার নজর কাড়ে। জলপ্রপাতের সামনে দাঁড়ালে যেমনটি দেখা যায়। পাথর-শ্যাওলা-জলজ উদ্ভিদ এবং লাল, নীল, সাদা, হলুদ, সবুজ, কমলা ও গোলাপী রঙের অসাধারণ সমারোহ। এক কথায় লিকুইড রেইনবো বলা যেতে পারে।’
মায়ের অভাব বুঝাতে লেখক গল্পে একজন সৎমাকে টেনে এনেছেন। সেই সৎমার নির্যাতনের শিকার একটি শিশু পাঠকের চোখ ভিজিয়ে দেয় খানিকের তরে-‘সবচেয়ে অদ্ভুত, অনেক মহিলা এদিক-ওদিক দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ কিছু বলেনি। ছোট্ট মেয়েটি যেন খুব অসহায়, নিরুপায়। হানিফা মেয়েটিকে কোলে নিয়েছিলো। সে তখন ফুপিয়ে কাঁদলো। মনে হল অনেকদিন পর একটু আদর পেয়েছে।’
গল্পটিতে জীবনের ব্যথা-সমস্যার পরিবর্তে প্রশান্তির কামনা সবসময় লেখকের। এজন্যে তিনি যেন পুরো জটিলতা পরিহার করে ‘বাবার হৃদ্যতাপূর্ণ কথামালায় বিস্মিত হয় ছেলে-মেয়ে। নিজেদের ভেতরের ভুল ধারণার জন্য লজ্জাবনত হয়। অনুতপ্ত হৃদয়ের মৌনতায় কিছুই বলতে পারেনি।’ জীবনের সকল চাওয়ার পূর্ণতায়, বাবার ত্যাগ-মহানুভবতা পরিবারটিতে আলোক ঝর্ণাধারা বইয়ে যাওয়ায় গল্পটির ‘আলোক ঝর্ণাধারা’ নামকরণ সার্থক হয়েছে।
‘সৌভাগ্যের স্বর্ণ সুড়ঙ্গ’ গল্পটিতেও একটি লন্ডন প্রবাসী পরিবারের কথা। সাংবাদিকতার ছাপ সহজে সাঈদ চৌধুরী ঝেড়ে ফেলতে পারেন না, এই গল্পটিতেও তা পরিলক্ষিত হয়। প্রতিদিনকার সংবাদ লেখার মতো তিনি লিখেছেন ‘প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর সিলেটে পেট্রল ও গ্যাস ছাড়াও রয়েছে উন্নতমানের বালু, চুনাপাথর, নুড়িপাথর ও কয়লা। সারা দেশে আনুমানিক ১০ হাজার কোটি মেট্রিক টন চুনা পাথর থাকার সম্ভাবনা আছে। বৃহত্তর সিলেটের টেকেরঘাট এলাকায় ইয়োসিন যুগীয় চুনাপাথর পাওয়া গেছে। কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকতে হাজার হাজার কোটি টাকার খনিজ পদার্থ রয়েছে। খনিজের প্রাক্কলিত মজুদের পরিমান ৪৪ টন। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মূল্যবান খনিজ, বালি জিরকন, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট ও রুটাইল উত্তোলন করা যেতে পারে।’ গল্পটিতে সিলেটের একটি গ্রামের শীতের সকালের চিরচেনা একটি দৃশ্য লেখক বর্ণনা করেছেন-‘আনাসের গ্রামের বাড়ি অনেক বড়। অসংখ্য গাছপালায় ভরপুর। বর্ষা এলেই প্রকৃতি শ্যামল সবুজে সাজে। ফল-ফুলের গাছ ছাড়াও নানা ধরনের সবজি। এই বাগান থেকে শাক-সবজি তুলতে গিয়ে বরকত ও ফারিহা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। সবজি বাগানে প্রতিদিন পানি দিতে হয়। আবার ভারি বৃষ্টিতে ক্ষতি যাতে না হয়, সেভাবে পানি নিষ্কাশন করতে হয়। মাটি যেন ঝুরঝুরে থাকে।’ গল্পের নায়ক আনাস নামক এক তরুণের মাধ্যমে লেখক বাংলাদেশের আশাবাদী মানুষের স্বপ্নের কথা বলেছেন। ম্যাসেজ দিয়েছেন সৎসঙ্গের, সেটা রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার-ব্যক্তি প্রতিটি ক্ষেত্রে। লেখক গল্পের সমাপ্তি টেনেছেন-‘বাংলোতে এখন ঘুমালেও সুদর্শন সেই লোকটিকে আর দেখতে পায়না আনাস। তবে একবার কে যেন ভ্রুকুটি করে বলেছে, তুমি নিতান্তই হতভাগা। সঙ্গদোষে বঞ্চিত হয়েছো। সৌভাগ্যের প্রসূতি তোমার জন্য স্বর্ণ সুড়ঙ্গের সন্ধান নিয়ে এসেছিল। আনাস আজো ভাবে, সত্যিই কী তাই ছিল।’
‘শুভ্র সাদায় আচ্ছাদিত’ গল্পটি লন্ডন প্রবাসী এক তরুণীর কথা। গল্পে এসেছে ইংল্যান্ডের সেই চিরচেনা বরফ পড়ার ছবিÑ‘সময়টি ছিল মধ্য জানুয়ারি। হঠাৎ করে প্রচন্ড তুষারপাত শুরু হল। বাড়ির ছাদগুলি শুভ্র সাদায় আচ্ছাদিত। জানালা দিয়ে যতদূর দেখা যায় সাদা আর সাদা। ঘরের পেছনের গার্ডেন কাশ্মিরী মখমলের বিছানায় রূপ নিয়েছে। সামনের রাস্তা জুড়ে এবং অলিতে-গলিতে বরফের সাদা স্তুপ পড়ে আছে।’ গল্পটি সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহ মহামারী করোনাকালের পটভূমিতে লেখা। ফারহানা নামের একটি মেয়ে যার বাবার মৃত্যু হয়েছে করোনায়, বরফপড়া দুর্যোগকালে যার মা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে; নিজের নেই একটি চাকরি। কিন্তু নিজের বিপর্যয়-দুর্ভোগ সত্বেও মেয়েটি তুষারপাতের দুর্যোগে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। ফারহানার মতো একটি সাধারণ মেয়ে নিজের আন্তরিকতার কারণে হয়ে উঠে অসাধারণ। তার কাজ রাতারাতি বদলে দেয় তার জীবন। লেখক বলতে চেয়েছেন জীবনে শুধুমাত্র নিরবচ্ছিন্ন বেদনার লাভা বয়ে যায় না, লাভাস্রোত থমকে দিয়ে জেগে উঠে আনন্দের পাহাড়। মোট কথা জীবনের নানা সংকটকে লেখক এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন জীবনানন্দের মতো-‘কে হায় হৃদয় খুড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?’ তাই যেন মেয়েটিকে একটি ভালো চাকরি পাইয়ে দিয়ে ফারহানার আনন্দে লেখকও অবগাহন করেছেন। ফারহানা নামের মেয়েটি একটি চাকরি পেয়ে যায়। আর এজন্যে-‘ ভোরে যখন তাদের ঘুম ভাঙ্গে, তখন ফারহানার মা অলৌকিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেছেন। চিৎকার করে বলছিলেন, স্বপ্নে স্বর্গদূত তার প্রতি মমতা জানিয়েছেন। তার স্বামী এক ঝর্ণা দিয়ে হাঁটতে দেখেছেন। ফুলে-ফলে ভরা শুভ্র সাদায় আচ্ছাদিত এক বাগানে তিনি বিচরণ করেছেন। স্বর্গ থেকে যেন তার পাশ দিয়ে বইছে সফেদ ঝর্ণাধারা।’
