যে কোনো সৃষ্টি বা নির্মাণের জন্যই কিছু উপকরণ প্রয়োজন হয়। সাহিত্য সৃষ্টির জন্যও প্রয়োজনীয় উপকরণ অপরিহার্য। ভাব-বিষয়-শব্দ মূলত এগুলো হলো সাহিত্যের মৌলিক উপকরণ। তবে সাহিত্যের অন্যতম প্রধান শাখা কবিতার জন্য এছাড়া আরো অতিরিক্ত কিছু উপকরণ যেমন ছন্দ, শব্দালংকার, উপমা, প্রতীক, রূপক-রূপকল্প ইত্যাদি প্রয়োজন হয়। তবে এখানে কবিতা নয়, শুধুমাত্র সাধারণভাবে সাহিত্যের বিষয়-ভাবনা নিয়ে আলোচনার প্রয়াস পাবো।
বিষয় সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। তাই সাহিত্য সৃষ্টির আগেই প্রথমে সাহিত্যের বিষয় নিয়ে ভাববার প্রয়োজন আছে বৈকি। প্রাচীনকালে সবদেশে সাহিত্যের মূল বিষয় ছিলো ধর্ম। ধর্ম মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। প্রাচীনকালে মানুষের জীবনের ভাব, অনুভূতি ও সকল কর্মকাণ্ডের মূল উৎস বা কেন্দ্রবিন্দু ছিলো ধর্ম। ধর্মের বাইরে মানুষ তখন কোনো কিছুই চিন্তা করতো না। আদি মানব আদম আ. ও মা হাওয়াকে আ. পৃথিবীতে পাঠানোর পূর্বে তাঁদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিধি-বিধান বা আদেশ-নির্দেশ প্রদান করা হয়। প্রকৃতপক্ষে সেটাই ছিলো তাঁদের ধর্মÑ যা যুগে যুগে ‘ইসলাম’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এ ধর্মীয় নির্দেশাবলীর মাধ্যমেই তাঁরা তাঁদের জীবন পরিচালনা করেছেন। কাল-প্রবাহে এ ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটেছে। যুগের প্রয়োজনে বিভিন্ন নবী-রাসূলদের মাধ্যমে আল্লাহ স্বয়ং এ পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, আবার কখনো মানুষ নিজে থেকেই আল্লাহর বিধানে পরিবর্তন এনেছে। মানুষের কাছে এ দুটোই ধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এ দুটোই ধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি পেলেও এর একটি আল্লাহ-প্রদত্ত অন্যটি মানুষের দ্বারা পরিবর্তিত বা মানুষের মনগড়া। দুটোরই অনুসারীর সংখ্যা কম নয়।
যাইহোক, প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জীবনে ধর্মের ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটেছে, সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছে, মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাধনা ও সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠেছে দর্শন-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিল্পকলা-ভাস্কর্য, সামাজিক রীতি-নীতি, মানুষের বিশিষ্ট জীবনধারা ইত্যাদি। এখানে বিশেষভাবে ধর্ম কীভাবে সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে, সেটাই সংক্ষেপে আলোচনার প্রয়াস পাবো।
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম দুটি মহাকাব্য ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ এ দুটোর বিষয়বস্তুই মূলত ধর্ম। এ দুটো মহাকাব্য হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থ হিসাবেও বিবেচিত হয়। গ্রীসের জাতীয় কবি হোমার, রোমানদের জাতীয় কবি কার্লাইল, ইংরাজ মহাকবি জন মিল্টন প্রমুখ সকলেই তাঁদের স্ব স্ব ধর্মভাবে উজ্জীবিত-উদ্বুদ্ধ হয়েই তাঁদের বিশ্ব-বিখ্যাত মহাকাব্যসমূহ রচনা করেন। বলা বাহুল্য, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কাব্য রচনার ফলেই এগুলো এতো জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ধর্মীয় বিষয়বস্তুর কারণেই সাধারণ মানুষ অদম্য আগ্রহ নিয়ে যুগে যুগে তা পাঠ করেছে এবং পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে তা সকলের কাছে সমাদৃত হয়েছে। মানুষের জীবনে ধর্মের অনিবার্য প্রভাবের ফলেই জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট সাহিত্যেও ধর্মীয় ভাব-বিষয় স্বাভাবিকভাবেই সাহিত্যের উপজীব্য হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের আদি নির্দশন ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’ বা চর্যাপদের মূলভাব ও বিষয়ও বৌদ্ধধর্ম থেকে উদ্ভুত। চর্যা পদকর্তাগণ ছিলেন বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। তাঁদের অনেকে ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মগুরু বা সিদ্ধাচার্য। বৌদ্ধধর্মের মূলভাব ও বিষয় নিয়ে তারা গান রচনা করে বৌদ্ধধর্ম মন্দিরে ভক্তদেরকে তা গেয়ে শুনাতেন। অবশ্য ধর্মমন্দিরের বাইরেও এগুলোর চর্চা হতো। চর্যাপদের অধিকাংশ গানেই রূপকার্থে বৌদ্ধধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে কতিপয় উদ্ধৃতি পেশ করা হলো। পাঁচ নম্বর চর্যাপদের দুটি লাইন:
