চর্যাপদ বাংলাসাহিত্যের প্রথম সন্তান হলে বৌদ্ধবিহার তার আঁতুড়ঘর। বলা বাহুল্য, বাংলাসাহিত্যের গোড়ায় তাই ধর্ম ও নীতির সরব উপস্থিতি। এরপর বঙ্গীয় সোশিওপলিটিকাল পট দ্রুত পরিবর্তনের ফলে বৌদ্ধধর্মীয় অনুষঙ্গ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে সনাতনী পৌরাণিক কিচ্ছা সগৌরবে স্থান দখল করে নেয়। আবারও ইতিহাসের চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দীর্ঘ মুসলিম শাসনে ইসলামী মিথ, সমাজবাস্তবতা, আচার-কালচার বাংলাসাহিত্যকে প্রভাবিত করে। যদিও এ সময় মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় রামায়ন-মহাভারত বাংলায় অনুবাদসহ বিভিন্নধারার মঙ্গলকাব্য, পদাবলির মাস্টারপিস রচিত হয়। বাংলাসাহিত্যে অনুবাদের ব্যঞ্জন যোগ হয় মুসলিম সাহিত্যিকদের দ্বারা। এসময় প্রচুর আরবি-ফারসি শব্দের সন্নিবেশ ঘটে বাংলাতে। আর হবেই না বা কেন? রাজদণ্ড যে মুসলিমদের হাতে। দাপ্তরিক ভাষা ফারসি। এরপর ইংরেজ আমলে গ্রাফ নামতে থাকে। রেনেসাঁ হয় সংস্কৃতবহুল সনাতনী সাহিত্যের। দৃশ্যপটে মুসলিমরা গায়েব ও অচ্ছুৎ। ধীরে ধীরে মুষ্টিমেয় কয়েকজন এগিয়ে আসা শুরু করে। রবীন্দ্র বলয় আর ত্রিশের দশকে পাণ্ডবদের উত্থানে তবুও সাহিত্যে মুসলিম কবি-লেখকেরা তাদের স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখতে সামর্থ হয়। তবে দেশবিভাগের বুমেরাং কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে ঢাকাই সাহিত্যকে চাঙা করে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বাজিমাৎ করে বাংলাসাহিত্যের চিরস্থায়ী সিংহাসনস্থাপিত হয় ঢাকায়। পঞ্চাশের দশক থেকে সুপরিকল্পিতভাবে বাংলাসাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সেক্যুলারাইজেশন করার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং তার শেষ পেরেকও ঠুকে দেয়া হয়েছে বর্তমান বাম আধিপত্যের রাজনীতি ও মিডিয়ার সুবাদে। আজকে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ডান-বাম বিভাজন নতুন নয়। একদিনে হয়নি। মধ্যযুগে হিন্দু-মুসলিম যে ভেদ লক্ষ্য করা যায় তারই পরম্পরা। সে প্রকটতা থেকেই বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি কিম্বা ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজ গঠন করতে হয়েছিল। এ অনিবার্য বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায়নি। এ সত্য মেনে নিয়েই সহনশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা, সহযোগিতার মাধ্যমে মানবতাবাদী সাহিত্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।বলার অপেক্ষা রাখে না, সাহিত্যের এই মেরুকরণ ও বাঁক নেয়ার নেয়ামকশক্তি হল রাজনীতির কলকাঠি। রাজনীতি কখনওই সাহিত্যের মূল বিষয়বস্তু হয়ে উঠেনি তবে ছিল অন্তঃপুরের গডফাদার। কখনও রাজন্যবর্গের প্রত্যক্ষ আদেশে বা তোষামোদের খাতিরে সাহিত্য রচিত হয়েছে। কখনও নিরেট মনোরঞ্জনের জন্য। বাংলাসাহিত্যে সমসাময়িকতা, প্রোলেতারিয়েত, মুক্তির প্রসঙ্গ এলো তো এই সেদিন নজরুলের হাত ধরে।

