সাজজাদ হোসাইন খান
প্রিয়বরেষু,
সপ্রীতি অভিনন্দন জেনো।

এম্নি না। তোমার সম্পাদিত ত্রৈমাসিক ‘কলম’ পত্রিকার নবপর্যায় পঞ্চম সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে- এই আনন্দ-সংবাদে।। শিশুসাহিত্যিক হিসেবে তুমি কৃতী। সম্পাদক হিসেবেও সমান কৃতী। তোমার সম্পাদিত- তা দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য সাময়িকী হোক, কি ‘কলমে’র মতো লিটল ম্যাগাজিন- তুমি সবসময় একটি পরিশীলিত রুচির পরিচয় দিয়ে চলেছ। বিশেষ করে আমি জানি, ‘কলমে’র মতো একটি পত্রিকা আমাদের মতো দেশে বের করে যাওয়া কতো কঠিন! উৎকৃষ্ট রচনা পাওয়া যায় না, বিজ্ঞাপন মেলে না, পাঠক নেই; তার মধ্যেও গাঁটের কড়ি খসিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করে তুমি যে ‘কলম’ বের করছ, এর জন্যে অভিনন্দন তোমার সাহিত্যপাঠক মাত্রেরই কাছ থেকে পাওনা। আমাদের মতো সাহিত্যজীবীরা তো আপনি করবে। বিশেষ করে তোমার পত্রিকার অতীত একটি সংখ্যা কবি জসীমউদ্দীন সংখ্যাটি একটি সুপরিকল্পিত চমৎকার সংখ্যা। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের পরে যে কবিকে এক-ডাকে চেনে সবাই, তাঁকে বাংলাদেশে আমরা অসম্ভব উপেক্ষা-অবহেলা করেছি, নিয়ে গেছি প্রায় বিস্মরণে। ‘কলম’-এ জসীমউদ্দীন সংখ্যাটি অন্তত আবার মনে পড়িয়ে দিল আমাদের এই একজন শ্রেষ্ঠ কবিকে। ‘কলম’ রুচিমান পত্রিকা; সুপাঠ্য রচনাও থাকছে, তবে ছাপার ভুল নিমূর্ল করা উচিত একেবারে, অন্তত তোমার মতো সম্পাদকের পত্রিকায়। কবি আবদুল কাদির আমাকে বলতেন ‘তোদের বই-এ ছাপার ভুল থাকে কেন? আমার বই-এ একটিও মুদ্রণপ্রমাদ পাবি না।’ তোমাদের আরো, একনিষ্ঠ ও একাগ্র হওয়া উচিত। তবে মূল সমস্যা বোধহয় ভাল লেখার। তরুণ উচ্ছল, মুক্তমনা লেখক খুঁজে বের করো। আমি নিজে বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি পত্রিকা সম্পাদনা করেছি। সেখানেও দেখেছি, লেখক- সংকটই প্রধানতম সমস্যা। তবু এখনো মাঝে মাঝে লোভ হয় পত্রিকা বের করার। একটি দায়িত্বও বোধ করি। কিন্তু আমার বয়সে এসে সময়কেই সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বি মনে হয়। তাই ইচ্ছা পরাস্ত হয় বারবার। তুমি জাত-সম্পাদক বলেই বোধ হয় অপরাজেয়।
এই সংখ্যার জন্যে গল্প চেয়েছিলে তুমি। সৃষ্টিশীল লেখায় ফিরেও আসতে চাই বারবার। কিন্তু এমন গ্যাঁড়াকলে জড়িয়েছি যে, মাথায় যে গ্প গুঞ্জন করে ফিরছে সেও লিখিত হয়ে উঠছে না। তাই ঠিক করেছি কথাসাহিত্য সম্পর্কে আমার ভাবনা-ধারণা-বেদনার সাম্প্রতিক সারাৎসার এই দ্রুত রচিত পত্রের কয়েকটি ছত্রে জানাব তোমাকে।
