হো হো করে হেসে উঠেছিলেন সুনীলদা। বলেছিলেন, ‘শুধু বেঁচে নয়, আমি বহাল তবিয়তে আছি।’
ক’দিন আগের ঘটনা। সুনীলদা নন, মারা গেছেন অভিনেতা সুনীল মুখোপাধ্যায়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর ‘গৃহযুদ্ধ’-খ্যাত সেই অভিনেতা।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন শহরের বাইরে। তাঁর ম্যান্ডেভিলা গার্ডেন্সের বাড়িতে ছুটে আসেন গড়িয়াহাট থানার পুলিশ। ‘সুনীল’ শব্দটা শুনেই ওরা ভেবেছিলেন, হয়তো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মারা গেছেন। তাই উপর মহল থেকে নির্দেশ পেয়ে তাঁরা নাকি ছুটে এসেছিলেন খোঁজ নিতে। ধনঞ্জয়দার কাছ থেকে ফোন-মারফত সেই খবরটা শুনে সুনীলদা তাই হো হো করে হেসে উঠেছিলেন।
সুনীল নামের এমনই মহিমা, ‘সুনীল বললেই মানুষ আজও তাঁদের প্রিয় নীললোহিতকেই ভাবেন। সে দিন খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়েছিলেন সুনীলদা। তাও মৃত্যু সংবাদে। আজ মনে হয়, সে দিন একবারের জন্যও কি আঁতকে উঠেনি সুলীলদার নরম প্রেমিক হৃদপিণ্ড! একটুও চলকে ওঠেনি রক্ত, নিজের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে!
না, আর কোনও দিনও আর জানা যাবে না এই প্রশ্নের উত্তর। কারণ, তার ক’দিন বাদেই সত্যি সত্যিই চলে গেলেন তিনি। কার্যত আমাদের ‘অনাথ’ করে গিয়ে। আমরা যারা সুনীলদার বাড়িতে যখন-তখন যাই, তারা যে কতখানি অনাথ হলাম, মাত্র ক’দিনেই তা বুঝতে পারছি।
আমরা অনেক তরুণ কবি-লেখক, যারা রবিবার বেলা সাড়ে এগারোটা-বারোটা নাগাদ তাঁর বাড়িতে আড্ডা দিতে যেতাম, তাদের প্রশ্রয় দিতেন। আড্ডা মারতে মারতে বেলা গড়াত। মাঝে মাঝেই স্বাতী বৌদি এসে তারা লাগাতেন, অনেক বেলা হয়েছে, এ বার ওঠো। কিন্তু দেখা যেত, আমাদের ‘আর পাঁচ মিনিট’, ‘আর দশ মিনিট’-এর আবদার প্রতি রবিবারই দুপুর আড়াইটে-পৌনে তিনটে অবধি টেনে নিয়ে যেত ।
সেই আড্ডায় নিয়মিত আসত শ্রীজাত, চিরঞ্জীব, রূপক, পাপড়ি, অয়ন, সত্যজিৎ ছাড়াও আরও অনেকে। সে দিন কারা ছিলেন, এই মুহূর্তে আর মনে পড়ছে না। তবে মনে পড়ছে, দুই ‘সুনীল’কে গুলিয়ে ফেলা পুলিশের কাণ্ডকারখানা নিয়ে সে দিন তিনি বেশ মজা করেছিলেন।
যত রাতই হোক না কেন, অফিস থেকে ফিরে আমি প্রত্যেক দিনই একবার নিউজ চ্যানেলে চোখ রাখি। এটা আমার বহু দিনের অভ্যাস। কিন্তু অষ্টমীর দিন রাত সাড়ে তিনটে পর্যন্ত ঠাকুর দেখে এতটাই কাহিল হয়ে পড়েছিলাম যে, বাড়ি ফিরেই বিছানায় চলে যাই।
যে আমাকে ছোট থেকে কোলেপিঠে করে বড় করেছে, আটটা নাগাদ সেই স্বর্ণ, আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে দিয়ে দেখে তুলল। বলল, দাদা, আপনারে ভাই ডাকতাছে।
পাশের ঘরের দরজার কাছে যেতেই ছেলে বলল, আমার ফোনে একটা খারাপ মেসেজ এসেছে। খবরটা একটু দেখো তো। কে মারা গেছে…
