নিঝুম রাত, চারিদিকে নিস্তব্ধতা এবং সুনসান পরিবেশ। বাইরে মাঝে মাঝে পাহারাদারদের হুইসেলের শব্দ এবং কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক শোনা যাচ্ছে। কিছুক্ষন আগে দেয়াল ঘড়ি ঢং ঢং করে রাত ২টা বাজার সংকেত দিয়েছে। তথাপি সিয়ামের চোখে ঘুম নেই। পাশের ঘর থেকে বাবা ও নতুন মায়ের গল্প আর হাসাহাসির শব্দ ভেসে আসছে। মা মারা যাওয়ার পর এক মাস যেতে না যেতেই বাবা একজনকে বিয়ে করে এনেছেন। নতুন মা আসার পর থেকেই সিয়ামের জীবনে দুঃখ আরও বেশি করে জেঁকে বসেছে যতটা না সে মা মারার পর পেয়েছে।

সিয়াম সাত বছরের ফুটফুটে সুন্দর একটি ছেলে। খুবই মায়াবি চেহারা। দেখলেই মায়া লাগে এবং কাছে টেনে আদর করতে ইচ্ছে করে। এতটুকু বয়সেই সিয়ামের চোখে ছিল অনেক স্বপ্ন। মা মারা যাবার পর সব স্বপ্ন হারিয়ে গেছে। তার জীবনে সবচেয়ে বড় আফসোস বাবার অবহেলায় চোখের সামনে মা’য়ের বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরন। অনেক অনুনয় – বিনয় এবং আকুতি- মিনতি সত্বেও বাবা মাকে শহরের কোনো বড় ডাক্তারের কাছ নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাননি। এমনকি ঠিকমতো ঔষধও কিনে দেননি। মাঝে মাঝে মায়ের হাতে ঔষধ কেনার মতো টাকাও থাকতো না। সিয়াম মায়ের এসব কষ্ট দেখে স্কুলে টিফিন না খেয়ে সামান্য কয় টাকা বাঁচিয়ে তা দিয়েই মাঝে মাঝে ঔষধ কিনে আনতো। তা দেখে মা সিয়ামের ওপর রাগ করে বলতেন, বাবা সিয়াম টিফিন না খেলে স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু সিয়াম শুনতো না। সিয়াম বাবার কাছে মায়ের ঔষধের টাকা চাইলেই বাবা রাগ করে বলতেন, তোর মায়ের চিকিৎসার জন্য আমি জায়গা- জমি বেচতে পারবো না। চিকিৎসা করাতে আমি যে নিঃস্ব হয়ে গেছি।

বাবা ছিলেন খুবই গরিব ঘরের ছেলে। নানার বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করেন। সেই সুবাদে মায়ের সাথে বিয়ে। মা শ্যমলা এবং একটু খাটো প্রকৃতির। প্রথমে কিছু না বললেও পরবর্তীতে এ নিয়ে বাবা মা’কে সবসময় খোটা দিয়ে কথা বলতেন। মা মুখ বুঝে এসব সহ্য করে ভাবতেন, সন্তান আসার পর সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠেনি। মা’য়ের ওপর বাবার অত্যাচার ক্রমেই বেড়ে চলে। এমনকি মাঝে মাঝে বাবা মাকে মা’য়ের গায়ে হাত তুলতেন। মা কখনও প্রতিবাদ না করে নীরবে শুধু চোখের পানি ফেলতেন।

বাবা কারনে-অকারনে মায়ের সমালোচনা করেই যেতেন। এটা যেন তার অভ্যাসে পরিনত হয়েছিল। বিশেষ করে খাবার সময় প্রায়ই বলতেন, মায়ের রান্না না কী ভালো হয়না। নানা অজুহাতে মায়ের রান্নার ভুল ধরে অযথা বকাবকি করাই ছিল তার কাজ। অথচ মায়ের হাতের রান্নার প্রশংসা ছোট থেকেই সিয়াম সবার কাছ থেকে শুনে আসছে। এইতো এক সপ্তাহ আগে বাবার অফিসের কয়েকজন বাসায় দাওয়াত খেয়ে মায়ের হাতের রান্নার খুবই প্রশংসা করেন। শুনে মা শুধু হাসেন। মায়ের মুখে সেদিন হাসি দেখে সিয়ামের মনপ্রান জুড়িয়ে গিয়েছিল।

