কবি সুজাউদ্দিন কায়সার। জন্ম ৯ এপ্রিল ১৯৫২ সাল।দীর্ঘ জীবন পাড়ি দিয়েছেন কবিদের সাথে কবিতার পথে ।কবিতার আকাশে নিজেকে সংহত করেছেন উজ্জল নক্ষত্র মত ।সত্তর দশক তার পরিচিতির কাল।তবে দশকের পরিচিতিকে অতিক্রম করে বিচরণ করেন কাব্যাঙ্গনের মুক্ত আকাশে।সকল দশকের কবিতা প্রেমিক পাঠকের নজরে আলো বিচ্ছুরণকারী নক্ষত্রগুলোর একটির নাম কবি সুজাউদ্দিন কায়সার।কবিতার পথে, কবিতার সাথে দীর্ঘ পথ চলায় কবি সুসংহত করেছেন স্বকীয় অবস্হান। তার কবিতার আঁটসাট পঙক্তি ,শব্দ চয়নের পরিমিতবোধ,উপমার সংযোজন, ভাবনায় গভীরতা কবিতাকে করে তুলেছে অন্য রকম, স্হান পেয়েছে অনন্য উচ্চতার।
কবি স্বকীয় সৃজনপথ বিনির্মাণে ব্যস্ত।এই পথ তৈরীতে তিনি প্রয়োগ করেন তার জীবনলব্ধ জ্ঞান।তিনি জানেন জীবনের দীর্ঘস্হায়ী কতটুকু।বয়সের নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত পৌছতে ক্ষমতা ও কোন কোন সময় জরুরী।এই জরুরী বিষয়টি নিয়ন্ত্রন করেন মানুষ অভিজ্ঞতা বলে।কেননা অভিজ্ঞতা ব্যাক্তির বড় ঐশর্য।চলতে চলতে মানুষের জীবনে সুখের সাথে পাল্লা দিয়ে আসে দুঃখ,আশার মাঝে চির ধরায় নিরাশা,সম্ভাবনার পথে অনিশ্চয়তা।এইসব দুঃখ,কষ্ট,ব্যাথা,হতাশা,নিরাশায় পড়ে জীবনের প্রতি হয় নিরাশ।অন্ধকারে তখন আশার আলোর প্রদীপ নিয়ে হাজির হন একজন সৃজনকর্মী।সুজাউদ্দিন কায়সার কবি। তার দীর্ঘ পথ চলার অভিজ্ঞতা লব্ধ সাহস মিশ্রিত জ্ঞানের পঙক্তি বিতরন করেন কাব্য রসে “এখন অথবা অন্য কোনোদিন/ একটি দুর্লভ আলো যদি পেয়ে যাও/ প্রশমিত হবে সময়শ্বাস ভরে যাবে সম্ভাবনা/ (দুর্লভ আলো)”।
কবি যা ভাবেন,যা অনুভব করেন,যা দেখেন তা প্রকাশ করেন কবিতার চরণে।এই প্রকাশে ব্যাক্তিগত বিষয়াদীও উল্লেখ করেন অবলীলায়।”নিস্কৃতি নেই স্বস্হানে নিঃসঙ্গ হয়ে গেছি/( ছক পদ্ধতির সঙ্গে)” কিংবা “মানবসারল্য আমাকে গরিব করেছে/ জীবনবিশ্বাস –আমাকে বানিয়েছে/ (বহুগুন বেশি) “। অথবা তার সরলোক্তিতে পাঠক মোহিত হয় যখন কবিতায় প্রবেশ করে পড়তে থাকেন “অভাবের জ্বর টলে পড়ছে বুঁদ হয়ে থাকা বাউল বুকে/ (এসো শুদ্ধমিলন)”। চেতনার বিভ্রমে দোল খায় তখন পাঠক নিজেই।একান্ত ব্যাক্তি কথন ছড়িয়ে পড়ে সর্বজনে।তারা আয়না ঝিলিক দেখেন বিষয় ও উপমায়।
বাক্য লিখতে গেলে সব ভাষারই কিছুু যতি চিহ্ন আছে।বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নহে।দাঁড়ি কমার ব্যবহার বাক্যে অনিবার্য।সুজাউদ্দিন কায়সার কবি।কবি বলেই তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে এসব বয়কটের চেষ্টার।চিহ্নগুলো যেন রেখে দিয়েছেন পাঠকের পঠন স্বাধীনতার জন্য।পাঠকের কণ্ঠই যেন এর বিচারক।স্বর যেখানে থামতে বলবে থামবে।এটি কবির কৃতিত্ব।চোখ মেলে দেখতে পারে মনোযোগী পাঠক “কেউ জানে না ” ” দৃশ্যে অদৃশ্যে “সহ আরো অনেক কবিতায়।যেখানে কবি একটি যতি চিহ্নও প্রয়োগ করেনি।অথচ পাঠে কোন বিভ্রাটও ঘঠেনি।সুজাউদ্দিন কায়সারের বাক্যের বিন্যাস সুসংযত,শব্দের প্রয়োগে তুমুল সংযমী,শব্দচয়নে টনটনে তার পরিমিতি বোধ ।
