মনজু রাফিদের বাড়ি থেকে চলে এসেছে কয়েকবছর হলো। আর কখনো ও বাড়িতে ফেরেনি। ফেরার প্রয়োজনও মনে করেনি। এভাবে চলে আসার পর কেউ আর কখনো ফিরতে পারে একথা ভাবা যায় না। মনের ভিতর অনেক ইচ্ছা, অনেক আশা। তার বিশ^াস, রাফি তাকে আজও ভুলতে পারেনি। তার পথ চেয়ে অপেক্ষার দিন গুনছে।। মনের দিক থেকে দুজন দুজনার খুব কাছাকাছি থাকলেও বাস্তবে অনেক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। অনেক প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি হয়েছে।
মনজুর মা অনেক বছর ধরে রোগে ভুগছে। মরণব্যাধি ক্যান্সারে সে মৃত্যু পথযাত্রী। সে খবরটা আজও ছেলের অজানা। জানে না পাড়া-প্রতিবেশী। তারা জানে, রোগ-শোক মঞ্জুয়ারার নিত্যসঙ্গী। তাদেরকে না-বলার কারণ, যেন একথা কোনোভাবে মনজুর কান পর্যন্ত গিয়ে না পৌঁছায়। মনজুকে সে ভালো করে চেনে। মায়ের এ অসুস্থতার খবর যদি জানতে পারে ছেলেটা বড্ড অস্থির হয়ে উঠবে। কোনোকিছুতেই মন বসবে না। যে-কোনো মূল্যে চাইবে মায়ের চিকিৎসা করাতে। সে প্রচেষ্টায় কোনো কাজ হবে না এমন প্রচেষ্টার কী দরকার আছে।তাই সে অকারণে ছেলের মনটাকে অস্থির করে তুলতে চায়নি। এমনিতেই বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে। পরের বাড়িতে থেকে মানুষ হওয়া এ বড় কষ্টের। কিছুটা লজ্জার। অন্যের মন জুগিয়ে চলতে হয়। তাছাড়া ওই বাড়িতে বড় বড় দুটো মেয়ে রয়েছে। তাদের সামনে নিজের দরিদ্র জীবনের প্রতিচ্ছবি একজন যুবকের জন্য কিছুটা হলেও অপমানের। এতে মনটা ছোট হয়ে যায়। তবু সময়কে মেনে নেয়া ছাড়া মানুষের কিবা করার আছে। মনজু সময়ের এক সাহসী সন্তান। নিজের ভাগ্যকে অন্যের উপর ছেড়ে দেয়নি। আবার বিধিলিপিকে অবিশ^াসও করেনি। খোদার উপর আস্থা রেখে সম্মুখপানে এগিয়ে চলেছে। তার বিশ^াস, তার পরিশ্রম, তার প্রচেষ্টা, কখনোই বৃথা যেতে পারে না।
মঞ্জুয়ারা বেশ কয়েকবছর ধরে লক্ষ করছে ছেলেটা যখন বাড়িতে আসে তখন কেমন একটা মনমরা ভাব। আবিদ সম্পর্কে ওর কাছে কোনো খবর জানতে চাইলে ইদানীং মাকে এড়িয়ে চলে। মা এ ব্যাপারে তাকে কোনো প্রশ্ন করুক তা-ও সে চায় না। একদিন সে মাকে বলেই ফেলল, ঔ লোকটাকে নিয়ে তোমার কীসের এত আগ্রহ? মা ছেলের কথায় ভীষণ কষ্ট পেলেন।
মায়ের সাথে এমন আচরণ করা তার উচিত হয়নি, তা বুঝতে পেরে তাকে এড়ানোর অন্য কোনো সহজ রাস্তা জানা ছিল না। এ যাবত মাকে সে কোনোকিছুই বুঝতে দেয়নি। তার ভয় ছিল, মা যদি একথা জানতে পারে তাহলে সে কেবল কষ্টই পাবে না, বরং একটু একটু করে সব খবরই তার কাছে চলে আসবে। মা নিজেকে অযথা দায়ী করবে। ভিতরে ভিতরে গুমরে মরবে। মনজু মাকে প্রচ- ভালোবাসে। তার বিশ^াস, তার মা এমন কোনো কাজ করতে পারে না, যাতে তাকে সন্তানের চোখে ছোট করে দেয়।