ভবনই গবন গম্ভীর বেঁগে বাহী।
দুআন্তে চিখিল মাঝে পার ন থাহী ॥
ভবনদী গহীন গম্ভীর বেগে প্রবাহিত, দু’পাড়ে কাদা, মাঝে অথই পানি। নদী-মাতৃক বাংলাদেশের বর্ষায় দু’কূল প্লাবণকারী প্রমত্তা নদীর বর্ণনা আছে উপরোক্ত দু’টি লাইনে। এখানে দৃশ্যত যে বর্ণনা রয়েছে, তা গূঢ়ার্থে পার্থিব জীবনের সাথেও তুলনীয়। এ ধরনের রূপক বা রূপকল্পের ব্যবহার চর্যাপদের বিভিন্ন স্থানে পরিদৃশ্যমান। নয় নম্বর চর্যাপদ থেকে দু’টি লাইন উদ্ধৃত করছি :
জিম জিম করিনা করিনিরে রিসঅ।
তিম তিম তথতা মদগল বরিসঅ ॥
হস্তি-হস্তিনীকে দেখে মদমত্ত হয়ে ছুটে যায়। নৈরাত্মা সান্নিধ্যে তিনি তথত্যমদ বর্ষণ করেন। এখানে যেমন একটি সাধারণ অর্থ আছে, রূপকার্থেও এর তেমনি অন্য একটি অর্থ আছে। হস্তি ও হস্তিনীর মিলন জৈবিক আসক্তি থেকে, মানবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনও তেমনি এক গভীর সাধনা ও আকাক্সক্ষার ফল। কবির বর্ণনা বাহ্যত যে অর্থ প্রদান করে, রূপকার্থে তা ভিন্ন আরেকটি অর্থ প্রকাশ করে। এ ধরনের রূপকল্প চর্যাপদে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। [মুহম্মদ মতিউর রহমান: হাজার বছরের বাংলা কবিতা, পৃষ্ঠা-১২-১৩।]
মধ্যযুগে হিন্দুদের রচিত বাংলা সাহিত্য মূলত হিন্দুধর্ম ও তাদের আরাধ্য দেব-দেবী সম্পর্কিত। বিভিন্ন ধরনের মঙ্গলকাব্যে লৌকিক দেব-দেবীর প্রাধান্য। অন্যদিকে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বৈষ্ণব পদাবলীতে বৈদিক দেব-দেবীর গুণ-কীর্তন লক্ষ্য করা যায়। লৌকিক দেব-দেবী মূলত অনার্য ও দেশজ নানা কাহিনী ও অলৌকিক উপদানে গঠিত ও সৃজিত। অন্তজশ্রেণীর হিন্দু, ধর্মান্তরিত জৈন ও বৌদ্ধদের মিশ্র ধর্মীয় মতবাদ ও জীবন দর্শনের মিশ্র উপাদানে লোকজ ধর্ম ও লোকজ দেব-দেবীর উদ্ভব। এ ধর্মমত ও দেব-দেবী সম্পূর্ণ দেশীয় উপাদানে ও দেশজ ভাবধারায় পরিগঠিত। তাই এর সাথে এদেশের সাধারণ মানুষের সম্পর্ক ও মমত্ববোধ স্বাভাবিকভাবেই অধিক।
অন্যদিকে, বৈদিক ধর্মমত ও দেব-দেবী আর্য-সম্ভূত। আর্যরা এদেশে বহিরাগত এবং আর্য দেব-দেবীও বাংলার মাটি ও মানুষের ওপর আরোপিত। তাই বৈদিক ধর্ম ও বৈদিক দেব-দেবী এদেশে বহিরাগত অল্পসংখ্যক আর্যব্রাক্ষ্মণ বা উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যেই সর্বদা সীমাবদ্ধ থেকেছে। সাধারণ মানুষ তা কখনো আন্তরিকভাবে নিজের বলে গ্রহণ করতে পারেনি। লোকজ ধর্ম, লোকজ দেব-দেবী, অলৌকিক ও অতিমানবিক বিষয়বস্তুই সাধরণ বাঙলি হিন্দুর জীবনে সর্বদা প্রভাব বিস্তার করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রমও চোখে পড়ে। যেমন মঙ্গলকাব্যে চাঁদ সওদাগরের চরিত্রে মানবীয় দিকটি প্রাধান্য পেয়েছে। অন্যদিকে, বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি রচিত কিছু কিছু চরণেও মানবীয় ভাব ও হৃদয়বৃত্তির পরিচয় ফুটে উঠেছে। অবশ্য অনেকের ধারণা, ইসলাম ও মুসলমানদের প্রভাবেই এ ধরনের মানবীয় ভাবধারার প্রকাশ ঘটেছে। সে যাইহোক, মধ্যযুগে বাঙালি হিন্দু রচিত সাহিত্যের প্রধান বিষয় ছিলো ধর্ম। এখানে চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি থেকে কতিপয় উদ্ধৃতি পেশ করছি:
শুন হে মানুষ ভাই
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।
রাধার বিরহ বর্ণনায় চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতিও সম্পূর্ণ মানবীয় রসে অভিষিক্ত হয়েছেন। বিদ্যাপতির বর্ণনা :
এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।
এ ভরা বাদর মাহভাদর
শূন্য মন্দির মোর ॥
অথবা, কত কত চতুরাণ মরি মরি যাওত
ন তুয়া আদি অবসানা।
তোহে জনমি গুণ তোহে মিলাওত
সাগরি লহরী সমানা ॥
বিদ্যাপতির আরেকটি কবিতার কয়েকটি চরণ :
জনম অবধি হম রূপ নিহারিল
নয়ন ন তিরপিত ভেল
সেই মধুর বোল শ্রবণহি শুনল
শ্রুতি পথে পরশ ন গেল ॥
কত মধু যামিনী রভসে গমাওল
ন বুঝল কেসন কেল।
লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রখিল
তৈও হিয় জুড়ন ন গেল ॥
