কতগুলো বছর কেটে গেল। মনজু কোথায়, কোন অবস্থায় আছে সে খবর কারো জানা নেই। এমনকি আবিদের পরিবারের কেউও জানে না সে কথা। রাফি তাকে কবে সেই এক পলক দেখেছিল তার মায়ের মৃত্যুর সময়। মনজুকে নিয়ে রাফির নানা জল্পনাকল্পনার আর অবসান হয় না। কোনসূত্রে যে মনজুর হৃদয়ে গেঁথে আছে তা ঠিক রাফিও বুঝতে পারছে না। যে মানুষটা হারিয়ে গেছে আজ থেকে বহু বছর আগে। সে আমাকে আদৌ মনে রাখছে কি না। হয়তো এমনও হতে আমার কথা অনেক আগেই ভুলে গেছে। এখন আর আমার মতো মেয়েকে হৃদয়ে ঠাঁই দেয়ার মতো কোনো জায়গাই নেই তার।
আবিদ ভাবছে, বড় মেয়েটার ভাগ্যে যা ঘটেছে সবই নিয়তির খেলা। ভাগ্যের লিখন। তা না হলে এমন হবে কেন। কত সুন্দর একটা মেয়ে! নিজের মেয়ে বলে বলছি তা নয়।না পেল বাবার সংসারে শান্তি। না জুটল স্বামীর সুখ।
রাফিকে নিয়ে আবিদ ইদানীং বড়ই ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। মেয়ে বড় হলে বাবার চিন্তা বেড়ে যায়। তাকে সুপাত্রে দান করা বাবার জন্য গুরু দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। পড়াশোনা শেষ করেরাফি এখন একটা ভালো অবস্থানে পৌঁছেছে। তাই বিয়ের জন্য এটাই উপযুক্ত সময়। আবিদের তাড়াটা মূলত এ কারণে একটু বেশি। মেয়ে যে মনজুকে পছন্দ করে এ খবরটা বাবার অজানা নয়।
একই মহল্লায় দীর্ঘদিন ধরে থাকছে আবিদ। এখন এখানের অনেক মানুষ তারচেনাজানা। চলন-বলন, আলাপ-ব্যবহারে আবিদের বড় মনের পরিচয়। অনেকেই তাকে মনেপ্রাণে ভালো জানে। ভালোবাসে।
রাফি দেখতে বেশ চমৎকার। তাকে দেখলে যেকোনো ছেলেরই মনে ধরবে। বাবার অনেক গুণ পেয়েছে মেয়ে। শুধু রাফি নয়, আফিও। এখন মেয়েদের নিয়ে একরকম ঝামেলার মধ্যেই আছে। পাড়া-মহল্লা থেকে নানাজনে নানা কথা বলছে। অবশ্য এগুলো তার ভালোর জন্য বলে তার বন্ধুজন। রাফির বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসা অনেককেই তার না-বলতে হয়েছে। তারা কিছুটা মনক্ষুণœ হয়েছে, কিন্তু কাউকেই আসল কথা বলতে পারেনি। ইনিয়ে-বিনিয়ে কিছু কথা বলে সত্যকে আড়াল করতে হয়েছে। মেয়ে এখন বিয়ে করবে না, আমিও চাচ্ছি না। আগে মেয়েটার একটা ভালো চাকরিবাকরি হোক, এরপর নাহয় এসব নিয়ে ভাবা যাবে ইত্যাদি নানা কথা।
এখন আর তিনি মনজুর ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না। যে ছেলেটা আদৌ তার মেয়ের খবরই রাখছে না, তার উপর কীভাবে নির্ভর করা যায়। তাই তিনি মেয়েকে বললেন, ‘মা, আমি এখন কী করব তুমিই বলো। বহুদিন ধরে তোমাকে দেখছি, এভাবে বাঁচা যায় না। সবারই মনে কিছু-না-কিছু চাওয়াপাওয়া থাকে। একটা নির্দিষ্টসময় পেরোতেই-না-পেরোতে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয়। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরেকটু অন্যভাবে ভাবতে হয়। অন্যথায় একটা সময় পরেই এজন্য তাকে আফসোস করতে হয়।’
বাবা, তুমি তো আমার ব্যাপারে সবই জানো।
জানি বলেইতো বলছি।
