আগেই বলেছি সিকিম ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম প্রদেশ। সিকিমে যেতে শিলিগুড়ি করিডোর সবচেয়ে ভালো। জনসংখ্যা খুবই কম , জলবায়ু উপক্রান্তীয়। কাঞ্চনজঙ্ঘা ভারতের সর্বোচ্চ এবং পৃথিবীতে তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত শিখর যা এই সিকিমের অন্যতম আকর্ষণ। আর সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কথাটা হচ্ছে সিকিম ভারতের পরিচ্ছন্নতম রাজ্য। আমরা যে লাচুং গেলাম সেখানে বাইরের প্লাস্টিকের বোতল নিষিদ্ধ। ওদের তৈরি এক ধরনের মোটা প্লাস্টিকই কেবল সেখানে গ্রহনযোগ্য। কিন্তু পর্যটকেরা সেকথা শুনবেন কেন? তাঁরা গোপনে হলেও বোতল নিচ্ছেন। আমি পথের ধারে এমন অনেক বোতল পড়ে থাকতে দেখেছি। আরও একটি কথা, যাঁরা আমাদের সবুজ দেশটাকে গাছপালা কেটে মরুভূমি করছেন, তাঁদের জন্য সিকিম আদর্শ উদাহরণ।দেখে আসুন প্রকৃতিকে কীভাবে লালনপালন করতে হয়। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া একটি গাছেও তাঁরা হাত দেননা। প্রতিটা পাহাড় কেটে পথ করেছেন, অথচ একটি পাহাড়ও আহত নয়। আর পাহাড়ে যে বাড়িঘর, ওমাগো, আমার তো চোখ ছানাবড়া !পাহাড় কেটে কী যে সুন্দর আধুনিক বাড়িঘর ওরা করেছে, না দেখলে বিশ্বাস করার উপায় নেই ! একটি পথ দিয়ে যাচ্ছি, দেখি বহু উপরে আলো জ্বলছে। ভাবি আহা কত উপরে ওরা থাকে !নাজানি কত কষ্ট হয় ওদের পাহাড়ি পথে চলতে। ওমা ! কিছুক্ষণ পরেই দেখি সেই পথটি আমরা পাড়ি দিচ্ছি।আর বাড়িগুলোও চার, পাঁচ, ছয় তলা পর্যন্ত। কী রঙিন সেসব বিল্ডিং ! লাল, নীল, সবুজ, কমলা, আকাশী – কোনটা রেখে কোনটা বলি ! কতযে রঙে ওরা নিজেদের বাড়িগুলো সাজিয়েছে না দেখলে বোঝার উপায় নেই। প্রতিটি বাড়ির সিঁড়িই পথ থেকে উঠে গেছে বাড়ি বরাবর। আমাদের মতো কোন এক্সট্রা সিঁড়ি ঘর নেই। আবার এইযে পাহাড়ে এতো ফুলের সমারোহ তাতেও ওদের তৃষ্ণা মিটেনি, প্রতিটি বাড়ির রেলিং এমনকি প্রতিটা দোকানের সামনে, রাস্তার ধারে, ছাদের উপর সার বেঁধে ফুলের টব রেখে দিয়েছে। আমি অভিভূত হয়েছি ওদের সৌন্দর্য বোধ দেখে !
সিকিমের এমজি মার্গ মার্কেট-আমাদের বসুন্ধরা সিটি মার্কেটের আদল।এখন যেমন বসুন্ধরা সিটি সময় কাটানোর, কেনাকাটা করার প্রথম চয়েস ঢাকাবাসীর, ঠিক তেমনই এমজি মার্গ
গ্যাংটকের অন্যতম আকর্ষণীয় এলাকা। জায়গাটা সকাল থেকে রাত দশটা এগারোটা অবধি লোকারণ্য থাকে। দুপাশে সারি সারি দোকান, হোটেল, মাঝখানে বসার জন্য সারবেঁধে বেঞ্চ বসানো। এখানে গাড়ির অনুপ্রবেশ নিষেধ। সাইড দিয়ে পথ উঠে গেছে বা নেমে গেছে অন্য কোন পাহাড়ে। সত্যিই অসাধারণ সুন্দর এই এমজি মার্গ মার্কেট এরিয়াটি !
