সিয়ামকে আমরা সাধনার মাস বলি। সংযমের মাস বলি। একইসাথে আত্মশুদ্ধির মাসও বলে থাকি। মুসলিম মাত্রই সিয়ামের মাসকে গুনাহ মাফের অনন্য মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে থাকে। এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহ ইবাদাতের সুবর্ণ সুযোগ লাভ করে এই সিয়ামের মাসে। সিয়াম আমাদের মাঝে হাজির হয় রহমত, বরকত, ও মাগফেরাত নিয়ে। সামাজিক সাম্য ও শান্তির বার্তা নিয়ে। যেন জগতের সকল বৈষম্য দূর হয়ে দেশ ও সমাজে সর্বোপরি মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ব গড়ে উঠে। আমরা এটাও জানি যে, এই রমজান মাসেই পবিত্র কুরআন অবর্তীর্ণ করা হয়। এবং মানুষের সমস্ত আমলকে দিগুণ করে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যাতে করে প্রভুর রহমে মানুষের জীবন কল্যাণে ভরপুর হয়ে থাকে।

এতোসব কিছু জানার পরেও আমাদের মানার পরিধি কম। জানার মানসিকতা কম। এসবের কারণ হলো, আমারা যে শুধু নামে মুসলিম হয়ে আছি। ইসলামকে পরিপূর্ণ না জেনেই। এবং জানার চেষ্টা করি না। বুঝারও চেষ্টা করি না। কিংবা যেটুকু জানি তার কিঞ্চিৎ আমল করারও প্রয়োজন মনে করি না। অথচ এই রমজান সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, [হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্বপুরুষদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।] আল্লাহ তায়ালা এই আয়াতের মাধ্যমে মুমিনদের জানিয়েছেন রোজা কেবল তোমাদের উপর ফরজ করেছি এজন্যই যে, যাতে তোমরা তাকওয়ার গুণাবলি আয়ত্ত করতে পারো। পরিশুদ্ধ হতে পারো। প্রশান্তি লাভ করতে পারো। কিন্তু মানুষরা হলো এমন বেত্তমিজ জাতি। এদের কোন কিছুতেই খেয়াল থাকে না। খবর থাকে না। বেখবর। না লালন করে দুনিয়ায় শান্তির জীবন। না আশা করে পরকালে মুক্তির জীবন।

তো যারা বেখবর জীবন নিয়ে হায়াত শেষ করে তাদের জন্যই রয়েছে ভয়াবহ শাস্তির দুঃসংবাদ। তাদের খেয়াল নেই এই সিয়াম কেন ফরজ করা হলো? কেনই বা বলা হলো রমজান তাকওয়া অর্জনের মাস। এই বিষয়গুলো চিন্তা করলেই দেখতে পাই কতো রকমের সুযোগে ভরপুর হয়ে আছে রমজান। রমজান মাসেই রয়েছে ইবাদতের অপূর্ব সুযোগ। প্রভুকে সন্তুষ্টি করার সুযোগ এবং সিয়ামের মাধ্যমে নিজের আত্নাকে পরিশুদ্ধ করার সুযোগ। কিন্তু আমরা বেমালুম। সমস্ত জীবন ভুলের মাঝে কাটাই। অন্যের দোষ খুঁজে কাটাই। নানান অপকর্মের মাঝে কাটাই। এমনকি মহত্ত্বের মাসে ইবাদতের সুযোগ পেয়েও অবহেলা করে করে কাটাই।

এই যে সিয়ামকে সংযমের মাস বলে স্বীকৃতি দিই। তা আমরা কতোটুকু অন্তরে লালন করি? কতোটুকু আমরা নিজেকে সংযমে রাখি! সংযম বলতে তো দেহের চাহিদা। মনের চাহিদা। খাবারের চাহিদা। একইসাথে সকল প্রকার অপকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখার নাম। কিন্তু আমারা নানান অপকর্ম থেকে বিরত থাকি না। মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখি না। এমনকি নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারি না খাবারের চাহিদাকেও। অথচ আমাদের মাঝে ইফতার মানেই আজ বিলাসিতায় রূপ নিয়েছে। বিভিন্নরকমের তৈলাক্ত খাবারের ম্যানুতে ভরপুর আমাদের ইফতারি। বাহারি সব আইটেমে সাজানো হয় ইফতার। যতোটুকু আমাদের প্রয়োজন তারচেয়েও বেশি করি আয়োজন। এবং অবশেষে অপচয় করি। এই অপচয় করতেও আমরা দ্বিধা করি না। চিন্তা করি না। বিবেককে কাজে লাগাই না।

রমজানেই আমরা অন্যসব মাসের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বাজার করি। যাতে বিলাসবহুল খাবারে দেহ ও মন শান্তি পায়। চাঙা রাখা যায়! আমরা জানি না কম আহারের মাঝেই সুস্থতা আছে। শান্তি আছে। তৃপ্তি আছে। রাসুল তো বলেই দিয়েছেন “তোমরা ক্ষুধা নিয়ে খেতে বসো, আবার ক্ষুধা নিয়ে উঠে যাও” তাই আজকের চিকিৎসা বিজ্ঞানও বলছে মানুষ যতো কম খাবে ততো সুস্থ থাকবে। এই খাবার বিষয়ে হাদিসে আরো আরো বিধিনিষেধ রয়েছে, ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। অথচ আমরা এসব জানতে ও মানতে নারাজ। ইসলাম ও সিয়াম তো মানুষের মাঝে শুধু খাবারের জন্য আসেনি। সিয়াম এসেছে মানুষকে আত্মশুদ্ধি শেখাতে। সংযম শেখাতে। একইসাথে নৈতিকতা শিক্ষা দিতে। যাতে মানুষ সুস্থ ও সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে পারে।

সিয়ামের এই আত্মশুদ্ধি। সংযম। ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা না থাকার ফলে মানুষের জীবনে নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। নানান সমস্যা। আজ সমাজের দিকে তাকালেই দেখতে পাই। মানুষে মানুষে বৈষম্য। ধনী ও গরীবে বৈষম্য। হিংসা ও বিদ্বেষ। হানাহানি। মারামারি। খুন আর রাহাজানি। এসবেই জড়িয়ে আছে মানুষ। অন্ধকারে কালো হয়ে আছে সমাজ। মানুষের মাঝে আত্মশুদ্ধি ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে এসব অপকর্ম হয়ে আসছে। করে আসছে। রাসুল সা. বলেছেন- “যে ব্যাক্তি মিথ্যা বলা ও অপকর্ম ত্যাগ করতে পারলো না, তার দিনের বেলায় পানাহার থেকে বিরত থাকা আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই” অথচ মানুষ মিথ্যা বলে ব্যবসা ও নানান অপকর্ম করে বেড়ায়। এই রমজান মাসেও অবৈধ ব্যবসা চালু করে রেখে বাজার থেকে বাজারে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে চলছে। যা ইসলামে অবৈধ এবং হারাম।

যার দ্বারা এই অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে নিন্ম ও মধ্যবিত্ত পরিবার অসহায় হয়ে আছে। বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ অসহায় হয়ে আছে। জিম্মি হয়ে আছে পুরো দেশ ও সমাজ। রমজান মাসে রোজা রেখে। নামাজ পড়ে। এবং অন্যেআরো ইবাদত করেও তারা এমন অপকর্ম আর অবৈধ ব্যবসার মাঝে নিজেদের জড়িয়ে রাখে। অথচ তারা নিজেদের মুসলিম বলে দাবী করে। গর্ববোধ করে। তো এসবের কারণ হলো মানুষের মাঝে নৈতিকতার অভাব। রাসুলের আর্দশের অভাব। সঠিক ইসলামি শিক্ষার অভাব। সুতরাং, যদি আমরা সিয়ামের মাধ্যমে তাকওয়ারগুণ ও আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে পারি। সংযমের শিক্ষা নিতে পারি। রাসুলের আর্দশকে মেনে নিয়ে জীবন পরিচালনা করতে পারি এবং এই সিয়ামের মাধ্যমেই শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও পরকালে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারি। তবেই কেবল সিয়ামের সাধনা স্বার্থক হয়ে উঠবে। সুন্দরে হেসে উঠবে মানুষের জীবন। সর্বোপরি দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ বয়ে আনবে।