আমি বললাম, তুই এখন জানলি? আজ নয়,দু’দিন আগেই মারা গেছেন যশ চোপড়া।
ঘুম থেকে দেরি করে উঠি বলেই অনেকে জানে, সকালে আমি কারও ফোন ধরি না। সম্ভবত সে কারণেই আমার মোবাইলে নয়, বারবার আমার বউয়ের ফোনে ফোন করছিল আমার ছোটবোন। ঠিক তার পরেই আমার ফোনটা কাঁপতে লাগল। ও প্রান্ত থেকে বোন বলল, শুনছি সুনীলদা নাকি মারা গেছেন…
আমার মনে হল, গড়িয়াহাটার ওই পুলিশগুলোর মতো ও-ও বুঝি ভুল করছে। তাই বললাম, রাখ। সক্কালবেলায় যত্তসব…
বিশ্বাস করিনি। কারণ, সে বছর কাস্তে কবি দিনেশ দাসের একশো বছর পূর্তি উপলক্ষে আলিপুর সেন্টার জেল সংলগ্ন তাঁর বাড়ির লাগোয়া রাস্তা গোপালনগরের আফতাব স্কুলের ছেলেরা দুর্গা পূজোর ‘থিম’ করেছেিল দিনেশ দাসকে নিয়ে। যেহেতু কবিকে নিয়ে থিম, ঠিক করা হয়েছিল, কোনও কবিকে দিয়েই পুজোটা উদ্বোধন করানো হবে। সঙ্গে আরও কয়েক জন থাকলে ভাল হয়। আমি জানি, সুচিত্রাদির শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। তাই সুচিত্রা ভট্টাচার্যের পরেই যাঁর নাম আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে, সেই বাণী বসুকে বলতেই, তিনি রাজি হয়ে গেলেন। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ও বললেন, এত আগে থেকে কী করে বলব! দেখি, আগের দিন বেলা দশটা নাগাদ একবার ফোন কোরো তো…
আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে বলতেই তিনি বললেন, এমনি সময় করলে অবশ্যই যেতাম। কিন্তু দিনেশ দাসের সঙ্গে যে তোমরা দুর্গাপুজোটাকে জড়িয়ে ফেলেছ, কী করে যাই! আমি তো এই সব ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাস করি না। তোমার ওখানে যদি যাই, তা হলে আরও অনেকে আমাকে ধরবে, তাঁদের পুজো উদ্বোধন করার জন্য। তখন কী করব?
সুনীলদা প্রথমটায় একটু গাঁইগুঁই করলেও আমার নাছোড়বান্দা বায়নার কাছে শেষ পর্যন্ত তিনি পরাজিত হলেন। বললেন, ঠিক আছে, যাব।
কিন্তু পঞ্চমির দিন সকালে যখন বাণীদিকে ফোন করলাম— সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ আপনার বাড়ি যাচ্ছি। আপনাকে তুলে ওই গাড়িতে করেই সুনীলদাকে নিয়ে আসব। তখন বাণীতে বললেন, সুনীল তো অসুস্থ। বম্বে গেছেন।
অসুস্থ! আমি জানতাম, ইদানিং কথা দিলেও শেষ অবধি কোনও অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না তিনি। উদ্যোক্তারা নিতে এলে বলতেন, শরীরটা খুব খারাপ। জ্বর হয়েছে। উঠতে পারছি না।
জানতাম, ওটা না-যাওয়ার বাহানা। তবু মনে মনে বললাম, সুনীলদা যে ভাবে জীবন কাটান, তাতে তো অসুস্থ হওয়ারই কথা। এই তো কিছু দিন আগে তেইশ ঘণ্টা প্লেন-জার্নি করে এসে পর দিন আমাদের সঙ্গে যখন আড্ডা দিচ্ছেন, দেখি, পা দুটো ফুলে কলাগাছের মতো হয়ে গেছে।
