দুপুর বারোটা। রাফি বাসায় একা। কলিংবেল বাজে। দরজা খুলে রাফি একটি ছেলেকে দেখতে পায়। ছেলেটি তার দিকে একনজর তাকায় আর জিজ্ঞেস করে এটি কি আবিদ সাহেবের বাসা ?
জি, হ্যাঁ। আপনি কাকে খুঁজছেন ?
আবিদ মামাকে।
এর আগেতো আপনাকে কখনো দেখেনি।
আমার বাড়ি নরসিংদীতে। মঞ্জুয়ারা বেগম আমার মা। মামা তাকে চেনেন। আর তিনিই আমাকে এখানে পাঠিয়েছেন। আপনি বলতে পারেন, মামা কখন বাসায় আসবেন ?
দুটোর আগে বাবা বাসায় ফেরেন না।
আপনার নামটা জানতে পারি ?
অবশ্যই। আমার নাম মনজু।
মনজু চলে গেল। আবিদ হোসেন আজ বাড়ি ফিরে এসেছেন একটার আগেই। শরীরটা ভালো লাগছে না। দুপুরের লাঞ্চ সেরে শুতে যাবেন এমন সময় রাফি বলল, বাবা, মনজু নামের একটা ছেলে তোমার খোঁজে এসেছিল।
কোন মনজু ?
ছেলেটির বাড়ি নরসিংদীতে। মঞ্জুয়ারা বেগম তাকে পাঠিয়েছে। মঞ্জুয়ারা নামটি শুনে আবিদ আঁতকে উঠল। এ নামটি তার বহুদিনের চেনাজানা। মঞ্জুয়ারাকে নিয়ে আবিদের বিষয়টি মেয়েরা এখনো জানে না। তার স্ত্রী সুমা বিয়ের পর সব জেনেছে। তাই আবিদকে কখনো নরসিংদীতে যেতে দেয় না। মঞ্জুয়ারার বিয়ে হয়ে গেছে আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে। এর মধ্যে আর কখনো দুজনের দেখা হয়নি। তবু সুমা মনে করে আবিদ এখনো মঞ্জুয়ারাকে ভুলতে পারেনি। সে যদি জানতে পারে, মঞ্জুয়ারার ছেলে আমার কাছে এসেছে তাহলে সে তা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
এসব কথা ভাবছে ঠিক এই মুহূর্তে কলিংবেল বাজল। আফি দরজা খুলে দেখে সেই ছেলেটি। ছেলেটি বলল, মামা বাসায় এসেছেন ?
হ্যাঁ, এসেছেন।
আমি ভেতরে আসতে পারি ?
অবশ্যই।
আবিদ ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল, ঢাকায় তোমার পরিচিত কেউ আছে ?
না। পরিচিত বলতে কেবল আপনি। এর আগে কখনো ঢাকায় আসিনি।
তাহলে এতক্ষণ তুমি কোথায় ছিলে ?
পার্কে।
দুপুরে কিছু খেয়েছ ?
জি।
কী খেলে ?
রুটি আর কলা।
তুমি হাত-মুখ ধুয়ে এসো। ওরা তোমায় খাবার দিচ্ছে।
না, মামা। এমনিতেই বেশি খাওয়া বারণ। মা আমাকে এই চিঠিটা দিয়ে আপনার কাছে পাঠিয়েছে।

আবিদ,
আমি কোনোদিন ভাবতে পারিনি, আমার ছেলেকে তোমার কাছে পাঠাতে হবে। নিয়তি আজ আমাকে তা-ই করতে বাধ্য করেছে। ওর বাবা মারা যাবার পর যেভাবে পেরেছি টেনেটুনে সংসার চালিয়ে ছেলেটাকে ইন্টার পাশ করিয়েছি। ছেলেটি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। মেধা তালিকায় খুব ভালো অবস্থানে আছে। ছেলের জেদের কাছে আর পারলাম না। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। শেষে তোমার কথা মনে হলো। একেতো গ্রামের ছেলে। তার উপর ঢাকা শহরে জানাশোনা কেউ নেই। কোথায় থাকবে ? কী করবে ? তাই তোমার কাছে পাঠালাম। তুমি একটা ব্যবস্থা করবে নিশ্চয়ই।
ইতি
মঞ্জুয়ারা বেগম

এ বাড়িতে মনজুকে থাকতে দেয়া হলো। নিচতলায় স্টোর রুমের পাশে ছোট একটা রুম। এ রুমেই থাকে মনজু। আবিদের দু’মেয়ে মাঝেমধ্যে ওর রুমে আসা-যাওয়া করে। খোঁজখবর রাখে। একদিন দুজন একত্রে মনজুর রুমে ঢুকল। ওদের দেখে মনজু খানিকটা লজ্জা পেল। মনজুর পরনে লুঙ্গি। গায়ে গেঞ্জি। মনজুর এ অবস্থা দেখে রাফি বলল ঃ মনজু ভাই, আপনার কি কেবলি দুটো শার্ট ? মনজু হেসে উত্তর দিল, এতেই আমার চলে যায়। আফি মনে মনে ভাবে, ছেলেটি কী বলে! আমাদের ওয়্যারড্রব ভর্তি জামাকাপড়। আর ও কিনা বলে! তাহলে কি ছেলেটি সত্যিই খুব গরিব ?
