জিরো পয়েন্ট- উত্তর সিকিমের শেষ প্রান্ত, ইয়ুমথাং থেকে ২৩ কি মি। চীন সীমান্তের কাছাকাছি বলে পর্যটকদের জন্য এখানেই যাত্রা থামাতে হয়। প্রায় ১৫,৫০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত জিরো পয়েন্টের স্থানীয় নাম ‘ইউমেসামডং’। এলাকাটি যে অবস্থায়ই থাকুকনা কেন, এক কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ দিয়েই সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে যথেষ্ট। আমরা নেমে পাথুরে নদীটার দিকে এগিয়ে গেলাম। দৃশ্যে যাবার আগে কিছু কথা বলে নেই। জিরো পয়েন্টে কেমন শীত থাকতে পারে সেটা আপনারা কমবেশি বুঝে নিবেন। আমাদের শৈত্য প্রবাহ ওখানের নির্মল বাতাস। আর বরুফে হাওয়ার ধারণাটা এবার কল্পনা করুন। তো ওখানে যেতে হলে আপনাকে প্যাকেট হয়ে যেতে হবে। মোটা জ্যাকেট, গাম বুট, হাত মোজা এসব না হলে বিপদে পড়বেন। কোথায় পাবেন? আপনি লাচুং এর যে হোটেলেই উঠবেন সেখানেই পাবেন। প্রতিটা হোটেল এসব জিনিস পার পিস ৫০ রুপিতে ভাড়া দেয়। সুতরাং নো চিন্তা। আমি এমনিতেই শীতের কাপড় অপছন্দ করি। কিন্তু সেখানে গিয়ে দুটো সোয়েটার +গেঞ্জি+ভারী জ্যাকেট পড়েও ঠকঠক করে কাঁপছি। এসব পড়ে যখন হোটেল লবিতে দাঁড়িয়ে আছি, দুটো বাঙালি তরুণ আমায় ইভটিজ করলো। আমি অবাক হলাম! যারা ইভটিজার তারা সব জায়গায়ই ইভটিজার, ঘৃণায় গা রি রি করে উঠলো !
যাহোক, আমরা ছবি তোলার জন্য পাথুরে ঝর্ণার কাছে পোজ নিলাম। দুটো কি তিনটে ছবি তুলেছি, হঠাৎ কোথা থেকে যেন হিমঠান্ডা বাতাস এসে আমাদের ছুঁয়ে গেলো। আর বিপত্তিটা হলো তখনই। আমার মনে হলো হঠাৎ মাথাটা কেমন ব্যাথা করছে, সাথে টের পেলাম পায়ের নীচের দিকটা অবশ হয়ে যাচ্ছে, আমি যেন শূন্যে ভেসে যাবো ! নীচের দিকে তাকালাম, ফাউন্টেন বেডটা পাথুরে, বেশ অনেকটা নীচে। ভাবছি, যদি পড়ে যাই, নিশ্চিত ইহলীলার এখানেই যাবনিকাপাত ঘটার সমূহ সম্ভাবনা। আমি আলমাস সাহেবকে শুধু বলতে পারলাম “আমাকে ধরো”। উনি লাফ দিয়ে এসে আমাকে ধরে ফেললেন। কিন্তু ততক্ষণে আমার অর্ধেক শরীর অবশ হয়ে গেছে। উনি আমাকে একরকম ধরে এনে বিরাট একটি পাথর খন্ডে বসিয়ে দিলেন। আমি চোখ বুঁজে পড়ে আছি। বুঝতে পারছিনা কী হলো আমার ! আলমাস সাহেব ঝাঁকুনি দিলেন ” ইভা উঠো” আমি চোখ মেলে তাকালাম। উঠতে চাই, পারছিনা, পুরো শরীর অবশ লাগছে। সামনের নেপালীর দিকে একটি হাত বাড়িয়ে দিলাম। দুজনে আমায় টেনে তুললেন। নেপালী বললেন “জোরসে শ্বাস লি জিয়ে”। আমি জোরে জোরে কয়েকবার শ্বাস নিলাম। এবার কিছুটা আরাম লাগছে। লজ্জা পেলাম, চারিদিকে তাকিয়ে দেখি আরো ৪/৫ জন আমার মতো পড়ে আছেন, অনেকে বমি করছে। আমি গিয়ে গাড়িতে আশ্রয় নিলাম। আমার আগেই আরো দুজন গাড়িতে ঠাঁই নিয়েছেন। আসলে ভুলেই গিয়েছিলাম, যত উচ্চতা তত অক্সিজেন কম।