মনজুর ইচ্ছে ছিল রাফির ভুল ভাঙিয়ে একথা প্রমাণ করা, বিশ্বাসঘাতকতা সে করেনি বরং তাকেই ভুল বুঝেছে সে। বিনা কারণে দূরে সরিয়ে রেখেছে। আজ তার মায়ের কথা বড্ড মনে পড়ে। অতীতের কথাগুলো বড় বেশি বিরক্ত করে। সে চায় না, সুদূর অতীতের কোনো কথা ভবিষ্যতে তার জন্য বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়াক, তার মনে কোনো প্রশ্ন জাগুক তার মাকে নিয়ে।
মঞ্জুয়ারা আজীবন তার স্মৃতির জানালায় একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকুক। মৃত মানুষটিকে কেউ কখনো বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এমন কিছু বলুক যাতে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠুক। মা সবসময়ই তার সন্তানের কাছে পরম শ্রদ্ধেয়। সেই শ্রদ্ধার আসন থেকে মনজু তার মায়ের গায়ে একটুও আঁচড় লাগতে দেবে না। এজন্য যদি তাকেতার প্রিয় মানুষটিকেও ছেড়ে দিতে হয় তাতেও সে পিছপা হবে না। এটা কেবল সিদ্ধান্ত নয়, মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসার প্রকাশও বটে।
মনজু আমেরিকায় চলে গেল। তার আমেরিকায় যাবার পেছনে বড় একটা কারণও ছিল। জীবনসংগ্রামে হাঁপিয়ে উঠেজীবনের সাথে কোনোমতে টিকে আছে মনজু। প্রকৃত অর্থে মানুষের একটা জীবন থাকে। সেখানে থাকে তার নিজস্ব চাওয়াপাওয়া। ভালোবাসা, অভিব্যক্তি। বড় হবার ইচ্ছে তার ছিল, সেটা হয়েছে। কিন্তু জীবনকে উপলব্ধি করার অপূর্ণতা তাকে অষ্টেপিষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
পড়াশোনার প্রতি সবসময়ই তার প্রবল আকর্ষণ ছিল। নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করার কোনো সুযোগ জীবনে আসেনি। যা হয়েছে জীবনের তাগিদে। বেঁচে থাকার জন্য। ছাত্রজীবন তাকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে অভাব-অনটন। আজ এখানে তো কাল ওখানে এই ছিল তার জীবন। এখন সবকিছু ছেড়ে মনটা বড় অস্থির হয়ে উঠেছে।
চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই সে একটা স্কলারশিপের কথা ভাবছিল। চেষ্টাও চলছিল। একসময় ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। মিলে গেল তার কাঙ্খিত স্কলারশিপ।এসে গেল আমেরিকায় পিএইচডি করার সুযোগ। তাই আর বিলম্ব না-করে পাড়ি জমালো স্বপ্নের গন্তব্যে।
রাফি ভাবতে পারেনি, তার সাথে দেখা হবার পরেও মনজু তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকবে। তার ধারণা ছিল, মনজু বিদেশে যাবার ইচ্ছেটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলবে। সে ভালো একটা চাকরি করে। জীবনে এরকম সুযোগ সে অনেক পাবে। সে এ বিষয়টি নিয়ে কেন এত মজলো কিছুতেই তার মাথায় আসছে না।
মনজু আমেরিকায় প্রায় এক বছর। কারো সাথে তার তেমন একটা যোগাযোগ নেই। আর যোগাযোগ করবেই-বা কার সাথে। আপন বলতে মা-বাবা ভাইবোন কেউই নেই। ছিল একমাত্র মা, সে-ও তাকে ছেড়ে চলে গেছে।
রাফি ভাবে, মনজুর অভিমান একদিন ভাঙবে। তাকে সে কোনোভাবেই ভুলে থাকতে পারবে না। যদি পারতো, তাহলে এতদিন মনে রাখত না। এই সময়টা তার জন্য অনেক কষ্টের। তাছাড়া বছর তো মাত্র তিনটে, দেখতে দেখতে কেটে যাবে। যতদিন ফিরে না-আসে ততদিন তাকে এই কষ্টটা বয়ে বেড়াতে হবে। ভুল বুঝে সে মনজুকে অনেক অপমান করেছে। সেই অপমান সে আজও ভুলতে পারেনি। তাই আমেরিকায় যাবার আগে তাকে কিছুই বলেনি।