২।
প্রচলিত স্রোতে সবাই গা ভাসাননি। স্বজাতির স্বকীয়তা ধরে রেখে বিশ্বাসের বিনির্মাণের ভিত তুলে দিয়ে গেছেন। শুধু ফররুখেই শুরু ফররুখেই শেষ নয়। শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জুলেখা’ মানুষকে দেব-দেবীর আজগুবি কাহিনি থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষের রোমান্টিকতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। জৈনুদ্দিন লিখেন ‘রসুলবিজয়’, সুফিধারার কবি মুজাম্মিল খ্যাতি পান ‘নীতিশাস্ত্রবার্তা’, ‘সায়াৎনামা’, ‘খঞ্জনচরিত’। এরপর শেখ ফয়জুল্লাহ, দৌলত কাজী, আলাওল প্রমুখ হয়ে আমরা কবি আব্দুল হাকিমকে স্মরণ করতে পারি। যাদের লেখনীতে বিশ্বাসের ছাপ সুস্পষ্ট। সাহিত্য নিয়ে সবার বয়ান সত্য নয়। সাহিত্যের পটকে সমসাময়িক সামাজিক ইতিহাস দিয়ে বিচার করলে আমাদের কাছে অনেক আড়াল হয়ে যাওয়া সত্য উন্মোচিত হবে। কবি আব্দুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’ কবিতারও ভুল ব্যাখ্যা আমাদের শেখানো হয়।
“আরবি ফারসি শাস্ত্রে নাই কোন রাগ।
দেশী ভাষে বুঝিতে ললাটে পুরে ভাগ।।
আরবি ফারসি হিন্দে নাই দুই মত।
যদি বালি খয়ে আল্লা নবীর ছিফত।।
যেই দেশে যেই বাক্য কহে নর গণ।
সেই বাক্য বুঝে প্রভু আপে নিরঞ্জন”।
ধর্ম বিদ্বেষীরা এখানে খড়গটা চালায় আরবি-ফারসি ভাষার উপরে। সযত্নে এড়িয়ে যায় পাশে থাকা হিন্দীকে (সংস্কৃতকেও)।অথচ এখানে কোন ভাষার প্রতি কবি বিষবাষ্প ছড়াননি।
বাংলাসাহিত্যের আধুনিক যুগে হাহাকার কাটিয়ে প্রথম উদিত নক্ষত্র মীর মশাররফ হোসেন। গগণচুম্বী খ্যাতিপ্রাপ্ত ‘বিষাদসিন্ধু’র ইসলামের ইতিহাস বিচারে আমরা হতাশ হলেও মুসলিমদের সাহিত্যযোদ্ধা ও অনুপ্রেরণায় তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনি জীবনীকাব্য ও গৌরবগাঁথা লিখেছিলেন বেশ। যেমন- ‘বিবি খোদেজার বিবাহ’, ‘হজরত বেলালের জীবনী’, ‘হজরত ওমরের ধর্মজীবন লাভ’, ‘হজরত আমীর হামজার ধর্মজীবন লাভ’, ‘মদীনার গৌরব’, ‘মোসলেম বীরত্ব’ ইত্যাদি। এছাড়া ‘এসলামের জয়’ নামে গদ্যগ্রন্থও আছে তার। লিখেছিলেন ‘মুসলমানদের বাংলা শিক্ষা’ নামে পাঠ্যবই। এরপর একে একে দৃশ্যপটে আসতে থাকেন মুনশী মহম্মদ মেহেরউল্লা, নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, ইসমাঈল হোসেন সিরাজী, বেগম রোকেয়া, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ কিংবদন্তী ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। যার সাহিত্যে বিশ্বাসের বীজ বুনেছেন, চাষাবাদ করেছেন। মুসলিম জাগরণে ভূমিকা রেখেছেন। মুনশী মহম্মদ মেহেরউল্লা একজন বাগ্মী, তার্কিক ও প্রাবন্ধিক ছিলেন যিনি ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব প্রচুর প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রেখে গেছেন। বাংলাসাহিত্যে