আবিদ মঞ্জুয়ারাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসত। তার বিশ্বাস, বিয়ের আগে কাউকে ভালোবাসা দোষের নয়,যদি সে ভালোবাসা দেখা-সাক্ষাৎ আর শারীরিক সম্পর্কে না গড়ায়। আবিদ সেরকম লোক নয়, আর মঞ্জুয়ারা, সে তো অন্যরকম। সেই ছোটবেলা থেকেই একই ক্লাসে পড়ত দুজন। একসাথে আসা-যাওয়া করত। বন্ধুত্বের সুন্দর একটা সম্পর্ক ছিল তাদের মাঝে। মঞ্জুয়ারা বড় হলো, বড় হলো আবিদ। একটু একটু করে ভালো লাগতে লাগল মঞ্জুয়ারাকে। তার চরিত্র, তার চলন-বলন সবই মার্জিত। যে-কোনো পুরুষেরই ভালো লাগতে পারে। জমা হতে পারে তার মনে গভীর ঝোঁক। আবিদও একসময় তার প্রেমে পড়ে গেল। মনে মনে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিল, মঞ্জুয়ারাকে জীবনসাথী হিসেবে বেছে নেবে।
মঞ্জুয়ারার প্রতি তার ভালোবাসা শূন্য থেকে পূর্ণতায় চলে গেল। পারিবারিক সাপোর্ট তাকে আরো উদ্যমী করে তুলল। তার জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ালো মঞ্জুয়ারা। তার মনে এ ধারণা বদ্ধমূল হলো, মঞ্জুয়ারা তার হতে চলেছে। সবই ঠিকঠাক চলছিল। বাবা বিলেত থেকে আসার পর সব গোল পাকাতে শুরু করল। বাবাই এখন হয়ে দাঁড়ালো সব থেকে বড় বাধা। কিছুতেই আর বাবাকে রাজি করাতে পারল না। কিছুদিন পরে মাও গেল ঘুরে। মঞ্জুয়ারাওতার থেকে দূরে সরে যেতে লাগল। ভালোবাসার নামে নোংরামিটা মঞ্জুয়ারা সবসময়ই অপছন্দ করত। তার কাছে পবিত্রতার চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছু নয়। এই বিরহ বিচ্ছেদের পরে যতদিন বেঁচে ছিল আবিদকে কেবল সহপাঠী বলেই ভাবত। তার কাছে সত্যের সীমারেখা অতিক্রম করা আরেক জঘন্য পাপ। এ পাপকে সে মনে-প্রাণে ঘৃণা করে।
মঞ্জুয়ারার মৃত্যুর পরে এই কথাগুলো বারবার ঘুরে-ফিরেআবিদের কানে বাজছে। তার আদর্শ, তার সততা, তার পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কাছে আজ বড়ই ছোট মনে হয় আবিদকে।বন্ধু ভেবে মঞ্জুয়ারা তার একমাত্র ছেলেকে তার কাছে পাঠিয়েছে সে তার নিরাপত্তাটুকু দিতে পারেনি। এর চেয়ে ব্যর্থতা আর কী হতে পারে। আবিদ বড়ই ছোট হয়ে গেল।
সবকিছু হারিয়ে আজ আবিদ নিঃস্ব। স্ত্রী তাকে ছেড়ে দিয়েছে। মেয়ে দুটো এখন তার ভরসা। ছেলের সন্ধান আজও মেলেনি। সেই সুখের দিনগুলো কোথায় হারিয়ে গেল। সুমা তার সাথে কেন এমন আচরণ করল ? শুধু কি একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর প্রতি প্রতিহিংসা ? তা-ও অবাস্তব কিছু কল্পনাকে ভিত্তি করে। বিবেক তাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। না সে স্বামী হিসেবে সফল, না প্রেমিক। সব জায়গাতেই তার পরাজয়। জীবন তার কাছে এক অসহ্য যন্ত্রণা। স্ত্রীতার ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে পথে ছুড়ে দিয়েছে তাকে। বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। স্ত্রী-তার আত্মীয়স্বজন সবাই তাকে ছেড়ে গেলেও মেয়েরা তাকে আগলে রেখেছে। শত কষ্টের মাঝেও মেয়ে দুটো তার অনেক বড় সান্ত¡না।
