লাচুং হলো ভারতের সিকিম রাজ্যের একটি ছোট্ট গ্রাম এবং পাহাড়ি স্টেশন। তিব্বতের সীমান্তঘেরা এই স্থানটি উত্তর সিকিমে। প্রকৃতির কোলে ছবির মতো সাজানো লাচুং নামের এই পাহাড়ি গ্রামটি। জনবসতি খুবই কম। পাহাড় ও বনভূমি নিঝুম। এই গাঁয়ে আকাশ ছুঁয়েছে পাইন, ফার আর ধুপিগাছের সারি। আর আছে নানান প্রজাতির রডোডেনড্রন।রডোডেনড্রন হচ্ছে পাহাড়ের ফুল। সাধারণত এই ফুলগুলো বসন্তের শেষে দল মেলে। উচ্চতা ভেদে বিভিন্ন কালারের হয়। আমরা পাহাড়ের গায়ে গায়ে যে রডোডেনড্রন এর গুচ্ছ দেখেছি, তার প্রায় সবই ছিল লাল বা গাঢ়ো কমলা রঙের আর পাহাড়ের নীচের দিকে ছিল হালকা বেগুনি, হালকা গোলাপি আর কী একটা অচেনা কালার যেন। কীযে তার রূপ, চোখ ছাড়া কেউ তা বর্ণনা করতে পারবেনা। মজার ব্যাপার, এই রডোডেনড্রন ফুলের কথা কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’য় উল্লেখ আছে। লাচুং এর পাশ দিয়েই বয়ে চলেছে স্রোতস্বিনী লাচেন চু নদী। লাচুং এই নদী থেকে প্রায় ৯,৬০০ ফুট বা ২,৯০০ মিটার উচ্চতায় । রাজধানী গ্যাংটক থেকে লাচুং এর দূরত্ব প্রায় ১২৫ কিলোমিটার বা ৭৮ মাইল। এখানের লোকজন বেশিরভাগই লেপচা আর তিব্বতি।
যাহোক, সকালে উঠেই ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে আমরা লাচুং এর পথে নেমে পড়লাম।
সকাল ১১ টায় শুরু হলো যাত্রা। এজেন্সি যত কথাই বলুক ওরা ১১টার আগে কখনোই রওয়ানা দিবেনা। গাড়ি ছুটে চললো পাহাড়ি পথ বেয়ে। পুরো সিকিমটাই কিন্তু পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে। হিমালয়ের সব ছোট-বড় পাহাড়গুলোই সিকিমের শহর-বন্দর-গ্রাম।
আঁকাবাঁকা পথ, উপর থেকে নীচে, নীচ থেকে উপরে জীপ চলছে, কখনো গাড়ি এমন বাঁক নিচ্ছে যে আরেক পাশের খাদের দিকে তাকালেই আত্মারাম খাঁচাছাড়ার অবস্থা! পথে ছোট-বড় অনেক ঝর্ণা। প্রথমেই পেলাম সেভেন সিস্টার্স ফলস। এই ফলসটি সাতটি লেয়ারে নীচে নেমে এসেছে, তাই এমন নাম, যদিও পাঁচটির বেশি দেখা যায়না। চমৎকার ! কিছুসময় সেখানে কাটিয়ে আবার ছুট।
এবার পেলাম নাগা ফলস। আগেরটার চেয়ে এটি অন্তত ৫০ গুণ বেশি সুন্দর আর স্রোতস্বিনী ! অনেক উপর থেকে বিরাট গর্জন করে পানি পড়ছে পাথরের উপর। কিছুটা নেমেই পানি নীল রঙ হয়ে আবার সফেদ চাদরে ঢেকে দিচ্ছে বাকি জায়গাটা। আর দারুণ একটা ব্যাপার হলো ঝর্ণাটা দুটি পাহাড়ের মাঝখানে। আর এদুটো পাহাড়কে ব্রীজের মাধ্যমে এক করা হয়েছে। এই ব্রীজের নীচ দিয়েই ঝর্ণার পানি গড়িয়ে পড়ছে নদীর বুকে।আবার কিছুটা পানি রাস্তা দখল করেছে। এইযে সারা সিকিম জুড়ে শুধু ঝর্ণা,ছড়া বা হাজারো ঝিরির ছড়াছড়ি, প্রকৃতিপ্রেমী সিকিম সরকার একটিরও পথ রোধ করেনি নগরায়নের জন্য। প্রয়োজনে পিচঢালা কংক্রিটের উপর দিয়েই পথ করে দিয়েছে ঝর্ণার সহজ বহতার জন্য, এমনকি কোথাও কোথাও পথ কেটে পথ করে দিয়েছে। অসাধারণ একটি আমেজ নিয়ে সামনে এগুতে লাগলাম। হঠাৎ করেই সামনে বিরাট টানেল চলে এলো। আমাদের গাড়ি সাঁ করে টানেলে ঢুকে গেলো। পাহাড় কেটে প্রায় এক মাইলের মতো লম্বা টানেল করেছে সিকিম সরকার। প্রযুক্তি আর সৌন্দর্য এক হলে যে কী হতে পারে এই টানেলটি তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।আমি তখন ভাবছিলাম লেডি ডায়ানার কথা, আমার দেখা সেরা পারসোনালিটি। আকাশের উপরে থেকেও কীকরে মাটি ছোঁয়া যায় জানতে হলে ডায়ানাকে জানতে হবে।যাহোক, আমাদের তৃতীয় স্পট হচ্ছে তিস্তা ভিউ পয়েন্ট। আরেকটি অদ্ভুত মুগ্ধতায় ভরা জায়গা ! দূরে পাহাড়ের কোলে অজস্র ঘরবাড়ি আর পাহাড়ের বুক চিরে এগিয়ে গেছে আঁকাবাঁকা পথ। এখান থেকেই দেখা মিলবে বহুল আলোচিত তিস্তা ব্যারেজের। খুব খারাপ লাগলো এমন কঠিন বাঁধ দেখে। ভারত আমাদের অন্যায়ভাবে পানি বঞ্চিত করছে এই বাঁধ দিয়ে। অনেকটা সময় এখানে কাটিয়ে আবার চলা শুরু হলো। চতুর্থ এবং দেখার মতো শেষ স্পট হচ্ছে ভিউমা থ্রি স্টেপ ফলস। তিন লেয়ারে পানি আপন মনে গড়িয়ে চলছে। আসলে এসব সৌন্দর্যের বর্ণনা দেবার ভাষা পৃথিবীতে আজও সৃষ্টি হয়নি। আমরা শুধু কিছুটা কল্পনার জন্য গৎবাঁধা কিছু শব্দ গেঁথে যাই।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আমাদের আট জনের দলে আমিই একমাত্র সবেধন নীলমনি। তাই আমার ছোট বড় সব আব্দারই ভাইয়েরা সানন্দে পূরণ করেছেন। সকাল ১১টায় শুরু করে রাত আটটায় এসে পৌঁছুলাম লাচুং। একটি এবং অত্যাবশকীয় কথা হচ্ছে লাচুংএ প্যাকেজ ট্যুর ছাড়া আপনি যেতে পারবেন না। এই প্যাকেজে যাতায়াত +হোটেল+খাবার থাকবে। অতএব আমাদের জন্য নির্ধারিত হোটেলে গাড়ি থামলো। কিন্তু রিসিপশন থেকে জানলাম এই গাড়ির জন্য এখানে কোন বুকিং নেই। পড়লাম মহা ফ্যাসাদে ! আগেই বলেছি পুরো সিকিমটাই চিটারদের আস্তানা, এবারও প্রতারিত হলাম। প্যাকেজ করার সময় এজেন্সি এই হোটেলটা দেখিয়েছে কিন্তু গাড়ি ছাড়ার পরেই সে অন্য কোথাও বুক করেছে। একদিকে ঠান্ডা অন্যদিকে সারাদিনের ধকল। যাহোক, ড্রাইভার আবার চলতে শুরু করলো। প্রায় আধা ঘন্টা সময় নিয়ে এমন একটি হোটেলের সামনে থামলো যে আমরা হতবাক হয়ে গেলাম! অজপাড়াগাঁ, নীচতলায় রুম। গীজারের অবস্থা তথৈবচ। খাবারের কথা নাইবা বললাম। প্রচন্ড ক্ষুধা সবার। যে যা পারলো কোনরকমে পেটে চালান দিলো, শুধু আমি আর মুন্না ভাই একরকম না খেয়েই উঠে এলাম। কিছু করার নেই। টাকাপয়সা দেয়া শেষ, এখন ওদের হাতের পুতুল আমরা। বাধ্য শিশুর মতো যে যার বিছানায় আশ্রয় নিলাম। প্যাকেজে লাচুং এর কয়েকটি স্পট দেখানোর কথা থাকলেও জিরো পয়েন্ট নেই। ওটা আলাদা ড্রাইভারের সাথে কথা বলে নিতে হয়। আমার মনে হয়েছে এখানেও সিকিম চিটিংবাজি করেছে ড্রাইভারের এক্সট্রা ইনকামের জন্য। আমরা আগামীকাল জিরো পয়েন্টে যাবার প্রোগ্রাম করে কম্বলের নীচে আশ্রয় নিলাম।