এ অবস্থাকে কাটানোর উপায় হচ্ছে বেশি করে পপকর্ণ খাওয়া। ওখানে কিছু পপকর্ণের দোকান আছে। কিছুক্ষণ ধাতস্থ হয়ে আবার নীচে নামলাম। চারিদিকে তাকালাম। পরিষ্কার নীলাকাশ, যেমনটি আমরা ক্যালেন্ডারে দেখি। সারি সারি উঁচু পাহাড়, পেছনে কাঞ্চনজঙ্ঘা সাদা মুকুট পড়ে একঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। যেন সব পাহাড়ের শাসন কর্তা ! আমি প্রাণভরে দেখে নিলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা পাহাড়ের চূড়া। মনে পড়লো সেই শৈশবে ঠাকুরমার ঝুলিতে লেখা থাকতো এই কাঞ্চনজঙ্ঘার নাম। তখন তো কিছুই বুঝি নাই কাঞ্চনজঙ্ঘা কী, আজ সময়ের ব্যবধানে কাঞ্চনজঙ্ঘা আমার দুচোখের দৃষ্টি সীমায় ! সাদা বরফে আলোর বিচ্ছুরণ, চোখ ধাঁধানো প্রকৃতি। এই রূপ এই সৌন্দর্য যাঁর দান তাঁর উদ্দেশ্যে মাথা নোয়ালাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কী না পারেন ! মাটিতে যেমন রুক্ষতা দিতে পারেন তেমনি পাথরেও পারেন ফুল ফোটাতে, পারেন পাহাড়ের চূড়ায় ডায়মন্ড সাজিয়ে রাখতে। বারবার আল্লাহকে যে ভাবেই কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি মনে হচ্ছে কম হয়ে গেলো ! সব গাড়িই ফেরার পথে। আমরাও চলতে শুরু করলাম। মাথাটা তখনও ঝিমঝিম করছে। ইয়ুমথাং এসে মনে হলো স্বাভাবিকতা ফিরে পেলাম। কিন্তু আমার সঙ্গীরা সবাই কমবেশি আক্রান্ত । তাই পথে আর কোথাও না থেমে সোজা লাচুং ফিরে এলাম। আমি আর মুন্না ভাই আগের মতো অভুক্তই রইলাম। বাকিরা কিছু খেয়ে গ্যাংটকের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম দেড়টার মধ্যেই। আমাদের ড্রাইভার নেপালী, নাম বিমল, বয়স ২৪। ছোট খাটো গড়ন কিন্তু সদা হাস্যময়। একেতো পাহাড়ি রাস্তা তার উপর ২৪ বছর, বুঝতেই পারছেন বোমার উপর এটোম বোম। যাবার সময় উত্তেজনায় খেয়ালই করিনি ওর ড্রাইভিং কিন্তু এখন খেয়াল করে সবাই আল্লাহ আল্লাহ করতে লাগলাম। আমিতো সারা পথ লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সুবহানাকা ইন্নি কুনতুম মিনাজ্জোয়ালিমিন পড়তে পড়তে মুখে ফেনা তুলে ফেললাম। কিন্তু আমার তরুণ ড্রাইভার সেসব শুনবে কেন? তার ঝড়ের গতি আর লাচুং চু নদীর ঝড়ো গতি মিলেমিশে একাকার। একসময় আমি চিৎকার করে কেঁদে ফেলি ভয়ে। ও এমনভাবে বাঁক নিচ্ছিলো যে একটু হেরফের হলেই গাড়ি সহ ৯০০০ ফিট নীচে লাচুংচু নদীতে পড়তে হবে। আমার কান্নায় বোধহয় বেচারার মনে কিঞ্চিৎ দয়া হয়েছিল। রাতে গ্যাংটক নেমে এ যাত্রায় প্রাণ নিয়ে হোটেলে ঢুকলাম।