১২০৪ সনে তুর্কিবীর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গবিজয়ের পর বাংলা সাহিত্যের বিষয়বস্তু হিসাবে একটি নতুন বিষয় সংযোজিত হয়। ইতঃপূর্বে বাংলাদেশ ছিলো প্রধানত হিন্দুÑ অধ্যূসিত একটি জনপদ। ইখতিয়ার উদ্দীনের বঙ্গবিজয়ের পর পূর্বতন শাসক শ্রেণীর শোষণ ও ধর্মীয় ভেদনীতি তথা জাতিভেদের কারণে এদেশের নীচবর্ণীয় হিন্দুগণ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মানবিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা ইসলামের ছায়াতলে এসে আশ্রয় নেয়। এভাবে অতি অল্পকালের মধ্যে হিন্দুপ্রধান একটি অঞ্চল মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে পরিণত হয়। এরফলে ক্রমান্বয়ে আমাদের ভাষা-সাহিত্য, সামাজিক রীতি-নীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি-অর্থনীতি তথা সামগ্রিক জীবনধারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। এ পরিবর্তগুলো প্রধানত নিম্নরূপ:
প্রথমত, সেন আমলে বাংলা ভাষার উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে বাংলা-সাহিত্যের চর্চাকে উৎসাহিত করা হয়। অর্গলমুক্ত পরিবেশে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের চর্চায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলে আত্মনিয়োগ করে।
দ্বিতীয়ত, শাসক শ্রেণীর ভাষা আরবি-ফারসি-তুর্কি থেকে অসংখ্য শব্দ বাংলা ভাষায় আত্মীকৃত হওয়ায় বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়। ফলে বাংলা ভাষায় বিচিত্র ভাব প্রকাশ ও সাহিত্য চর্চা সহজতর হয়।
তৃতীয়ত, প্রাচীন ও উন্নত আরবি-ফারসি সাহিত্যের প্রভাবে বাংলা সাহিত্য বিশেষভাবে সমৃদ্ধ হয় এবং বাংলা সাহিত্যে উন্নতর ও আন্তর্জাতিক ভাবধারার সংযোজন ঘটে। তাছাড়া, আরবি-ফরসি সাহিত্যের রূপাঙ্গিক, রূপরীতি ও প্রকরণগত নানা বিষয়ের প্রভাবও বাংলা সাহিত্যে পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। তাই শুধুমাত্র সাহিত্যের বিষয়-ভাবনায় যে পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে কেবল সে সম্পর্কেই এখানে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করার প্রয়াস পাবো।
মুসলিম শাসনামলে সাহিত্যের বিষয়বস্তু হিসাবে বাঙালি হিন্দুরা আগের মতোই হিন্দুধর্ম ও হিন্দু দেব-দেবীকে তাদের সাহিত্যের উপজীব্য করেছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমানগণ ঐ সময় আল্লাহ, রাসূল, সাহাবায়েকেরাম, পীর-আউলিয়া, মুসলিম বীর ও তাদের ধর্মীয় উপাখ্যান নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছে। এক্ষেত্রে তারা উভয়েই তাদের স্ব স্ব ধর্ম থেকে অনুপ্রেরণা ও সাহিত্যের বিষয়বস্তু সংগ্রহ করেছে। কিন্তু বাঙালি মুসলিম কবিগণ শুধু ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও বিষয়বস্তুর মধ্যেই তাদের সাহিত্য-চর্চা সীমাবদ্ধ রাখেনি। ধীরে ধীরে তারা বিভিন্ন মানবিক উপাখ্যান-উপাদান- সংবেদনা ও বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে সাহিত্য চর্চার প্রয়াস পেয়েছে। এটা বাংলা সাহিত্যের এক তাৎপর্যপূর্ণ ক্রান্তিকাল। ইংরাজিতে এটাকে বলা যায় টার্নিংপয়েন্ট।
এ সময় থেকেই বাংলা সাহিত্যে এক নতুন স্রোতধারা সৃষ্টি হয়। মানবীয় সংবেদনশীলতার সংস্পর্শে সাহিত্যে এক নতুন প্রাণবন্ত ধারার উন্মেষ ঘটে। এটাই আধুনিকতার লক্ষণ। তাই বলা যায়, বাঙালি মুসলমানদের হাতেই বাংলা সাহিত্যে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে এবং আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে শাহ মোহাম্মদ সগীর রচিত ‘ইউসুফ জোলায় খাঁ’, দৌলত উজির বাহরাম খাঁ রচিত ‘লাইলী মজনু’, ফকির গরীবুল্লাহ রচিত ‘কারবালা’, সৈয়দ আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ প্রভৃতি মানবিক কাহিনীপূর্ণ কাব্যের উল্লেখ করা যায়।