অল্পদিনের মধ্যে মনজুর সাথে ওদের সম্পর্ক ভালোই হয়েছে। প্রায়ই দু’বোন ওর রুমে যায়। ওর সাথে গল্প করে। একপর্যায়ে ওরা জানতে পারে মঞ্জুয়ারা ওকে এখানে পাঠিয়েছে। মনজুর থেকে ওর মার সম্পর্কে অনেক গল্প শুনেছে ওরা।
রাফি ওর বাবাকে বলল, বাবা, আমাদের বাড়িতে যে ছেলেটি উঠেছে ওর মাত্র দুটো জামা। আর একটি প্যান্ট। তুমি ওকে ভালো দেখে ক’টা জামাকাপড় কিনে দাও। আবিদ বলল, তোরা তো ভালো কথা বলেছিস। আজই আমি নিউমার্কেট থেকে আসার পথে ওর জন্য যা যা প্রয়োজন নিয়ে আসব।
সুমা বাড়ির দোতলাতে থাকে। নিচতলাতে তেমন একটা নামে না। স্বামী সামান্য কেরানি হলেও এভাবেই সে জীবনটা কাটিয়ে আসছে। আবিদের শ^শুর ভালোমানুষ ছিলেন। ঢাকাতেই অনেক জমিজমা তার। মেয়ের আয়েশি জীবনের কথা ভেবে বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে মেয়েকে একটা বাড়ি লিখে দিয়েছিলেন। এই সুবাদে তার আয়েশিপনা আরো বেড়ে যায়। আবিদ আর এ দোতলা বাড়িটাকে তিনতলা করতে পারেনি। এখন ভেঙ্গে ভেঙ্গে একটা রুগ্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়েছে বাড়িটি। বিয়ের কিছুদিনের মাথায় শ^শুর মারা যায়। তাই বাবার কাছে মেয়ের নতুন করে আবদারের আর কোনো সুযোগ থাকল না। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ আর সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো আবিদকে। এর বাইরে অন্যকিছু ভাবার সুযোগ তার হয়ে উঠেনি।
দু’মাস হয়ে গেল। এতদিন ধরে একটা ছেলে তার বাড়িতে থাকছে তিনি দোতলা থেকে নিচতলায় নেমে দেখার প্রয়োজন অনুভব করলেন না। প্রায়ইতো গ্রাম থেকে কেউ না কেউ আসে। এতে আর দেখার কী আছে। তিনি যখন শুনলেন এই ছেলেটি এ বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে থাকবে এ নিয়ে আবিদের সাথে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলো। তুমি কি এই বাড়িটাকে মুসাফিরখানা পেয়েছ ? যারা আসবে পারলে তাদের দু’বেলা খায়িয়ে বিদায় করে দাও। দয়া-দাক্ষিণ্যের হাত আর বাড়িয়ো না। আমার এসব ভালোলাগে না। মেয়েরা বড় হয়েছে। ছেলেটা বাড়ির বাইরে। না-জেনেশুনে যাকে তাকে বাড়িতে আশ্রয় দেয়া ঠিক না। এটুকু বলে সুমা আর কথা বাড়ালো না।
সন্ধের দিকে রাফি কয়েকটা গেঞ্জি আর প্যান্ট নিয়ে মনজুর ঘরে ঢুকল। রাফিকে দেখে মনজু দাঁড়িয়ে যায়। কোথায় বসতে দেবে রাফিকে। তার বাড়িতে তাকেই বসতে বলব। তবু ভদ্রতার খাতিরে বলল, দাঁড়িয়ে কেন, বসুন। রাফি তার পাশে খাটে বসে পড়ল। হঠাৎ আফি চলে আসায় রাফি উঠে দাঁড়াল।
আবিদ বুঝতে পারল, মনজুর আসল পরিচয় ওদের কাছে আর অজানা নেই। তবে মেয়েদের উপর তার বিশ^াস আছে। ওরা এমন কিছু বলবে না যাতে সংসারে অশান্তি হয়। তাছাড়া তার মায়ের সম্পর্কে তারা ভালো করেই জানে। তার মা যদি কোনোভাবে জানতে পারে মনজুর মা তার স্বামীর সাবেক প্রেমিকা তাহলে সে মনজুকে এখানে থাকতে দেবে না।
