আহমদ ছফা (৩০জুন ১৯৪৩-২৮ জুলাই ২০০১) বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসে এক অপরিহার্য নাম। তার বহুমূখী প্রতিভা সবার কাছে সুবিদিত। তার তীব্র বুদ্ধি ও সাহসিকতাদীপ্ত আলোচনা-পর্যালোচনা সবাইকে কাঁপিয়ে তুলতো। এমনকি সময়ের প্রেক্ষিতে তিনি হারানোর মত নন। কেননা তার কলম থেকে এমন কিছু অমীয় বাণী বেরিয়েছিলো যা পৃথিবী পৃথিবী ধ্বংসের আগ পর্যন্ত টিকে থাকবে। আহমদ ছফার মাঝে দেশপ্রেম চরমাকারে ধারণ করেছিল।
তার শিক্ষা জীবন সুখের ছিল না। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষা বারবার ব্যহত হয়েছে তথাকথিত প-িত ও বুদ্ধিজীবীদের জন্য। তথাপি তিনি পিএইচডি-র ছাত্র ছিলেন জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাকের তত্ত্বাবধানে। শেষ করতে পারেননি যদিও আব্দুর রাজ্জাকের প্রবল চেষ্টা ছিল। রাজনৈতিক অদূরদর্শীভাবাপন্ন নেতাদের ক্ষমতার দাপটকে ভয় করেনি। উল্লেখ্য একবার খালেদা জিয়াকে ফোন করে বলেই বসলেন এবং বললেন, “ক্ষমতা পরিচালনার জন্য চারপাশে অপদার্থ ও মুর্খ লোক দিয়ে ভরে রেখেছেন। এতে দেশের বারটা বাজবে।” আবার শেখ হাসিনা ছিয়ানব্বইয়ে ক্ষমতায় আসলে তার কর্মকা- দেখে বললেন, “আওয়ামী লীগ জিতলে শেখ হাসিনা জিতে যায়। আর আওয়ামী লীগ হারলে যেন পুরো দেশ হেরে যায়।” এমন ভাবেই সমালোচনা করতেন।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এদেশের কথিপয় লেখকের আত্ম-অহংকার ও দাপটে নবীন লেখকেরা সুযোগ পেত না। এমনকি তারা এমন একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে রেখেছিল নতুন লেখকেরা বই প্রকাশের সুযোগ পাবার আশায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করতো। এ সিন্ডিকেট তিনি ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। কথাসাহিত্যিক হূমাযুন আহমদের প্রথম লেখা প্রকাশের জন্য প্রকাশক ও প্রতিথযশা লেখকদের ধারে ধারে ঘুরেছিলেন দিনের পর দিন। কিন্তু ব্যর্থ। কোন লেখক তার লেখা না পড়েই বলে দিল হয়নি। আহমদ ছফা সেই লেখাটি নিয়ে কভার পেজ ছিঁড়ে ফেলল এবং লেখকের নাম মুছে নিজের বলে চালিয়ে দিল। সে-সময় আজিজ সুপার মার্কেটে লেখকদের আড্ডা-খানায় সরগোল পড়ে গেল এমন অসাধারণ লেখনির জন্য। প্রকাশ হলো ‘নন্দিত নরকে’। প্রকাশনার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিলেন এদেশের তথাকথিত প্রতিথযশা লেখকদের হীনমণ্যতা।
আহমদ ছফার জীবনে স্থিরতা বলে কিছুই ছিল না। ধর্ম বিশ্বাসের বেলাও তাই ছিল। রাজনৈতিক মাঠেও সংযুক্ত হয়েছিলেন, কিন্তু ফিরে আসেন দ্রুত। যৌবনের শুরুতে বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু বামপন্থীদের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পৃক্ত হোন। তিনি তখন মাও সেতুং-এর বাণী সমূহ সর্বমহলে প্রচারের জন্য অনুবাদ করেন। মাওলানা ভাসানীর প্রতি ছিল বেশ দুর্বলতা, কিন্তু অন্ধ ভক্তি ছিলনা। ফলে অন্যান্য রাজনীতির বিষয়বস্তু