কালপরিক্রমায় বিশ্বের সবদেশের সাহিত্যের বিষয় বৈভবে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন ঘটেছে। বলা যায় জীবনের সাথে সম্পর্কিত সব বিষয় নিয়েই এখন সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে। অতএব, সাহিত্যের বিষয়বস্তুর কোনো সীমা-সরহদ নিরূপণ করা দুষ্কর। রাজনীতি-অর্থনীতি, ধর্ম-সংস্কৃতি, শিক্ষা-সভ্যতা, ইতিহাস-দর্শন-ভূগোল, সামাজিক রীতি-নীতি, মানুষের জীবনের প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বিরহ-বিচ্ছেদ, সীমাহীন নিসর্গ, আকাশ-সমুদ্র, নদী-নালা-পাহাড়, বন-জঙ্গল, পশু-পাখি-প্রাণীকুল এমনকি, সৌরজগতের বিভিন্ন বিষয়ও এখন অবলীলায় সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে পরিণত হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, সাহিত্যে যেকোনো কিছু উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সাহিত্যিকের নিজস্ব বোধ-বিশ্বাস, পারিপার্শ্বিক ও কালিক অবস্থার প্রভাব সর্বদা ক্রিয়াশীল।
সাহিত্য চিন্তার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধারণার উদ্ভব হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ (আর্ট ফর আর্ট সেক), ‘জীবনের জন্য শিল্প’ (আর্ট ফর লাইফ’স সেক) অথবা ‘সত্য সুন্দর কল্যাণের জন্য শিল্প’ ইত্যাদি মতবাদের উল্লেখ করা যায়। এ প্রত্যেকটি চিন্তা বা ধারণাই বিশেষ বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্ভূত। এর পক্ষে যেমন যুক্তি আছে, বিপক্ষেও যুক্তির কোনো অভাব নেই। তবে শেষোক্ত ধারণাটিই অধিকতর যুক্তিসংগত ও সর্বশ্রেণীর মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
সাহিত্যের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচ্য। সাহিত্য মানুষের মনে ও সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী শিল্পকর্ম। তাই সাহিত্যের প্রভাব নেতিবাচক হলে তা বিপর্যয় সৃষ্টি করে, ইতিবাচক হলে শুভ ফল বয়ে আনে। মানুষের চিন্তা ও মননে, বিভিন্ন কর্ম-প্রচেষ্টায়, সামাজিক সংগঠন ও আয়োজনে এমনকি, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নেও সাহিত্য অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সাহিত্যের বিষয়বস্তু যাতে ইতিবাচক, কল্যাণকর ও ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য হিতকর হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা সুস্থ্য বিবেকবান মানুষের কাছ থেকে একান্তভাবে প্রত্যাশিত।
সাহিত্যের বিষয় নির্বাচন যদিও সাহিত্যিকের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, তবু এক ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী শিল্পকর্ম হিসাবে সাহিত্যের বিষয় নির্বাচনে সমাজের দায়িত্বশীল সচেতন নাগরিক তথা সমাজপতি-শিক্ষক-সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সর্বোপরি পাঠক সমাজের সক্রিয় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা আবশ্যক। তারা কীভাবে এ ভূমিকা রাখতে পারেন, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। ভালো ও ইতিবাচক সাহিত্যের প্রশংসা এবং খারাপ ও নেতিবাচক সাহিত্যের বিরূপ সমালোচনার মাধ্যমে এবং সর্বোপরি খারাপ ও নেতিবাচক সাহিত্যপাঠে পাঠকের অনীহা প্রদর্শনের মাধ্যমে এ ভূমিকা পালন সম্ভব। তাছাড়া, খারাপ ও নেতিবাচক সাহিত্য সম্পর্কে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে।
পৃথিবীতে সবকিছুরই বিপরীতমুখী দুটি বিষয় সুস্পষ্ট। প্রাণীকুলের মধ্যে যেমন স্ত্রী ও পুরষ দুটি লিঙ্গ রয়েছে, তেমনি ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, সুনীতি-দুর্নীতি, ন্যায়-অন্যায়, কল্যাণ-অকল্যাণ, সুন্দর-অসুন্দর, শ্লীল-অশ্লীল ইত্যাদি বিপরীতমুখী দুটি বিষয় মানুষের জীবনে ও সমাজে সর্বদা ক্রিয়াশীল। এক্ষেত্রে কোনটা ভালো ও কল্যাণকর আর কোনটা মন্দ ও অকল্যাণকর তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন পড়ে না। একটি মানুষের জীবনে ও সমাজে অফুরন্ত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে আর অন্যটি মানুষের জীবন ও সমাজকে নিয়ে যায় জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। সাহিত্যে কোন্ বিষয়টি স্থান পাবে তা সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত বিবেচনার বিষয়। তাই এ ক্ষেত্রে তাকে দায়িত্বশীল ও সুবিবেচকের ভূমিকা পালন করা আবশ্যক।
সকল প্রকার জুলুম-নির্যাতন, অসত্য-অন্যায়-দুর্নীতি-অসুন্দর ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সোচ্চারিত হওয়াই বিবেকবান দায়িত্বশীল মানুষের কাজ। সাহিত্যের বিষয়বস্তু নির্বাচনেও এ বিষয়টি মনে রাখা অবশ্য কর্তব্য।

