আমাদের সবসময়ই আজানের সময় ঘুম ভেঙে যায়। এখানে আজান নেই সত্যি কিন্তু সময়টা আমাদের ঠিকই জাগিয়ে দিলো। ধীরে ধীরে প্রকৃতিতে আলো ফুটছে। হঠাৎ দরজায় নক; বাইরে আসতেই চোখ ছানাবড়া ! গতরাতে যে জন্যে মন খারাপ ছিল আজ তা চোখের সামনে ! হোটেলের ফ্রন্ট সাইডে বিশাল বিশাল পাহাড়, আর তিনটি চূড়া বরফাচ্ছাদিত। আমরা কিছুক্ষণ বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলাম ! এ বরফ চূড়া দেখবো বলেই তো জিরো পয়েন্টে যাচ্ছি, আর সেটাই দৃষ্টি সীমানায় ! বারবারই দেখতে মন চায়, ফিরে ফিরে নয়ন মন তৃপ্ত করি। সাড়ে পাঁচটায় বের হওয়ার কথা, সবাই রেডি কিন্তু আমাদের ড্রাইভার লাপাত্তা। অবশেষে তিনি এলেন আর শুরু হলো আমাদের ইয়ুমথাং ভ্যালি আর জিরো পয়েন্ট অভিমুখে যাত্রা।
সিকিমের রাস্তার ধারের গ্রামগুলো মোটামুটি টিপিক্যাল। একটি কমন জিনিস আমার নজর কেড়েছে –
আপনি সিকিমের যেখানেই যাবেন বিশেষ করে গ্রামের আশেপাশে, দেখবেন প্রচুর পতাকা টাঙানো, হয় সারি সারি সাদা পতাকা নয়তো পর পর লাল-নীল-সবুজ-হলুদ পতাকা। সবগুলোতেই মন্ত্র লেখা। এই দু ধরনের পতাকার মানে কিন্তু ভিন্ন –
সাদা পতাকার মানে হচ্ছে মৃতদের আত্মার শান্তি কামনা করা অথবা ভূতপ্রেতের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য। আর রঙিন পতাকা হচ্ছে গ্রামের সুখ সমৃদ্ধির জন্য। এছাড়াও পতাকাগুলো কাছাকাছি জনবসতির নির্দেশক।
গাড়ি চলছে। লাচুং থেকে ইয়ুমথাং খুব বেশি দূরে নয়, রাস্তাও চমৎকার। কিছুদূর এগোতেই সবকিছু অন্যরকম লাগছে। যেদিকে তাকাই লাল কমলা হলুদ বেগুনি ফুলের ছড়াছড়ি। মনে হচ্ছে পাহাড়গুলো সদ্য কৈশর পেরিয়ে যৌবনবতী হয়েছে ! ড্রাইভার বললো এটা রডোডেনড্রন ফুল। চারিদিকে শুধু নানারকম রডোডেনড্রন গাছের সারি, চোখ জূড়ানো সুন্দর।
দু’একটা গ্রাম ও কয়েকটি মিলিটারি ক্যাম্প পেরোতেই শুরু হয়ে গেলো ভিউকার্ডের দৃশ্য- নীল আকাশ, দুধসাদা মেঘ আর বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া। এটাই ইয়ুমথাং। সাংঘাতিক বিপজ্জনক এরিয়া। পাহাড় থেকে একটা ঝর্ণা নেমে এসেছে সাথে অসংখ্য বোল্ডার। বোল্ডার হচ্ছে পাথরের টুকরা। সেকি পাথররে বাবা ! এক একটা পাথরের টুকরা মনে হয় আমাদের বড়সড় একটা ঘরের সমান। ইয়ুমথাং ভ্যালি পুরোটাই পাথরের রাজ্য।