সায়মনের স্ত্রী জারিফার চাল-চলন ও আচার-আচারণে সেই আগের অবস্থা ফিরে এসেছে। হঠাৎ এ পরিবর্তন সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। স্বয়ং মেয়ের বাবা হতবাক মেয়ের আচরণে। মেয়ের এ পরিবর্তনে বাবা মোটেই খুশি হতে পারলেন না, মনে মনে দারুণ আশাহত হলেন। তিনি ভয় পেতে লাগলেন মেয়েকে নিয়ে। একটা সময় এই মেয়েটাই তার যত চিন্তার কারণ ছিল। সায়মনের ঘাড়ে চাপিয়ে তিনি কিছুটা স্বস্থির নিঃশ^াস ফেলতে পেরেছিলেন। আজ আবার সে উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
জারিফার বর্তমান অবস্থা এখন আর কারো কাছে অজানা নয়। শ^শুরবাড়ির লোকজনের কাছে ইতোমধ্যে এ খবর পৌঁছেছে। অবশ্য এতে জারিফার কিছু এসে-যায় না। কারো পরোয়া সে করে না। কিন্তু স্বামীর বাড়ির লোকজনের কাছে তার প্রতি এতদিন ভালোবাসার যে ছিটেফোটা অবশিষ্ট ছিল সেটুকু হারাতে আর বাকি রইল না।
বিয়ের আগে ছেলেমেয়েদের বদলে যাওয়াটা সমাজ মেনে নিলেও বিয়ের পরের অবস্থাটা একেবারে অন্যরকম। মেয়ে নিয়ে আয়নুদ্দিনের বড়ত্বের জায়গাটা ক্রমে ক্রমে ক্ষীণ হয়ে আসতে থাকে। বেয়াইকে পাঁচ কথা শুনিয়ে দেবে এখন তার সে মুখ নেই। নাতির জন্য মন কাঁদে আবিদের। একটা বাড়তি চিন্তা যোগ হয়েছে। এতদিন মোটামুটি নিশ্চিন্তেই ছিল।
দিন যত বাড়তে থাকে জারিফার উদ্ভট আচরণও তত প্রকাশ পেতে থাকে। অন্যদিকে সুমা আর আবিদের মনে ভয় জমতে থাকে। মাঝেমধ্যে কখনো কখনো এমনও মনে হয় পরের মেয়ে উচ্ছন্নে গেলে আমাদের কী এসে-যায়। তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষমতা আমাদের নেই। নিমেষেই থমকে যায় মাথার সব ভাবনাগুলো। নিউজ চ্যানেলের নানা খবরে আঁতকে উঠে মন। একটুও ভালোলাগে না। বারবার দাদুভাইয়ের কথা মনে জাগে। ক্রমাগত ভয়ের এক তীব্রতায় হাঁপিয়ে উঠে তারা। একবার মন চায় সমস্ত লজ্জা-শরম বিসর্জন দিয়ে আয়নুদ্দিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াই, আর বলি-আমরা দাদুভাইকে নিতে এসেছি। আমাদের বংশধরকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন। স্বার্থপর এই আচরণে নিজেদেরও লজ্জা হয়, তাই একথা বলতে পারে না। যেতেও পারে না। আবেগ আর বাস্তবতার মুখোমুখী যতটুকু আগায়আত্মসম্মানের ভয়ে তার চেয়ে বেশি পিছিয়ে যায়। মনটা ভারি অস্থির হয়ে উঠে দাদুভাইয়ের জন্য। কিছু একটা করতে হবে, অন্যথায় মনটা শান্তি পাবে না।
অনেক ভেবে-চিন্তে সুমা আর আবিদ একদিন আয়নুদ্দিনের বাড়ি গিয়ে উঠল। তখন আয়নুদ্দিন বাড়িতে ছিল না। আয়নুদ্দিনের স্ত্রী তাদের সাথে যে ব্যবহার করেছে আত্মীয়তার বিচারে তা একান্ত দায়সাড়া। তবুও মেনে নেয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। কারণ তাদের ছেলের ব্যবহার, দায়িত্বহীনতা তাদের চুপ রাখতে বাধ্য করেছে। সবকিছু তাদের নীরবে সয়ে যেতেই হবে। ছেলে অকর্মণ্য হলে তার দায়ভার কখনো কখনো পিতামাতার উপর বর্তায়।
কিছুক্ষণের মধ্যে আয়নুদ্দিন বাড়িতে এলো। আবিদকে দেখতেই চেহারায় একধরনের ফ্যাকাশে ভাব জেগে উঠল। আর বুঝতে বাকি রইল না এ বাড়িতে তাদের অবস্থান। তবু বুঝেও না বোঝার ভান করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। সুমা বলল-বেয়াই, কেমন আছেন ?
কীরকম থাকতে পারি?
আমরা তো এসেছিলাম একটা বিশেষ আবদার নিয়ে। যদি আপনি সময় করে একটু শুনতেন, তাহলে নাহয় দুটো কথা বলতাম। কী আর শুনব। যখন কিছু বলার ছিল তখন বলতে পারলেন না। আজ কী শুনাতে এসেছেন। সময়টা বড় দুঃসময়। না পারছি কিছু বলতে, না পারছি কিছু করতে। মেয়েই আজ আমার অবাধ্য।
শুনুন, তারপর নাহয় কিছু বলবেন। আমরা বউমাকে নিতে এসেছি।
সে নাহয় বুঝলাম। আপনার বউমা কি তাতে রাজি হবে ? আপনি বললে নিশ্চয়ই হবে।
দেখুন, সে অধিকার আমি অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছি। তাছাড়া আপনার ছেলে সম্পর্কে আমার মেয়ের ধারণা আগের তুলনায় অনেকটাই বদলে গেছে। ওর বিশ^াস আপনার ছেলে নিশ্চয়ই কোনো অন্যায়ের জগতে পা বাড়িয়েছে, তা না হলে এতদিন সে ফিরে আসত। আমার কেন জানি মনে হয়, আপনার ছেলে সম্ভবত কোনো সরকারবিরোধী উগ্রবাদীদের দলে নাম লিখিয়েছে। বিয়ের প্রথম প্রথম সায়মন সম্পর্কে জারিফার ধারণা খুব একটা ভালো ছিল না। ও প্রায়ই বলত, বাবা, সায়মন যেন কেমন প্রকৃতির। আমি তখন ওর কথায় কোনো গুরুত্ব দেইনি। আজ বুঝতে পারছি, মেয়ে আমার অন্যায় কিছু বলেনি।
অমন করে বলবেন না। ছেলেটা আমার যাইহোক অপরাধী হতে পারে না। এমনতো হতে পারে ও কোনো বিপদে পড়েছে, তাই কারো খবর রাখতে পারছে না।
আপনার ছেলে কী দিয়েছে স্ত্রীকে। বিয়ের পর থেকে কেবল অবহেলা আর অবজ্ঞা। আমি চাই না আমার মেয়ে আর ওখানে ফিরে যাক। আপনি চাইলে আপনার নাতিকে নিয়ে যেতে পারেন।
কী বলছেন আপনি ?
আমি ঠিকই বলছি।
আবিদ আর সুমা মলিনমুখে ওখানে বসে রইল। আর মনে মনে আশা করল বউমা ছেলেকে নিয়ে তাদের সামনে আসবে। কিন্তু না। শেষপর্যন্ত তাদের সাথে দেখা হলো না।