আবিদ একবার চিন্তা করল, আমি মনজুকে বলি ওর আসল পরিচয় ও যেন কাউকে না বলে। অনেক ভেবে এ কথাটি ও আর মনজুকে বলতে পারল না। মনজু অবুঝ নয়, সে এর মানে অবশ্যই বুঝতে পারবে। তাই সে মঞ্জুয়ারাকে তার ছেলের কাছে ছোট করতে চায় না। আর যে করেই হোক ছেলেটাকে এ বাড়িতে রাখতে হবে। কারণ, মঞ্জুয়ারা এই প্রথম তার কাছে মুখ ফুটে কিছু চেয়েছে। তাকে সে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। মঞ্জুয়ারা তার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছে। তার ভালোবাসায় কোনো খাত ছিল না। তবুও সে আবিদকে বিয়ে করেনি। তার মতো একজন অসহায় মেয়েকে বিয়ে করে আবিদ কী পেত।
সুমা মনজুর পরিচয় এভাবে জানে, সে আবিদের কোনো এক বোনের ছেলে। এই শহরে তার কেউ নেই। আর্থিক অসচ্ছলতা তাকে গ্রাস করেছে। তাই ছেলেটাকে আবিদের আশ্রয় দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। সুমাও আর অমত করেনি। এতে যদি আবিদের সম্মান বাঁচে তাহলে সে অমত করবে না। সুমা ভেবে দেখল ঃ ছেলেটি মেধাবী, চরিত্রও ভালো।
অল্পদিনে মনজু সুমার খুব আপন হয়ে যায়। নিজের ছেলের মতো জানে। মনজুকে নিয়ে সংশয়ের কিছু দেখে না। সায়মনের অভাব কিছুটা সে পূরণ করছে মনজুকে দিয়ে। কয়েক বছর হলো ছেলেটো বাড়ি ছেড়েছে। একটি বারের জন্য মা-বাবার খবর সে নেয়নি। মনজুর অনার্স শেষ। ইকোনোমিকসে মাস্টার্স চলছে। ওদিকে বাড়িতে মায়ের শরীরও তেমন ভালো নেই। মাও অপেক্ষায় দিন গুনছে কবে ছেলে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাবে। বয়সও বেড়েছে। একা মানুষ বাড়িতে। টিউশনি করে মনজু সামান্য যে ক’টা টাকা পায় হাতখরচের জন্য নিজে কিছু রেখে বাকিটা মায়ের জন্য পাঠিয়ে দেয়।
এ ক’বছরে মনজু এ বাড়ির একজন হয়ে উঠেছে। সবাই তাকে আপন ভাবে। মনজু এ বাড়িতে থেকে এমন কোনো কাজ করেনি যাতে তার মায়ের অসম্মান হয়। আবিদ দুর্দিনে তাকে আশ্রয় দিয়েছে। মনজু মন-প্রাণ দিয়ে তাকে ভালোবাসে। মনজুকে যে ভালোবাসা সে দিয়েছে তা কখনো ভুলতে পারবে না। আবিদ মনজুর জন্য যা করেছে অনেক বাবাও তার ছেলের জন্য করে না।
একদিন রাফি বলল ঃ মনজু ভাই, তোমার মা দেখতে নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর। অনেকটা তোমার মতো।
মনজু বলল, তুমি কি দেখেছ মাকে ?
বাবা যে বলল, তুমি নাকি দেখতে তোমার মায়ের মতো। তোমার মা নিশ্চয়ই বাবাকে প্রচ- ভালোবাসত।
মা আবিদ মামাকে খুব সম্মান করে। আমাকে যখন প্রথম এখানে পাঠান-মা বলেছিল, দেখিস বাবা, আবিদ অত্যন্ত ভালো মানুষ। তুই ওর মান রাখিস।
তুই গরিব ঘরের ছেলে। টাকাকড়ি-অর্থবিত্ত নেই। কিন্তু সমাজে মানুষ আমাদের ভালো জানে, ভালোবাসে। তুই সেটাকে হারিয়ে যেতে দিস না।