আর পাথর ফুঁড়ে ছেয়ে আছে নানারকম রডোডেনড্রন ফুলের গাছ। এপ্রিল মে মাসে পুরো ইয়ুমথাং ভ্যালি থাকে ফুলের দখলে। শুধু ফুল আর ফুল। এজন্য স্থানীয়রা এটিকে “ভ্যালি অব ফ্লাওয়ারস ” বলে। রাস্তাটা ঘুরে ঘুরে ওই একটি ঝর্ণার উপর দিয়েই যাচ্ছে আর আমরা দুলছি নদীতে নৌকা দোলার মতো। তবে এটা পানির নদী নয় পাথরের নদী। আমাদের তো অবস্থা কাহিল।
পাথরের নদী পেরোলেই আরেকটি বিরাট উপত্যকা। সে আরেক দৃশ্য ! দুপাশে সারি সারি উঁচু পাহাড় দুদিক থেকে এসে মিশেছে কোণা হয়ে। সেখানে একটি মেঘে ঢাকা পাহাড়চূড়া। এই চূড়াটাকে মেঘ এমনভাবে ঢেকে রেখেছে যেন মনে হচ্ছে এটা মেঘের আগ্নেয়গিরি যার মাথা থেকে শুধু সাদা ধোঁয়া বেরোচ্ছে ! ওইযে শিলিগুড়িতে মেঘ দেখে ভেবেছিলাম দেশ ভিন্ন তো মেঘ ভিন্ন, গ্যাংটক এসে জেনেছি এই অদ্ভুতুড়ে সাদা মেঘ আর কিছুই নয় জমে থাকা বরফকুচির বাষ্প হয়ে যাওয়ার দৃশ্য। সে কী সৌন্দর্য লিখেও বোঝাতে পারবোনা। এগুলো লেখার জিনিস নয় , দেখতে হলে গ্যাংটক আর লাচুং আসতে হবে। উপত্যকার একপাশে বয়ে চলেছে লাচুং চু নদী, নদীর পার ঘেঁষে চরে বেড়াচ্ছে ইয়াকের দল। সেই ইয়াক যা আমরা বাচ্চাদের পড়াই Y for Yak। আশেপাশের পাহাড়ের উপর মেঘ পালটে পালটে যাচ্ছে কিন্তু মেঘের আগ্নেয়গিরি একই রকম নিশ্চল ,তার কোন চেঞ্জ নেই। অসাধারণ সেই রূপ চামড়ার চোখ প্রাণভরে উপভোগ করেছে ।
এবার জিরো পয়েন্ট এর পথ।
জিরো পয়েন্ট সমতল হতে ১৫৫০০ ফিট উপরে।সুতরাং ক্রমশ প্যাচানো পথে উপরে উঠতে থাকা। এবার গাছপালা কমে শুধু ধূ ধূ মরুভূমি। আমার মনে হচ্ছে চান্দের দেশে যাচ্ছি। এমন পাথুরে জমির কথাই তো চাঁদের বুকে আছে বলে জানি। আবার এক জায়গায় পাথরের গায়ে লালচে রঙের শ্যাওলা। কী অদ্ভুত কারবার ! শ্যাওলা -তা আবার লাল ! রিভারবেডটা পর্যন্ত লালচে রঙের হয়ে গেছে !
চলতে চলতে একসময় ড্রাইভার গাড়ি থামালো। সামনে পাথুরে জমি আর বরফে ঢাকা সফেদ শুভ্র পাহাড়। শ্বেতশুভ্র পাহাড়গুলো কাঞ্চনজঙ্ঘা, আর ওপাশে চীনের সীমানা।
বুঝতেই পারছেন, আমাদের ঈপ্সিত জায়গায় আমরা চলে এসেছি। হ্যা, জিরো পয়েন্ট। এর পরে আর সিকিম নেই, একেবারে শেষ সীমানা। সবাই আনন্দে আত্মহারা ! সবাই যার যার মতো নেমে পড়লো। আমরা দুজনও নেমে এগিয়ে গেলাম পাথুরে ঝর্ণাটার দিকে। আলমাস সাহেব ক্যামেরায় হাত লাগিয়েছেন, হঠাৎ ঘটলো এক অভাবনীয় ঘটনা !