সাঈদ চৌধুরী ইংল্যান্ডে করোনায় বিপর্যস্ত ইংল্যান্ডকে অনুভব করেছেন রক্তে মাংসে, বলা যায় মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। এজন্যে তার ‘নির্বাক মুগ্ধতায়’ গল্পটিতেও এসেছে করোনাকালের কথা। প্রযুক্তি-অর্থনীতিতে এগিয়ে থাকা দেশে দেশে বিয়ের প্রতি তরুণীদের অনীহার বিষয়টি এই গল্পের মুল বিষয়। কিন্তু বিয়ে প্রশান্তির একটি চাবিকাঠি, লেখকের বিশ্বাস-বাস্তবতা তুলে ধরার জন্যে লেখক নানা সূত্র থেকে তথ্য-তত্ত্ব এনে গল্পটি সাজিয়েছেন। এইসব জোড়া দিতে দিতে গল্পটির বড়ো একটি অংশ প্রবন্ধের রূপ ধারণ করেছে। গল্পের নায়িকা সাবিহা বিয়ের বিপক্ষে। তার কাছে এ নিয়ে নানা যুক্তি। গল্পের নায়ক মারওয়ানের সাথে একটি অনুষ্ঠানে তাদের আলাপ চলছিলো। বিয়ের পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে তর্কাতর্কি। লেখকের কল্যাণকামী চিন্তা বিয়ের পক্ষে, তিনি বিয়ের পক্ষে নানা যুক্তি গল্পের নায়ক মারওয়ানের মাধ্যমে সাবিহার কাছে তুলে ধরেছেন। এজন্যে ‘অনুষ্ঠানটি সাবিহা ও মারওয়ানের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এতক্ষণে পরস্পরকে গভীরভাবে জানা হয়ে যায়। বুঝাবুঝির নতুন মাত্রা লাভ করে। নির্বাক মুগ্ধতায় তারা হয়ে ওঠে রোমাঞ্চিত।’

‘বাসকিউন্স ভুত’ আর ‘ভুতের অট্টহাসি’ দুটো গল্পই ভুত নিয়ে। গল্প দুটোর একটির পরিবেশ-প্রতিবেশ ইংল্যান্ড আর অপরটি বাংলাদেশ। ‘বাসকিউন্স ভুত’ গল্পটি লন্ডনের টাওয়ার ব্রিজ অতিক্রমকালে টেমস নদীতে একটি জাহাজের আটকে যাওয়া। তারপর যা হবার, ব্রিজের দু’পাশে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ যানজট। লোকজন চেন্জ করে তাদের রুট। সেই ব্রিজ এলাকায় একজন সাংবাদিককে ইংল্যান্ডের নানা স্থানের নানা সময়ের ভৌতিক ঘটনা বলছিলো জন নামের এক ইংলিশ। জন নামের সেই লোকটি ভুতের গল্প বলতে বলতে হঠাৎ দৌড়াতে শুরু করে, ভয়ের কাঁটা ফুটে উঠে সাংবাদিকের মনে-‘হঠাৎ এভাবে দৌড়ে পালানোর বিষয়টি ভাবতে গিয়ে আমার শরীরটা কেমন যেন শিউরে ওঠে।’
‘ভুতের অট্টহাসি’ গল্পটি বাংলাদেশের একটি গ্রামের পটভূমিতে, গ্রামটি লেখকের চিরচেনা একটি গ্রাম। এখানে লেখক ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে জিনের অস্তিত্ব প্রমাণ এবং আয়াতুল কুরসী পাঠ করে ভুতের ভয় তাড়ানো-স্বস্তি লাভের কথা বলেছেন। মোট কথা লেখক তার বিশ্বাসের কথা জানান দিতে সতত তৎপর।
‘মানবিকতা’ গল্পটি বাংলাদেশের গ্রামীণ পটভূমিতে লেখা। গ্রামীণ জীবনের জটিলতা ফুটে উঠেছে। তুচ্ছ বিষয়ে ঝগড়া-ঝাটি বাধিয়ে গ্রুপিং সৃষ্টি করে আধিপত্য বিস্তার, নানামুখী ষড়যন্ত্রের টুকরো টুকরো ছবি ফুটে উঠেছে গল্পটিতে। মানুষকে ফাঁসানোর কথা এসেছে-‘সে ফিরে আসার আগেই খবর আসে, ছমরু পুলিশ নিয়ে এসেছে। বৈঠক থেকে সবাই পালিয়েছে। দুপুরে আচমকা হানা দেয় পুলিশের এনফোর্সমেন্ট টিম। ৫ কেজি গাঁজা ও ৩ টি দেশীয় অস্ত্রসহ দুইজনকে আটক করেছে। পুলিশের অপারেশনে উত্তেজনা প্রশমিত হয়। কিন্তু ভাবার বিষয় হল, পুলিশ দা ও ছুরি পেয়েছে। এটা না হয় দেশীয় অস্ত্র। গাঁজা পেল কোথায়? অন্যদিন কোন ভাল লোককে আবার ফাঁসিয়ে দেবে নাতো?’