বেশ খেয়াল করতেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু যাবার আগে লেখকদের সংগঠিত করে ‘স্বাধীন বাংলা লেখক সংগ্রাম শিবির’ তৈরি করেন যা স্বাধীনতার পরে ‘বাংলাদেশ লেখক শিবির’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এভাবে তিনি স্ব-শরীরে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি কলমের মাধ্যমেও অন্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছিলেন। অথচ সে-সময় অনেক লেখক নিশ্চুপ চিলেন কিন্তু স্বাধীনতার পর মহানায়কের আসনে অধীষ্ঠ হয়ে যান।
আহমদ ছফা গল্প, কবিতা, নাটক, উপন্যাস, ইতিহাস, প্রবন্ধ, ও অনুবাদ করেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার মৌলিকত্ব আছে। তবে সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে নিজস্ব কোন ধারা তৈরি করতে না পারলেও ছিলেন নির্মোহ। খ্যাতির শীর্ষে ছিল বলে কাউকে ছাড় দেননি। বরং তিনি তাদের আরো কঠোরভাবে ধরেছেন। বিশেষ করে তার সমালোচণায় ব্যক্তি মানস ঠাই পেয়েছে তীব্রভাবে।
এদেশের অনেক সাহিত্যিক ও সাহিত্য সমালোচক কাজী নজরুল ইসলামকে বড় বা মৌলিক কবি হিসেবে আজো মানতে নারাজ। কিন্তু এক্ষেত্রে আহমদ ছফা একেবারে ভিন্ন। তিনি বললেন, “নজরুলকে আমি আমার নিজের পেটের ছেলের মত মনে করি। নজরুলের জন্য আমার দরদ অপরিসীম। নজরুল যদি একাধারে শ্যামাসঙ্গীত ও ইসলামী গজল লিখে থাকেন ক্ষতি কি তাতে? সে জন্য তিনি সমালোচিত হবেন কেন? তাঁর মার্ক্সবাদী চিন্তা বা রাজনৈতিক জ্ঞানের মধ্যে ক›ট্টাডিকশন আছে কি না-আছে সেটিও তাঁর কাব্যসমালোচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়।”
নজরুল সম্পর্কে আরো বললেন, “নজরুল ইসলাম পল্টনে থাকাকালীন সময়ে রুশ বিপ্লবের কথা শুনেছিলেন এবং রুশ বিপ্লবের আদর্শে তাঁকে ভয়ানকভাবে উদ্দীপ্ত করে তুলেছিলেন। তিনি তাঁর গদ্য রচনায় রাশিয়ার লাল ফৌজের কথা উল্লেখ করেছেন। লাল ফৌজরা যেভাবে শোষণের ভবসান ঘটিয়ে ইনসাফের রাজত্ব কায়েম করেছে সে রকম একটা সমাজ এই ভারতে কায়েম করা যায় কিনা সে বিষয়টা অল্পদিনের জন্য হলেও নজরুল ইসলামের চিন্তাভাবনার বিষয় হয়ে উঠতে পেরেছিল। রুশ বিপ্লবের আদর্শে নজরুল ইসলাম অনেকগুলো কবিতা রচনা করেছিলেন এবং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালেরই বিখ্যাত সঙ্গীতটির প্রথম দিককার অনুবাদক এবং সরকার দুই ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। রুশ এমন কি কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করার সময় নজরুল ইসলাম অল্পস্বল্প ভূমিকা করেছেলেন। নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা উপন্যাসটি নানা কারণে নজরুল সাহিত্যে নয় শুধু, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের জন্য একটি বিশিষ্ট রচনা। কারণ যাদের নিয়ে নজরুল এই রচনা লিখতে আরম্ভ করেছিলেন তারা ছিলেন সমাজে একেবারে নিচুতলার মানুষ। এই নিচুতলার মানুষদের নিজেদের পেশাকে তাঁর উপন্যাসে হাজির করতে নজরুল ইসলাম বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হন নি। মৃত্যুক্ষধা উপন্যাসে পাত্রপাত্রীরা নিজেদের আপন ভাষায় কথা বলেছেন। বলা বাহুল্য, সেটা ভদ্রলোকদের ব্যবহৃত শুদ্ধ ভাষা নয়।”