এখন আমরা দুই শতাব্দীর সন্ধি মুহূর্তে আছি- একটি শতাব্দী অস্ত যাচ্ছে; উদিত হচ্ছে আর একটি শতাব্দী। বাংলা ছোটগল্প এক শতাব্দী অতিক্রম করে গেছে। তার মধ্যেই দেখা দিয়েছেন অনেক রথী মহারথী- বিস্ময়কর সব গল্পকার। এখন এটি পরিষ্কার কবিতার মতোই ছোটগল্পেও বাঙ্গালীর স্বতঃস্ফূর্ত সাবলিল অধিকার। বিশেষত আমরা যারা বাংলাদেশের অধিবাসী তাদের গত পঞ্চাশ বছরের জীবন এত দ্রুত-পরিবর্তীত হয়েছে, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর আমাদের জীবনযাত্রা এত বহুধা বিকশিত রূপান্তরিত হয়েছে যে, অন্তত শ-খানেক উৎকৃষ্ট গল্পকারের প্রয়োজন ছিল এই সময়ের ধারাবাহী চি‎হ্ন ধরে রাখার জন্যে। বেদনার সঙ্গে স্বীকার করতে হবে, তা আমরা পারিনি। বরং পঞ্চাশের দশকে একসঙ্গে যতজন গল্পকার কাজ করেছেন, নব্বইয়ের দশকে কি তার শিকিভাগও প্রতিশ্র“তিশীল গল্পকার এসেছেন? আবার ঐ পঞ্চাশের দশকে উত্থিত হয়েছিলেন যত গল্পকার, তাঁরা ক’জন
[যাঁরা জীবিত আছেন, তাঁদের কথা বলছি] সময়ের সঙ্গে চলমান? স্থবিরতা, প্রায়-স্থবিরতা। এই আমাদের এখনকার ছোটগল্পের চারিত্রিক লক্ষণ।
এর কতগুলো বাস্তব কারণ আছে। এক. এমন একটি মাত্র গল্পপত্রিকা নেই যেখানে তরুণ/প্রবীণ [বা শুধু তরুণেরা/শুধু প্রবীণেরা] একত্রিত হতে পারেন। দৈনিক পত্রিকার সাপ্তাহিক সাময়িকীতে অধিকাংশ গল্প ছাপা হচ্ছে এবং মাসান্তে সেগুলো চলে যাচ্ছে পুরোনো কাগজঅলার কাছে। দুই. উপন্যাস বা এমনকি কবিতার প্রকাশক যা আছে, ছোটগল্পের তাও নেই। তার কারণ গল্পগ্রন্থ সাধারণ পাঠক কিনতে নারাজ। তিন. সংঘবদ্ধ আন্দোলন নেই। যা একটু-আধটু আছে সেটা দলবাজি, নানারকম সাহিত্যিক চালাকি আর বদমাশিতে জটিল কুটিল। চার. সমকালীন গল্পের ভাল সমালোচকও নেই। গল্পকাররা নিজেরাও সাধারণত পরস্পর সম্পর্কে নীরব থাকেন। পাঁচ. আসল কারণই মনে হয়, সৃষ্টিশীল গল্পকারের অভাব। সৃজনের গরিবানা ঢাকতে আমরা নানা রকম দুষ্ট বুদ্ধির, ছলচাতুরীর, দলবাজির অহমিকার অভিমানে মতাদর্শের আশ্রয় নিয়েছি। মতাদর্শের ভাল দিক আছে, লেখকের মতাদর্শ থাকবেই। তা যদি সুফলপ্রসু না হয়, অর্থাৎ ভাল গল্পের জন্ম না দ্যায়, তাহলে তাতে কোন মঙ্গল নেই।
আজ একটি পয়েন্ট থেকেই কথা বলতে চাই। আমি নিজে প্রায় চার দশক থেকে গল্প লিখে আসছি। আমি নিজের স্বভাব যেটুকু বুঝতে পারি, তাতে মনে হয় মূলত আমি মনোবিশ্লেষক গল্প লিখিয়ে। অন্তত মনোবিশ্লেষণেই মূল প্রবণতা আমার। তাছাড়া আমার কেন্দ্রিক কবিস্বভাবের জন্যে হয়তো সময় সময় গল্পে রূপক প্রতীকের অন্তর্গৃহও তৈরি করেছি। ষাটের দশকে এগুলো একটু বেশি ভাবেই