দিন যতই বাড়তে থাকে রাফির স্বপ্নের জগতটা ক্রমেই তত ধোয়াশা হয়ে আসতে থাকে। সে আর মনজুর বিষয়টি কোনোভাবেই স্বাভাবিক করে নিতে পারে না। না সে নিজে থেকে রাফিকে ফোন করছে আর না তাকে আগের নম্বরে পাওয়া যাচ্ছে। ফেইজ বুক, টুইটারেও তার দেখা মেলে না। বিষয়টি গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলল রাফিকে। কিন্তু তার করার কিছুই নেই। এখনো তাকে দেড়টি বছর অপেক্ষা করতে হবে। এরপর হয়তো সে একটা সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারবে। এর বিকল্প কোনো রাস্তা তার সামনে খোলা নেই।
সবদিকেই খবর রাখে রাফি। সে মনজুর ব্যাপারে কিছু জানতে পারে কিনা। এমনকি তার সহকর্মীদের সাথেও বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করেছে। তারা তার ব্যাপারে কিছু জানে কিনা। সবার সেই একই উত্তর, মনজু কেন হঠাৎ করে যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। একপর্যায়ে রাফিও মনজুর ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। কেউ যদি এভাবে নিজেকে আড়াল করতে চায় তাকে কখনো খুঁজে আনা যায় না। আর যদিও আনা যায়, এ আনার মধ্যে কোনো সার্থকতা নেই।সুতরাং একজন হারানো মানুষকে টেনে বের করে মনের ইচ্ছে পূরণ করা যাবে না। তাকে তার পথে চলতে দেয়াই ভালো। সে যদি নিজে এসে ধরা দেয়, তাহলে তাকে পরম ভালোবাসায় কাছে টেনে নেব।
খোঁজ নিয়ে জানতে পারল, মনজুর ফিরে আসতে আর মাত্র একমাস বাকি। মনজুর এক সহকর্মী রাফিকে ফোনে একথা জানিয়েছে। মনজু নাকি তাকে ফোন করে আসার খবরটা জানিয়ে দিয়েছে। এতদিন রাফি মনজুর ব্যাপারে উদাসীনতার ভাবটা দেখালেও তার ফিরে আসার খবরে মনটা কেমন জানি চঞ্চল হয়ে উঠেছে। এদিক-সেদিক বিভিন্ন দিকে ফোন করে মনজুর ব্যাপারে জানার চেষ্টা করছে।
নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেও মনজু আর ফিরে এলো না। এদিকে সরকারের দেয়া নির্দিষ্ট মেয়াদের ছুটিও শেষ হয়ে গেল। আশ্চর্যের বিষয়! সে ছুটি বর্ধিত করণের জন্য কোনো আবেদন পর্যন্ত করেনি। সবার কাছে বিষয়টা এখন কেমন যেন লাগছে। তাহলে মনজু কি আর ফিরছে না ?
তিন বছর ছ’মাস পেরিয়ে আমেরিকা থেকে একটা চিঠি আসলো তার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। সে চাকরি থেকে অব্যাহতি জানিয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছে। কারণ হিসেবে তাতে উল্লেখ রয়েছে সে বোস্টন বিশ^বিদ্যালয় থেকে পিএইডি ডিগ্রি অর্জন করে সেখানেই অধ্যাপনা শুরু করেছে। তাই চাকরিতে পুনরায় যোগদানে তার কোনো ইচ্ছাই নেই।
পাশাপাশি রাফিকে সে এ খবরটাও বেশ ষ্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিলো, যেহেতু তার মায়ের সাথে তার বাবার কোনো একসময় ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল, তাই ও পরিবারের সাথে নতুন কোনো সম্পর্কে আর সে জড়াতে চায় না। সে সবকিছু মাথায় নিয়েই রাফিকে গ্রহণ করত, কিন্তু এ ভালোবাসার সম্পর্কের মাঝে তারা যে অবিশ^াসের জন্ম দিয়েছে সেখানে তার পক্ষে আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। বহুবিদ চিন্তা নিয়েই সে এ পথ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং রাফিকে সরি বলা ছাড়া তার সামনে আর কোনো উপায় নেই।
সে আরও জানিয়ে দিলো-সে এক আমেরিকা প্রবাসী মেয়েকে বিয়ে করেছে। ভাগ্য যে এমন হতে পারে সে কখনো ভাবতে পারেনি। সাবিহার সাথে তার দেখা হয়ে যাওয়া, তার সাথে বিয়ে হওয়া সবই নিয়তির খেলা। কারণ, যাকে সে ভালোবাসলো তাকে ছেড়ে আসতে হলো আর যে তাকে দূরে সরিয়ে দিলো সে-ই হলো তার জীবনসাথী।