মনজু পরিস্থিতির কারণে রাফিকে এড়িয়ে চললেও মন থেকে তাকে ভুলে যেতে পারেনি। তার মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহসও তার হয়নি। আবিদকে মনে-প্রাণে ভালোবাসে। তারপরেও কখনো তার কাছে ফিরে যায়নি। চাইলে সে গোপনে দেখা করতে পারত, কিন্তু তার কাছে এটা কখনো ঠিক মনে হয়নি। তার মধ্যে এই আত্মমর্যাদাবোধ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে যারা তার মাকে অসম্মান করেছে তাদের সে কীভাবে সম্মান জানাবে। যে মানুষটি জীবনের সবকিছু বিসর্জন দিয়ে পরের কথা ভেবেছে। নিজের আবেগ, নিজের চাওয়াপাওয়া, কোনোকিছুরই দাম সে দেয়নি। আজ তারাই তাকে ছোট ভাবছে! তাদের আশ্রয়ে থাকা তার জন্য শোভনীয় নয়। এই দাসবৃত্তিমূলক মনোভাব তার নেই। কোনোদিন ছিলও না। তাহলে এত কিছুর ভিতর দিয়েও এ পর্যন্ত উঠে আসা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আজ পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে তা নিজের চেষ্টায়, আর মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে সম্ভব হয়েছে।
দিন যতই বাড়ছে মঞ্জুয়ারা ততই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এবার আর ছেলের চোখ ফাঁকি দিতে পারল না। তাকে না-বলার আর যে কোনো উপায় নেই। সবই তার চোখের সামনে বিদ্যমান। ধীরে ধীরে তার শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। দিন দিন স্বাস্থ্যের অবনতি হচ্ছে। নানারকম দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। যন্ত্রণায় একরকম ছটফট করছে। মন থেকে চাইছে ছেলে যাতে বুঝতে না-পারে, কিন্তু কোনোভাবেই নিজেকে সামলে রাখতে পারছে না। প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে।
এদিকে মাকে নিয়ে মনজুর দুশ্চিন্তা বেড়ে যাচ্ছে। কোনোভাবেই মনকে বোঝাতে পারে না। এ কঠিন বিপদের দিনে কেউ তার পাশে নেই। না আপনজন, না ভালোবাসার মানুষ কেউই। মঞ্জুয়ারা ছেলের ব্যাকুলতা দেখে বলল, বাবা, মাকে নিয়ে এত টেনশনের কিছু নেই। তোর মা বহু আগেই মরে গেছে, এখন যা দেখছিস তা তো বিদায়ের আগে শেষ যন্ত্রণাটুকু। বাবা, তুই শত চেষ্টা করলেও মাকে বাঁচাতে পারবি না। আমি আর সে অবস্থায় নেই রে। তবে খোদা চাহে তো সবকিছু করতে পারেন। আমার মনে কেবল একটাই কষ্ট, তুই আমার ছেলে হয়েও এভাবে বলতে পারলি! তুইও নিজের মাকে চিনতে পারলি না।
মা, আমি তোমাকে কখনোই ভুল বুঝিনি। আর কষ্টও দিতে চাইনি। আমি সবসময় ভয় করতাম, তুমি যেন আবিদ মামা সম্পর্কে আমাকে কোনো প্রশ্ন করে না বসো। তাই তোমাকে ওই প্রসঙ্গ থেকে দূরে রাখতে চাইতাম। যা কিছু করেছি তোমার ভালোর জন্য করেছি। বাধ্য হয়ে করেছি। তুমি কষ্ট পাবে বলে করিনি। ভুল হলে তুমি আমায় ক্ষমা করে দিয়ো। মা তুমি জানো না, আমি আবিদ মামার বাসা থেকে চলে এসেছি আরও তিন বছর আগে।
কী বলছিস তুই!
আমি ঠিকই বলছি।
তাহলে এতদিন তুই আমায় বলিসনি কেন?