স্ঈাদ চৌধুরীর গল্পগুলো পাঠ করে অনুভূত হয়েছে, তিনি একজন পরিশুদ্ধ সমাজকামী। মানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই তিনি তার গল্পে জীবনের ক্লেদ, অবক্ষয়, হতাশা উপেক্ষা করে মানুষের সৌন্দর্যকেই হাতড়ে ফিরেছেন। ছোটগল্পের ব্যাকরণ ব্যাহত হচ্ছে কিনা সেই কথাটি ভাবার চেয়ে তার বড়ো নজর মানুষের সম্ভাবনা, স্বপ্ন, সুস্থতা, মানুষের ভেতর জ্বলে ওঠা আলো, সৌন্দর্যবোধ জাগ্রত করার প্রতি। এজন্যে দেখা যায় ‘মানবিকতা’ গল্পের সমাপ্তি টেনেছেন-‘ গল্পটি উপস্থিত সকলের জীবনের বাঁক ঘুরিয়ে দেয়। তারা সকলে মিলে গ্রামে মানবিক সহায়তা ও মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টির কর্মসূচি চালু করেন। গ্রাম জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষার আলো। ঘুরে দাঁড়ায় মানুষ। রুখে দেয় অন্যায় ও বৈষম্য।’ সবগুলো গল্পতেই লেখক চেয়েছেন পাঠককে ম্যাসেজ দিতে। শত ক্লেদের মধ্যেও মানুষের আছে ভালোবাসা-অনুভিূতির গভীর প্রকাশ। জীবনের সুকোমল ফুলেল দিকের উপরই লেখক আলো ফেলেছেন। এজন্যে গল্পগুলোর ভাবমধুর দিকগুলো ভালোবাসার কাঙ্গাল জনের মনে খানিকটা হলেও সঞ্চার করবে রস, সন্দেহ নেই।
পাণ্ডুলিপিটির শেষ গল্প ‘হাতপাখা ও পাখির ছানা’। গল্পটা লেখকের আত্মজৈবনিক। এটি চিরন্তন গ্রামবাংলার একটি সাম্প্রতিক ছবি। চিরাচরিত গ্রামীণ জীবনে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। শহরতলীর একটি গ্রামের বনেদি একটি পরিবার। পরিবারের সদস্যরা নানা স্থানে ছড়িয়ে। তারা গেট টুগেদার করছেন বৃষ্টিভেজা একটি ঝড়ো দিনে নিজেদের গ্রামের বাড়িতে। অনেকদিন পর পর তারা ভাইবোনেরা এইভাবে মিলিত হন। স্মৃতি হাতড়ে ফেরেন। সেই বৃষ্টিভেজা দিনটিতেও তারা কথা বলছিলেন দাদার পুরনো পালংক নিয়ে, সেই শীতল পাটি, হাতপাখা, হুক্কা-স্মৃতিসব মিষ্টি আতর হয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো তাদের। চারপাশে প্রতিনিয়ত কতো উলট-পালট, কিন্তু এরপরও কিছু মানুষ তার অতীতকে ভুলতে পারেনা। ভাপা পিঠার চমৎকার সোয়াদ, যা তাদের জিহ্বা থেকে সহজে মুছে যায় না। অতীতের স্মৃতি উদ্দীপ্ত করে উজ্জীবিত করে। গল্পটিতে ফুটে উঠেছে. শহরে মানুষের ক্যামন একটি বন্দী জীবন, কিন্তু এখনো গ্রামগুলো মুক্ত, এখনো রয়েছে প্রাণের ছোঁয়া। আজো গ্রামে আসেন কুটুম, গ্রামের লোক নিয়ে আজো জমে আড্ডা বাংলোঘরে। গ্রামজীবনের এইসব টুকরো টুকরো ছবির পাশাপাশি বাড়ির একটি গাছে পাখির বাসা, তার ছানাদের কথা বলতে বলতে লেখক জীবনের চরম সত্য উচ্চারণ করেছেন, আদনানের পাখি পুষা নিয়ে। আদনান নামের তাদের পরিবারের একটি শিশু শহরে এসে তাদের গ্রামের বাড়িতে দেখা সেই পাখির মতো দুটো পাখি নিজে পুষতে শুরু করে, দারুন যত্ন। পাখিগুলো ছানা দেয়। এতো কিছুর পরও একদিন পাখিগুলো একে একে উড়ে চলে যায়। এযেন মানুষের চিরন্তন জীবনকথা, মানুষও এইভাবে ধীরে প্রিয়জনদের ছেড়ে চলে যায় দূরে। একদিন মানুষও হয় দূরের পাখি। সেই পাখির স্বজনেরা ঝরায় চোখের পানি-আমার সোনার ময়না পাখি, কোন দেশেতে গেলা উইড়্যা রে দিয়া মোরে ফাকিরে, আমার সোনার ময়না পাখি…