ভালো-মন্দের ভার তোমার উপর ছেড়ে দিলাম। তোমার যা ইচ্ছা সেটাই কোরো। খোদা আমার ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন, এর থেকে একটুও ব্যতিক্রম হবে না। তার হাসিমাখা কথাগুলো আমার উপর অনেক দায়িত্ব চাপিয়ে দিলো।
আমি মেয়ের কথায় মনে মনে খুব ব্যথা অনুভব করলাম। বুকটা চিন করে ধরে এলো। আমি জানি সে আজও মনজুকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। কিন্তু তার বিশ^াস, তাকে আজ বড় হালকা করে দিয়েছে। এতদিন যে ধারণা মনে পুষেছিল সেখান থেকে ক্রমে ক্রমে সে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। বাবা হয়ে এটা আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি।
আমি আর মেয়েকে কিছু বললাম না। তার ব্যাপারে খোঁজ নিতে শুরু করলাম। কার কাছে তার ব্যাপরে জানব, এ নিয়ে দারুণ সংশয়ের মধ্যে পড়ে গেলাম। লোকে কী ভাবে। তাছাড়া এ ব্যাপারে লোকে কমবেশি কিছু জানে। হয়তো কেউ কেউ ভাববে, মেয়ে বড় হয়েছে বলে বাবা জামাই খুঁজতে বেরিয়েছে। রাফি সম্পর্কে গ্রামের লোকজন আগে থেকেই নানা কথা ছড়িয়েছে। বাতাসে ভেসে সে কথা এখন অনেক বড় আকার ধারণ করেছে। সামান্য মাস্টারের ছেলে হয়ে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়েছিল, আশ্রয়দাতারই সর্বনাশ করতে চেয়েছিল। খোদা মেহেরবান, তাই প্রাণে বেঁচে গেল। ঝেটিয়ে বিদায় করে দিয়েছে। ভাগ্যিস, প্রাণে মেরে দেয়নি।
আবিদ মনজুর গ্রামের বাড়িতে ছুটে গেল। আবিদকে দেখে গ্রামের লোক চোখ টেপাটেপি করে। পরিচিতজনেরাও আড়চোখে তাকায়। স্বামীর বদচরিত্র, নইলে এই বুড়ো বয়সে স্ত্রী কাউকে ছেড়ে চলে যায়। বাপু, শুনি তোর কী অভাব ছিল ? ঘরে সুন্দরী বউ, ব্যাংকে টাকাকড়ি। বাড়ি-গাড়ি সবই ছিল। কথায় বলে- স্বভাব কী আর সহজে যায়। ছাত্রজীবন থেকে যে অভ্যেস তাকে কী আর সহজে ভোলা যায়।
আবিদ কারো কথার কোনো উত্তর দিতে পারে না। স্বয়ং তার স্ত্রীই তাকে অভিযুক্ত করেছে। সেখানে অন্য মানুষের মুখ সে কীভাবে আটকাবে। মঞ্জুয়ারার বাড়ি ঢুকতেই তার বুকটা ধক করে উঠল।
আজ পাড়াসুদ্ধ মানুষ তোমায় নিয়ে কত কথা বলছে। কেউ ভেবে, আর কেউবা সমালোচনার সুরে। অথচ তুমি ছিলে কত নির্দোষ। পলকহীনভাবে আবিদ তাকিয়ে রইল মঞ্জুয়ারার কবরটার দিকে।
মঞ্জুয়ারা, আজ তুমি কবর দেশে ঘুমিয়ে বেশ সুখেই আছো। আর আমি জাহান্নামের আগুন বুকে নিয়ে জ¦লে মরছি। আমি চাইলেও আজ কাউকে বোঝাতে পারি না, আমি দোষী নই। তোমরা যা ভাবছ তা কখনোই সত্যি ছিল না।
আবিদ কিছুদূর এগিয়ে মঞ্জুয়ারার বাসার কাছে গেল। কোনো লোকজন নেই। নির্জন অরণ্যের মতো বাড়িটা কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুরাতন রীতিতে সে বেশ কয়েকবার মঞ্জুয়ারা, মঞ্জুয়ারা বলে ডাকল। পাশের বাড়ি থেকে একটা মেয়ে ছুটে এলো।
দাদা, আপনি ? কখন এসেছেন ? কাকে ডাকছেন ?দিদি তো সেই কবেই মারা গেছেন।
আবিদ একটু অন্যমনস্ক ভাবে বলল, তাই বুঝি। মেয়েটি আবিদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। দাদাবাবু এসব কী বলছে।
এবার সে মেয়েটিকে বলল, তুমি কি বলতে পারো, মনজু কোথায় ?
শুনেছি, দাদাবাবু শহরে অনেক বড় চাকরি পেয়েছে। মাঝেমধ্যে গাড়িতে করে বাড়িতে আসে। এলাকার মেম্বর, চেয়ারম্যান সবাই দাদাবাবুর সাথে দেখা করতে আসে। তখন নির্জন বাড়িটা আর নির্জন থাকে না, বাড়িটা তার আগের রূপ ফিরে পায়। মাস্টার কাকা জীবিত থাকলে যেমন লোক ফুরাতো না বাড়িটা তেমন হয়ে যায়।
তুমি কি তার ঠিকানা বলতে পার ?
তা কেন পারব না ? আপনি একটু দাঁড়ান, আমি আসছি।
এই বলে মেয়েটি বাড়িতে চলে গেল। কয়েক মিনিট পরে ডায়রির একটা ছেড়া পাতায় একটি মোবাইল নম্বর ও দু-লাইনের একখানা ঠিকানা এনে আমার হাতে দিয়ে বলল, দাদাবাবু বলেছে, কেউ আমার খোঁজে এলে তাকে এই নাম ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর দিয়ে দিয়ো।
মেয়েটি আবারও বাড়িতে গেল। আমি ভাবলাম, সে আর কী বলতে চায়, কিন্তু না এবার সে হাতে করে একগ্লাস শরবত ও আমার ছোটবেলার খুব প্রিয় কয়েকটা কাঁচা-পাকা পেয়ারা নিয়ে এলো। আমি শরবত গ্লাস একবারে খেয়ে ফেললাম। কারণ, দীর্ঘ পথ হেঁটে আসায় আমি অত্যন্ত ক্লান্ত ছিলাম। একটা পেয়ারাও মুখে তুলে নিলাম। এমন সময় মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে বলে ফেলল, আপনি দাদাবাবুকে কেন খুঁজছেন ?
মেয়েটির বলার ভঙ্গিতে মনে হলো সে এ ব্যাপারে কিছু জানে। তবু মেয়েটিকে এড়িয়ে বললাম, ওর সাথে আমার একটা ব্যক্তিগত কাজ আছে।
মেয়েটি বলল, ওহ! বুঝেছি।
আমি বললাম, তুমি কী বুঝেছ ?
