লেখক পরিচিতি অনুযায়ী সাবরিনা চৌধুরীর “সৃষ্টিশীল কলম জন্ম দিয়েছে অনেক ছোট গল্প, কবিতা, গান। নিসর্গ, নর-নারীর ভালবাসা, যাপিত জীবনের ক্ষরন জ্বালা,পাওয়া-না পাওয়ার আনন্দ-বেদনা হয়েছে তার গল্প-আখ্যান”। এই সব বিষয় ও চিন্তার পটভুমিতে তার লেখা নয়টি গল্প নিয়ে বের হয়েছে তার প্রথম গল্পসংকলন “অন্তর্জাল”। প্রথম গল্প “শব্দহীন সেপাই” পড়ে আমার মুগ্ধতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। গল্পের শিরোনাম থেকে শুরু করে কাহিনী, প্লট নির্মান,চরিত্রচিত্রন এবং ন্যারেটিভ এত নিখুত যে লেখক অভিজ্ঞ হয়ে পাকা হাতে লিখছেন না, এটা মানতে কষ্ট হয়।কি অগতানুগতিক আর দুসাহসী ভঙ্গিতে শুরু হয়েছে গল্পটি!ইরা নামের কিশোরী মেয়ে ভাই মাহীনকে নিয়ে দাপুটে নানা বাড়ি বেড়াতে গেলে তার নানা জোর করে বিয়ের এনগেজমেণ্টের আয়োজন করেন তার বাবা-মা এবং তার মতামতের অপেক্ষা না করে। প্রতিশোধ নেয়া আর প্রতিবাদ করার উদ্দেশ্যে ইরা সরবত তৈরি করে বিয়ের ঘটক টিয়াভাইকে পান করানোর জন্য,যে সরবতে ষড়যন্ত্র অনুযায়ী তার ভাই মাহিন থুথু মেশায়।এটা এপিটাইজার মাত্র।আসল অস্ত্র ইঁদুর মারার বিষ মিশিয়ে পোলাও খেতে দেয়া হবে তাকে তার ঘটকালী চিরদিনের জন্য শেষ করে দিতে। কিন্তু প্ল্যান ভেস্তে যায় ইদুর মারার ওষুধের কারনে,যে ওষুধ খেয়ে এ পর্যন্ত একটা ইঁদুরও মরে নি। হতাশ হয়ে ইরা নানা বাড়ির পুকুরের ঘাটলায় বসে ভাবছে এখন কি করবে, এই সময় নানী এসে তার কাছে সব শুনে রেগে গিয়ে বলেন,” কি! এত বড় সাহস! আমার নাতনীর বিয়ে, আর আমি কিছুই জানি না? বাস,ইরাকে ঘটক নিয়ে আর চিন্তা করতে হয় না।গল্পের এই অংশটকু এত সাবলীল আর কৌতুকের সঙ্গে লেখা যে পাঠকের শেষ পর্যন্ত না পড়ে উপায় থাকে না।আর শেষের অংশেই বোঝা যায় লেখক ইরা চরিত্রকে দিয়ে কি বলতে চান আর কেনই বা গল্পের নাম “শব্দহীন সৈনিক”। নানা বাড়িতে থাকতেই মাজেদ আলি নামে গ্রামের ঠিকাদার তার নানাকে জানায় কাঁচা রাস্তা পাকা করার টেণ্ডার পেয়েছে সে। কিন্তু রাস্তা পাকা করতে গিয়ে বুড়ো বটগাছটা কাটতে হবে। সে বলে” দেশের উন্নয়নের রাস্তাঘাট বানাতে হলে গাছ ত কাটা লাগবেই”। শুনে ইরার নানা বলেন,দেখো চেষ্টা করে না-কেটে করা যায় কিনা।হাজার হলেও অনেক পুরনো গাছ।অনেক স্মৃতি মেখে আছে।”

ইরা পাশে থেকে সব কথা শোনে, বুড়ো বটগাছ কাটার কথা শোনার পর সে অস্থির হয়ে পড়ে।মাজেদ আলি চলে গেলে সে নানাকে ভর্তসনার স্বরে বলে, আপনি না বুড়ো বটগাছটাকে নিয়ে কত গল্প বলেছেন? কি বললেন মাজেদ মিয়াকে?”একটু সম্ভব হবে কিনা”। এ কথার মানে কি?” তারপর সে জোর দিয়ে বলে,” সম্ভব হতেই হবে।বয়স্ক মুক্তিযুদ্ধের গাছটাকে কাটা যাবে না”।তার কথায় নানার চোখের সামনে মুক্তিযুদ্ধ সময়ের একটার পর একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে।তার মনে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বুড়ো বটগাছটা কত ভাবেই না মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছিল।আর মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর জয় বাংলা পতাকা প্রথমে উড়েছিল ঐ বট গাছের মাথা থেকেই।

মুক্তিযুদ্ধের অনেক গল্প পড়েছি, নিজেও লিখেছি কিন্তু এমন শক্তিশালী লেখা যেখানে শুধু মুক্তিযোদ্ধারা না, একটা গাছও তার সাহসী ভুমিকা নিয়ে অন্যতম প্রধান চরিত্র হয়ে আছে,এমন গল্প পড়া হয় নি। শুধু এই একটি গল্প পড়ার জন্যই বইটি কেনা যায়।এর পর যে সব গল্প সে গুলি বর্ননায়,চরিত্র চিত্রনে,বিশ্বাসযোগ্যতায় এতই দুর্বল যে একই লেখকের লেখা বলে মনে হয় না। যে লেখক “শব্দহীন সৈনিকের” মত মন কেড়ে নেয়া গল্প লিখতে পারেন তিনি ভাল গল্প লেখার ক্ষমতা রাখেন।সেই ক্ষমতা তাকে সতর্ক হয়ে মনোযোগের সঙ্গে লিখতে হবে।লেখা বড় হয়ে যাচ্ছে,তাই অন্য গল্পগুলি সম্বন্ধে কিছু বলা গেল না। তার নিজস্ব ভাষা তৈরিতে কুশলতার কিছু দৃষ্টান্ত দিয়ে মন্তব্য শেষ করছিঃ
১) ইরা ক্যারাব্যারা টাইপের নাতনী (২) এতক্ষনে তার অবস্থা নিশ্চয় কেরোসিন (৩) হাসগুলো কতকত করে শামুক খায় আর দিদাকে স্যালুট দিয়ে পানিতে নামে। -যখন লাইন ধরে ফিরে আসে, সত্যিই অসাধারন লাগে, একেবারে ঝাক্কাস। (৪) আজ সে হিংস্রতা দেখাচ্ছে না। ঝাকানাকা মুডে আছে। (৫) রান্নাঘরের পাশে টুথব্রাশের মত বারান্দা। (৬) আধুলি টাইপের শিশুটা (৭) সারাদিন বখাটে মনের সাথে লড়ে হেরে যায়।