করেছি। আমর [এবং আমাদের] তখনকার লক্ষ্য ছিল, আমাদের পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশের গল্পের ধারাকে আবহমান বাংলা গল্পের সমান্তরালে উপস্থিত করা। কিন্তু কোনো লেখকই তার দেশ কালের বাইরে যেতে পারে না। আমাকেও আমারই পরিপ্রেক্ষিত ব্যবহার করতে হয়েছে। আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ, বিখ্যাত এবং কুখ্যাত ‘সত্যের মতো বদমাশ’ বেরিয়েছিল আজ থেকে তিরিশ বছরেরও আগে, ১৯৬৮ সালে। তারপর আরো কয়েকটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। আরো অনেক গল্প ছড়িয়ে আছে পত্র-পত্রিকায়। সেখানে দেখবে আমি ক্রমাগত এক জায়গা থেকে অন্য অন্য জায়গায় চলে এসেছি। চেষ্টা করে নয়। জীবনেরই টানে।
গল্প লিখতে গিয়ে আমার মন ক্রমশ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল, সেটা বলি। মনোবিশ্লেষণের গল্প যখন লিখছিলাম, তখন আমি ছিলাম নির্জন ও আত্মকেন্দ্রিক। বহিঃপৃথিবীর মধ্যে আমার যোগাযোগ দিনে দিনে বাড়তে থাকে। আর-একদিকে লক্ষ্য করি, যাঁরা বাস্তববাদী গল্পকার বলে দাবি করেন বা তাদের চ্যালা-চামুণ্ডারা আরো শোর তোলেন; তারা এক কল্পিত বাস্তবতায় মজে আছেন। তাই পাকিস্তান আমলে যিনি প্রেমের গল্প লিখতেন, বাংলাদেশের জন্মের পরে তিনি রাতারাতি হয়ে ওঠেন সমাজবাদী গল্পকার। কোনো এককালে গ্রাম ছেড়েছেন হয়তো, এখন সেই গ্রামের গল্প লিখলে যা হয়। সে গ্রাম তো সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। সম্পূর্ণ অন্যরকম, সেই স্মৃতি থেকে গল্প লিখছেন হয়তো। কিংবা শহরেই থাকেন, মাঝে মাঝে পারিবারিক প্রয়োজনে ঘুরে আসতে হয় গ্রামে। তাই নিয়ে তৈরি হয় গল্প। যেটা হয়ে ওঠে শেষ পর্যন্ত বানানো বাস্তবতার গল্প। আর এটাও এর সঙ্গে যোগ না করলে মিথ্যে হবে যে, অভিজ্ঞতা থাকলেও বৃথাই যাবে সব-যদি ছোটগল্পের শিল্পকুশলতা স্থায়িত্ব না হয়। আর বাস্তবতার শিল্পীও যদি কাউকে খুশি করতে চান গল্প লিখে, কারো সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তাহলেও তার রচনা লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে।
না মেনে উপায় নেই, যুগে যুগে বিভিন্ন মতবাদের উত্থান এবং পতন হয়েছে। আমাদের চোখের সামনেই দেখলাম সমাজতন্ত্রের সুদৃশ্য বড় বড় থামগুলো ধসে পড়তে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে অমোঘভাবে যা টিকে আছে, তা হচ্ছে মানুষের ধর্ম। এই ধর্মের দু’টি রূপ; একটি হচ্ছে মানবধর্ম যা সব বিশিষ্ট ধর্মেরই অন্তঃসার; আর একটি হচ্ছে বিশেষ ধর্মমত, যেমন ইসলাম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদি ধর্ম। এখন, যে দেশের শতকরা প্রায় নব্বইভাগ লোক মুসলমান সে- দেশের গল্পে যদি এই মুসলমান জীবনের আদৌ ছায়াপাত না ঘটে তাহলে কি তাকে বলব বাস্তবতার দাবি পূর্ণ হলো? আমাদের দেশে হিন্দুরাও সংখ্যায় অনেক। তাঁদের জীবনের দাবিও আসতে হবে। খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ বা আরো যাঁরা আছেন গ্রামবাসী মানুষ, পাহাড়ি মানুষ, তাঁদের জীবনের চিত্রনও জরুরি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের জীবনাচার ধর্মাচারই মুখ্যত প্রতিবিম্বিত-প্রতিসরিত হওয়া চাই আমাদের গল্পে। আবার পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান আর পূর্ব বাংলার [এখনকার বাংলাদেশের] মুসলমানের জীবনযাপনের ধারার মধ্যে পার্থক্য অনেক। সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ বা আবদুল জব্বার যে জীবনের রূপকার, তা থেকে স্বতন্ত্র হবে আমাদের গল্পকারের গল্প। ২০০০ সালের ঢাকার পটভূমিতে একটি গল্প আর ২০০০ সালের কলকাতার পটভূমিতে একটি গল্প, নোয়াখালির পটভূমিতে একটি গল্প আর মুরশিদাবাদের পটভুমিতে একটি গল্প এসবের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান থাকবেই। আমার এক অনুজ হিন্দু বন্ধু আছেন। তিনি একদিন বললেন মান্নান ভাই, ঈদের সময় আমার বাচ্চারা এমন কান্নাকাটি জোড়ে যে সব বাচ্চারা নতুন কাপড়-চোপড় পড়ছে ওদেরও তাই নতুন কাপড়-চোপড় কিনে দিতে হয়, সেমাই-টেমাইও বানাতে হয় সকালবেলা। এটাই বাস্তবতা। এরিষ মারিয়া রেমার্ক কথিত ‘Romanticisim of un-romantics’ দের দিয়ে বাংলাদেশের গল্পের বস্তাবতার ঘনঘোর চাহিদা মেটানো যাবে না।
কিন্তু এখানেও চাই খোলা দৃষ্টি। শেষ- পর্যন্ত শিল্প সৃজনের কোনো নিয়ম-কানুন নেই। বিধি-বিধান নতুন গল্পই তৈরি করবে। সংকীর্ণতা কূপমণ্ডুকতা দিয়ে শৃঙ্গ জয় করা যাবে না। মানবধর্মকে আঘাত করে অগ্রসর হওয়া যাবে না। মাঝে মাঝে কি মনে হয় জানো? সব বাদ দিয়ে যদি শুধু ছোট গল্প নিয়ে থাকতে পারতাম, তাহলে আমার চেয়ে অনাবিল সুখি কেউ হতো না। হয়তো কত নিয়ম-কানুন চূর্ণ করতে পারতাম। হয়তো কত নতুন আইন-কানুন প্রতিষ্ঠা করা যেত। কিন্তু আমার বিধিলিপি অন্য। এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে ছুটে চলা অবিরাম। শুধু যখন গল্প মাধ্যমটিতে এসে দাঁড়াই-মনে হয়- বালির পাহাড় পেরিয়ে এইবার মরুদ্যানে এসে পৌঁছানো গেল।
গল্প সম্পর্কে তাৎক্ষণিক যা মনে এল, এই কয়েকটি অনুচ্ছেদে তা লিখে গেলাম। নতুন কলমে না, অনেক দিনের পুরোনো কলমে।

ইতি
আবদুল মান্নান সৈয়দ
৬-৮-২০০০