সিকান্দার আবু জাফর (জন্মঃ১৯ মার্চ ১৯১৯)। একাধারে কবি, কথাশিল্পী, নাট্যকার, গীতিকার, অনুবাদক, সাংবাদিক ও সম্পাদক প্রভৃতি পরিচয়ে বহুমাত্রিক প্রতিভার সংগ্রামী পুরুষ। ‘মাসিক সমকাল পত্রিকা’ সম্পাদনার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত। পুরো নাম সৈয়দ আল্ হাসেমী আবু জাফর মুহম্মদ বখ্ত সিকান্দার। জন্ম সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়ায়। পিতা সৈয়দ মঈনুদ্দিন হাশেমী এবং মাতা মিসেস জাহেদা খাতুন। পূর্বপুরুষগণ পেশোয়ার থেকে প্রথমে কলকাতায় এবং পরে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ছাত্রাবস্থায় মিলিটারি একাউন্টস্ বিভাগের মাধ্যমে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। কিন্তু অত্যন্ত স্বাধীনচেতা এবং নির্ভীক চরিত্রের হওয়ায় চাকরি ছেড়ে দেন। কলকাতায় থাকাকালীন টালিগঞ্জের পুষ্প সেনের (পরবর্তীতে নার্গিস জাফর) সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। অবশ্য জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মামাতো বোন কাজী রোজীকে বিয়ে করেন (১৯৭১)। তিনি বিভিন্ন মিডিয়া ও পত্র-পত্রিকার সাথে কাজ করেন। এরমধ্যে দেশবিভাগের পূর্বে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘দৈনিক নবযুগে’ সাংবাদিকতা এবং পরে রেডিও পাকিস্তান, দৈনিক ইত্তেফাকের সহযোগি সম্পাদক, দৈনিক মিল্লাতের প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেন, কিন্তু ব্যবসায় সফল হননি।

১৯৫৭ সাল থেকে সাহিত্য পত্রিকা মাসিক ‘সমকাল’, ‘সমকাল মুদ্রায়ন’ এবং ‘সমকাল প্রকাশনী’ নামে প্রকাশনার সাথে পুরোপুরিভাবে জড়িত হন এবং শেষ পর্যন্ত ছিলেন। ফলে তাঁর পরিচিতি একজন সম্পাদক হিসেবেও বেশি পরিচিত হয়। সমকালের সহযোগি সম্পাদক ছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান। ‘সমকাল’ ছিলো ষাটের দশকের প্রথিতযশা কবি-সািিহত্যিক, রাষ্ট্র, সমাজচিন্তক ও অগ্রসর তরুণ লিখিয়েদের জন্য একটি স্বপ্নযাত্রিক পত্রিকা। এ প্রসঙ্গে বাংলা সাহিত্যের অনন্য নক্ষত্র কবি আল মাহমুদ বলেন, “আমরা বাংলাদেশের আধুনিক কবি ও কথাশিল্পীরা ষাট দশকে তাঁর নেতৃত্বেই ‘সমকাল’ সাহিত্য মাসিকের রুচিশীল উদার ছায়ায় আশ্রয় পেয়ে বেড়ে উঠি। আমরা কবিরা যেমন ভাবতাম জাফর ভাই শুধু আমাদের, তেমনি আমাদের অজ্ঞাতে সেকালের পূর্ব পাকিস্তানী আবহাওয়ায় পূর্ববঙ্গীয় সমকালীন সংস্কৃতির সর্ব শাখায় ‘তরুণ তুর্কিরা’ও তাদের দিশারী হিসেবে বিবেচনা করতেন। বাংলাদেশের স্বাংস্কৃতিক স্বাধিকারের আগুন ভাষাবিদ্রোহীদের মিছিল থেকে সরাসরি দেশের তরুণতম কবি ও অন্যান্য ভাষা শিল্পীদের বুকে সঞ্চারিত করার দায়িত্ব তাঁর একক ব্যক্তিত্বের শিখায় লেলিহান হয়ে উঠেছিল।’’ ষাটের দশকে সাহিত্য পাড়ায় ‘সমকালে’র ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তাঁর বিখ্যাত ‘বাঙলা ছাড়ো’ নামক প্রতিবাদী কবিতাটি ‘সমকালে’ই ছাপা হয়েছিলো।
‘রক্তচোখের আগুন মেখে ঝলসে যাওয়া আমার বছরগুলো
আজকে যখন হাতের মুঠোয় কণ্ঠনালীর খুন পিয়াসী ছুরি
কাজ কি তবে আগলে রেখে বুকের কাছে কেউটে সাপের ঝাঁপি!
আমার হাতেই নিলাম আমার নির্ভরতার চাবি;
তুমি আমার আকাশ থেকে সরাও তোমার ছায়া,
তুমি বাংলা ছাড়ো।’
(বাঙলা ছাড়ো-কাব্যগ্রন্থ)