সাধারনের চোখ আয়না দেখে,দেখে সাগর।কিন্তু একজন কবি শব্দের সাথে শব্দের সেলাই দেন চিন্তার মিহি সূতায়, তৈরী করেন আয়নাসাগর। এভাবে প্রচেষ্টা অব্যহত রাখায় কবিতা নির্মিতে তৈরী করেন মায়াহরিণ চোখ, প্রেমপুঁথির ম্যানেজার,বাঘছাল,বাতাসের কান,সূর্যস্রোত,ভন্ডস্রোত,অগ্নিবাহার ‘র মতো শব্দের নতুন অবয়ব।শব্দের সাথে শব্দের নকশী সেলাইয়ে কবি বাক্যের ভিতর সঞ্চার করেন অর্থের দ্যোতনা।”নিজেকে বাটারফ্লাই মনে হলে তো / হবে না,তবে পতঙ্গসম “/ (বাঙালী ভাই) বলে উপমাও হাজির করেন তার কবিতায়।এবং চিত্রকল্পের জন্যও অন্য কোথাও না গিয়ে এই কবিতার দেহেই অলংকৃত হতে দেখি “টাই পরবে টাই “।কিংবা যখন “কিচেন গার্ডেনে পোড়ে রসুন গন্ধী ঝাঁজ ” পাই,এবং দেখি “এই জীবনের বারোমাস, কাক চিল ওড়ে, বসে প্রজাপতি,তখন সুজাউদ্দিন কায়সারের কবিতায় খুঁজে পাই চিন্তার সাথে নন্দন তথ্যের গভীর মিলন।কবি হাজির করেন কবিতায় কারুকার্যময় শব্দের নান্দনিক পঙক্তি, যাতে থাকে উপমা,চিত্রকল্পের যথাযথ প্রয়োগ।
সময় বয়ে যায়। যেতে যেতে আটান্ন বছর অতিক্রান্ত হয়।আটান্ন বছর কেটেছে আত্মলীন,’ হৃদয়ের আলিঙ্গনে একটি নিয়ন্ত্রন ‘।এই আটান্ন বছরে এসেছে প্রেম ভালোবাসা,এসেছে বিরহ।ভালোবাসা কখনো মিশে গেছে হৃদয় বিবরে,কখনো হিসেব করে দেখা গেছে ‘ আটান্ন বছরের বদান্যতা মিশেছে কেবলই বৃষ্টির ঘরে ‘।এ হিসাব হয়তো কবির জীবনের হিসাব,অথবা তার অভিজ্ঞতার স্বারক। তবে হিসাব যাই হোক।প্রেম কবির জীবনের অনুসঙ্গ,ভালোবাসা জীবনের জন্য অনিবার্য বিষয় তাই তার সরল স্বীকারোক্তি “বরফ না কয়লা- জানি নাই ভরপেটে সুখ নিতে/ আমার তো জীর্ণ ও দীর্ণ ভালোবেসে যাবার সময়/( ভালোবেসে যাবার সময়)”। প্রেম তার জীবনের উপনীত স্বপ্ন তাই প্রেম বিরাজ করে “মনের গহিন গোপনে শুধু প্রেম,শুধুই প্রেম/ ছোঁয়া লাগে ধ্বনির প্রতিভাকাশে/ (মধুক্ষরণ হয় না শেষ)। “
সুজাউদ্দিন কায়সারের কবিতায় প্রেম ভালোবাসা রূপায়িত হয় বর্ণিল রঙে।কবির ভাষায় বলতে হয় “দুচার পঙক্তি কী লিখবো, নীল প্রেম/ সুপর্ণা সবুজ ( সুপর্ণা সবুজ) এবং প্রেম ও প্রেমিকের পরিনতি চিত্রিত হয় তার পঙক্তিতে এবং এটি তিনি ব্যাক্ত করেন প্রশ্নবোধক বক্তব্যে ” “ভালোবাসা কেনো যে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে/ কী যে বিপন্ন অনুনয় ভুলে / ( ঐ)”।
সুজাউদ্দিন কায়সারকে যতই পাঠ করা যায় উপলব্ধিতে ধরা পড়ে তিনি আপাদমস্তক প্রেমের কবি। পাঠক বুঝতে পারেন “রোদে মেঘে বৃষ্টিতে প্রেম এসেছে বিষাক্ত ডানায়/…….একদিন লাল একদিন হলুদ একদিন যাবতীয়/ অন্যদিন ফুটফুটে প্রথম স্ফুট আলো/ নিস্পাপ কুসুম ছানা/ (সকল বিস্তৃতি)”।
একুশে ফেব্রুয়ারী আমাদের অহংকার,আমাদের ইতিহাস,আমাদের গৌরব।কবি তার কবিতায় একুশকে এনেছেন শিল্পিত অবয়বে।তার বয়ানে “রক্তের অমেয় ধারা কখনো সখনো অসহযোগ করে বসে/ অকস্মাৎ দ্রীপ্র হয়,আবার ক্ষোভে ক্রোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে/ এভাবে বিলোল রক্তে জন্ম নেয় কিছু কিছু সূর্যবীজ/…………. সে – সব শব্দ চেহারা রক্তভেজা বৃক্ষগুলো একুশে ফেব্রুয়ারি / (বৃক্ষগুলো একুশে ফেব্রুয়ারি)
মধ্যবিত্ত জীবনের হাহাকার,মধ্যবিত্ত জীবনের চাওয়া পাওয়া,আশা আকাঙ্খার আলো আঁধারীর রূপ কবি যেন চিত্রিত করেন কলমের ঐশি আঁচড়ে।এবং উজ্জল হয়ে দেখা দেয় চোখের কার্ণিশে
“তবু জীবনের শব্দ শুনি মধ্যবিত্ত সংসারে নিরুত্তর/ আলো- অন্ধকারের জীবিত ও মৃত আশা- নিরাশার/…. বিক্ষুব্ধ মধ্যবিত্তের বাসনা বেলাশেষে যেন ভষ্মবহ্নি “( নিষ্ফলা)।”
‘ স্বপ্নভুক বৈভব ‘ সাতাশ বছর লুকিয়ে থেকে আবার গন্ধ বিলায়।’মায়া সভ্যতা ‘সাতাশ বছর লুকিয়ে থেকে আবার স্পষ্ঠ হয় কাছে ও দূরে।ইচ্ছের ধ্রুব সাধনায় সাতাশ বছর পর কবি সুজাউদ্দিন কায়সারের মনে হয় ‘সবে তে পথ শুরু ‘।তাই কবি অনুভব করেন মেঘের আকাশ পেরোলেই সুখদুঃখ অতিক্রম করে জীবন নতুনতর স্বপ্নশোভায় উদ্ভাসিত হবে।নিজেকে প্রবোধ দেন “দুটি চোখ জন্মান্তর দেখো “….. ‘ সবে তো পথ শুরু ‘ হতাশ হবার কিছু নেই সামনেই আছে ‘আশার ঝুমঝুমি ‘।এর আগ পর্যন্ত নিজে অটল থাকার জন্য কবি মহান বিধাতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন ‘আমাকে দাও মৌনশক্তি/ ডাকে প্রাণপ্রগতি /( সবে তো পথ শুরু)।
কবি সুজাউদ্দিন কায়সার ‘র ইতোমধ্যে” স্বোপার্জিত আত্মজা “সহ একাধীক কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ হয়েছে।বাংলালিপি প্রকাশনি প্রকাশ করেছে “সুজাউদ্দিন কায়সারের কবিতা “নামে একটি গ্রন্হ।এটি তার সমগ্র গ্রন্হ নহে।এবং এই গ্রন্হে গ্রন্হিত কবিতাসমুহ পূর্বে প্রকাশিত গ্রন্হভূক্ত নহে।এর সবগুলো কবিতা কবির বিভিন্ন সময়ে লিখা অগ্রন্হিত কবিতাসমুহের একটি মলাটবদ্ধরূপ।যা প্রকাশ হয়েছে ১৪২৪ বঙ্গাব্দের আশ্বিন -কার্তিক মাসে।একটি প্রচ্ছদে বইটির উপরিভাগকে শোভন করে তুলেছে তবে কার প্রচ্ছদ,কে এঁকেছেন তা খোঁজে পেতে কষ্ট হয়।এবই বইয়ের শাড়ি কাভার কোন রকমে খসে পড়লে শিল্পীর নাম জানা দুরোহ হয়ে যাবে।প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী মাসুক হেলাল। ১০৪ পৃষ্টার বইটির মুল্য রাখা হয়েছে ৩০০ টাকা। স্বচ্ছ ছাপা ,শক্ত বাঁধাই,উন্নত কাগজের বইটি সংগ্রহশালাকে সম্বৃদ্ধ করবে নিঃসন্দেহে।আমরা বইটি প্রসার প্রচার কামনা করি। জয় হোক কবিতার।