ক’দিন আগে গড়িয়ায় টিনার বাড়িতে আমাদের নিমন্ত্রণ ছিল। সুনীলদাকে দেখেছিলাম, সামান্য ক’টা সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে দোতালায় উঠতেই তাঁর কত কষ্ট হচ্ছিল। তাই শ্রীজাত আর ওর বউ দুর্গা বলেছিল, আমাদের সেলিমপুরের নতুন ফ্ল্যাটে সুনীলদাকে মধ্যমণি করে যে গৃহপ্রবেশের অনুষ্ঠান করার কথা ভাবছি, সেখানে তো লিফট নেই। তা হলে কী হবে! তখন আমাদের মধ্যে থেকেই কে যেন বলেছিল, কোনও চিন্তা নেই। সুনীলদার কোনও কষ্ট হবে না। আমরাই সুনীলদাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে প্রথমে শ্রীজাতর শ্বশুরের দোতলার ফ্ল্যাট নিয়ে যাব। সেখানে সুনীলদা একটু বিশ্রাম করে নেবেন। তার পরে সেই চেয়ারে করেই সুনীলদাকে তিনতলায় নিয়ে যাব।
সুনীলদাকে আমি অন্তত তিরিশ বছর ধরে চিনি। ১৯৮৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাডেমির অর্থানুকূল্যে ‘শোকপ্রস্তাব’ নামে আমার যে কবিতার বইটি প্রকাশিত হয়েছিল, তার ভূমিকা লিখেছিলেন সুনীলদা। আমি যখন সানন্দা পত্রিকায় ফ্রিল্যান্স করতাম, আনন্দবাজারে আগুন লাগার আগে ওই একই করিডরে ছিল দেশ পত্রিকার দফতর। ওখান থেকে যাতায়াতের সময় সুনীলদার সঙ্গে চোখাচোখি হত। মাঝে মাঝেই কবিতা নিয়ে তাঁর ঘরে ঢুকে পড়তাম। তখন দেশ পত্রিকার কবিতা অফিশিয়ালি সুনীল বসু দেখলেও, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পছন্দ করে দিলে সুনীল বসু সেগুলো ফেলে দিতে পারতেন না। তখন দেশ পত্রিকা ছিল সাপ্তাহিক। একই মাসে একাধিকবার আমার কবিতা ছেপে দিতেন সুনীলদা।
পরবর্তী কালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার যৌথ সম্পাদনায় বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে অজস্র সংকলন বেরিয়েছে। আমাকে নিয়ে গদ্যও লিখেছেন তিনি। মৃত্যুর এক বছর আগে এ বি পি আনন্দের রাজীব ঘোষ, য়ার একটি ইংরেজি কবিতার বই আমাদের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় শুধু উদ্বোধন করেই ক্ষান্ত হননি, ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, সেই রাজীব আর তার দাদা সুবীর ঘোষ প্রতি বছরের মতো তাদের ‘জন্মদিন’ সাহিত্যপত্রের তরফ থেকে ‘কবিতা পার্বণ’ উৎসবের আয়োজন করেছিল ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি সন্ধে ছটায়।
