জারিফার বর্তমান গতিবিধি সবার কাছেই সন্দেহজনক। পাড়া-মহল্লায় তাকে নিয়ে নানা কথা উঠেছে। আয়নুদ্দিন নিজেও বিব্রতবোধ করছেন। একদিন তিনি তার মেয়েকে ডেকে বললেন, তোমাকে নিয়ে চারিদিকে অনেক কথা শোনা যাচ্ছে। তুমি জানো, মহল্লার মানুষ আমায় যথেষ্ট সম্মান করে। তুমি আমার মেয়ে বলে সামনাসামনি অনেকেই অনেক কথা বলতে সাহস পায় না,তাই বলে যে তারা চুপ করে থাকছে তা নয়। লোকমুখে যা শুনছি তা একদমই আশা করিনি। এভাবে আর মানুষের সামনে আমাকে ছোট কোরো না। তোমার স্বেচ্ছাচারিতায় আমি অতিষ্ঠ। আর সইতে পারছি না তোমার যন্ত্রণার ভার। আর কত অপদস্থ হবো। আমি আর পারছি না। বাবা হয়ে করজোরে অনুরোধ করছি, এ পথ থেকে ফিরে এসো।
পূর্বের সবকিছু ভুলে যাও। খোদার কাছে তওবা করো। নিজেকে বদলে নাও। জীবনের একটা বড় অংশ অতিবাহিত করেছ নিজের খেয়াল-খুশিতে। যাচ্ছেতাই করেছ। জীবনটা ফুরিয়ে এসেছে। খোদার সামনে তোমাকে-আমাকে সবাইকে একদিন দাঁড়াতে হবে। হিসাব দিতে হবে জীবনের সব কাজকর্মের। কম করে হলেও এই চিন্তাটা একবার মাথায় আনো। দেখবে অনেক পাপ থেকে বেঁচে গেছ। আমি জানি, তুমি চাইলে নিজেকে বদলাতে পারবে। সে শক্তি আমি তোমার মধ্যে দেখেছি। তুমি সেই ঘুমন্ত মানুষটিকে একবার জাগিয়ে তোলো।
মনের কষ্টে তোমার শ^শুর-শাশুড়িকে অনেক কথা বলেছি। তোমার কথা ভেবেই এতগুলো কথা বলতে হয়েছে। যা বলা আমার জন্য মোটেই ঠিক হয়নি। তারাও সন্তানের বাবা-মা। তাদের সন্তানটা এখনো নিখোঁজ। যে আদৌ বেঁচে আছে, না মরে গেছে, সে খবরও তারা জানে না। একজন বাবা-মার কাছে এ অনেক কষ্টের। তাছাড়া আমি যতটুকু জেনেছি, সায়মন মোটেই অমন প্রকৃতির লোক নয়। তোমার সাথে কোনোদিনও বাজে ব্যবহার করেনি। অপরাধ তার এইটুকু স্বামী হিসেবে সে তোমার প্রয়োজন মেটাতে পারেনি। বেকারত্ব তাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। আর তুমি তারই সুযোগ নিয়েছ।
প্রতিটি সংসারে এমন কিছু-না-কিছু সমস্যা থাকে। এসব নিয়েই সংসার। কারো খবর লোকে জানে, কারোটা-বা চাপা থেকে যায়। তোমার উচিত ছিল, সবকিছু মানিয়ে নিয়ে স্বামীর সংসারে থাকা। তুমি তা পারোনি। সংসার জীবনে এরকম নানা ঘাত-প্রতিঘাত আসে, তাকে মেনে নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। নিজের যা আছে তা নিয়েই তুষ্ট থাকতে হয়। তাতেই মঙ্গল। একজন মেয়ে হিসেবে তুমি সেটা করতে পারোনি। নিজেই ভেঙ্গে দিলে নিজের সংসার। চিরতরে হারিয়ে দিলে নিজের স্বামীকে।
কথাগুলো তোমাকে আরও আগে বলা উচিত ছিল। তোমাকে বেশি আদর করি, ভালোবাসি, তাই বলতে যেয়েও বলতে পারিনি। আজ তাহলে কেন বললাম ? বললাম এজন্য যে, তোমার স্বেচ্ছাচারিতা সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে।
তোমার বুকটা কি একবারও কাঁপে না ? আল্লার ভয় হৃদয়ে জাগে না ? আমি অবাক হই তোমার আচরণে,একজন মা হিসেবে সন্তানের প্রতি তুমি কি দায়িত্ব পালন করেছ ?মানুষযে কেবল নিজের জন্য বাঁচে তা কিন্তু নয়, কখনো কখনো সে অন্যের জন্যও বাঁচে। নিজের সব শখ আহ্লাদকে অপরের জন্য বিসর্জন দেয়।
আল্লাহ তোমাকে একটা সন্তান দিয়েছেন। সে তোমার দূরের কেউ নয়, পরও নয়, তোমারই রক্ত, যার ধমনীতে শুনতে পাওয়া যায় তোমারই প্রতিধ্বনি। ওর মুখটার দিকে তাকালে কলিজাটা শুকিয়ে আসে। বাবা থেকেও আজ নেই; তুমি সবসময় ওর কাছে রয়েছ। এখন তুমিই ওর মা আর তুমিই ওর বাবা। তোমার উপর রয়েছে অনেক দায়িত্ব। নিজের কথা ভাবতে হবে। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে। তাকে কীভাবে মানুষ করা যায়।
দেখো মা, মানুষের অনেক অপূর্ণতা থাকে। আল্লাহ মানুষের সব আশা পূরণ করেন না। একেক জনের সুখের মানে একেক রকম। তুমি আল্লাহর উপর ভরসা করো আর বর্তমানকে মেনে নিয়ে সুখী হও। একদিন তুমি অনেক সুখী হতে পারবে। তাছাড়া সায়মন ফিরেও আসতে পারে। কারণ, সে স্বেচ্ছায় সংসার ছেড়েছে। তার অভিমান যেদিন ভাঙবে, দেখবে, ঠিকই সে চলে এসেছে।
আর যদি তুমি ভাবো তোমার জীবনের ডিসেশন নেয়ার ক্ষমতা কেবল তোমার,তাহলে মনের কথাই শোন। কারণ জীবন তোমার, তাকে তুমি কীভাবে সাজাবে সে অধিকারও তোমার। তবে বাবা হিসেবে আমার কাছে যেটা ভালো মনে হয়েছে,আমি তোমায় সেটাই বলেছি। এর বাইরে যদি তোমার অন্য সিদ্ধান্ত থাকে,চাইলে তুমি সেটা গ্রহণ করতে পার। সেটা তোমার ইচ্ছে। আমি তোমায় কোনোরকম বাধা দেবো না। আমি তোমার সেরকম বাবা নই যে, আমার সিদ্ধান্ত তোমার উপর চাপিয়ে দেবো। কেবল এটুকু বলব, এতদিন তুমি যা করেছ আমি কোনো কাজেই বাধা দেইনি। কিন্তু এই কাজটি আমি মন থেকে মেনে নিতে পারলাম না।
বাবার কথা শুনে জারিফার চেহারা খুবই মলিন হলো। সে বাবাকে কিছুই বলল না। তার কথাগুলো জারিফার যে খুব একটা ভালো লাগেনি, তা তার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে।