একাধারে জাতীয়তাবাদী ও বামপন্থী অধ্যাপক ও লেখক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরী’ শিরোনামে একটি মূল্যায়নধর্মী নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি রবি ঠাকুরের জাতীয়তাবাদ ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধীতা প্রসঙ্গে লিখেছেন: “বাঙালির জাতীয়তাবাদের শত্রু ছিল দু’টি। একটি বাইরের, অপরটি ভেতরের। বাইরেরটি ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী ও অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা। রবীন্দ্রনাথ এই শত্রুর বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন এবং এর বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সজাগ করতে চেষ্টা করেছেন।” [১]

অথচ আজ আমরা জানি রবীন্দ্রনাথের ব্রিটিশ বিরোধীতায় শুভংকরের ফাঁকি ছিল। ব্রিটিশ শাসনের সুবিধাভোগী জমিদার নন্দন হিশেবে তিনি ইনিয়ে বিনিয়ে সুযোগ পেলেই ব্রিটিশ শাসনের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করতেন। অনেকে বলে থাকেন যে তার নোবেল পুরস্কার পাবার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ রাজের প্রতি তার এই ওভারঅল আনুগত্যেরও একটা ভূমিকা আছে। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মূল্যায়নে এসব প্রসঙ্গ আসেনি। তিনি শুধু এক অতিসরলীকৃত রবীন্দ্র বন্দনা দিয়েই তার নিবন্ধের সূচনা করলেন।

১৯০৫ সালের প্রথম বঙ্গভঙ্গকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একটি সাম্প্রদায়িক ও প্রশাসনিক বিভাজন আখ্যা দিয়ে এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের বিরোধীতার মধ্যে কোনো সমস্যা দেখলেন না। তিনি লিখেছেন: “..১৯০৫ সালে প্রশাসনিক বিভাজনের আয়োজন করা হয়েছিল; রবীন্দ্রনাথ তার বিরোধিতা করেছেন” [২]

এই বঙ্গভঙ্গ বিরোধিতার মধ্য দিয়ে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হয়েছিল তা যে সুবিধাভোগী কলকাতা ভিত্তিক হিন্দু জমিদার শ্রেণির স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছিল এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের কোন উচ্চবাচ্য ছিল না। পূর্ব বঙ্গের সুবিধাবঞ্চিত কৃষক প্রজা শ্রেণি সহ বাঙালি মুসলিম মধ্য শ্রেণির উন্নয়নে এই নতুন প্রদেশ একটি সুযোগ হিশেবে পরিগণিত হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অসংবেদনশীলতা নিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মত রবীন্দ্র ভাষ্যকারেরা নিশ্চুপ থাকেন। উদ্দেশ্য হল রবীন্দ্রনাথের প্রশ্নহীন বন্দনা ও পূজাকে অব্যাহত রাখা।

এরপরে আমাদের এই বামপন্থী বুদ্ধিজীবি আরো গদগদ হয়ে দেবতাদর্শনের কৈশোরক বিহ্বলতা নিয়ে বলছেন যে রবীন্দ্রনাথ নাকি একাধারে সাম্প্রদায়িকতা আর শ্রেণিবিভাজনের বিরোধী ছিলেন। তিনি লিখেছেন: “বাঙালির ঐক্য ও মুক্তি তিনি (রবীন্দ্রনাথ) সর্বতোভাবে কামনা করেছেন; সে জন্য সাম্প্রদায়িকতা তো অবশ্যই শ্রেণিদূরত্বও ঘোচাতে চেয়েছেন। পারেননি। সে-ব্যর্থতা তার নয়। তার দেশবাসীর।” [৩]

হ্যা, একথা মানলাম যে রবি ঠাকুর বঙ্কিমচন্দ্রের মত ঠিক কট্টর হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। কিন্তু তিনি ব্রাহ্ম হিশেবে একধরনের ঔপনিষদিক হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক মহাভারত কল্পনা করতেন। যেই মহামানবের মহাসাগরে মুসলিম সম্প্রদায়কে তিনি ধর্মে মুসলিম হতে বলেছেন কিন্তু সংস্কৃতিতে হিন্দু হবার পরামর্শ দিয়েছেন। তার এই সম্প্রদায় চেতনায় মুসলিম স্বাতন্ত্র্যচেতনার কোন স্থান ছিল না। কাজেই সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের অবস্থান মূল্যায়নে এত সরলীকরণের কোন অবকাশ নেই।

এরপরে তিনি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও সঙ্গীত নিয়ে যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন তাতেও ধরা পড়েছে সেই কৈশোরক ভক্তিগদগদ অভিব্যক্তি। যেমন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন: “রবীন্দ্রনাথ নিজেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়। যে-বহুমুখিনতাকে আধুনিক ইউরোপ তার জন্মকালে অত্যন্ত প্রশংসা করত, রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সেই গুণ ছিল, তার আগে অন্য কোনো বাঙালির মধ্যে এটা দেখা যায়নি, পরেও দেখা যাবে বলে আশা করা যায় না” [৪]

রবীন্দ্রনাথকে বাংলা মুলুকের একমাত্র রেনেসাঁ মানব হিশেবে দেখিয়ে- এমন মহামানব আর কখনো আসবে না- এধরনের উক্তি বাগাড়ম্বর, অতিশয়োক্তি ও অতিরঞ্জন দোষে দুষ্ট। নীরদ সি চৌধুরী, শিবনারায়ণ রায় এবং আহমদ শরীফের রবীন্দ্র মুল্যায়ন অনেক বেশি পরিণত ও ভারসাম্যপূর্ণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এই উচ্ছ্বাসময় রবীন্দ্র ভাষ্য থেকে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরো লিখেছেন: “তার গান বাংলাদেশেরও জাতীয় সংগীত হয়েছে, যদিও এ বাংলাদেশ সেই অবিভক্ত বাংলা নয়, যার তিনি মুখপাত্র ছিলেন। তিনি ভারতবর্ষের, বিশ্বেরও বটে, কিন্তু তারও আগে তিনি বাংলার। বিশ্বের সঙ্গে নানা সূত্রে তার যোগাযোগ ছিল, তবে সবটাই বাঙালি হিসেবে। বাঙালির নাটকে, চিত্রকলায়, বিজ্ঞানমনস্কতায়, লোকসাহিত্যচর্চায়, ভাষাবিজ্ঞানে কোথায় তিনি ছিলেন না, কোথায় থাকবেন না, অনেককাল?” [৫]

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আজকের বাংলাদেশ যে রবীন্দ্রনাথ আকাঙ্খিত অবিভক্ত বাংলা নয় তা উল্লেখ করা সত্ত্বেও তার গান বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিশেবে যে অনেকের বিবেচনায় যথোপযুক্ত নয়- এই বিষয়টি বেমালুম চেপে গেলেন।

এছাড়া রবীন্দ্রনাথকে এভাবে স্থান-কাল-পাত্রের কাঠামোর উর্ধ্বে উঠিয়ে এমনভাবে তার এক হাইপার ভাবমূর্তি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীরা এখনো বানিয়ে যাচ্ছেন যা বাঙালি মুসলমান ও বাংলাদেশ তো বটেই এমনকি খোদ ভারতবাসীদের উত্তরোত্তর উত্তরণ ও বিকাশে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠবে। ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে সঙ্গে এক্ষেত্রে সম্পূরক পর্যালোচনারও পরিসর থাকা প্রয়োজন। তাহলে আমাদের জাতিসত্তা, পরিচয়, ধর্ম, সাহিত্য ও সংস্কৃতি গতিশীল ও সৃজনশীল হবার পরিসর খুঁজে পাবে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন: “সমাজে বিচ্ছিন্নতার দৌরাত্ম্য যে বৃদ্ধি পাচ্ছিল তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ উদ্বিগ্ন ছিলেন, জানতেন যে এর প্রধান কারণ হচ্ছে বৈষম্য, পুঁজিবাদ যে-বৈষম্যকে পুষ্ট করেছে, কিন্তু তাই বলে এই মত তিনি প্রচার করেননি যে, যন্ত্রকে পরিত্যাগ করে চলে যেতে হবে কুটির শিল্প ও ব্যক্তিগত উৎপাদনের যুগে। ‘রক্ত করবী’তে পুঁজিবাদের প্রাণবিনাশী বস্তুতান্ত্রিকতার ভয়াবহতাকে তিনি আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন। কমিউনিস্টদের তিনি বলপ্রয়োগকারী হিসেবেই জানেন, কিন্তু ‘অমৃত’ নামের কবিতায় অমিয়া যে জেলগেটে রায়বাহাদুরনন্দন কমিউনিস্ট মহীভূষণকে বরণ করে নিচ্ছে সেটা এই ভরসাতেই যে, মহীভূষণ তাকে মুক্তি দেবে অন্য এক কারাগার থেকে, সে-কারাগার উপকরণের, সে-কারাগার বস্তুতান্ত্রিকতার।” [৬]

রবীন্দ্রনাথ সোভিয়েত ইউনিয়নের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রশংসা করেছিলেন বলে, কিংবা ধনবৈষম্য দূর করার কথা লিবারেল পরিভাষায় বলেছিলেন বলে তাকে শ্রেণিবিভাজনের বিরোধী দেখিয়ে উদার সমাজতন্ত্রী বানাবার এই কষ্টকল্পিত চেষ্টাটি একদম অযৌক্তিক ও হাস্যকর। এটি সার্বিক রবীন্দ্র সাহিত্য ও চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন; রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্ব ও চেতনাকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নিজস্ব মতাদর্শের রঙে রঞ্জিত করার একটা কৈশোরক কিংবা অপরিণত প্রচেষ্টা। যা আসলে উইশফুল থিঙ্কিং ছাড়া আর কিছু নয়।

এভাবে রবি ঠাকুরের স্বকপোলকল্পিত ভাবমূর্তি রচনা করার মধ্য দিয়ে তার এই ভাষ্যকারেরা খোদ রবি ঠাকুরের চাইতে বেশি খতরনাক হয়ে উঠছেন। বামপন্থী চশমা পড়ে দেখলে সবকিছুকে বামপন্থী মনে হওয়ার এটা একটা টেক্সটবুক উদাহরণ হতে পারে।

রেফারেন্স:
[১] থেকে [৬] সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরী, দৈনিক দেশ রূপান্তর, ঢাকা, ৬ আগস্ট, বৃহস্পতিবার, ২০২০, পৃষ্ঠা ৪