বিয়ের আগে-পরে এরকম বহু উপদেশ সে শুনেছে। কোনো কথাই সে অমলে নেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। আজও করল না। মনের অনুগত চলা জারিফার স্বভাব। এ বৈশিষ্ট্যের বিপরীতে সে কখনো না কিছু করেছে, আর না করবে।
হোক না বাবা। তাতে কী, আমি তার কাজে কখনো হস্তক্ষেপ করিনি। আমি যখন ছোট ছিলাম, মাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমার কথা ভাবল না! সেদিনও আমি কিছু বলিনি। কারণ, সে আমার বাবা। অন্য কেউ হলে আমি তাকে দেখে নিতাম। মেয়ে বলে দুর্বল নই। কী দোষ ছিল মায়ের। কোনো স্ত্রী কি এমন স্বামীকে মেনে নিতে পারে! নিজের চোখের সামনে আরেকটি মেয়েকে নিয়ে। ছি! ছি! তা-ও আবার মেয়ের বয়সী। একে একে তিন তিনটে বিয়ে করেছে। মেয়েদের প্রতি এমনিতেই বাবার একটু লোভ। সে কি কখনো ভেবেছে, বাবার এধরনের অপকর্ম একটা সন্তানের জন্য কত অপমানের! আজ যে আমাকে মান-অপমান বোঝাতে এসেছে।
যখন আমি বাবার দেখানো পথে হাঁটি বাবার খুব কষ্ট হয়। আমার দেয়া কষ্টটাতো তোমার কাছে সামান্য। একটি অবুঝ শিশুকে তুমি মা বলার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছ। সারাটা জীবন আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মেরেছ। আমি নীরবে দুচোখের অশ্রু ঝরিয়েছি। আজ তুমি কীভাবে আমাকে তোমার অনুগত সন্তান হিসেবে পাবে ? না বাবা, না, এ হতে পারে না। কখনোই হতে পারে না। আজ আমি মানুষ থেকে অমানুষে পরিণত হয়েছি। এ কেবল তোমার জন্য। তুমি তোমার রঙ্গখেলা নিয়ে ব্যস্ত থেকেছ। আমাকে মানুষ করার সময় তোমার ছিল না। নিষিদ্ধ পল্লিতে তোমার সময়টা ভালোই কাটত। আমি মেয়ে হয়ে সবই বুঝতাম। কিন্তু কিছু বলতে পারতাম না। আমার মা তোমার এ কাজের প্রতিবাদ করেছিল বলে তুমি তাকে তাড়িয়েছ। নিজের ঘরটাকে বানিয়ে রেখেছ পাপের আতুরঘর।
আয়নুদ্দিন আর জারিফাকে কিছুই বলছে না। সে বুঝতে পারল, মেয়ের তার উপর প্রচ- রাগ। আর তা কেন, সে কথাও তার অজানা নয়। তাই এখন মেয়েকে শাসন করতে গেলে নিজেরই বিবেকে বাধে। তবুও মেয়েকে কিছু না-বলে পারছে না। কারণ, সামাজিক মর্যাদায় বড় আঘাত লাগছে। মেয়েকে কিছু বলতে ইতস্তত করে। জারিফা খিলখিলিয়ে হাসে, সভ্য সমাজের ভিতরকার নোংরা চেহারা দেখে। এরাই নাকি সমাজের নেতা। গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। হায়রে সমাজ! হায়রে মানুষ! এই তোর আসল চেহারা।
বেশ কিছুদিন ধরে জারিফার ব্যাপারে একটি কথা চারদিকে শোনা যাচ্ছে। আয়নুদ্দিন মেয়েকে বলতে চাইলেও বলতে পারে না। নিজের ভেতরকার দুর্বলতা তাকে চেপে ধরে। বিয়ের পর মেয়েটার স্বভাব পরিবর্তন হয়েছিল। ইদানীং তার চলাফেরা আর কথাবার্তায় একটা পরিবর্তন লক্ষ করছে আয়নুদ্দিন। শেষপর্যন্ত মেয়ের মুখোমুখি না হয়ে তার কোনো উপায় নেই। তাই সরাসরি মেয়েকে ডেকে বলল, তুমি যদি মনে করো, সায়মন আর ফিরবে না, তার অপেক্ষায় দিন গুনবে না, সেটা তোমার সিদ্ধান্ত। তবে পাড়া-মহল্লায় এভাবে আমার মানইজ্জত নষ্ট করবে, এ অধিকার আমি তোমাকে দেইনি। আমি শুনেছি ইদানীং তুমি একটা ছেলের সাথে প্রায়ই …। তুমি জানো, তুমি একটি মুসলিম পরিবারের মেয়ে। একজন সধবা মহিলার পক্ষে অন্য পরপুরুষের সাথে মেলামেশা করা শোভা পায় না। এটা যে কেবল আমার চোখে খারাপ লাগছে তা নয়; পুরো পাড়া-মহল্লা তোমায় নিয়ে ছি! ছি! করছে।
পিতার কথায় জারিফার মনে এবার একটু ভয়ের উদ্রেগ হলো, আর যাহোক সমাজ বলে একটা কথা আছে। এভাবে পাপের পথে পা বাড়ানো যায় না। জারিফা ভাবল, সায়মনের ব্যাপারে এবার একটা সিদ্ধান্ত আমাকে নিতে হবে। বারবার প্রতারিত না হওয়ার চেয়ে বরং প্রতারক থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
জারিফা ভাবল, ছেলেটিকে একটু বাজিয়ে নেয়া যাক। এরপর নাহয় কোনো একটা সিদ্ধান্তে আসা যাবে। ক্ষণিকের পরিচয়, তাতেই এতদূর! ভুলহলো না তো? যদিও আমার ধারণা, ছেলেটি অন্য সব বাজে ছেলের মতো নয়। সে চাইলে অনায়াসে আমাকে ভোগ করতে পারত, অনেক সুযোগ আমি তাকে দিয়েছি, সে এরকম কোনো চেষ্টাই করেনি। চারিত্রিক দিক দিয়ে তাকে ভালো বলতেই হয়। আমি তাকে মন্দ বলতে পারি না। সে যে ভালো ছেলে হবার ভান করছে এমন আলামতও তার মাঝে দেখিনি। যা কিছু পেয়েছি সবই সহজ-সরল একজন মানুষের রূপ।
জারিফা ভাবল, জীবনে মিথ্যাচার, পাপাচার এসব কম করিনি। আমি ওকে সব খুলে বলব। এরপর যদি ও আমাকে আপন করে নেবার ইচ্ছা পোষণ করে তো ভালো, অন্যথায় নতুন করে আর কোনো ভুল করবো না।
ছেলেটির নাম পল। প্রথমে ভেবেছিল সে খ্রিষ্টান। পরে জানল, যে মুসলমান। তাহলে তার নাম পল কেন। সে কথা সে বলতে রাজি ছিল না, তাই জারিফাও অযথা বাড়াবাড়ির প্রায়োজন মনে করল না। এটা নিছক একটা নামের বিষয়। অবশ্য নামের ভিন্ন একটা মাহাত্ম্য আছে। পলকে পল বলেই ভাবতে থাকল। গেল বছর থেকেই সে এ শহরে আছে। তার আসল বাড়ি চট্টগ্রামের হালি শহরে। আর জারিফা এ শহরেরই মেয়ে। পল একটি বড় প্রজেক্টের কাজ নিয়ে এ শহরে প্রায় এক বছর। পেশায় সে একজন ঠিকাদার। সরকারি গণপূর্ত ভবনের একটি ঠিকাদারির কাজে এ শহরে এসেছে।
একদিন জারিফা পলকে বলল, দেখ, আমরা দুজন দুজনকে চিনি বটে, তবে আমাদের এমন কিছু কথা থাকতে পারে যা এখনো পরস্পরের অজানা। এই না-বলা কথাগুলো ভবিষ্যতের জন্য সমস্যা হয়ে দাড়াঁতে পারে।
জারিফা, তোমাকে জানাইনি এমন কোনো গোপন বিষয় নেই। আর একজন মানুষের সবকথা আরেকজন মানুষ কখনোই জানতে পারে না, জানাতেও হয় না। তাহলে তার প্রাইভেসি বলে কিছু থাকে না। আর যাদের প্রাইভেসি নেই তাদের ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। আর ব্যক্তিত্বহীন মানুষ কখনো মানুষের পর্যায় পড়ে না। জারিফা মনে মনে ভাবল, পল একদম মন্দ বলেনি।
পল, তুমি জানো না, আমার জীবনে এমন কিছু ঘটনা আছে যা আমার প্রতি তোমার ধারণাকে বদলে দিতে পারে।
আমি সবই জানি।
জারিফা অবাক হলো পলের কথায়।
এতে অবাক হবার কিছু নেই। তুমি একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। কে-না তোমার বাবাকে চেনে। আমি আগে থেকেই তোমার ব্যাপারে সবকিছু জেনে নিয়েছি। নতুন করে আর কিছু জানার নেই। তুমি তো বলতে চাও, তুমি বিবাহিতা, তোমার একটি সন্তান আছে।
জারিফার মনেসন্দেহ জাগল এই পলকে নিয়ে।কী তার পরিচয়? এ নিশ্চয়ই তার চেনাজানা কেউ। তবে সে অন্য ছেলেদের মতো নয়। যথেষ্ট স্মার্ট। সে কিছু আড়াল করলেও ধরা মুশকিল। যদি সে নিজে থেকে ধরা না দেয়। পল ও জারিফার সম্পর্ক অনেকদূর গড়িয়েছে। এ ভালোবাসার পূর্ণতা কেবল সময়ের ব্যাপার।
পল, ছেলের ব্যাপারে আমি কি সিদ্ধান্ত নেব?
তোমার মন কী চায়? ও আমার কাছে থাকুক, তুমি রাখতে চাইলে তাতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি থাকার কথা নয়। আর করবও না। কারণ, আর যদি করতেও যাই তা অমানবিক। আমি তোমাকে এধরনের একটা দুঃখজনক সিদ্ধান্ত নিতে বলতে পারি না।
যদি বলো এখন আমাকে বিয়ে কর, তাহলে একটু ভাবতে হবে। বিয়েটা দুদিনের ব্যাপার নয়। বিয়ে যখন করবোই তখন সবাইকে জানিয়ে-শুনিয়ে করব। তাতে তোমার কোনো আপত্তি আছে ?
তা থাকবে কেন? তবেপ্রস্তুতির একটা বিষয় আছে। তুমি সবইজানো, ইসলামী রীতি মোতাবেক আমি এখনো অন্যের স্ত্রী। পল বলল, সেটা নাহয় কদিন বাদেই করলে। আমিতো তোমার উপর অবৈধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ছি না। তোমাকে কিছু করতে বাধ্যও করছি না। তাহলে এত তাড়াহুড়ো কীসের।