তখন সে আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে দিয়ে আবার বাড়ির দিকে ফিরে গেল।
মেয়েটির কাছ থেকে পাওয়া ঠিকানা নিয়ে মনজুর সাথে দেখা করব বলে বেরিয়ে পড়লাম। কেন জানি আমার মনে ভয় জমতে থাকে। কবেকার সেই মনজু এখনো কি আগের মতো আছে ? এ মঞ্জুয়ারার ছেলে, মঞ্জুয়ারা নয়।
মানুষ যখন বিপদে পড়ে তখন সে মনে মনে সান্ত¡না খোঁজে। আমিও ঠিক তেমনি নিজেকে আশ^স্ত করতে লাগলাম, পৃথিবীর সব মানুষ বদলে যেতে পারে না, তাহলে ভালো আর মন্দের তফাতটা হারিয়ে যাবে, পাপে পাপে ভরে যাবে এ দুনিয়া। অবশ্য চারিদিকে তাকালে এমন দৃশ্যই চোখে পড়বে। অন্যায়কারী অন্যায় করেও যুক্তি দিয়ে সেটাকে হালাল করার চেষ্টা করে। না দূর হয় মনের কালিমা, না-কাটে সংশয়।
এখন আর আবিদের নিজের গাড়ি নেই। বাড়িও নেই। শেষপর্যন্ত মেয়ের ভালোবাসা তাকে অনেকদূর টেনেছে। এখন কোনো কষ্টই অতি সহজে তার কাছে কষ্ট মনে হয় না। অনেককিছু সহ্যের ক্ষমতা তার হয়েছে। সময়, পরিস্থিতি তাকে অনেক বড় শিক্ষা দিয়েছে। মনজুর ঠিকানায় সে পৌঁছল। চাঁদপুর জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে। মনজু এখানকার সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্বপালন করছে প্রায় দু-বছর।
আবিদ যখন পৌঁছল তখন বেলা দেড়টা। অধিকাংশ দপ্তর ফাঁকা। লাঞ্চের জন্য বেরিয়ে পড়েছে সবাই।উল্লেখযোগ্য কাউকেই চোখে পড়ছে না। হঠাৎএকজন তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কাউকে খুঁজছেন ?
আমি বললাম, জি¦ হ্যাঁ।
কাকে ?
মনজু ইসলামকে
আপনি কি স্যারের পরিচিত ?
ও আমার ভাগ্নে।
স্যার তো এইমাত্র বাসায় গেলেন। আপনি কি তার বাসায় যাবেন ?তাহলে আপনাকে বাসাটা দেখিয়ে দি।
তবে তো বেশ ভালোই হয়।
লোকটি মনজু সম্পর্কে উচ্ছস্বিত প্রশংসাই করল। এখানকার সবার কাছে সে একজন ভালোমানুষ, তাতে আর কোনো সন্দেহ রইল না। লোকটি কথা একটু বেশিই বলে। আমি এক লাইন জিজ্ঞেস করলে সেদুই লাইন বলে। এসব মানুষের একটা ভালো দিক আছে-মৃত্যু, জড়তা এসব এদের ঘিরে থাকলে মুখের বুলি এদের অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখে।
আমি তার কথা বিমুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকলাম। তার সরলতা আমাকে দারুণভাবে মুগ্ধ করল। লোকটি আমাকে উদ্দেশ করে বলল, জানেন, ভালোমানুষের প্রতি আল্লাহ সবসময় সদয় হন।
আমি বললাম, এ আপনি ঠিক বলেছেন। ভালোমানুষের পুরস্কার তো আল্লাহ-ই দিয়ে থাকেন।
লোকটি এবার আমার দিকে তাকিয়ে হেসে দিলো আর বলল, মানুষ এতো সুন্দর হতে পারে!
আমি বললাম, আপনি কার সুন্দরের কথা বলছেন ?
লোকটি বলল, আমি স্যারের স্ত্রীর কথা বলছি।
আবিদ কথাটা শুনে থমকে গেল। যেটুকু আশা তার মনে অবশিষ্ট ছিল তা-ও চুরমার হলো। সামনের দিকে পা আর এগোতে চায় না। সমস্ত শরীর শক্তিহীন হয়ে আসছে। বাসাটি দেখিয়ে লোকটি পুনরায় তার কাজে চলে গেল। আবিদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। সে ভাবতে পারছে না, মেয়েকে কী বলবে। এর কোনো উত্তর তার কাছে জানা নেই।
তবু তার বাস্তবতা না-মেনে উপায় নেই। জীবনে বাঁচতে হলে এরকম অনেক কঠিন সত্যের কাছাকাছি হতে হয়।