মা মারা যাবার আগে কোরবানি ঈদে বাবা চাচা – চাচি, ফুপা- ফুপুদের, সিয়াম এবং নিজের জন্য খুব দামী ও উন্নতমানের কাপড়-চোপড় কিনলেও মায়ের জন্য খুব কমদামি সাধারণ মানের একটি শাড়ি কিনেন। বাসায় আনার পর তা দেখে সিয়াম খুব কষ্ট পায়। কিন্তু মা বাবার কাছ থেকে হাসি মুখে শাড়িটি গ্রহণ করেন। কম দামী শাড়ি বলে মায়ের কোনো অভিযোগ ছিলনা। ঈদের দিন মা যখন শাড়িটি পরে সামনে আসেন তখন তা দেখে সিয়ামের মন খারাপ হয়ে যায় । মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে মা’কে বলে, বড় হয়ে তাকে দামী শাড়ি কিনে পরাবে। শুনে মা হেসে বলেন, আমাকে নয়, বউকে পরাবি। বিয়ের পর মায়ের কথা কী তোর মনে থাকবে? মমতাময়ী মায়ের কথায় সেদিন সিয়াম নিভৃতে অনেক কেঁদেছিল।

রাতে মা সিয়ামকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পাড়ানির গান, কখনও ভুতের আবার কখনও রুপকথার গল্প শোনাতেন। মাঝে মাঝে মা আফসোস করে বলতেন, তোর বাবা তো ব্যস্ত মানুষ। তাছাড়া আমি কালো এবং দেখতে অসুন্দর। বেমানান বলে তোর বাবা বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোথাও বেড়াতে নিয়ে যায়নি। কক্সবাজারের কথা অনেক শুনলেও সেখানে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। তোর বাবাকে অনেকবার বলেও কোনো সুফল পাইনি। বরং পেয়েছি শুধু তিরস্কার আর কটু কথা। বড় হয়ে তুই আমাকে কক্সবাজারে বেড়াতে নিয়ে যাস। একদিন ভালো হোটেলে নিয়ে খাওয়াবি। সুন্দর একটি ফুটফুটে সুন্দর মেয়ের সাথে তোর বিয়ে দেব। তোদের নিয়ে বাকী জীবনটা সুখেই কাটাবো। আমাকে শেষ বয়সে হজ্জ করাবি। বুকভরা আশা নিয়ে মা সিয়ামকে তার ইচ্ছের কথাগুলো শোনাতেন। সিয়াম মায়ের ইচ্ছের কথাগুলো শুনে খুব কষ্ট পেত। মাকে জড়িয়ে ধরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়তো তা টের পেতনা।

সিয়াম একদিন স্কুল থেকে ফিরে বাসায় ঢুকেই শুনতে পায় বাবা মাকে বকাবকি করছেন। মা মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। সে মাকে দ্রুত বাবার সামনে থেকে টেনে ঘরে নিয়ে যায়। মায়ের হাত ধরেই চমকে ওঠে কপাল ছুঁয়ে দেখে মায়ের প্রচন্ড জ্বর। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। একারণে মা ঘুমিয়ে পড়ায় রান্না করতে দেরি হয়েছে। সময়মতো খেতে না পারায় বাবার বকাবকি। ঔষধ আনার কথা শুনে মা বলেন, খোকা চিন্তা করিস না বাবা। এমনিতেই সেরে যাবে। বিকেলে মায়ের জ্বর আরও বেড়ে গেলে বাবার কাছে টাকা চেয়ে না পাওয়ায় সিয়াম পাড়ার নগেন ডাক্তারের কাছ থেকে বাকীতে হোমিওপ্যাথি ঔষধ এনে খাওয়ায়। এক সপ্তাহ ভোগার পর মা মোটামুটি সুস্থ হন।

একদিন রাতে খাওয়ার সময় মা বাবার পাশে দাঁড়িয়ে খাবার পরিবেশন করছিলেন। মা এতটাই অসুস্থ ছিলেন যে ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছিলেন না। মায়ের এ অবস্থা দেখে সিয়াম খুব কষ্ট পাচ্ছিলো। মা একপর্যায়ে বাবাকে খুবই নীচু স্বরে সংসারে তাকে সহায়তার জন্য একজন কাজের মেয়ে রাখার কথা বলেন। একথা শুনে বাবার সে কী রাগ? বলেন, কাজের মেয়ে রাখার মতো পয়সা তার নেই। উল্টো বাবা মাকে প্রশ্ন করেন, সংসারে রান্না ছাড়া তোমার আর কী কাজ? পারলে সংসারের কাজ করবে। না পারলে বাপের বাড়ি চলে যেতে পারো। এতে তার কোনো আপত্তি নেই। মা দুঃখ পেলেও বাবাকে সন্তুষ্ট করার জন্য মুখে হাসি বজায় রেখে বলেন, ঠিক আছে। কষ্ট হলেও তার কোনো কাজের মেয়ের দরকার নেই। এরপরেও বাবা মায়ের ওপর রাগ করে খাওয়া ছেড়ে উঠে পড়েন। মা তার কথার জন্য দু’হাত জোড় করে বাবার কাছে ক্ষমা চান। কিন্তু বাবা কোনো কথা না শুনে মা’কে বকাবকি করেই যান। মা অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সিয়ামের খুবই মায়া লাগে। সে বলে, মাগো তুমি চিন্তা করোনা। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে আমি তোমার কাজকর্মে সহায়তা করবো। সিয়ামের কথা শুনে মা তাকে আবেগে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকেন। মায়ের কান্না দেখে সায়েম চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনা। মনে মনে ভাবে,কেন এমন হয়?