জীবন যে কতটা কষ্টের হতে পারে শেষ জীবনে এসে এমনটা তাকে উপলব্ধি করতে হবে তা কখনো ভাবতে পারেনি। বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে আজ সে তারই মুখোমুখী। সে কি ভেবেছিল জীবনে কখনো এমন হবে ? যে স্ত্রীকে ভালোবেসে জীবনের সব অতীত ভুলে গিয়েছিল, সেই স্ত্রীই তাকে এভাবে অভিযুক্ত করবে ? এর চেয়ে লজ্জা, অপমান আর কী হতে পারে। জীবনের মাঝ বয়সে এসে আজ তাকে এমন অপদস্থ হতে হলো।
যা কিছু করেছে, যা কিছু ভেবেছে সবই তার স্ত্রীকে নিয়ে। নিজের চাকরি থেকে একটু একটু করে জমানো টাকাগুলো পর্যন্ত স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছে। নিজের জন্য কিছুই সঞ্চয় করেনি। সে ভাবত, কী হবে এসব দিয়ে। জীবনেআমার বলতে কিছু নেই। এই মূল্যবান জীবনটাইতো তাকে দিয়েছি। সে আমাকে যা দিয়েছে খোদার আশীর্বাদে এর চেয়ে বড় দান আর কী হতে পারে। শেষ বয়সে মেয়ে দুটোই আমার সম্বল। ওরাই আমার বাঁচা-মরা।
আজ আবিদের কাছে কিছু নেই। আছে শুধু মেয়ে দুটো। সহায়-সম্বল বলতে যা ছিল স্ত্রী সবই কেড়ে নিয়েছে। এতকিছুর পরেও কীভাবে ও সংসারে থাকতে পারে?আবিদও সুমাকে ছেড়ে অন্য শহরে গিয়ে উঠেছে। বাপের ভিটায় যেতে মন চাইলেও সেখানে আর ফিরে যাবে না বলে ঠিক করে নিয়েছে। মনের কষ্টকে সে আর বাড়াতে চায় না। সুখের ভাগি যখন তাদের করতে না পেরেছে, দুঃখের খবরটাও তাদের জানাতে চায় না। তাই মেয়ে দুটোকে নিয়ে নতুন শহরে নতুন জীবনের তিন সদস্যের এক ছোট্ট পরিবার। পরিবার এর আগেও ছোট ছিল। এখন কেবল মাইনাস হয়েছে সুমা। তবে ভিন্নতা আছে। এখন অভাব তাদের পিছু ছাড়ে না। জীবনের টুকরো স্মৃতিগুলো বারবার আঘাত হানে মনে।
আফি সবেমাত্র অনার্স পাশ করেছে। একটা প্রাইভেট জবও শুরু করেছে। হাজার বিশে টাকা মাইনে। রাফি এখনো মাস্টার্স করছে। পড়াশোনা শেষ হয়নি। বাবা বেকার। কী আর করবে এই বুড়ো মানুষটা। আয় করছে কেবল আফি। তার উপর ভর করেই চলছে তিনজনের সংসারটা। জীবনের অনেক কিছু ছেটে দিয়ে আজ সাধারণ জীবন বেছে নিতে হয়েছে তাদের। বাড়ি ভাড়া। সংসার খরচ। বোনের লেখাপড়া। কোনোমতে টেনেটুনে চলে সংসার। বাবার অবস্থা দেখে ভীষণ খারাপ লাগে তাদের। সবসময় মনে হয় কী এক ভারি বোঝা চেপে আছে তার বুকে। রাফি জিজ্ঞেস করল, বাবা, কী হয়েছে তোমার? বাবা হেসে দিয়ে বললেন, রাফি, জীবনে এমন কোনো পাপ করেছি যার জন্য তোর মা আজ আমাদের এত বড় শাস্তিটা দিচ্ছে? নিজের থেকে মেয়েদেরকে আলাদা করে দিয়েছে। যে মেয়েদের জন্ম দিলো তাদেরও অবিশ^াস করছে ?যাকে নিয়ে এতটা বছর সংসার করল তাকে এতটুকু চিনতে পারল না ?