যে কোনো সৃষ্টি বা নির্মাণের জন্যই কিছু উপকরণ প্রয়োজন হয়। সাহিত্য সৃষ্টির জন্যও প্রয়োজনীয় উপকরণ অপরিহার্য। ভাব-বিষয়-শব্দ মূলত এগুলো হলো সাহিত্যের মৌলিক উপকরণ। তবে সাহিত্যের অন্যতম প্রধান শাখা কবিতার জন্য এছাড়া আরো অতিরিক্ত কিছু উপকরণ যেমন ছন্দ, শব্দালংকার, উপমা, প্রতীক, রূপক-রূপকল্প ইত্যাদি প্রয়োজন হয়। তবে এখানে কবিতা নয়, শুধুমাত্র সাধারণভাবে সাহিত্যের বিষয়-ভাবনা নিয়ে আলোচনার প্রয়াস পাবো।
বিষয় সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। তাই সাহিত্য সৃষ্টির আগেই প্রথমে সাহিত্যের বিষয় নিয়ে ভাববার প্রয়োজন আছে বৈকি। প্রাচীনকালে সবদেশে সাহিত্যের মূল বিষয় ছিলো ধর্ম। ধর্ম মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। প্রাচীনকালে মানুষের জীবনের ভাব, অনুভূতি ও সকল কর্মকাণ্ডের মূল উৎস বা কেন্দ্রবিন্দু ছিলো ধর্ম। ধর্মের বাইরে মানুষ তখন কোনো কিছুই চিন্তা করতো না। আদি মানব আদম আ. ও মা হাওয়াকে আ. পৃথিবীতে পাঠানোর পূর্বে তাঁদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিধি-বিধান বা আদেশ-নির্দেশ প্রদান করা হয়। প্রকৃতপক্ষে সেটাই ছিলো তাঁদের ধর্মÑ যা যুগে যুগে ‘ইসলাম’ নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এ ধর্মীয় নির্দেশাবলীর মাধ্যমেই তাঁরা তাঁদের জীবন পরিচালনা করেছেন। কাল-প্রবাহে এ ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটেছে। যুগের প্রয়োজনে বিভিন্ন নবী-রাসূলদের মাধ্যমে আল্লাহ স্বয়ং এ পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, আবার কখনো মানুষ নিজে থেকেই আল্লাহর বিধানে পরিবর্তন এনেছে। মানুষের কাছে এ দুটোই ধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এ দুটোই ধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি পেলেও এর একটি আল্লাহ-প্রদত্ত অন্যটি মানুষের দ্বারা পরিবর্তিত বা মানুষের মনগড়া। দুটোরই অনুসারীর সংখ্যা কম নয়।
যাইহোক, প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের জীবনে ধর্মের ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষের চিন্তা-চেতনার বিকাশ ঘটেছে, সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছে, মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান-সাধনা ও সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতেই গড়ে ওঠেছে দর্শন-সাহিত্য-সংস্কৃতি, শিল্পকলা-ভাস্কর্য, সামাজিক রীতি-নীতি, মানুষের বিশিষ্ট জীবনধারা ইত্যাদি। এখানে বিশেষভাবে ধর্ম কীভাবে সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে, সেটাই সংক্ষেপে আলোচনার প্রয়াস পাবো।
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম দুটি মহাকাব্য ‘রামায়ণ’ ও ‘মহাভারত’ এ দুটোর বিষয়বস্তুই মূলত ধর্ম। এ দুটো মহাকাব্য হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থ হিসাবেও বিবেচিত হয়। গ্রীসের জাতীয় কবি হোমার, রোমানদের জাতীয় কবি কার্লাইল, ইংরাজ মহাকবি জন মিল্টন প্রমুখ সকলেই তাঁদের স্ব স্ব ধর্মভাবে উজ্জীবিত-উদ্বুদ্ধ হয়েই তাঁদের বিশ্ব-বিখ্যাত মহাকাব্যসমূহ রচনা করেন। বলা বাহুল্য, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কাব্য রচনার ফলেই এগুলো এতো জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ধর্মীয় বিষয়বস্তুর কারণেই সাধারণ মানুষ অদম্য আগ্রহ নিয়ে যুগে যুগে তা পাঠ করেছে এবং পবিত্র গ্রন্থ হিসেবে তা সকলের কাছে সমাদৃত হয়েছে। মানুষের জীবনে ধর্মের অনিবার্য প্রভাবের ফলেই জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট সাহিত্যেও ধর্মীয় ভাব-বিষয় স্বাভাবিকভাবেই সাহিত্যের উপজীব্য হয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের আদি নির্দশন ‘বৌদ্ধগান ও দোহা’ বা চর্যাপদের মূলভাব ও বিষয়ও বৌদ্ধধর্ম থেকে উদ্ভুত। চর্যা পদকর্তাগণ ছিলেন বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। তাঁদের অনেকে ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মগুরু বা সিদ্ধাচার্য। বৌদ্ধধর্মের মূলভাব ও বিষয় নিয়ে তারা গান রচনা করে বৌদ্ধধর্ম মন্দিরে ভক্তদেরকে তা গেয়ে শুনাতেন। অবশ্য ধর্মমন্দিরের বাইরেও এগুলোর চর্চা হতো। চর্যাপদের অধিকাংশ গানেই রূপকার্থে বৌদ্ধধর্মের নিগূঢ় তত্ত্ব প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে কতিপয় উদ্ধৃতি পেশ করা হলো। পাঁচ নম্বর চর্যাপদের দুটি লাইন:
ভবনই গবন গম্ভীর বেঁগে বাহী।
দুআন্তে চিখিল মাঝে পার ন থাহী ॥
ভবনদী গহীন গম্ভীর বেগে প্রবাহিত, দু’পাড়ে কাদা, মাঝে অথই পানি। নদী-মাতৃক বাংলাদেশের বর্ষায় দু’কূল প্লাবণকারী প্রমত্তা নদীর বর্ণনা আছে উপরোক্ত দু’টি লাইনে। এখানে দৃশ্যত যে বর্ণনা রয়েছে, তা গূঢ়ার্থে পার্থিব জীবনের সাথেও তুলনীয়। এ ধরনের রূপক বা রূপকল্পের ব্যবহার চর্যাপদের বিভিন্ন স্থানে পরিদৃশ্যমান। নয় নম্বর চর্যাপদ থেকে দু’টি লাইন উদ্ধৃত করছি :
জিম জিম করিনা করিনিরে রিসঅ।
তিম তিম তথতা মদগল বরিসঅ ॥
হস্তি-হস্তিনীকে দেখে মদমত্ত হয়ে ছুটে যায়। নৈরাত্মা সান্নিধ্যে তিনি তথত্যমদ বর্ষণ করেন। এখানে যেমন একটি সাধারণ অর্থ আছে, রূপকার্থেও এর তেমনি অন্য একটি অর্থ আছে। হস্তি ও হস্তিনীর মিলন জৈবিক আসক্তি থেকে, মানবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলনও তেমনি এক গভীর সাধনা ও আকাক্সক্ষার ফল। কবির বর্ণনা বাহ্যত যে অর্থ প্রদান করে, রূপকার্থে তা ভিন্ন আরেকটি অর্থ প্রকাশ করে। এ ধরনের রূপকল্প চর্যাপদে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। [মুহম্মদ মতিউর রহমান: হাজার বছরের বাংলা কবিতা, পৃষ্ঠা-১২-১৩।]
মধ্যযুগে হিন্দুদের রচিত বাংলা সাহিত্য মূলত হিন্দুধর্ম ও তাদের আরাধ্য দেব-দেবী সম্পর্কিত। বিভিন্ন ধরনের মঙ্গলকাব্যে লৌকিক দেব-দেবীর প্রাধান্য। অন্যদিকে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন ও বৈষ্ণব পদাবলীতে বৈদিক দেব-দেবীর গুণ-কীর্তন লক্ষ্য করা যায়। লৌকিক দেব-দেবী মূলত অনার্য ও দেশজ নানা কাহিনী ও অলৌকিক উপদানে গঠিত ও সৃজিত। অন্তজশ্রেণীর হিন্দু, ধর্মান্তরিত জৈন ও বৌদ্ধদের মিশ্র ধর্মীয় মতবাদ ও জীবন দর্শনের মিশ্র উপাদানে লোকজ ধর্ম ও লোকজ দেব-দেবীর উদ্ভব। এ ধর্মমত ও দেব-দেবী সম্পূর্ণ দেশীয় উপাদানে ও দেশজ ভাবধারায় পরিগঠিত। তাই এর সাথে এদেশের সাধারণ মানুষের সম্পর্ক ও মমত্ববোধ স্বাভাবিকভাবেই অধিক।
অন্যদিকে, বৈদিক ধর্মমত ও দেব-দেবী আর্য-সম্ভূত। আর্যরা এদেশে বহিরাগত এবং আর্য দেব-দেবীও বাংলার মাটি ও মানুষের ওপর আরোপিত। তাই বৈদিক ধর্ম ও বৈদিক দেব-দেবী এদেশে বহিরাগত অল্পসংখ্যক আর্যব্রাক্ষ্মণ বা উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যেই সর্বদা সীমাবদ্ধ থেকেছে। সাধারণ মানুষ তা কখনো আন্তরিকভাবে নিজের বলে গ্রহণ করতে পারেনি। লোকজ ধর্ম, লোকজ দেব-দেবী, অলৌকিক ও অতিমানবিক বিষয়বস্তুই সাধরণ বাঙলি হিন্দুর জীবনে সর্বদা প্রভাব বিস্তার করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রমও চোখে পড়ে। যেমন মঙ্গলকাব্যে চাঁদ সওদাগরের চরিত্রে মানবীয় দিকটি প্রাধান্য পেয়েছে। অন্যদিকে, বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি রচিত কিছু কিছু চরণেও মানবীয় ভাব ও হৃদয়বৃত্তির পরিচয় ফুটে উঠেছে। অবশ্য অনেকের ধারণা, ইসলাম ও মুসলমানদের প্রভাবেই এ ধরনের মানবীয় ভাবধারার প্রকাশ ঘটেছে। সে যাইহোক, মধ্যযুগে বাঙালি হিন্দু রচিত সাহিত্যের প্রধান বিষয় ছিলো ধর্ম। এখানে চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতি থেকে কতিপয় উদ্ধৃতি পেশ করছি:
শুন হে মানুষ ভাই
সবার উপরে মানুষ সত্য
তাহার উপরে নাই।
রাধার বিরহ বর্ণনায় চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকের প্রখ্যাত বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতিও সম্পূর্ণ মানবীয় রসে অভিষিক্ত হয়েছেন। বিদ্যাপতির বর্ণনা :
এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।
এ ভরা বাদর মাহভাদর
শূন্য মন্দির মোর ॥
অথবা, কত কত চতুরাণ মরি মরি যাওত
ন তুয়া আদি অবসানা।
তোহে জনমি গুণ তোহে মিলাওত
সাগরি লহরী সমানা ॥
বিদ্যাপতির আরেকটি কবিতার কয়েকটি চরণ :
জনম অবধি হম রূপ নিহারিল
নয়ন ন তিরপিত ভেল
সেই মধুর বোল শ্রবণহি শুনল
শ্রুতি পথে পরশ ন গেল ॥
কত মধু যামিনী রভসে গমাওল
ন বুঝল কেসন কেল।
লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রখিল
