একদিন ভোরবেলা সায়মনকে নিয়ে আবিদের বাসায় চলে এলো সুমা। তখনো ঈদের ছুটি শেষ হয়নি। রাফি, আফি দুজনেই বাসায় আছে। সায়মনকে দেখে চমকে উঠল ওরা।
সবাই অবাক! এ কী দেখছে! এত বছর পর মানুষটি আবার ফিরে এলো। তাহলে এ দীর্ঘ সময় কোথায় ছিল সে ? নিজের আপনজনের কথা একবার মনে হয়নি ? কীভাবে ভুলে থাকতে পারল ?
সায়মনকে দেখে সবই ভুলে গেল আবিদ। শুকরিয়া খোদার। তার প্রতি ভালোবাসায় মাথা নত হয়ে আসছে। কত মহান তিনি। তিনি চাইলে মানুষকে মুহূর্তে কাঁদাতে পারেন, আবার হাসাতেও তার সময় লাগে না। সবই তার পরীক্ষা। সুমার কথা একপ্রকার সে ভুলেই গেছে। অথচ এই মানুষটি তার সামনে দাঁড়ানো।
এখন তার করণীয় কী, এসব নিয়ে মনে মনে ভাবছে। একদিকে ছেলেমেয়ে। অন্যদিকে তার সংসার। নিজের স্ত্রী-পরিজন। বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। আবিদ মেয়েদের কাছে আর ছোট হতে চায় না। নিজেরাই মিটিয়ে ফেলতে চায় নিজের বিষয়।
সুমা আবিদের দিকে চায়। আবিদ মুখটা ঘুরিয়ে নেয়। সুমার অলক্ষ্যে আবিদও তার দিকে তাকায়। কিছুতেই ক্ষমা করতে পারছে না সুমাকে। স্ত্রী হয়ে স্বামীর সাথে যে নোংরা খেলাটা খেলেছে তা কখনো আবিদের কল্পনায় আসেনি। তাই মন দিয়ে মুছতে পারে না সে কথা।
তবু ভাবে, সন্দেহ আর সংশয় তাদের আলাদা করে দিলেও এ বন্ধন যে জনম জনমের। না যায় তাকে ভোলা। না করা যায় তাকে পর।
আবিদ ছেলের দিকে তাকিয়ে ঝর ঝর করে কেঁদে দিলো। নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না। সে কখনো ভাবেনি ছেলের সাথে আর কখনো দেখা হবে। সবই খোদার কুদরত। তিনি চাইলে কিনা পারেন।
আয় বাবা! কাছে আয়।বেকার বলে, গালমন্দ করেছি। কত অপমান করেছি। ছেলে বেকার থাকলে বাবার কত জ¦ালা তা বুঝবি না। যখন তোরা বাবা হবি ঠিক একটা সময় উপলব্ধি করতে পারবি।
এতদিন কোথায় ছিলি ?
এদেশেই ছিলাম। বলেছিলাম বাবা, এ সায়মন তোমাদের কাছে সেদিন ফিরবে, যেদিন তার দৈন্যদশা তাকে ছেড়ে চলে যাবে। মানুষের করুণা নিয়ে তাকে আর বাঁচতে হবে না।তোমার ছেলে আজ আর অসহায় নয়। গরিবি হালত তাকে ছুঁতে পারে না। তার হাতে আছে কোটি কোটি টাকা। গাড়ি-বাড়ি।
ভেবো না, এসবের মালিক আমি অন্যায়ের রাস্তা ধরে হয়েছি। মানুষের ভাগ্য যখন সুপ্রসন্ন হয়,তখন সে কোথা থেকে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় নিজেও তা জানে না।
সন্তান তো আছে, এবার বউমাকে নিয়ে এসো।
তা আর হয় না। সে পথ সে নিজেই বন্ধ করে দিয়েছে। যে স্ত্রী স্বামীকে লোভের মোহে ছেড়ে দিতে পারে,তার প্রতি অনুগ্রহ দেখানো গেলেও তাকে ভালোবাসা যায় না। অন্য কথা নাহয় বাদই দিলাম।
সে পল নামে এক বিত্তশালীর প্রেমে পড়ে স্বামী-সন্তান সবাইকে ছেড়েছে। সে একবারও ভাবেনি তাদের ভালোবাসার কথা। নিজের ছেলের সুখের কথা। সে জানত না, এই পল কে ? এই পল ছিল তারই স্বামী। যে ছদ্মবেশে তাকে নিয়ে খেলছিল। বুঝতে চাইছিল, সত্যিই কি সে আগের মতো আছে ?নাকি সন্তানের মায়া তাকে মানুষ করে তুলেছে। কিন্তু না, সে পশুত্বকে কাটিয়ে উঠতে পারল না।
বাবা, তোমার নতুন বউমা তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কে?