রাফির বিশ^বিদ্যালয়ে যাওয়া প্রায় বন্ধ। একদিকে মন ভালো লাগছে না। অন্যদিকে পারিবারিক সমস্যা। পড়াশোনা আর করবে না বলেই ঠিক করেছে। তবু বড় আপুটার কারণে তা পারছে না। ওর কথা, সবাই যদি আমরা এভাবে ভেঙ্গে পড়ি তাহলে তো সবই শেষ হয়ে যাবে।
বল, আপু, শেষ হতে আর কিই-বা আছে।
রাফি, এত তাড়াতাড়ি ভেঙ্গে পড়লে চলবে না। এখনো কিছুই হয়নি। একদিন সবই ঠিক হয়ে যাবে। মা তার ভুল বুঝতে পারবে। বাবার কাছে এসে ক্ষমা চাইবে। দেখিস, সেদিন বেশি দূরে নয়। তুই কথা দে বোন, এরকম পাগলামি আর করবি না। লেখাপড়াটা চালিয়ে যাবি। শত কষ্টের মাঝে তুই আমাদের সান্ত¡না। আমাদের একটা বোনতো মানুষের মতো মানুষ হচ্ছে। অন্তত এইটুকু আশা নিয়ে বেঁচে থাকতে দে।
দিন দিন আবিদের অবস্থা খারাপ হচ্ছে। সবসময় মনে কী এক দুশ্চিন্তা পুষে থাকে। ওষুধের খরচও বেড়ে চলেছে। মেয়েদের সেবা-যতœ পেলে হয়তো এতটা ভেঙ্গে পড়ত না। আফি থাকে অফিসে। রাফি সারাদিন ক্যাম্পাসে। সামনে তার পরীক্ষা। বাবা প্রায়ই একলা বাসায় পড়ে থাকে। রাফি বলে, বাবা, মনমরা হয়ে থেকো না। একটু বাইরে বেরোয়। মানুষের সাথে মেশ। দিন দিন আবিদ এক জটিল ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। সারারাত ঘুমোয় না। আস্তে আস্তে শরীর শুকিয়ে যাচ্ছে। মেয়েদের দারুণ ভয় পায় আবিদ। এই ভয় ভালোবাসার। বাবা-মেয়ের অপূর্ব সম্পর্কের। মেয়েরা যখন দেখতে আসে সে ঘুমোলো কিনা, আবিদ ঘুমোনোর ভান করে। কখনো কখনো নিদ্রাহীন রাত্রি কাটানোর চেয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। সারারাত ইবাদতে মশগুল থাকে।
ইদানীং তার মধ্যে নতুন একধরণের শক্তিমত্তা কাজ করছে। বাঁচব যতদিন মনের জোর নিয়ে বাঁচব। ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে মরার চেয়ে সুস্থ-সবল ভাবে দুদিন বেঁচে থাকাও ভালো। তাই সে একটা কাজ নিয়েছে। মেয়েরা যখন চলে যায় সেওবেরিয়ে পড়ে। মেয়েরা কিছুই জানে না। আবার মেয়েরা বাসায় ফেরার আগেই চলে আসে। মাঝেমধ্যে দু-একদিন এদিক-ওদিক হলে সামলে নেয়। মেয়েরা বেশ কিছুদিন হলো লক্ষ করছে বাবার অন্যরকম পরিবর্তন। তাছাড়া তিনি ওষুধ কেনার জন্য যে টাকাগুলো নিতেন ইদানীং তা আর নিচ্ছেন না। অথচ ওষুধও ঠিকমতো চলছে। কিছু জিজ্ঞেস করলে বলেন, শরীরটা আগের তুলনায় অনেক ভালো।
বাস্তব অবস্থা তা নয়। আমরা বাইরে থেকে যেটা দেখছি সেটা বাবার প্রকৃত অবস্থা নয়। বাবার ওষুধের লম্বা ফর্দ আর ডাক্তারের দীর্ঘপরামর্শ বাবাকে অনেক সতর্ক করে দিয়েছে। কিন্তু বাবা কোনোকিছুরই তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। জীবনের প্রতি তার আগ্রহ নেই। কেবলই কৃত্রিমতার আবরণে সবকিছু ঢেকে দিয়েছেন।
বেশ কিছুদিন ধরে দুবোন বাবাকে ফলো করে আসছিলাম। বাবা কিছুতেই বলতে রাজি হচ্ছিলেন না, তিনি কী করছেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, বাবা একটিকম্পিউটারের দোকানে কাজ করেন।মাসে পাঁচ হাজার টাকা মাইনে। কিছু কমন কাজ ওরা বাবাকে দেয়। বাবা তার সময় সুবিধামতো কাজগুলো করেন। খবরটা জেনে ওখানে বসেই ইচ্ছেমতো কিছু সময় কাঁদলাম। এতটা কষ্ট পেলাম যা বলে বোঝাতে পারব না। যার ঢাকায় বাড়ি ছিল। গাড়ি ছিল।ছিল কোটি কোটি টাকা। সেই ব্যক্তি আজ অন্যের দোকানে কর্মচারীর কাজ করছে। তা-ও সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে। এইতো নিয়তি। জীবনের উত্থান-পতন।
বড়আপুকে নিয়ে আমারও ভারি চিন্তা হচ্ছে। কত কষ্টইনা করছে আপু। মানুষ এমন হতে পারে ? কালেমাকে সাক্ষী রেখে যাকে স্ত্রী বলে স্বীকার করে নিয়েছে তাকে এভাবে পাষণ্ডের মতো ভুলে থাকতে পারে ?একবারও কি স্ত্রীর কথা মনে পড়ে না,জাগ্রত হয় না নিজের দায়িত্ববোধ।