তৈও হিয় জুড়ন ন গেল ॥
১২০৪ সনে তুর্কিবীর ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গবিজয়ের পর বাংলা সাহিত্যের বিষয়বস্তু হিসাবে একটি নতুন বিষয় সংযোজিত হয়। ইতঃপূর্বে বাংলাদেশ ছিলো প্রধানত হিন্দুÑ অধ্যূসিত একটি জনপদ। ইখতিয়ার উদ্দীনের বঙ্গবিজয়ের পর পূর্বতন শাসক শ্রেণীর শোষণ ও ধর্মীয় ভেদনীতি তথা জাতিভেদের কারণে এদেশের নীচবর্ণীয় হিন্দুগণ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে। ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ মানবিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা ইসলামের ছায়াতলে এসে আশ্রয় নেয়। এভাবে অতি অল্পকালের মধ্যে হিন্দুপ্রধান একটি অঞ্চল মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে পরিণত হয়। এরফলে ক্রমান্বয়ে আমাদের ভাষা-সাহিত্য, সামাজিক রীতি-নীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রাজনীতি-অর্থনীতি তথা সামগ্রিক জীবনধারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। এ পরিবর্তগুলো প্রধানত নিম্নরূপ:
প্রথমত, সেন আমলে বাংলা ভাষার উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে বাংলা-সাহিত্যের চর্চাকে উৎসাহিত করা হয়। অর্গলমুক্ত পরিবেশে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বাংলা ভাষা-সাহিত্যের চর্চায় জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলে আত্মনিয়োগ করে।
দ্বিতীয়ত, শাসক শ্রেণীর ভাষা আরবি-ফারসি-তুর্কি থেকে অসংখ্য শব্দ বাংলা ভাষায় আত্মীকৃত হওয়ায় বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হয়। ফলে বাংলা ভাষায় বিচিত্র ভাব প্রকাশ ও সাহিত্য চর্চা সহজতর হয়।
তৃতীয়ত, প্রাচীন ও উন্নত আরবি-ফারসি সাহিত্যের প্রভাবে বাংলা সাহিত্য বিশেষভাবে সমৃদ্ধ হয় এবং বাংলা সাহিত্যে উন্নতর ও আন্তর্জাতিক ভাবধারার সংযোজন ঘটে। তাছাড়া, আরবি-ফরসি সাহিত্যের রূপাঙ্গিক, রূপরীতি ও প্রকরণগত নানা বিষয়ের প্রভাবও বাংলা সাহিত্যে পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। তাই শুধুমাত্র সাহিত্যের বিষয়-ভাবনায় যে পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছে কেবল সে সম্পর্কেই এখানে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করার প্রয়াস পাবো।
মুসলিম শাসনামলে সাহিত্যের বিষয়বস্তু হিসাবে বাঙালি হিন্দুরা আগের মতোই হিন্দুধর্ম ও হিন্দু দেব-দেবীকে তাদের সাহিত্যের উপজীব্য করেছে। কিন্তু বাঙালি মুসলমানগণ ঐ সময় আল্লাহ, রাসূল, সাহাবায়েকেরাম, পীর-আউলিয়া, মুসলিম বীর ও তাদের ধর্মীয় উপাখ্যান নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছে। এক্ষেত্রে তারা উভয়েই তাদের স্ব স্ব ধর্ম থেকে অনুপ্রেরণা ও সাহিত্যের বিষয়বস্তু সংগ্রহ করেছে। কিন্তু বাঙালি মুসলিম কবিগণ শুধু ধর্মীয় অনুপ্রেরণা ও বিষয়বস্তুর মধ্যেই তাদের সাহিত্য-চর্চা সীমাবদ্ধ রাখেনি। ধীরে ধীরে তারা বিভিন্ন মানবিক উপাখ্যান-উপাদান- সংবেদনা ও বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে সাহিত্য চর্চার প্রয়াস পেয়েছে। এটা বাংলা সাহিত্যের এক তাৎপর্যপূর্ণ ক্রান্তিকাল। ইংরাজিতে এটাকে বলা যায় টার্নিংপয়েন্ট।
এ সময় থেকেই বাংলা সাহিত্যে এক নতুন স্রোতধারা সৃষ্টি হয়। মানবীয় সংবেদনশীলতার সংস্পর্শে সাহিত্যে এক নতুন প্রাণবন্ত ধারার উন্মেষ ঘটে। এটাই আধুনিকতার লক্ষণ। তাই বলা যায়, বাঙালি মুসলমানদের হাতেই বাংলা সাহিত্যে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটেছে এবং আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে শাহ মোহাম্মদ সগীর রচিত ‘ইউসুফ জোলায় খাঁ’, দৌলত উজির বাহরাম খাঁ রচিত ‘লাইলী মজনু’, ফকির গরীবুল্লাহ রচিত ‘কারবালা’, সৈয়দ আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ প্রভৃতি মানবিক কাহিনীপূর্ণ কাব্যের উল্লেখ করা যায়।