ওর নাম তানিয়া।
একে তো চিনতে পারলাম না।
এই মেয়েটিই সেই মেয়ে যার ভালোবাসা আজ আমাকে অনেক বড় করেছে। ওর বাবাই আমাকে ¯েœহ-ভালোবাসা দিয়ে, অর্থ দিয়ে, পরিশ্রমী হতে শিখিয়েছেন। যার কারণে আজ আমি এত বড় হয়েছি। তবু আমাকে এই মানুষটি নীতিহীন হতে দেননি। বারবার আমার স্ত্রীর কাছে আমাকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছেন। আমি বারবার ভেবে দেখেছি। কিন্তু আমি কোনো লোভী জারিফাকে চাই না। তাই মনের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। এ কারণে আমি তানিয়াকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেছি। এ যদি আমার ভুল হয়ে থাকে, তাহলে তুমি যা বলবে আমি তা মাথা পেতে মেনে নেব।
তুই ভুল করেছিস সেকথা আমি বলব না। তবে কষ্ট হচ্ছে দাদুভাইয়ের জন্য।
ভুল আমি করেছি, আর সেটা তোমাদের না-জানিয়েই। বহু আগেই আফি আমাকে চিনতে পেরেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ওর সাথে আমার পরিচয় ছিল। আমার ব্যাপারে কাউকে কিছু না-বলার জন্য ওকে বেশ শক্ত করে বারণ করে দিয়েছি। এবং ওকে এ-ও বলেছি, আমার বিষয়ে কেউ যদি কিছু জানতে পারে, তাহলে আমি মনে করব তুইই বলেছিস। তাহলে তোদের কাছে ফিরে আসার যে আশাটুকু জেগেছে হয়তো তা আর থাকবে না। তাই ও তোমাদের কিছু বলেনি।
আফি মাঝে-মধ্যে তানিয়াদের বাসায় যেত। তোমরা মনে করতে ও হয়তো অফিসের কাজে বাইরে কোথাও আছে। ওর স্বামীর মৃত্যুর খবরটা যখন ওকে জানাই ও প্রচ- ভেঙ্গে পড়ে। ভাবতেই পারছিলাম না, আসলে ওকে নিয়ে কী করব। দীর্ঘদিন এ বাড়িতে ওর আসা-যাওয়া লক্ষ করলেন আমার শ^শুর। তখন আমাদের বিয়ে হয়নি। আমাকে ডেকে কাছে নিয়ে বললেন, বাবা, তোমাকে আমি মন দিয়ে ভালোবাসি। আমি চাই তোমার সাথে আমার একটা পরিচয় চিরদিন থেকে যাক। তোমার বোনটাকে আমার দারুণ ভালোলাগে। তুমি যদি অমত না-করো তবে আমার ছেলের বউ করে নিতে চাই। তার কথাতে আমার হ্যাঁ বলা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তাই তোমাকে না-জানিয়েই এ মস্ত ভুলটা করেছি বাবা।
বাবা, তুই কোনো ভুল করিস নি। একজন ভাই হিসেবে যা করা উচিত ছিল তুই তা-ই করেছিস। এজন্য আমি তোকে মোটেই দায়ী করছি না। বরং তোকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমি বাবা হয়ে যা পারিনি, তুই ভাই হয়ে তা করেছিস।