সে অনেক কথা। শুধু এইটুকু জেনে রেখো, যারা আমার মাকে অসম্মান করে, ছোট ভাবে, আমি তাদের সাথে কোন খাতিরে সম্পর্ক রাখব।তাই আমি স্বেচ্ছায় ওদের ছেড়ে চলে এসেছি। আমি অতটা অকৃতজ্ঞ নই। ছেড়ে আসতে আমার দারুণ কষ্ট হয়েছে। তবু মুখ ফুটে বলতে পারিনি, তোমরা যা করছো তা ঠিক নয়, আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিয়ো না। তোমাদের ওই কথার পরে আমি এখানে কীভাবে থাকব বলো ? একে কি তাড়ানো বলে না?
বাবা, আমি সবই বুঝেছি। তোকেও কিছু কথা জেনে রাখা দরকার। এমন সুযোগ আর কখনো না-ও আসতে পারে। তোর প্রতি আমার পুরোপুরি বিশ^াস আছে, তবু কথাগুলো না বললে নয়। একজন মা হিসেবে এই কথাগুলো তোকে যদি বলতে না-পারি মনে অনেক কষ্ট থেকে যাবে। কেবল বিশ^াস নয়, বাস্তবতার নিরিখে তোর জেনে রাখা দরকার। মন বড়ই আজব বিষয়। কখন কী যে বলে উঠবে। আমি আবিদকে ভালোবেসেছিলাম, একথা সত্যি। কিন্তু সেই ভালোবাসা আমাকে কখনো আমার আদর্শ থেকে এক চুল পরিমাণও সরাতে পারেনি। শয়তানের শয়তানি কখনো ভুল পথে পরিচালিত করতে পারেনি। ভালোবাসা পাপ নয়, পাপ তখনি, যখন দৃষ্টিভঙ্গিটা সঠিক থাকে না। কিছু নোংরা বাসনা মনে বাসা বাঁধে। আর কুপ্রবৃত্তি সেটাকে বাস্তবে রূপ দিতে মরিয়া হয়ে উঠে। আবিদ আমাকে প্রচ- ভালোবাসত। বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিল।
ছোটবেলা থেকেই আমি খুব অসহায়। মামার কাছে মানুষ। মামা ভালোবাসলেও মামি কখনো নিজের মেয়ে ভাবতে পারিনি। যখন যা খুশি ব্যবহার করত আমার সাথে। ভেবেছিলাম, আবিদকে বিয়ে করলে জীবনটা অন্যরকম হবে। যেহেতু ছেলে হিসেবে মন্দ ছিল না। তাই আবিদের প্রস্তাবে রাজিও হয়েছিলাম। যখন বুঝতে পারলাম, ওকে পাবো ঠিকই, কিন্তু ওর পরিবারের বউ হয়ে কারো মনে জায়গা হবে না। তখন দারুণ কষ্ট পেলাম। ধীরেধীরে নিজেকে বদলে নিলাম।গরিব হতে পারি, কিন্তু কারো করুণার পাত্র হয়ে বাঁচার ইচ্ছা কখনোই ছিল না। মামার কাছে মানুষ হয়ে হাড়ে হাড়ে বুঝেছি পরাধীনতার কী জ¦ালা। তাই যাকে প্রচ- ভালোবাসি তাকে হাসি মুখে বিদায় জানালাম। পর করে দিলাম তাকে। আবিদের সেই কান্নার কথা আজও আমার মনে পড়লে নিজেকে খুব অপরাধী বলে মনে হয়। ওর তো কোনো দোষ ছিল না।
শেষপর্যন্ত মামার সিদ্ধান্তকে নিজের সিদ্ধান্ত বলে মেনে নিলাম। একটা সুপাত্র দেখে মামা আমার বিয়ে দিলেন।একটা সময় বুঝতে পারলাম, খোদা সারাজীবন আমাকে বঞ্চিত রাখলেও এবার আমাকে তার অপার করুণা ঢেলে দিয়েছেন। একজন ভালোমানুষকেই আমার সঙ্গী হিসেবে মনোনীত করেছেন। বিয়ের পর আমি কখনোই অসুখী ছিলাম না। কিন্তু যার কপালে সুখ থাকে না মানুষ তাকে কীভাবে সুখী করবে? আমিও বিপদে-আপদে ওপরওয়ালার সব ইচ্ছাকেই মেনে নিলাম। কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে তার শুকরিয়া করে চললাম। একসময় মারা গেল তোর বাবা। আমি হয়ে পড়লাম চরম অসহায়। জীবনে এই প্রথম নিজেকে এতটা অসহায় মনে হলো। না ছিল কোনো আপনজন, আর না ছিল কেউ পাশে। সুখে-দুখে একমাত্র আল্লাহই ছিল আমাদের ভরসা।