সর্বকালের বেস্টসেলার উপন্যাস ‘আনোয়ারা’র লেখক নজিবর রহমান। মুসলমানদের সাংবাদিকতার পথিকৃৎ মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, তার সম্পাদিত সাহিত্যপত্রিকা ‘মাসিক মোহাম্মদী’ শত শত কবি-লেখক-সাহিত্যিক তৈরির ব্যাপারে মূল প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে। বঙ্কিমের ‘দূর্গেশনন্দিনী’র মুসলিম বিদ্বেষের জবাবে ‘রায়নন্দিনী’ লিখেছিলেন ইসমাঈল হোসেন শিরাজী। যার ক্ষুরধার লেখনীও বৃটিশ মসনদে কাঁপন ধরিয়েছিল। বাংলাভাষা, সাহিত্যের উৎকর্ষ সাধন ও ইসলামের সাথে দ্বন্দ্ব নিরসনে সবচেয়ে বেশি কলম চালিয়েছেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বাঙালিপনা বা মুক্তবুদ্ধির খাতিরে যারা ধর্ম নিয়ে উন্নাসিক তাদের জন্য এই দুটোর অসাধারণ সমন্বয়ের মডেল স্থাপন করেছেন তিনি। ইসলামী প্রসঙ্গ নিয়ে তার অজস্র রচনাবলী রয়েছে। যেমন- ‘ইসলাম প্রসঙ্গ’, ‘কুরআন প্রসঙ্গ’, ‘রোযার ঈদ ও ফিতরা’, ‘ঈদুল আযহা ও কুরবানীর আহকাম’, ‘হজ্জের ও রওজা পাকের যিয়ারতের দোয়া-দরুদ’, ‘তাজরীদুল বোখারী’, ‘শেষ নবীর সন্ধানে’, ‘প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে শেষ নবী’, ‘ছোটদের রাসুলুল্লাহ’, ‘Hundreds saying of the holy prophet’, ‘Tales from the holy Quran’, ‘Pearls from the holy prophet’, ‘Essays on Islam’ইত্যাদি। এইপথগুলো ধরেই ইসলামী রেনেসাঁকে তুঙ্গে নিয়ে যান ইব্রাহীম খাঁ, গোলাম মোস্তফা, কিছুটা কবি নজরুল ইসলাম, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন, বে-নজীর আহমদ, বন্দে আলী মিয়া, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, সৈয়দ আলী আহসান, সৈয়দ আলী আশরাফ প্রমুখ। সেই সিলসিলা বন্ধ হয়নি এখনও। আসকার ইবনে শাইখ, আল মাহমুদ, শাহাবুদ্দীন আহমদ, আব্দুল মান্নান তালিব, মতিউর রহমান মল্লিক, গোলাম মোহাম্মদ হয়ে বিশ্বাসীদের সাহিত্য সম্ভার এগিয়ে চলছে মহাকালের পথে।

৩।
বিশ্বাসীদের সাহিত্য মানেই ধর্ম-কর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ তেমনটি নয়, যেমন নয় শুধু হামদ-নাত কিংবা গজলের মধ্যে সীমাবদ্ধতা। বিশ্বাসী ভাবধারার সাহিত্য মানে মানবতাবাদী সাহিত্য, বিশুদ্ধতার চর্চা, জীবন ও যৌনতা নিয়ে খাম-খেয়ালিপনা বা সীমা লঙ্ঘন নয়, শ্রমজীবী মানুষের উপাখ্যান, প্রকৃতির বন্দনা, শোষণের প্রতিবাদ, মুক্তির আস্বাদন। Not for pleasure only, also for sufferings and tears. সেখানে আরবি-ফারসির বাহুল্য অনিবার্য উপাদান নয়, অনিবার্য হল জীবনবোধের সরব উপস্থিতি। বিজাতীয় যা কিছু বিশ্বাসের পরিপন্থী তা বিনয়ের সাথে পরিত্যাজ্য। আমরা উপরে আলোচনা করে এসেছি ধর্ম ও রাজনীতি কিভাবে সাহিত্যকে প্রভাবিত করেছে। প্রায় পাঁচশ বছরের নিরবচ্ছিন্ন মুসলিম শাসন ও দুশো বছরের ইংরেজ শাসনের সুবাদে প্রচুর আরবি-ফারসি-ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশী ভাষার প্রচুর শব্দ বাংলায় পরিভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এগুলো এখন বাংলাভাষার সম্পদ। তথাপি গ্রাম-গঞ্জ, অফিস-আদালতে বহাল তবিয়তে ব্যবহৃত হচ্ছে। সুতরাং জীবনমুখী সাহিত্যে সেসকল শব্দের সফল প্রয়োগে হীনম্মন্যতা মূর্খতা অথবা জ্ঞানপাপের পরিচায়ক। লিখিত সাহিত্যে ব্যবহৃত শব্দের উৎস সম্পর্কে (শতকরা হিসেবে) বাংলা একাডেমীর একটি গবেষণায় দেখা যায়- অষ্টাদশ শতকে ৩১.৫% তৎসম, ৩৮.৯% তদ্ভব, ২৬.৩% আরবি-ফারসি-তুর্কি ও ৩.৩%স্থানীয় সব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। ঊনবিংশ শতকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠা ও হিন্দু জাগরণের ফলে তৎসম বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭.৬%, তদ্ভব ১৯.২%, আরবি-ফারসি-তুর্কি ১% ও ২.২% স্থানীয় শব্দ ব্যবহৃত হয়। তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ ঢালাওভাবে ব্যবহার কোন সমস্যা নয়, সতর্কতার বিষয় হল যেসকল তৎসম বা সংস্কৃত বহুল শব্দ হিন্দু ধর্ম ও মিথের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত এবং একত্ববাদের সাংঘর্ষিক তা এড়িয়ে চলতে হবে। তেমনি অন্যান্য ধর্ম ও ইজমের প্রতিনিধিত্বশীল শব্দের ব্যাপারেও একই দৃষ্টিভঙ্গী প্রযোজ্য। আবার মুসলিমদের বিশ্বাস-আচার সম্পর্কিত অনেক শব্দকে ব্যঙ্গ ও শ্লেষ করে ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোকে সযত্নেপরিহার করতে হবে। যেমন- মহাবিশ্ব বোঝাতে ‘বিশ্বব্রহ্মান্ড’ শব্দটি বহুল ব্যবহৃত। অথচ এখানে ব্রহ্মা হল হিন্দুদের স্রষ্টা যার অন্ডকোষ থেকে সৃষ্ট। তেমনি লক্ষ্মীছেলে নয়, নয় সূর্যসন্তান বা অগ্নিকন্যা, অগ্নিপুরুষ। বিসমিল্লাহয় গলদ নাই, গোড়ায় গলদ বলুন। আপামর না বলে আমজনতা বলুন। কেননা, হিন্দুমতে শূদ্ররা হল পামর যাদের স্থান সবার নিচে রৌরব নরকে। তাল-বাহানা অর্থে অযুহাত নয়। হদিস নাই শব্দটিও হাদিসকে কটাক্ষ করে প্রচলিত করা হয়। আদিম যুগ আসলে আদম থেকে উদ্গত যা বর্বর অর্থে ব্যবহার আপত্তিকর। মধ্যযুগীয় কায়দা বা বর্বরতা বোঝাতে ইসলামের স্বর্ণযুগকে অস্বীকার করা হয়। আরও কিছু শব্দ ব্যবহার করা উচিত নয় যেমন- অর্ঘ্য, উৎসর্গ, যম, জন্মান্তর, লাল সালাম, কমরেড, গুরুজী, আচার্য, অগ্নিপরীক্ষা ইত্যাদি। বৃহদার্থে রাম উপসর্গ ব্যবহার অনুচিত। অকালমৃত্যু ইসলামের বিশ্বাস পরিপস্থী। কারণ সবার মৃত্যু একটি নির্দিষ্ট সময় ও প্রেক্ষিতে নির্ধারিত। প্রয়াত বলবেন না, মরহুম বলুন। যেখানেই থাকুন ভাল থাকুন মানে আপনি পরকালের বিষয়ে আস্থা আনতে পারেননি। ভেস্তে যাওয়া মানে খারাপ কিছু নয় বেহেশতে যাওয়া থেকে শ্লেষ করা হয়েছে।হুরের প্রতিশব্দ অপ্সরা নয়। প্রতিমূর্তি, ভাবমূর্তিকেও আমাদের ভেঙ্গে ফেলতে হবে। কোলাকুলি গ্রহণযোগ্য কিন্তু আলিঙ্গন পরিত্যাজ্য। ঈশ্বরের ঐশীবাণীর উপাস্য হওয়াও কাম্য নয়। এভাবে শব্দচয়নে সতর্ক হওয়া বিশ্বাসেরএকান্ত দাবি।