আমাদের ট্যুর ছিল সিকিম টু দার্জিলিং। জিরো পয়েন্টে গিয়ে আমরা সবাইই কমবেশি সিক হয়েছি। আমাদের সঙ্গীদের অবস্থা ছিল আরো সিরিয়াস। একজন রীতিমতো শয্যাশায়ী হলেন। বাধ্য হয়ে উনারা দার্জিলিং ট্যুর ক্যান্সেল করলেন।আমরাও অনেক ভেবেচিন্তে দার্জিলিং ট্যুর বাতিল করলাম।

সকালেই শিলিগুড়ি অভিমুখে রওয়ানা দিলাম। চমৎকার জীপ পেলাম, আরও চমৎকার নেপালী ড্রাইভার।দেখতেও সুন্দর, ব্যবহারও সেইরকম। রাম্পু পর্যন্ত খুব ভালোভাবেই এলাম। ড্রাইভারের সাথে ছিল ওর ৫ বছরের ভাতিজী। ওকে রাম্পুতে নামিয়ে দিবে। রাম্পু ওকে নামালো ঠিকই কিন্তু গাড়িতে তুলে নিলো দারুণ সুন্দরী এক নেপালী কিশোরী। যেমন রূপসী তেমনই কথার সাগর। সারা রাস্তা ওর কথায় গাড়ি মুখরিত হয়ে রইলো। জানলাম মেয়েটির নাম প্রিয়া এবং ড্রাইভার ওর হবু বর। প্রিয়ার সাথে আমার দারুণ ভাব হয়ে গেলো। সন্ধ্যা নাগাদ শিলিগুড়ি শ্যামলী বাস কাউন্টারে নেমে গেলাম।
পরের দিন ইমিগ্রেশন পার হয়ে দেশের মাটিতে পা রাখলাম। আমার বুক থেকে যেন জগদ্দল পাথর নেমে গেলো। মাত্র ৫ দিন দেশের বাইরে ছিলাম তাতেই আমি হাঁপিয়ে উঠেছি ঘরে ফেরার জন্যে। দার্জিলিং যাবার শখও বাদ দিয়েছি। সত্যি বলছি, এসময়ে আমার খুব প্রবাসীদের কথা মনে হয়েছে। প্রবাসীরা শুধুমাত্র পরিবার পরিজনের কথা ভেবে বছরের পর বছর বিদেশে কী করে যে জীবন কাটাচ্ছেন কিছুটা হলেও বুঝেছি। আহা, একবারও যদি কোন পরিবার প্রবাসীদের এই আত্মত্যাগকে বুঝার চেষ্টা করতো, তবে আর একটি পরিবারেও ভাঙন ধরতোনা। কত চিন্তা, কত হাহাকার নিয়ে প্রবাসীরা নিজের জীবনকে বলী দিয়েছেন শুধুমাত্র পরিবারকে ভালো রাখার জন্য আমরা সেকথা ভুলেও ভাবিনা -অপ্রিয় হলেও সত্যি।
গাড়ি ছুটে চললো ঢাকা অভিমুখে। আবছা আলো আবছা আঁধার, আমি বাংলার প্রকৃতি দেখছি। আজ যেন নতুন রূপে মা আমাকে ধরা দিয়েছে ! আমি রূপকথার সিকিমের সাথে আমার দেশের সবুজ প্রকৃতিকে মেলাতে চেষ্টা করছি। অন্তর আমার বারবারই বলে উঠলো-
“এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবেনাকো তুমি,
সকল দেশের রাণী
সে যে আমার জন্মভূমি-
সে যে আমার জন্মভূমি-“
সে যে আমার জন্মভূমি-

সমাপ্ত