মঞ্জুয়ারা ভেবেছিল, সে যেরকমই থাক, ছেলেটা তার সুখে আছে। আজ যখন জানতে পারল, ছেলের অবস্থা, দারুণভাবে ভেঙ্গে পড়ল। আমার কারণে ওই বাড়িতে ছেলেটাকে কতই-না অপমান সহ্য করতে হয়েছে। মায়ের ব্যাকুলতা দেখে মনজু ভাবল, মাকে বিষয়টি পরিষ্কার করে না-বলা ছাড়া এখন আর কোনো উপায় নেই। এখন যে মাকে বলতেই হবে। মানুষ যখন মানুষের পথ আগলে দাঁড়ায়, তখন অসহায় মানুষটিকে সাহায্য করার জন্য খোদা তার রহমতের দরজা খুলে দেন।
মা, তুমি অযথাই চিন্তা করছ। খোদা যদি চায় বান্দার কল্যাণ করবেন মানুষ তখন তার কোনো ক্ষতি করতে পারে না। বান্দার যখন একটি দরজা বন্ধ হয়ে যায় চাইলে খোদা তার জন্য রহমতের হাজারও দরজা খুলে দিতে পারেন। তখন কত মানুষ তার বিপদে তারই পাশে এসে দাঁড়ায়। বিপদের দিনে তার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয়।
ও বাড়ি ছেড়ে আসার পর কিছুদিন এক বন্ধুর বাসায় থাকি। ওর মা আমাকে খুব ভালোবাসত। ছেলের মতো জানত। খুব আপন মনে করে আমি আন্টিকে সব খুলে বললাম। তিনি আমার কথা শুনে খুবই মর্মাহত হলেন। আমাকে তার বাড়িতে রাখতে চাইলেন। কিন্তু আমার পূর্বের অভিজ্ঞতা কিছুতেই আমাকে রাজি করাতে পারল না। আমি বিনয়ের সাথে বললাম, উপকার যদি করতেই চান, কিছুদিনের জন্য আমাকে আশ্রয় দেন। বেশ কিছুদিন কাটল এভাবে।এরমধ্যে হলে একটা সিটও পেয়ে গেলাম। প্রথম প্রথম আমার দারুণ কষ্ট হচ্ছিল। যদিও সাবিহা আমাকে বলেছিল, কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবে। কিন্তু আমি মুখ ফুটে কিছুই বলতে পারিনি। জানো মা, কখনো কখনো মানুষ মানুষের সামনে ফেরেশতা হয়ে পথ দেখিয়ে দেয়। দুর্দিনের সাথী হয়। আজও সাবিহার কথা ভুলতে পারি না। কত ভালো বন্ধু ছিল আমার। এই ঢাকা শহরে যখন আমাকে আশ্রয় দেয়ার মতো কেউ ছিল না, সাবিহা একটি মেয়ে হয়েও আমায় আশ্রয় দিয়েছিল। একটি বারের জন্যও ভাবেনি, লোকে তাকে কী বলবে ? আমি ধন্যবাদ জানাই আমার সেই বন্ধুটিকে। আমি কৃতজ্ঞ আজীবন তার কাছে।
আমি কীভাবে চলব, তার একটা ব্যবস্থাও করে দিয়েছিল। ও যখন টাকাপয়সা দিয়ে আমাকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করত আমি খুব লজ্জা পেতাম, তখন সাবিহা হেসে বলত-মনজু, আমরা আকাশ থেকে পড়িনি, এদেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা মানুষ। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়াবে এটাইতো ধর্ম। তুমি আমার আত্মীয় নও, তাতে কী হয়েছে। আত্মীয়ের চেয়েও অনেক বড় আসনে বসিয়েছি তোমায়। তুমি তো এদেশের মানুষ। তার চেয়ে বড় পরিচয় তুমি আমার বন্ধু। আমার সহপাঠী। মনে কিছু কোরো না, আজকে তোমায় যা দিচ্ছি তার বিনিময়ে একদিন তোমার থেকে অনেক বড় কিছু চেয়ে নেব, সেদিন কিন্তু না বোলো না।