চল্লিশ দশক থেকে শুরু হওয়া প্রতিভাবান সাহিত্যসাধক, কবি ও সাংবাদিক সিকান্দার আবু জাফর। লেখালেখির প্রথম দিকে তিনি ঔপন্যাসিক ছিলেন। পরবর্তীতে সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করেন। অবশ্য কবি হিসেবে খ্যাত হলেও ১৯৬৫ সালের আগে তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থই প্রকাশিত হয়নি। ১৯৬৫ সালে ‘প্রসন্ন প্রহর’; ‘বৈরী বৃষ্টিতে’ এবং ‘তিমিরান্তিক’ একসঙ্গে তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সমকালীন কবিদের মধ্যে তিনিই সবশেষে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। তাঁর কবিতায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধি প্রসঙ্গ তাঁকে করে তুলেছে অত্যন্ত সাহসী, মাটি ও গণমানুষের কাছাকাছি। দরিদ্র, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের জন্য সহৃদয় সহানুভূতি এবং প্রতিবাদী ভূমিকা ও সহজ-সাবলীল বর্ণনার কারণে তাঁর লেখাপাঠক মাত্রকেই আকৃষ্ট করে।
‘মৃত্যু নেই কোনোখানে
আছে শুধু মৃত্যুর বঞ্চনা
ক্ষয় নেই আছে শুধু ক্ষতির ছলনা।
জীবনের বেড়াজালে
নিপীড়িত মৃত্যু শুধু কাঁদে
প্রতিকারহীন তিক্ত ঘৃণ্য অপবাদে।’
(মৃত্যু নেই, ‘প্রসন্ন প্রহর’ কাব্যগ্রন্থ)

‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ শীর্ষক গীতি কবিতায় লিখেন-
‘একুশে ফেব্রুয়ারী,
মৃত্যুর শেষে যারা রেখে গেলো
প্রাণ-ফসলের দান
তুমি ইতিহাস বহো তারি।’
(গান, মালব কৌশিক)
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের সময় সিকান্দার আবু জাফর ভূমিকা ছিল সাহসী সেনাপতির মতো। অনেকগুলো গানেরও রচয়িতা তিনি। ‘মালব কৌশিক’ গানের সংকলনে ২১৪টা গান রয়েছে। তিনি গানগুলোকে তিন ক্যাটাগরিতে ভাগও করেছেন। হৃদয়ের সুরে সুরে (প্রেমের গান), পৃথিবীর তৃণফুল (প্রকৃতির গান) এবং মানুষের কাছে কাছে (গণসঙ্গীত বিষয়ক)। তিনি পঞ্চাশ ও ষাট দশকের সামরিক শাসন এবং অগণতান্ত্রিক আচরণ প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই তাঁর লেখনিতে সংগ্রামী চেতনা এবং চিন্তাধারার প্রভাব সুষ্পষ্ট। দুঃসাহসিক কবির সাহসী উচ্চারণ ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই’। এ জনপ্রিয় গণসঙ্গীতটি মুক্তির বার্তা হিসেবে মানুষের মুখে মুখে ছিলো সেসময়।
‘জনতার সংগ্রাম চলবেই,
আমাদের সংগ্রাম চলবেই।
হতমানে অপমানে নয়, সুখ-সম্মানে
বাঁচবার অধিকার কাড়তে
দাস্যের নির্মোক ছাড়তে
অগণিত মানুষের প্রাণপণ যুদ্ধ
চলবেই চলবেই,
আমাদের সংগ্রাম চলবেই।’
(সংগ্রাম চলবেই, ‘কবিতা ১৩৭২’ কাব্যগ্রন্থ)