অসুখ -বিসুখে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে না পেরে মায়ের শরীর ক্রমশ: খারাপ হতে থাকে। বাবাকে বলার পরও বাবা এবিষয়ে কর্নপাত তো করেনই না বরং ঔষধ কেনার খরচ দিতে গড়িমসি করেন। গ্রামের পল্লী চিকিৎসক রহিম আলীর কাছে বাকীতে ঔষধ আনতে গেলে তিনি অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, আমার ঔষধে কোনো কাজ হবেনা। বাবাকে বল দ্রুত শহরে নিয়ে কোনো বড় ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করাতে। তা নাহলে তোর মা’কে বাঁচানো যাবেনা। সিয়াম বাসায় এসে বাবাকে বিষয়টি জানালে বাবা রেগে বলেন, তোর মায়ের কিছুই হয়নি। কাজের মেয়ে নেওয়ার জন্য এসব তার লোক দেখানো অভিনয়। এই নে বিশ টাকা। এ দিয়ে একটি কোল্ড ড্রিংস্ এনে মাকে খাইয়ে দে। দেখবি তোর মা তরতাজা হয়ে উঠবে। রাবিশ কোথাকার? তোর মা আমার জীবনটাই বরবাদ করে দিয়েছে। এমন স্ত্রী থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। একথা শুনে সিয়াম প্রতিবাদ করে বাবার সাথে অনিচ্ছাকৃত তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়ে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে বাবা সিয়ামকে ধমক মেরে ঘর থেকে বের করে দেয়।

স্বামী ও সন্তানের সমস্ত কথোপকথন সিয়ামের মা পাশের রুম থেকে শুনতে পান। ওঠে দাঁড়ানোর মতো শক্তি তার নেই। বাবার সাথে তর্কাতর্কির জন্য সিয়ামের ওপর খুবই রাগ হয়। বাবার মুখের ওপর কথা বলার সাহস সে কোথায় পেয়েছে? আজ গালে চড় মেরে তাকে উচিৎ শিক্ষা দিয়ে জানাবে বাবার মুখে মুখে তর্ক করার পরিনাম কী? গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে তিনি বিছানা থেকে ওঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে চৌকির কোনায় লেগে মাথায় প্রচন্ড আঘাত পান এবং অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মায়ের এ অবস্থা দেখে সিয়ামের চিৎকারে পাশের বাসা থেকে লোকজন ছুটে আসে। এসময় বাবাকে ডাকতে গেলে তিনি বলেন, তোর মা অভিনয় করছে। ডাক্তার ডাক। দেখবি ভালো হয়ে গেছে। বারবার অনুরোধ করা সত্বেও বাবা মাকে দেখতে আসেননা। বরং মা’র সমালোচনা করতে থাকেন। সিয়াম বাবার এধরনের আচরণে খুবই মর্মাহত হয়।

এরমধ্যে পাড়ার একজন এমবিবিএস ডাক্তার এসে সিয়ামের মা’কে পরীক্ষা করে জানান , তিনি অনেক আগেই মারা গেছেন। একথা শুনে সিয়াম মায়ের বুকে আছড়ে পড়ে জোরে কেঁদে বলতে থাকে, মাগো কেন তুমি অভিমান করে চলে গেলে। তুমি ছাড়া আমি কীভাবে বাঁচবো। কার সাথে থাকবো? মাগো বড় হয়ে তোমার দুঃখ কষ্ট দূর করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে সুযোগ না দিয়ে তুমি ফাঁকি দিয়ে চলে গেলে না ফেরার দেশে। এখন কে আমাকে আদর করে খাওয়াবে এবং রাতে গান ও গল্প বলে ঘুম পাড়াবে। কার সাথে আমি সুখদুঃখের কথা বলবো? বাবা থাকতেও নেই। আমার যে আর কেউ রইলো না। আমি যে এতিম হয়ে গেলাম। সিয়ামের কথা শুনে উপস্থিত কেউ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননা। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শোকের ছায়া নেমে আসে। সিয়ামের আহাজারিতে পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছিল। মনে হয় প্রকৃতি যেন সিয়ামের ব্যথায় ব্যথিত হয়ে অঝোর ধারায় কেঁদেই চলেছে। সিয়াম মায়ের লাশ বুকে জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলে ভেবেই চলে, কেন তার স্বপ্নগুলো দুঃস্বপ্ন হয়ে যায়? তার এ বেদনার নেই কোনো শেষ!