সে বায় আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত আমার ‘দোহাই আপনার’ কবিতার বইটিকে ওরা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত করেছিল। সুনীলদা সে কথা শুনে শুধু খুশিই হননি, সেই পুরস্কার আমার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য সস্ত্রীক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বহরমপুরে ছুটে গিয়েছিলেন। বহরমপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মোহনা-র লোকঠাসা সুসজ্জিত নেতাজি সুভাস প্রেক্ষাগৃহে দাঁড়িয়ে সুনীলদা বলেছিলেন— ‘সিদ্ধার্থ হচ্ছে সব্যসাচী লেখক। কী লিখে না ও? ছড়া, কবিতা, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ, উপন্যাস সবই। ছোটদের জন্য কি লিখেছে? লোকে বলে, আমি নাকি প্রচুর লিখেছি। আমার তো মনে হয়, ও যখন আমার বয়সে এসে পৌঁছবে, তখন আমার চেয়েও ওর বইয়ের সংখ্যা অনেক বেশি হবে।’
সংখ্যার দিক থেকে হয়তো সে বছর আমার বই কোনও ভাবে একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। বেশ আত্মশ্লাঘাও বোধ করছিলাম। কিন্তু আমার বই ঘিরে সুনীলদার প্রশংসা এবং আমোদ দেখে বুঝেছিলাম, সূর্য যেমন কীটপতঙ্গের উপরেও আলো বর্ষাতে থেমে থাকে না, একবারও ভাবে না, কে বৃহৎ কে ক্ষুদ্র, সুনীলদাও যেন তেমনই। তাঁর স্নেহ-ভালবাসা রোদ-বৃষ্টির মতোই অক্লেশে ঝড়ে পড়ত আমাদের ওপরে। আমরা ধন্য।
সে দিন বহরমপুর সার্কিট হাউসেই রাত কাটিয়েছিলেন সুনীলদা। সকাল সকাল রওনা হয়ে যাওয়ার কথা আরেকটি জায়গায়। তাই রাজীব, সুবীর আর ওদের পত্রিকার আরও কয়েক জনের সঙ্গে সক্কালবেলায় আমিও গিয়ে হাজির হয়েছিলাম সুনীলদার ঘরে।
সুনীলদা আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন। বলেছিলেন, তুমিও চলো না আমাদের সঙ্গে। কাল বিকেলের মধ্যে কলকাতায় ফিরে যাব। কিন্তু সে দিন সন্ধ্যাবেলার মধ্যে আমাকে অফিসে পৌঁছতেই হবে। টিকিটও কাটা আছে। তাই সে দিন ইচ্ছে থাকলেও সুনীলদার সফর-সঙ্গী হতে পারিনি। এখন ভাবতে গেলেই মন খারাপ হয়ে যায়। প্রতি বছর বইমেলার সময় প্রকাশিতব্য আমার বইয়ের সংখ্যা বলতে আমার নিজেরই লজ্জা করে।
মৃত্যুর দু’বছর আগে সুনীলদর জন্মদিন উপলক্ষে না, ৭ সেপ্টেম্বর নয়, তার আগের দিন ৬ সেপ্টেম্বর, রাত থেকে মধ্যরাত অবধি সুনীলদাকে নিয়ে এক আড্ডার আয়োজন করেছিল দিপ্তেন্দুদা। প্যারিস-নিবাসী আমাদের দিপ্তেন্দু চক্রবর্তী। গড়িয়াহাট মার্কেটের পাশেই, দিব্যেন্দু পালিত, শরৎ মুখোপাধ্যায, বিজয়া মুখোপাধ্যায়ের আবাস-ভূমি ‘মেঘমল্লার’-এ।
আমার যে সে বছর বইমেলায় বত্রিশটা বই বেরোচ্ছে, সেটা জানতেন কবি সুবোধ সরকার। তিনি সে দিন ওখানে সুনীলদাকে সে কথা বলতেই, সুনীলদা বলেছিলেন— বত্রিশটা! অনেক দিন আগে একবার বইমেলায় আমার সবচেয়ে বেশি বই বেরিয়েছিল একসঙ্গে তেইশটা। তাও দ্বিতীয় সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ-টুদ্রণ নিয়ে। আর ওর বত্রিশটা! তা হলে এ বার তো ও শুধু আমার রেকর্ডই ছাপিয়ে গেল না, ব্যাপারটাকে পুরো উল্টো করে দিল। তেইশের দুইটাকে তিনের সামনে থেকে তুলে তিনের পরে বসিয়ে দিল!