কালপরিক্রমায় বিশ্বের সবদেশের সাহিত্যের বিষয় বৈভবে ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন ঘটেছে। বলা যায় জীবনের সাথে সম্পর্কিত সব বিষয় নিয়েই এখন সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে। অতএব, সাহিত্যের বিষয়বস্তুর কোনো সীমা-সরহদ নিরূপণ করা দুষ্কর। রাজনীতি-অর্থনীতি, ধর্ম-সংস্কৃতি, শিক্ষা-সভ্যতা, ইতিহাস-দর্শন-ভূগোল, সামাজিক রীতি-নীতি, মানুষের জীবনের প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বিরহ-বিচ্ছেদ, সীমাহীন নিসর্গ, আকাশ-সমুদ্র, নদী-নালা-পাহাড়, বন-জঙ্গল, পশু-পাখি-প্রাণীকুল এমনকি, সৌরজগতের বিভিন্ন বিষয়ও এখন অবলীলায় সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে পরিণত হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, সাহিত্যে যেকোনো কিছু উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সাহিত্যিকের নিজস্ব বোধ-বিশ্বাস, পারিপার্শ্বিক ও কালিক অবস্থার প্রভাব সর্বদা ক্রিয়াশীল।
সাহিত্য চিন্তার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধারণার উদ্ভব হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ (আর্ট ফর আর্ট সেক), ‘জীবনের জন্য শিল্প’ (আর্ট ফর লাইফ’স সেক) অথবা ‘সত্য সুন্দর কল্যাণের জন্য শিল্প’ ইত্যাদি মতবাদের উল্লেখ করা যায়। এ প্রত্যেকটি চিন্তা বা ধারণাই বিশেষ বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্ভূত। এর পক্ষে যেমন যুক্তি আছে, বিপক্ষেও যুক্তির কোনো অভাব নেই। তবে শেষোক্ত ধারণাটিই অধিকতর যুক্তিসংগত ও সর্বশ্রেণীর মানুষের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
সাহিত্যের বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচ্য। সাহিত্য মানুষের মনে ও সমাজে ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী শিল্পকর্ম। তাই সাহিত্যের প্রভাব নেতিবাচক হলে তা বিপর্যয় সৃষ্টি করে, ইতিবাচক হলে শুভ ফল বয়ে আনে। মানুষের চিন্তা ও মননে, বিভিন্ন কর্ম-প্রচেষ্টায়, সামাজিক সংগঠন ও আয়োজনে এমনকি, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নেও সাহিত্য অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সাহিত্যের বিষয়বস্তু যাতে ইতিবাচক, কল্যাণকর ও ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য হিতকর হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা সুস্থ্য বিবেকবান মানুষের কাছ থেকে একান্তভাবে প্রত্যাশিত।
সাহিত্যের বিষয় নির্বাচন যদিও সাহিত্যিকের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়, তবু এক ব্যাপক প্রভাব বিস্তারকারী শিল্পকর্ম হিসাবে সাহিত্যের বিষয় নির্বাচনে সমাজের দায়িত্বশীল সচেতন নাগরিক তথা সমাজপতি-শিক্ষক-সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং সর্বোপরি পাঠক সমাজের সক্রিয় ইতিবাচক ভূমিকা রাখা আবশ্যক। তারা কীভাবে এ ভূমিকা রাখতে পারেন, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। ভালো ও ইতিবাচক সাহিত্যের প্রশংসা এবং খারাপ ও নেতিবাচক সাহিত্যের বিরূপ সমালোচনার মাধ্যমে এবং সর্বোপরি খারাপ ও নেতিবাচক সাহিত্যপাঠে পাঠকের অনীহা প্রদর্শনের মাধ্যমে এ ভূমিকা পালন সম্ভব। তাছাড়া, খারাপ ও নেতিবাচক সাহিত্য সম্পর্কে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে।
পৃথিবীতে সবকিছুরই বিপরীতমুখী দুটি বিষয় সুস্পষ্ট। প্রাণীকুলের মধ্যে যেমন স্ত্রী ও পুরষ দুটি লিঙ্গ রয়েছে, তেমনি ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যা, সুনীতি-দুর্নীতি, ন্যায়-অন্যায়, কল্যাণ-অকল্যাণ, সুন্দর-অসুন্দর, শ্লীল-অশ্লীল ইত্যাদি বিপরীতমুখী দুটি বিষয় মানুষের জীবনে ও সমাজে সর্বদা ক্রিয়াশীল। এক্ষেত্রে কোনটা ভালো ও কল্যাণকর আর কোনটা মন্দ ও অকল্যাণকর তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন পড়ে না। একটি মানুষের জীবনে ও সমাজে অফুরন্ত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে আর অন্যটি মানুষের জীবন ও সমাজকে নিয়ে যায় জাহান্নামের দ্বারপ্রান্তে। সাহিত্যে কোন্ বিষয়টি স্থান পাবে তা সাহিত্যিকের ব্যক্তিগত বিবেচনার বিষয়। তাই এ ক্ষেত্রে তাকে দায়িত্বশীল ও সুবিবেচকের ভূমিকা পালন করা আবশ্যক।
সকল প্রকার জুলুম-নির্যাতন, অসত্য-অন্যায়-দুর্নীতি-অসুন্দর ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সোচ্চারিত হওয়াই বিবেকবান দায়িত্বশীল মানুষের কাজ। সাহিত্যের বিষয়বস্তু নির্বাচনেও এ বিষয়টি মনে রাখা অবশ্য কর্তব্য।