মাইকেল মধুসূদন সম্পর্কে অনেক কথা থাকলেও তিনি তাকে বেশ গুরুত্ব সহকারেই বিবেচনা করেছেন। তার মতে, “মাইকেলের উদ্দাম কল্পনা করার ক্ষমতা, কবিতা রচনার অসাধারণ প্রতিভা, তাঁর ঐতিহ্য, মানস সংগঠন, শিক্ষা, সাধনা, খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা, প্রাচীন কবিদের রচনার প্রতি আগ্রহ এবং সর্বোপরি বীররসের কাব্য রচনা করার অনিবন্ত কামনা তাঁকে সম্পূর্ণভাবে নবযুগের আগ্রদূত হিসেবে চিহ্নিত করে। অন্যান্য মহৎ কবিদের মত তিনিও তাঁর যুগের চাইতে অনেক দূর অগ্রগামী ছিলেন। কারণ, ইন্দ্রজিৎ এবং প্রমীলার প্রতি তাঁর জাগ্রত সহানুভুতি। তাঁদেরকে মূল রামায়নের রাম, লক্ষণ, সীতার চাইতে অধিকতর মহৎ এবং বলিষ্ঠভাবে চিহ্নিত করেছেন। রাবণ, ইন্দ্রজিৎ, প্রমীলার চরিত্রে সাহিত্যিক মহত্বের প্রতিষ্ঠা দিয়ে মাইকেল ঐতিহ্য এবং সংস্কারের বুকে যে প্রচ- আঘাত করলেন তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।”
ঠিক তেমনিভাবে বঙ্কিমকে নিয়েও তার মতামত প্রণিধানযোগ্য। তার মতে, “বঙ্কিমের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ অভিযোগ হল তিনি ইতিহাসকে বিকৃত করেছেন, কথাটা সত্যি। কিন্তু তা সত্বেও তিনি যে বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠতম সন্তানদের একজন সে বিষয়ে কারো সন্দেহের অবকাশ থাকা উচিত নয়।”
তবে নজরুলকে তিনি বাংলা সাহিত্যে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে তৃতীয় আদর্শ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একথার সত্যতা সল্লিমুল্লাহ খানের লেখাতেও পাওয়া যায়। তার মতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রভাব বিস্তারে বঙ্কিমের সমতুল্য হতে পারেননি। আহমদ ছফা লিখেছেন, “বঙ্কিম সানন্দে যে অন্ধকার ছড়িয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত একজন ব্যক্তিত্বের জীবনভর সংগ্রাম তা দূর করতে পারে নি। শয়তান তার প্রাপ্য আদায় করে ছাড়ে নি।” তবে প্রতিভার তুলনায় রবীন্দ্রনাথকে তিনি কেবল রবীন্দ্রনাথের সাথে তুলনা করে বললেন, “রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যে যে ভূমিকা পালন করেছেন তা বাঙ্গালি জাতি এবং বাংলা সাহিত্যের তুলনাহীন কল্যাণ সাধন করেছেন। তাঁর প্রশান্ত ব্যক্তিত্বের প্রভাবে বঙ্কিম এবং অন্যান্য লেখকের পূর্বে যে বিদ্বেষবিষ ছাড়িয়েছিলেন তার ধার অনেকটা মরে আসে।”
এভাবে হালেও প্রত্যেক সাহিত্যিককে নিয়ে তিনি তার মতামত প্রকাশ করেছেন নানাভাবে, যা বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে বেশ বড় ভূমিকা পালন করছে অদ্যবদি। এমন সাহসী সমালোচক খুব কমই বাংলাভাষায় জন্ম নিয়েছে।