সুনীলদা এ ভাবেই কথা বলতেন। নীললোহিত বলতেন একটু অন্যরকম ভাবে। আর সনাতন পাঠক? সত্যিই তিনি চিরকালীন পাঠক। তাই কোনও বই পেলেই আগে উল্টেপাল্টে পড়ে নিতেন। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, পরে পড়ব বলে রেখে দিলে সেটা আর কোনও দিন পড়াই হবে না। পড়ে থাকবে। আর কোনও বই পড়া হয়ে গেলেই, বসার ঘরের এক দিকে টাল দিয়ে রেখে দিতেন। যাতে তাঁর বাড়িতে আসা অন্য কোনও বইপ্রেমী সেই বইগুলো নিয়ে যেতে পারেন। পড়তে পারেন।
সুনীলদা যত বড় কবি-লেখক-উপন্যাসিক, তার চেয়েও অনেক অনেক অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন। তাই শুধু যোগ্য লোককেই নয়, যাঁরা তাঁর কাছে আসতেন, ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতেন, তাঁরা অযোগ্য হলেও শুধুমাত্র ভালবাসার খাতিরেই তিনি তাঁদের দু’হাত উজাড় করে দিতেন। কারও নাম সুপারিশ করে দিতেন স্কলারশিপের জন্য। কারও নাম অতিথি কবি ও সাহিত্যিক হিসেবে রেকমেন্ড করে দিতেন বিদেশ যাওয়ার জন্য। কারও নাম বলে দিতেন পুরস্কারের জন্য।
আর টাকা পয়সার ব্যাপারে? এ রকম উদাসীন মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। বিভিন্ন কারণে নানান প্রকাশনী থেকে তাঁর পাওনা টাকা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চেকে নিয়ে আসতাম ঠিকই, কিন্তু অনেকেই আবার খামে করেও টাকা দিতেন। আমি যত বার সুনীলদাকে নগদে টাকা দিয়েছি, উনি কোনও দিনই গুনে দেখেননি, কত দিলাম। শুধু আমি নই, অন্য কেউ টাকা দিয়ে গেলেও, উনি কোনও দিনই দেখতেন না, কে কত দিয়ে গেল।
পরেও যে দেখতেন না, তার প্রমাণ, ওই টাকা পাওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই হয়তো কিছু আনার জন্য ওখান থেকেই ধনঞ্জয়দাকে টাকা বের করে দিতেন। কিংবা অন্য কাউকে অন্য কোনও কারণে দিয়ে দিতেন।
মনে আছে সে বছর শৈব্যা প্রকাশনীর কর্ণধার সোমনাথ বলকে নিয়ে আমি যখন সুনীলদার বাড়িতে গিয়েছিলাম, রয়্যালটি বাবদ সুনীলদার প্রাপ্য টাকা সোমনাথ একটা খামে ভরে সুনীলদাকে দিতেই, সুনীলদা স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় তাঁর নির্দিষ্ট চেয়ারের বাঁ হাতের সেলফের একটা তাকে রেখে দিয়েছিলেন। শুধু তাই-ই নয়, কত টাকা লেখা আছে না-দেখেই, রিসিপ্টের পেছন পাতায় সই করে দিয়েছিলেন। সুনীলদা এমনই।
সে দিন ‘কিশোর জ্ঞান-বিজ্ঞান’-এর শারদীয়া সংখ্যার জন্য লেখা চাইতেই সুনীলদা বলেছিলেন, এখনও উপন্যাসটাই শেষ করতে পারিনি, কখন লিখব? তার পরেই বলেছিলেন, একটা কাজ করতে পারো। কয়েক বছর আগে ‘সন্দেশ’-এর নাম করে আমার কাছ থেকে একটা গল্প নিয়ে গিয়েছিল সুজয় বলে একটা ছেলে। সেটা সন্দেশে ছাপেওনি। আমাকে ফেরতও দিয়ে যায়নি। আমার কাছে ওটার কোনও কপিও নেই। আমি সন্দীপকে ফোন করেছিলাম। শুনলাম, ও নাকি ওখানে লেখাটা দেয়ইনি। ওখানে আর কাজও করে না। ওই লেখাটা ওর কাছ থেকে জোগাড় করতে পারবে? কল্পবিজ্ঞানের গল্প। পেলে তোমাদের কাগজের পক্ষে ভালই হবে।
সুজয়, মানে সুজয় সোম। এক সময় সন্দেশের হয়ে কাজকর্ম করত। আমি চিনি। এমনও হয়েছে যে, রাত বারোটার পরে আনন্দবাজারে এসে আমার কাছ থেকে নীরেনদা, মানে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা নিয়ে গেছে।
কিন্তু না। ওর যে ক’টা ফোন নম্বর আমার কাছে ছিল, তত দিনে সেগুলো অকেজো হয়ে গেছে। ওর সঙ্গে আর যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি। উদ্ধার করতে পারেনি সেই লেখাটাও। বহু দিন আগে হঠাৎ করে উধাও হয়ে যাওয়া সুনীলদার লেখা অপ্রকাশিত কবিতা-ভর্তি খাতার মতো সেটাও বুঝি আর কোনও দিনই পাঠকদের কাছে গিয়ে পৌঁছবে না।
সেই লেখা জোগাড় করতে পারেনি শুনে সে বার ‘কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান’-এর শারদীয় সংখ্যা বেরোনোর মাত্র দিনসাতেক আগে উনি অবশ্য একটা নতুন গল্প লিখে গিয়েছিলেন। যা আরও মূল্যবান করে তুলেছিল ওই সংখ্যাটিকে। সুনীলদা এ রকমই।
সুনীলদার এই চলে যাওয়াতে বাংলা সাহিত্যের তো অপূরণীয় ক্ষতি হলই, ক্ষতি হল ওই সব লোকজনেরও। যাঁরা তাঁর পাশে থেকে তাঁর আলোয় আলোকিত হতেন। মনে করতেন, আমরাও এক একটা কেউকেটা। এ বার যে তাঁদের কী হবে, কে জানে! ইতিমধ্যেই তো তাঁদের বেশির ভাগই বাংলা বাজার থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছেন। না, আমি তাঁদের কারও নাম বলব না।
আসলে সুনীলদার পুরো ব্যাপারটাই ছিল নায়কোচিত যে কোনও হেরে যাওয়া, পিছিয়ে যাওয়া লোককে জিতিয়ে দিতে পারলেই যেন তিনি আনন্দ পেতেন। সেটা জীবনের ক্ষেত্রেই হোক বা তাঁর সৃষ্ট কোনও চরিত্রের ক্ষেত্রেই হোক। সে জন্যই বুঝি তাঁর অন্যতম অমর গোয়েন্দা চরিত্র কাকাবাবুকে শারীরিক দিক থেকে পঙ্গু করেও শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাকে সফল করাতেন।
না, উনি কখনও কোনও ধর্মে বিশ্বাস করতেন না। ওঁর কাছে সবচেয়ে বড় ধর্ম ছিল— মানুষকে ভালবাসা। মানুষের মুখে হাসি ফোটানোটাই ছিল ওঁর কাছে সত্যিকারের পুজো।
না দিনেশ দাসকে নিয়ে গোপালনগরের থিম-পুজোয় তিনি আসেননি। তাই সে দিন পূজো মণ্ডপে উদ্বোধন করা যায়নি সুনীলদা আর আমার যৌথ ভাবে সম্পাদিত প্রেমের গল্পের সংকলনটি। বইটির প্রচ্ছদ করেছিল আমার ছেলে শুভঙ্কর সিংহ। সুনীলদা ওকেও খুব ভালবাসতেন। ও আর আমি ঠিক করেছিলাম, আনুষ্ঠানিক প্রকাশ যখন হলই না, না হোক। পুজোর পরে বিজয়া করতে গিয়ে বইটা দিয়ে আসব। কিন্তু কাকে দেব! তার আগেই যে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। আমরা একেবারে অনাথ হয়ে গেলাম। আমাদের মাথার ওপর আর কোনও অভিভাবক রইল না। পায়ের নীচেও কি মাটি রইল!