সিকান্দার আবু জাফরের সাহিত্যসম্ভার বেশ সমৃদ্ধ। গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদগ্রন্থ ও কাব্যগ্রন্থ সব শাখায় তাঁর অবদান অসামান্য। অন্যান্য লেখা বাদ দিলেও শুধুমাত্র বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মহান অধিপতি শেষ স্বাধীন নবাবকে নিয়ে রচিত ’সিরাজ-উ-দৌল্লা’ (১৯৬৫) নামক অমর ট্র্যাজেডি নাটকটির জন্য তিনি আজীবন বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবেন। অন্যান্য নাটকের মধ্যে ‘মাকড়সা’ (১৯৬০), ‘শকুন্ত উপাখ্যান’ (১৯৬২) এবং ‘মহাকবি আলাওল’ (১৯৬৬) এবং ‘সিংগের নাটক’ (১৯৭১) রয়েছে। তাঁর রচিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছেঃ ‘পূরবী’ (১৯৪১), ‘মাটি আর অশ্রু’ (১৯৪২), ‘জয়ের পথে’ (১৯৪৩), ‘পূরবী’ (১৯৪৪) এবং ‘নতুন সকাল’ (১৯৪৬)। কাব্যগ্রন্থসমূহঃ ‘প্রসন্ন প্রহর’ (১৯৬৫), ‘বৈরী বৃষ্টিতে’ (১৯৬৫), ‘তিমিরান্তিক’ (১৯৬৫), ‘কবিতা ১৩৭২’ (১৯৬৮), বৃশ্চিক লগ্ন’ (১৯৭১), ‘বাঙলা ছাড়ো’ (১৯৭২), ‘কবিতা ১৩৭৪’ (১৯৭২) এবং গীতিকাব্য ‘মালব কৌশিক’ (১৯৬৬) রয়েছে। ‘নবী কাহিনি’ (১৯৫১) এবং ‘আওয়ার ওয়েল্থ’ (১৯৫১) স্কুল-কলেজের বিভিন্ন শ্রেণির পুস্তকেও পাঠ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। বিখ্যাত পারস্য কবি ওমর খৈয়ামের ’রুবাইয়াৎ, সেন্ট লুইয়ের ‘সেতু’ এবং বার্নাড মালামুডের ‘যাদুর কলস’এরও সার্থক অনুবাদক তিনি।

সংগ্রামী ও প্রতিবাদী চরিত্রের অধিকারী ছিলেন তিনি সবসময়ই। ১৯৭১এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর কলম অবিরত ছিল। এ সময় তাঁর ‘বাঙলা ছাড়ো’, ‘জনতার সংগ্রাম’ কিংবা ‘অভিযোগ’-এর মতো রচনা নানাভাবে প্রেরণা জুগিয়েছে। ২৬ জুলাই ‘অভিযোগ’ নামের ইশতেহারটি প্রকাশিত হয়েছিলো। হানাদার বাহিনীকে অভিযুক্ত করে বিশ্ব বিবেকের প্রশ্ন, ইয়াহিয়া চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও ইশতেহারে হানাদারদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য তরুণদেরকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি এভাবে, “তোমার নিরীহ বৃদ্ধপিতা-মাতাকে ওরা পশুর মতো হত্যা করছে, কুকুর দিয়ে খাইয়েছে তাদের লাশ, তুমি তাদের বদলা নেবে না?… তোমার বন্ধুদের ট্যাঙ্কের তলায় পিষ্ট করে ওরা রাস্তায় জঞ্জাল বৃদ্ধি করেছে-তুমি তার প্রতিশোধ নেবে না? তোমার জন্মভূমিকে ওরা পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে তুমি তার কৈফিয়ত চাইবে না?”

কবি ও সাংবাদিক হিসেবে সিকান্দার আবু জাফর ছিলেন সৎ, নির্ভীক, সাহসী এবং কর্মপরায়ণ মানুষ। অসাধারণ নেতৃত্বগুণ সম্পন্ন এবং বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। কার্যসম্পাদনে তিনি ছিলেন একরোখা এবং দুর্বার। ১৯৭৩ সালে বাকস্বাধীনতার জন্য ‘কমিটি ফর সিভিল লিবার্টিজ এন্ড লিগ্যাল এইড’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সংস্থাটির সভাপতি হিসেবে নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন। ১৯৭৪ সালের ‘মন্বন্তর প্রতিরোধ আন্দোলনে’ বিবৃতি দিয়ে সর্বপ্রথম স্বাক্ষর করেছেন ‘নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটি’র সভাপতি হিসেবে। জীবনের শেষ লগ্নে তিনিও কবি ফররুখ আহমদের ন্যায় অসুস্থ এবং অর্থ সংকটে পড়েন। কিন্তু শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি সাহসের সাথে লড়াই করেছেন। তিনি ১৯৬৬ সালে ‘বাংলা একাডেমি’ পুরস্কার এবং ১৯৮৪ সালে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকার পিজি হাসপাতালে কীর্তিমান সাহিত্যসংগ্রামী সিকান্দার আবু জাফরের জীবনাবসান হয়।

তথ্যসূত্রঃ
১। সিকান্দার আবু জাফর রচনাবলী (১ম খণ্ড): সম্পাদনা-আবদুল মান্নান সৈয়দ
২। সিকান্দার আবু জাফর-কাজী মুহম্মদ অলিউল্লাহ
৩। সিরাজ-উ-দ্দৌলা (নাটক): সিকান্দার আবু জাফর (ড. রবিউল হোসেন সম্পাদিত)
৪। সিকান্দার আবু জাফরঃ কবি ও নাট্যকার-মাহবুবা সিদ্দিকী